ভারতঃ সলমন খান ঘুড়ি ওড়ান বলেই ছত্রধরদের ‘ঘুড়ি’ কাটা পড়ে

7050_1_16_2014_1

c

যেন দোষীদের জামিন ও সাজা মুকুবের মরশুম  চলছে। তবে তা চলছে  হাইপ্রোফাইল অপরাধীদের জন্য, কোন এলিতেলি হলে চলবে না। জেলেই পচে মরতে হবে তাকে। সলমন খানই হোক বা ১৪ হাজার কোটি টাকার সত্যম কেলেঙ্কারির খলনায়ক রামলিঙ্গ রাজু দুজনকেই নিম্ন আদালত দোষী সাব্যস্ত করে যথাক্রমে ৫ বছর ও ৭ বছরের কারাদন্ডের সাজা শোনাল আজ তারা দুজনেই জামিনে মুক্ত। আর দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত জয়ললিতাকে এক্কেবারে ক্লিনচিট দিয়ে বসল কর্ণাটক হাইকোর্ট। এই সব ধনী ও ক্ষমতাবানরা যখন জামিন বা ক্লিনচিট পাচ্ছেন ঠিক তখনই বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে এরাজ্যে লালগড় জনসাধরণ কমিটির নেতা ছত্রধর মাহাতো সহ ৬জনকে দোষী সাব্যস্ত করল মেদিনীপুর আদালত।

লালগড় আন্দোলনের সময় যে ছত্রধরের সঙ্গে  ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তত্কালীন বিরোধী নেত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে সভা করেছিলেন, কলকাতা থেকে বুদ্ধিজীবীরা লালগড়ে গিয়ে যে ছত্রধরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন সে আজ রাষ্ট্রদ্রোহী। যে রাজা সরখেল, প্রসূণ চট্টোপাধ্যায়কে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের একটা সময় পর্যন্ত  মমতা-টিএমসির সাংবাদিক বৈঠকে হাজির থাকতে দেখা গিয়েছিল তারাও আজ রাষ্ট্রদ্রোহী।এদের সবাইকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা শুনিয়েছে আদালত।
দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কিছু বললেই নাকি আদালত অবমাননার দায় বিচারক যাকে তাকে জেলে পুরে দিতে পারেন। কিন্তু এটা যে কোন সাধারণ বুদ্ধির লোকই বুঝতে পারছে দেশে দু ধরনের লোকেদের জন্য দুধরনের বিচার চলছে। তা নাহলে একটি গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মারার মামলা চলল ১৩ বছর ধরে। আর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হাইকোর্ট জামিন দিয়ে দিল সলমনকে। নগর দায়েরা আদালতে লোডসেডিং চলার কারণে বিচারকের আদেশের পুরো কপি টাইপ করা সম্ভব হয়নি নাকি! তাই আদেশ না হাতে পাওয়ার কারণেই  সলমনকে অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া হয়েছিল।  অথচ নিম্ন আদালতে  মিথ্যা সাক্ষী হিসাবে ড্রাইভারকে হাজির করানো সত্ত্বেও  সলমন খানের অন্তর্বর্তী জামিন বহাল রাখে হাইকোর্ট। কেন? স্পষ্ট করে বলা কঠিন। তবে অনেকেরই মনে প্রশ্ন উঠছে বেশকিছুদিন ধরেই খান পরিবাররা হঠাত্ মোদি ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। সলমন খান নিজে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন কিছুদিন আগেই। অনেকেই বলছেন ‘ফ্রি লাঞ্চ’ বলে কিছু হয় না।

৬৬ কোটি টাকার আয়ের সঙ্গে সঙ্গিতীহীন সম্পত্তির মামলায়  ১৮ বছর পর দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন জয়ললিতা। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কর্ণাটক হাইকোর্ট তার জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। সেই সময় হাইকোর্ট জানিয়েছিল জয়ললিতার অপরাধ মানবতার বিরোধী  তাই তাঁকে জামিন দেওয়া যাবে না। আর ৬ মাস ঘুরতে না ঘুরতেই সেই হাইকোর্টই জয়ললতিকে ক্লিনচিট দিল। এর মধ্যে কী কী ঘটেছে তা সবটা কারো পক্ষেই কোন দিন জানা সম্ভব হবে না। তবে কেন্দ্রে মোদি সরকারের সমর্থক হয়ে উঠেছে এআইডিএমকে। জয়ললিতার দলের লোকসভার সদস্য এম  থাম্বিদুরাই হয়েছেন ডেপুটি স্পিকার। কেন্দ্রের বিভিন্ন বিলকে সমর্থন করছে জয়ললিতার দল।

সত্যমের প্রতিষ্ঠাতা রামলিঙ্গ রাজুর রাজনৈতিক যোগাযোগ যে অনেকটা তা সকলেরই জানা। তবে তার সঙ্গে হায়দরাবাদ হাইকোর্ট থেকে তার ও ওই মামলায় দোষী সাব্যস্ত অন্য ৯ জনের জামিন পাওয়ার কোন সম্পর্ক আছে কি না তা বলা কঠিন।
এরাজ্যে সারদা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ সৃঞ্জয় বোস হঠাত্ জামিন পেয়ে গেলেন। তা নাকি কিছু টেকনিক্যাল কারণে আদালতের ভুলে !( সলমনের মত লোডসেডিংকাণ্ড)। আরেক অভিযুক্ত মন্ত্রী মদন মিত্র জেলে থাকার আদালতের আদেশের পর থেকেই এসএসকেএমের ভিআইপি ওয়ার্ডই তাঁর ‘দ্বীতিয় বাসস্থান’; বললে বোধ হয় ভুল হবে না। হাসাপাতলে দাওয়াইয়ের আর জেলে থাকলে দারু কোনটারই অভাব হয়নি মদনবাবুর। অথচ দিল্লির রাম লাল কলেজের  ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী  অধ্যাপক জেএন সাইবাবাকে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে গত বছর মে মাসে বাড়ি থেকে কার্যত অপহরণের কায়দায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায় মহারাষ্ট্রের সাদা পোশাকের পুলিস। বিচারাধীন অবস্থায় গত ১ বছর ধরে নাগপুর জেলের কুখ্যাত আন্ডা সেলে যেভাবে তাঁকে রাখা হয়েছে তাতে যে কোন দিনই তাঁর মৃত্যু হতে পারে।
তাই এদেশে সবকিছুই আছে, পাওয়াও যায়। তবে তা সবার জন্য নয়। বিচার ব্যবস্থাও ধনী ও ক্ষমতাবানদের হাতের মুঠোয়। অন্তত  এই সব ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করল। প্রখ্যাত আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ  ২০১০ সালে অভিযোগ করেছিলেন যে সুপ্রিম কোর্টের ১৬ জন প্রধান বিচারপতির মধ্যে ৮জনই অসত্। আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে করা আদালত অবমাননার মামলার ফয়সলা হয়নি। কারণ রাজা নিজেও জানে সে উলঙ্গ।

   রীতেন্দ্র রায়চৌধুরীর এই লেখাটি ১৪.৫.২০১৫ দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.