ভারতের মাওবাদী নারী গেরিলারা –

  naxalsstory

শারীরিক কাঠামোয় ক্ষীণ হলেও তাদের হালকাভাবে নেওয়াটা বোকামি। যুদ্ধকঠোর, লক্ষ্যে অবিচল এখানকার মাওবাদী নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষ কমরেডদের মতই সমান দুর্ধর্ষ ও প্রতাপমণ্ডিত। মাওবাদী আন্দোলন তাদের দিয়েছে পরিচয়, যে পরিচয়ে তারা গর্বিত।

মহারাষ্ট্র-ছত্তিসগড় সীমান্তের কাছে নদী তীরবর্তী জঙ্গলের বেশ বড় একটি ফাঁকা জায়গায় পাথরের বিশাল এক চাঁই এর উপর মাওবাদী কমান্ডার তারক্ক বসে আছেন। পরনে শার্ট এবং জলপাই সবুজ পাজামা। কেরোসিন ভেজানো টুথব্রাশ দিয়ে তার একে-৪৭ রাইফেলটা পরিষ্কার করছেন। কানে তালা লাগানো নদীর গর্জন আর নিশাচর পোকামাকড়ের শব্দ চারপাশের পরিবেশকে অদ্ভুত করে তুলেছে। বিষাক্ত সাপ, কদাকার মাকড়শা, বুনো শুকর এমনকি ভাল্লুকদেরও আবাসস্থল মাওবাদীদের এই ক্যাম্প। এক ঘন্টা আগে বিশাল একটি সাপ মারা হয়েছে যেটির মুখের ভিতর ছিল আরেকটি সাপ । তারক্ক হেসে বললেন, “পুলিশ এখানে আসে না, ওরা জানে এখানে এলে ওরা মরবে”।

“ভাল কথা, আপনি তিত করল্লার চাটনি খেয়ে দেখেছেন? আমি বানিয়েছি”, বন্দুকে ম্যাগাজিন ভরতে ভরতে তারক্ক বললেন। একটা ক্লিক শব্দের সাথে বন্দুকের ভিতর ম্যাগাজিন ঢুকে গেল।

তারক্ককে ঘিরে মাওবাদী গেরিলাদের একটি প্লাটুন- যাদের অধিকাংশ অল্পবয়সী নারী পুরুষ- নিখুঁতভাবে দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদন করছে। মহিলারা কুঠার নিয়ে কাঠ কাটতে গেলে পুরুষেরা রান্নার কাজ করে। নিরাপদ খাবার পানির জন্য পানি ফুটানো হয়। একপাশে কয়েকজন গেরিলা রাতে পাহারার দায়িত্ব সেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিছু মেয়ে নিজেদের মাঝে পড়াশোনা করছে, দুজন তাদের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, ছোট টেপ রেকর্ডারে গোন্ডি ভাষার গান বাজছে। আরেকটি তাঁবুতে সামরিক কৌশলের উপর ক্লাশ নেওয়া হচ্ছে। এক কোণে বসে মাওবাদী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর একজন গেরিলা তাদের অনুষ্ঠানের মহড়া দিচ্ছে। যে যাই করুক, হাতের কাছে বন্দুক সর্বদা প্রস্তুত।

বর্ষার সময় জীবন এখানে অনেক কঠিন। বৃষ্টির জলে ভরা নদী নালা পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কয়েকদিন চলার পর আমরা ক্যাম্পে পৌঁছেছি। অঝোরধারায় বৃষ্টি আর যেদিকে চোখ যায় সেদিকে পরিপূর্ণ সবুজ। সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা ভিয়েতনাম বলে মনে হয়। রাতে আমরা তাঁবুতে কিংবা গ্রামের সীমানায় আদিবাসীদের নিরিবিলি যে কুঁড়েঘর গুলো আছে সেখানে থাকব। অন্ধকারে কেবল আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়; কারও বা কাশির শব্দ, আবার কেউ মশার হাত থেকে রক্ষা পেতে মশা নিবারক মলম বের করে শরীরে লাগাচ্ছে।

ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগের রাতে আমরা একটি আদিবাসী গ্রামে মাওবাদীদের ছোট দলটার সাথে যাত্রা বিরতী দিয়েছি। একজন আদিবাসী লোক কয়েক নলা ভাত গলায় ঠেলে দিয়ে খানিকক্ষণ পর কেঁদে উঠে। হয়তো মহুয়ার রসের প্রভাবে অথবা হয়তো মদের প্রভাব ছাড়াই।

 “কাঁদছেন কেন”? গোন্ডি ভাষায় জানতে চাইলেন মাওবাদী নেতা সামায়া। “কান্না পাচ্ছে”, জবাব দিল লোকটি।

নিভৃত অরণ্যে

 পরদিন বিকেলে আমরা মাওবাদীদের ক্যাম্পে পৌঁছলাম। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব। আর সব জায়গা থেকে নিয়মিত নির্দেশনা আসছে। হঠাৎ হঠাৎ দিনে রাতে যে কোন সময়ে সশস্ত্র গেরিলা দলের আগমন ঘটে কমরেড নর্মদার কাছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কমরেড নর্মদার বয়স ৪৮। ৩০ বছর ধরে তিনি এই অরণ্যে বাস করছেন। খোঁজ খবর নেবার জন্য বিনীতভাবে সামনে থেকে উঠে গেলেন। মাওবাদীদের দলগুলো নিয়মিতভাবে স্থান পরিবর্তন করে থাকে, বিশেষ করে তাদের প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে যেখানে পুলিশের এমবুশের মুখে পড়ার ভয় নেই  সেসব এলাকায় তারা প্রায় স্বাধীন ভাবে চলাচল করে। আমরা জানতে পারলাম ক্যাম্পের সবচেয়ে কাছের গ্রামে পুলিশ আসার ঘটনা শেষ ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে।

 

যখন মাওবাদীরা কোন ক্যাম্প স্থাপন করে, সেটি গ্রামবাসীদের জন্য একটি দেখার মত দৃশ্য হয়। ভীড়ের মধ্য থেকে গলা বাড়িয়ে সবাই দেখার চেষ্টা করে। এখানেও, ক্যাম্প এলাকার সীমানায় একদল আদিবাসী জড় হয়েছে। আমার ফরাসী সাংবাদিক বন্ধু ভানেসা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে আর নর্মদা সেটা গোন্ডি ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ভানেসা আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় এখানে কোন স্কুল আছে কিনা আর সেখানে কখনো কোন শিক্ষক পড়ান কিনা।

 

নর্মদা প্রশ্নটা বুঝিয়ে দিলেন। কয়েক সেকেন্ড সবাই নীরব। তারপর ওদের মাঝে ডলু নামে একজন হাসতে আরম্ভ করে। তার হাসি আর থামতেই চায় না। শেষ পর্যন্ত যেন প্রায় গলা চেপে ধরে ও হাসি থামালো। “গুরুজী!” ‘দিল্লী’ শব্দটা ও যেমন বিস্ময়ের সাথে উচ্চারণ করে, ‘গুরুজী’ শব্দটাও সেই একইরকম বিস্ময়ের সাথে উচ্চারণ করল। “গুরুজী, তিনিতো প্রতি বছর ১৫ই অগাস্টে আসেন, পতাকা তোলেন, ব্যাস। আমরা আর কোনদিন তাকে দেখতে পাই না,” যেন স্কুল শিক্ষক সম্পর্কে কেন কেউ কিছু জানতে চাইবে এটাই সে বুঝতে পারছেনা। যেন এমন করাটাই স্কুল শিক্ষকদের পক্ষে স্বাভাবিক ঘটনা।

 

 অল্পবয়সী এক মহিলা -বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে- হেঁটে গিয়ে একটা কুকুরকে লাথি লাগালো। ওটা চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে চলে গেল। একপাশে দুজন মাওবাদী বসে ছিল। ওদের পাশে গিয়ে আশ্রয় নিল কুকুরটা।

 

অবাক হলাম। এখানে বসবাসরত আদিবাসীরা আর এখানকার কুকুরগুলো যে আচরণ পাচ্ছে তার ভিতর সত্যি কি কোন তফাৎ আছে? মহিলাটির কাছে পদাঘাত পেয়ে কুকুরটি আশ্রয় নিল মাওবাদীদের কাছে। রাষ্ট্রের কাছে পদাঘাত পেয়ে এই আদিবাসীরা আশ্রয় নেবে কার কাছে?

 

 

তারক্কর বিদ্রোহ

গাদচিরোলিতে গ্রামের বয়স্ক কিছু মানুষ বসে নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন। মহারাষ্ট্রের এই জেলাতেই ১৯৮০ সালে মাওবাদীরা প্রবেশ করেছিল। সেসময় আদিবাসীদের উপর শোষণের মাত্রা ছিল তুঙ্গে। বনবিভাগের কর্মকর্তারা, বড় শহরের ব্যবসায়ীরা এবং কন্ট্রাকটররা ওদের উপর লু্ণ্ঠন চালাতো। এটা ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। কৌশলী ব্যবসায়ীরা আদিবাসীদের খাদ্যাভাসে লবণের পরিচয় ঘটায়। এক কেজি লবণের বিনিময়ে তারা এক কেজি পরিমাণ শুকনো ফল নিয়ে যেত। এই অঞ্চলে কাজ করছেন এমন একজন সমাজকর্মীর সাথে আলাপ করে জানা গেল জঙ্গলে থাকা এবং বন থেকে জ্বালানী কাঠ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহের অনুমতি দেয়ার বিনিময়ে  বনবিভাগের একজন কর্মকর্তা দারিদ্র নিষ্পেষিত আদিবাসীদের থেকে তিন মাসে এক লাখ আদায় করেছিল। টেন্ডু পাতা ও বাঁশ ঠিকাদারদের পরোক্ষ মদদে এই কর্মকর্তারা তাদের দিয়ে নামমাত্র মজুরীতে আবাদী জমিতে কাজ করাতো। আর সর্বোপরি আদিবাসী নারীদের উপর ছিল যৌন নির্যাতন।

 

এই সব অবিচারের ঘটনা তারক্ককে উদ্যোগী করে তোলে। মা বাবার নিষেধ উপেক্ষা করে তারক্ক গাদচিরোলিতে তার গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় চলে যান যেখানে মাওবাদী বিদ্রোহীরা আশির দশকের শুরুর দিকে একটি ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। প্রথমদিকে গ্রামবাসীরা তাদের ডাকাত ও লুটেরা ভেবে ভয় পেত। শেষে কেউ যখন তাদের সাথে মিশছিল না, তখন বিদ্রোহীরা গ্রামের একটি ছেলেকে পেয়ে তাদের আদর্শ, লক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী তার কাছে ব্যাখ্যা করে। এভাবে তাদের কথা ছড়িয়ে পড়ে। তারক্ক জানান, প্রতি বছর তাদের বাড়িতে বন কর্মকর্তারা ধান ও জোয়ার নেবার জন্য আসত। “এগুলো কেন ওদেরকে দিচ্ছ?’ আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু বাবা শুধু আমাকে চুপ করে থাকতে বলত”। শেষ পর্যন্ত, তিনি গোপনে নদী তীরবর্তী এলাকায় যান এবং শংকর আন্না নামে একজন শীর্ষ পর্যায়ের মাওবাদী নেতার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তারক্কর বয়স তখন ১৫। বছর কয়েক পর ১৯৮৬ সালে তিনি বিপ্লবীদের সাথে সার্বক্ষণিক হিসেবে যোগদান করেন। তার প্রথম সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা হয় ১৯৯৩ সালে যখন তার দল একটি পুলিশ পোস্টের উপর হামলা চালায়। শেষবার তিনি এ ধরনের অভিযান দেখেন ২০০৮ সালে যখন তাদের ক্যাম্পের উপর পুলিশ গুলি চালায়। তবে তারক্কর নাম লক্ষণীয়ভাবে পরিচিতি পায় ২০০৯ এর অক্টোবরে গাদচিরোলির লাহেরি এলাকায় পুলিশের উপর হামলার ঘটনায়। এ হামলায় ১৭ জন পুলিশ খতম হয়। একটি উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে তারক্ককে এ হামলার নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয় ‘তিনি এমন একজন নারী যিনি শুধুমাত্র নকশাল আন্দোলনে তার প্রতিশ্রুতিশীলতার জন্যেই নয়, তার সৌন্দর্যের জন্যেও পরিচিত’। এ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করাতে প্রায় কিশোরীর মত হেসে উঠেন তিনি; বন্দুকে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “না, লাহেরিতে পুলিশের উপর হামলার দলে আমি ছিলাম না”। মাওবাদীদের আশ্রয়ে যোগদানের কারণগুলো তারক্ক যতটা সহজে উল্লেখ করেন, অল্পবয়সীদের অধিকাংশই এ বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যায়। ভাষাগত বাধা এর প্রধান কারণ। এমনকি নেতারা যারা গোন্ডি ভাষায় কথা বলেন তারা অনুবাদকের ভূমিকা পালন করলেও অল্পবয়সী গেরিলারা বেশি কিছু বলতে চায় না, বিশেষ করে মেয়েরা।

 

ওরা কেন এখানে যোগ দিয়েছিল এটা জানতে চাওয়া যেমন অর্থহীন, তেমনি আদিবাসীদের কাছে জানতে চাওয়া অর্থহীন উন্নত জীবনের জন্য তারা কী চায়।

 

মাওবাদী আন্দোলনে অংশ নেবার কারণ জানতে চাইলে কমবয়সী ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশের কাছ থেকে কোন সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যায় না।

 

দলের উঁচুস্তরের নেতাদের রাজনৈতিক নির্দেশনার ফলে হয়ত বছর কয়েকের ভিতর তারা “শ্রেণী সংগ্রাম”, “কৃষক বিদ্রোহ”, এ শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে উঠবে কিংবা তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো উত্তোলিত হয়ে জানাবে ‘লাল সালাম’। তবে এর মূল কারণ যুদ্ধ। এটা তাদের মাঝে এক ধরনের দলগত বন্ধন সৃষ্টি করে, নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্য করে এবং জীবনকে অর্থমণ্ডিত করে তোলে।

 

পরিচয়ের খোঁজে

বছরের পর বছর জঙ্গলে ঘুরে আমি এটা উপলব্ধি করেছি যে, গোটা ভারত থেকে অসহায় ভাবে পরিত্যাক্ত এসকল আদিবাসীর সাথে উন্নত জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। পেট ভরানোই তাদের জন্য প্রধান চিন্তা। আমরা এখানে এসে পৌঁছনোর মাত্র এক সপ্তাহ আগে মাওবাদীদের ক্যাম্পের পাশেই এক গ্রামে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দুজন মারা যায়। গ্রামবাসী জমিতে ফসল উৎপাদন করে কিন্তু চাষাবাদ সংক্রান্ত সঠিক জ্ঞানের অভাবে শস্যে নানা ধরনের রোগবালাই দেখা দেয় ও ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য আদিবাসীরা স্থানীয় একজন বৈদ্যের কাছে যায় যে কিনা ফসল রক্ষার জন্য দেব পূজার আয়োজন করে থাকে। উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ সকলের পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই এরা প্রধানত ভাতের মণ্ড খেয়ে জীবন ধারণ করে। সবচেয়ে নিকটবর্তী যে রেশনের দোকানটি আছে সেটি এখান থেকে ২০ কি.মি. দূরে। “কিন্তু আমরা যতক্ষণে রেশন আসার খবর জানতে পারি ততক্ষণে সব ফুরিয়ে যায়,” জানালেন একজন গ্রামবাসী। এখান থেকে অনেকেই বম্বে ও পুনে চলে গেছে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে।

 

মাওবাদী ও গ্রামবাসীর মাঝে গড়ে উঠেছে বন্ধন। রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে, এই গেরিলাদের উপরেই তারা ছোট ছোট বিষয়ে সাহায্যের জন্য নির্ভরশীল। গ্রামবাসীরা প্রায়ই তাদের ক্যাম্পে একসাথে খায়। মাওবাদীদের চিকিৎসক দল তাদের কাছে ঔষধপত্র বিলি করে যার ভেতরে রয়েছে ম্যালেরিয়া ও সাপের বিষের প্রতিষেধক টিকা। এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে গ্রামবাসীদের অনেকেই মাওবাদীদের সাথে যোগ দেয়। যেমন ১৪ বছরের সুরেশ। ও এখন সিপিআই (মাওবাদী) এর সাংস্কৃতিক সংগঠন চেতনা নাট্য মঞ্চের সাথে জড়িত। ওর দলনেতা রাজু বললেন, “আমরা ওকে এত অল্প বয়সে যোগ দিতে বারণ করেছিলাম কিন্তু ও শোনেনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে ও আমাদের সাথে আছে”।

 

সুরেশ উপজাতি মন্ত্রণালয় অধীনস্থ স্থানীয় একটি পাঠশালায় পড়ত। “কিন্তু ওখানে খাবার ভীষণ খারাপ আর উল্টোপাল্টা ছিল। তাই চলে এলাম,” বলল ও। সুরেশ এখন দলের সাথে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। বেশ কয়েক মাস পর ও নিজ গ্রামে ফিরে এসেছে। ওর মা ওকে দেখতে এসেছেন, বললেন, “আমি ওকে ফিরে আসতে বলি কিন্তু ও রাজি হয় না”।

 

মাওবাদী মতাদর্শ সুরেশকে দিয়েছে নতুন এক পরিচয়। তার  কমরেডদের কর্মকাণ্ড ও তাদের বন্দুকগুলো ওর জীবনকে করে তুলেছে অর্থপূর্ণ । এটি নিজস্ব পরিচয়ের এমন একটি বোধ, যে বোধের কারণে এখানকার আরেকটি ছোট ছেলে তার মাথার টুপিটি কখনও খোলে না। টুপিটি একটি তারা লাগানো জলপাই সবুজ রঙের। এক প্রান্তে লেখা, বিজু। নামটা পার্টির দেওয়া। একজন গেরিলা জানালেন, “কিছু কমরেড যারা ওর আসল নাম জানত তারা সেই নামে ডাকলে ও মন খারাপ করত। তাই টুপির উপর ‘বিজু’ নামটা লিখে রেখেছে”।

 

ক্যাম্পের ভিতরে বিজু ঘুমিয়ে পড়েছে। গাদচিরোলি বিভাগের রাজনৈতিক প্রধান কমরেড নর্মদা সেদিকে তাকালেন, তার চোখে মমতা। দেহরক্ষীকে বললেন ওর গায়ের উপর একটা চাদর দিতে। নর্মদা জানালেন, “আমরা শাড়ি ছেড়ে পুরুষদের মত সামরিক পোশাক পরেছি। আমরা নারী কমরেডরা অনেকটা পথ অগ্রসর হয়েছি”। চেক শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার পরা ছোট চুলের নর্মদাকে দেখলে তার দলের অন্যদের থেকে আলাদা করা যায় না। পাঁচদিন আগে তিনি এ ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছেন। ময়লা নর্দমা পেরিয়ে আসায় সারা শরীরে প্রচণ্ড এলার্জি দেখা দিয়েছে।

 

নর্মদার বাড়ি অন্ধ্র প্রদেশে। ১৮ বছর বয়সে তিনি মাওবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। “আমার বাবা কমিউনিস্ট ছিলেন আর ওই সময় একজন কমিউনিস্টের অবস্থা ছিল অস্পৃশ্য মানুষের মত। বাবা মাওবাদীদের কথা বলতেন। বলতেন ওরা গার্হস্থ্য জীবনের সমস্ত শৃংখল ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছে”, নর্মদা বলেন। সেসময়ই নর্মদা মাওবাদে যোগ দেবেন বলে মনস্থির করেন। এখন তিনি মাওবাদীদের সকল নারী ক্যাডারদের জন্য নীতিকাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন। গাদচিরোলির সামরিক শাখার বিভাগীয় প্রধান কমান্ডার এইয়াতুর সাথে সামরিক কৌশল বিষয়ে আলোচনা ও লেখালেখির এক ফাঁকে নর্মদা প্যাকেট খুলে কোন শব্দ না করে ওষুধ বের করলেন।

 

বাঁশির আওয়াজ শোনা গেল। খাবার সময় হয়েছে। স্টিলের প্লেট নিয়ে দুজনে রান্নাঘরে গেলেন। মেন্যু ভাত আর ডাল। অতিথি এলে (এক্ষেত্রে আমরা) হয়তো ডিম বা মুরগী থাকে যার বৃহদান্ত্র বা ক্ষুদ্রান্ত্র কোন অংশই ফেলে দেওয়া হয়না। পুরোটাই রান্না করা হয়।

 

নর্মদার দেহরক্ষী ছোট একটি মেয়ে, নাম সুনিতা। ছোট করে ছাঁটা চুলে ওকে দেখতে এলটিটিই মিলিশিয়াদের মত লাগে। সহজে হাসে না, খেতে বসলেও ওর একে-৪৭ রাইফেলটা হাঁটুতে হেলান দেওয়া থাকে। ওর বন্ধু রুম্মি আবার ওর বিপরীত। সহজেই মুখে হাসি ফুটে উঠে। ও মৃত কমরেডদের নিয়ে বিপ্লবী গান গাইতে ভালোবাসে। এরা সবাই লিখতে পড়তে জানে আর কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে বন্দুক জোড়া লাগাতে জানে। পাহারা চলাকালীন সময়ে এরা নিঃশব্দে চলাচল করে আর দক্ষতার সাথে ভয়ংকর আক্রমণ চালায়।

 

নারী পুরুষের সম্পর্কের বিষয়ে সিপিআই (মাওবাদী) এর পরিষ্কার নীতি ও পথ রয়েছে। পারস্পরিক মতামত প্রদানের মাধ্যমে একজন পুরুষ কমরেড একজন নারী কমরেডকে বিয়ে করতে পারে। এক দম্পতির গল্প শুনলাম। মাওবাদীদের একটি দলের উপর গুলিবর্ষণ চলাকালীন স্বামী-স্ত্রী দুজনে পিছনে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে ব্যস্ত রাখে এবং দুজনে একসাথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে অন্যদের নিরাপদে পালাতে সাহায্য করে। সুরেখা নামে আরেকটি মেয়ে আমাদেরকে ওর ছোট বাক্সটা দেখালো যার ভিতর একটি হাতবোমা রয়েছে। ও কি কখনও কোন অভিযানে অংশ নিয়েছে? আমরা জানতে চাই। মেয়েটি কিছু বলে না। পরে একজন জানালেন মেয়েটি অভিযানে অংশ নিয়েছে তো বটেই, এর ভেতরে ছিল দুর্ধর্ষ কিছু সম্মুখ যুদ্ধ।

  

এখানে যুদ্ধ

অভিযোগ রয়েছে ২০০৮ সালে কমান্ডার এইয়াতুর ভাই এক সাজানো সংঘর্ষে তার স্ত্রী সহ নিহত হন; তার অপর ভাইটিও একজন মাওবাদী কমান্ডার। এইয়াতুর স্ত্রী মাওবাদীদের চিকিৎসক ব্রিগেডে কাজ করেন। বললেন, “আমাদের মাঝে মাঝে দেখা হয়”।

সে রাতে এইয়াতু লাহেরি হামলার সামরিক পরিকল্পনার কিছু টুকরো টুকরো অংশ আমাদের জানালেন। তিনি এ অভিযানের নেতা ছিলেন। “এসেম্বলি নির্বাচনের আগে, জনগণকে জোরপূর্বক বশে আনার জন্য পুলিশ গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টি করে”, জানান এইয়াতু। একদিন তাদের প্লাটুনের কাছে খবর এল, পুলিশের একটি কমান্ডো দল এগিয়ে আসছে। দলের নেতৃত্বে ছিল রামা। পুরো দুদিন ধরে কেবলমাত্র খাবার বিরতির সময়টুকু ছাড়া গেরিলারা তাদের অনুসরণ করে । শেষ পর্যন্ত লাহেরি পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মাত্র ৭৫০ গজ দূরে লাহেরির ভামরাগড় নামক স্থানে লড়াই শুরু হয়। প্রায় ৪২ জন পুলিশ এবং ১৮ জনের মত মাওবাদী গেরিলা (যারা তাদের ক্লান্ত শ্রান্ত অন্যান্য কমরেডদের আগেই ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল) প্রচণ্ড বন্দুকযুদ্ধের মাঝখানে আটকা পড়ে যায়। এইয়াতু বলেন, “পুলিশের কাছে প্রচুর পরিমাণে গোলাবারুদ রয়েছে আর ওরা মাটির উপর শুয়ে শুধু হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। কিন্তু আমাদের কাছে সীমিত পরিমাণ গোলাবারুদ থাকায় আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে গুলি চালাই”।

এইয়াতু বলেন, পুলিশের লোকেরা গলাবাজি করে বলে যাচ্ছিল যে অসংখ্য গেরিলা নিহত হবে যেহেতু পুলিশের বাহিনী আসছে। কিন্তু মাওবাদীরা মাটি কামড়ে পড়ে ছিল আর সংখ্যা বাড়িয়ে চলছিল। প্রথম ৩০ মিনিট কোন পক্ষেরই কেউ আহত হয়নি। পরবর্তী ১০ মিনিটে ছয়জন পুলিশ নিহত হয়। এইয়াতু দাবী করেন যে এরপর অধিকাংশ পুলিশ তাদের নেতাসহ পালিয়ে গিয়েছিল। বিশেষ একটি স্থানে যেখানে আটজন পুলিশ অবস্থান নিয়েছিল সেখানে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। “কিন্তু তারা আরও একঝাঁক গুলি বর্ষণ করে। এতে আমাদের একজন জেষ্ঠ্য কমরেড নিহত হন”, এইয়াতু জানান। এরপর গেরিলারা একনাগাড়ে গুলিবর্ষণ করে সেই আটজন ও অপর তিনজনকে খতম করে। সে যুদ্ধে সর্বমোট ১৯টি অস্ত্র দখল করা হয়। এ ঘটনা থেকে আধুনিক অস্ত্রের প্রাচুর্য প্রমাণিত হয়েছিল যা ওই প্লাটুনটির কাছে দেখেছিলাম। গত ১৮ মাসে বড় ধরনের পাঁচটি সংঘর্ষে শুধুমাত্র গাদচিরোলি জেলার নিরাপত্তা বাহিনীর থেকেই মাওবাদীরা ৭৭টির মত বন্দুক কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছে যার মধ্যে বেশিরভাগ হল এ কে-৪৭ এবং ইনসাস রাইফেল।

 

বার্তা এসে গেছে আবার। প্রত্যেকের দৃষ্টি উপরে। আমরা আর এগোতে পারবো না মনে হচ্ছে- সব নদীর পানি বেড়ে গেছে। (পরে, আমরা যখন ফিরি, তখন বয়োজেষ্ঠ্য মাওবাদী নেতা গনেশ উইক এর মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারি। তার ম্যালেরিয়া হয়েছিল। বন্যার কারণে তাকে বস্তারের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি।) এখন আমাদের পক্ষে ফেরা ভীষণ কঠিন। পথঘাট বন্ধ। তিন দিন ধরে আমরা ছোট একটা গ্রামে অসহায়ভাবে আটকা পড়ে আছি। অবশেষে শেষ দিনে আমরা একটি ছোট নৌকায় করে উন্মত্ত নদী পার হওয়ার মত সাহস সঞ্চয় করি।

 

আমাদের সাথে একজন লেখক আছেন যিনি তার অসুস্থ মা কে রেখে এসেছেন; আমাদের অরণ্যবাসের শেষ রাতটিতে তিনি আচমকা ঘুম থেকে জেগে উঠে চেঁচিয়ে বলেন, “মা, আমি আসছি”। সামায়াকে এ কথা বললাম আর দুজনে হাসলাম। “হ্যাঁ, মায়েদের পক্ষে এই অনুভূতি জাগিয়ে তোলা সম্ভব”, সামায়া বলল। “হো”, মাথা নাড়ল সামায়া। হো মানে হ্যাঁ। হ্যাঁ।

 

সূত্রঃ openthemagazine.com

(১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০)

Advertisements

Leave a comment on “ভারতের মাওবাদী নারী গেরিলারা –”


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s