ফের দাসত্বের কবলে নেপালের কৃষি শ্রমিকরা

poverty sends nepal 2_55993_1

২০০৮ সালে মাওবাদীদের নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার দেশটি থেকে বন্ধকী শ্রম প্রথা উৎখাত করে। সেসময় সরকার ওই প্রথার শিকারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।
সরকারের ওই পদক্ষেপে হরিলাল পারিয়ারের মতো আরো অনেকেই বন্ধকী শ্রমের নামে কার্যত দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ আর পাননি তারা। ফলে পারিয়ারকে ফের তার ভুমি প্রভুর কাছেই ফিরে যেতে হয়।

৩৮ বছর বয়সী পারিয়ার বার্তা সংস্থা এএফপির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, গত ছয় বছরে কিছুই বদলায়নি। জন্মের পর থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত আমার ভুমি প্রভুই আমার জীবনের মালিক আছেন।

download

নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার ছয় বছর পরও নেপালে বন্ধকী শ্রম প্রথা এখনো পুরো মাত্রায় বিরাজমান। হালিয়া নামে পরিচিত দেশটির ভুমিহীন কৃষি শ্রমিকরাই প্রধানত এই প্রথার শিকার। হালিয়ারা বন্ধকী শ্রমিক হিসেবেই জন্মগ্রহণ করেন। এরপর এক প্রজন্মের ভুমি প্রভুর হাত থেকে অন্য প্রজন্মের ভুমি প্রভুর কাছে হস্তান্তরিত হন।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের সাবেক মাওবাদী বিদ্রোহীদের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার হালিয়াদেরকে বন্ধকী শ্রম থেকে মুক্তি দেয়ার পদক্ষেপ নেয়ার পর অনেকেই নিজের জীবনে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। মাওবাদীরা ক্ষমতায় আসার কয়েকমাস পরই নেপালের আড়াইশো বছরের পুরোনো রাজতন্ত্র উৎখাত করে এবং নেপালকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।

মাওবাদীরা শত বছরের আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। যে দেশের নাগরিকদের প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করেন (দৈনিক আয় ১.২ ডলার বা ১০০ টাকারও নিচে) এমন একটি দেশের মানুষদের ভাগ্য বদলানোর জন্য একটি নুতন সংবিধান প্রণয়নেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মাওবাদীরা।

download (1)

কিন্তু নতুন সংবিধান বা রাষ্ট্র গঠনতন্ত্র নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নেপালের আইন প্রণেতাদের অব্যাহত কলহে দেশটির হালিয়া বা ভুমিহীন শ্রমিক শ্রেনীসহ কোটি কোটি নেপালি হতাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন।

মাওবাদীদের পতনের পরবর্তী সরকারগুলোও হালিয়াদের ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ করা হয়নি। আর বহুদিনের প্রতিশ্রুত ভুমি মালিকানার সংস্কার কর্মসুচিও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে হালিয়াদের জীবন আজও ভুমি প্রভুদের দয়ার উপরই নির্ভরশীল রয়ে গেছে।

লাঙ্গল টানতে টানতে পারিয়ারের হাতে কড়া পড়ে গেছে আর কাঁধে সৃষ্টি হয়েছে দূরারোগ্য ব্যাথা। ছয় পুরুষ আগে থেকে পারিয়ারদের এই বন্ধকী শ্রমিকের জীবনের সূত্রপাত ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে দৈনিক ১৫ ঘন্টা করে কাজ করা শুরু করেন পারিয়ার। বিনিময়ে তার জন্য খাদ্য ও বাসস্থানের বন্দোবস্ত করেন তার ভুমি প্রভু।

পারিয়ার বলেন, ‘আমরা ভুমি প্রভুর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মতোই। আমার দাদা তার জন্য কাজ করতেন এরপর আমার বাবাও তার হালিয়া ছিলেন। আর এখন আমি তার জমি চাষবাস করি।’

হিমালয় উপত্যকার তিহি নামের একটি গ্রামে পারিয়ারের বসবাস। বিদ্যুৎ ও পানিহীন গ্রামটিতে আরো কয়েকটি হালিয়া পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে।

পারিয়ারের মতো বেশির ভাগ হালিয়াই হিন্দু সম্প্রদায়ের দলিত বা অচ্ছুৎ বর্ণের সদস্য। গ্রামের উচ্চ বর্ণের বাসিন্দাদের ঘর, উপাসনালয় ও জলাধারে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি উচ্চ বর্ণের লোকদের গৃহপালিত পশুর বসত ঘর এবং ব্যবহৃত জলাধার মাড়ানোর অধিকারও নেই তাদের! শুধুমাত্র জমিতে কাজ করার সময়ই ভুমি প্রভুরা সামান্য মানবিক মর্যাদা দিয়ে থাকেন দলিত ও অচ্ছুৎদের। তাদের নেই কোনো ভুমি, নেই কোনো বাসস্থান এবং শিক্ষার সুযোগ।

দুই একজন যদিও বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় কিন্তু শ্রেণিকক্ষেও তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। নিম্নবর্ণের শিশুদেরকে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে নয় বরং মেঝেতে বসতে দেয়া হয়।
নেপালের সংবিধান লেখা হয়েছে পুরোপুরি দেশটির উচ্চ বর্ণের ভুমি প্রভুদের স্বার্থের অনুকুলে। দেশটির সব ভুমিই উচ্চ বর্ণের কব্জায়। ফলে হালিয়াদেরকে বেঁচে থাকার জন্য ভুমি প্রভুদের চাপিয়ে দেয়া শর্ত মেনে নেয়া ছাড়া সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।

হালিয়াদের পুনর্বাসনের দায়িত্বে থাকা লক্ষণ কুমার হামাল নামের এক সরকারি কর্মকর্তা অবশ্য অর্থের অভাবে হালিয়াদের পুনর্বাসন করা যাচ্ছে না বলেই জানান। তিনি বলেন, অর্থের অভাবে হালিয়াদের পুনর্বাসনের জন্য একবারেই প্রয়োজনীয় সব জমি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

images (1)

২০০৬ সালে মাওবাদি বিদ্রোহী ও নেপাল রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিতেও ভুমি মালিকানায় সামন্ত প্রথা উৎখাতের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক ভুমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়। কিন্তু এরপর থেকে আজও পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলই ভুমি প্রভুদেরকে হালিয়াদের মাঝে জমি বন্টনের তাগিদ দেয়নি।

সরকার কর্তৃক চিহ্নিত ১৯ হাজার হালিয়া পরিবারের মধ্যে মাত্র ৮০টি পরিবারকে কিছু ভুমির মালিকানা দেয়া হয়েছে।

এক শীতের সকালে পারিয়ার তার ভুমি প্রভুর একখণ্ড পাহাড়ী জমিতে চাষ দিতে দিতে বলছিল এই দাস প্রথার অবসানের চেয়ে আর অন্য কোনো কিছুই তাকে বেশি সুখী করতে পারবে না। অথচ এই বন্দিশালা থেকে বের হয়ে একটি দিন কাটানোর স্বপ্নও আমি আর এখন দেখতে পারছি না।

সুত্র – dhakatimes24.com

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.