‘আমাদের প্রথমে অবশ্যই শ্রেণীসংগ্রাম করতে হবে, দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লেখার সময় বুঝলাম, আমি আসলে একটি মিথ্যা জীবন যাপন করছি——- সিমোন দা বুভোয়ার সাক্ষাৎকার

প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক, দার্শনিক, সমালোচক, শিক্ষক ও আন্দোলনকর্মী সিমোন দা বুভোয়ার (Simone de Beavuoir) ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকে বিখ্যাত সাংবাদিক জন গেরাসিকে (John Gerassi) এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। বিখ্যাত বই ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ (The Second Sex) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। প্রায় ২৫ বছর আগে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। বুভোয়ার ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ প্রকাশিত হওয়ার সমসাময়িক এবং পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ ও সমাজে ধ্বনিত প্রতিক্রিয়ার অনুঘটকগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করেছেন এই সাক্ষাৎকারে। সেই সঙ্গে নারীবাদের সামাজিক সংজ্ঞায়ন, পরিপাশ্র্বের দৃশ্যপট এবং ব্যক্তিগত জীবনবোধ-জীবনাচরণ বর্ণনা করেছেন অকপটে। ‘সোসাইটি’ পত্রিকায় একই বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন সুশান্ত বর্মণ

1

জন গেরাসি :  ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় ২৫ বছর কেটে গেল। অনেকে মনে করেন, বিশেষ করে আমেরিকায় বইটি সমকালীন নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা করেছে। আপনিও কি?

সিমোন দা বুভোয়ার :  আমি সে রকম ভাবি না। বর্তমানের নারীবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছে ঠিক পাঁচ অথবা ছয় বছর আগে। তখন এই বইয়ের সমকালীন কয়েকজন নেতা তাঁদের কিছু তত্ত্বীয় ধারণা এখান থেকে নেন। ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর নারীবাদী আন্দোলন শুরু করার কোনো সুযোগ ছিল না। যেসব মেয়ে আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তারা ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে খুব অল্পবয়সী ছিল। বইটি ঠিক সেই সময় বের হয়। আমাকে যেটা খুশি করেছে তা হলো, তারা এটাকে পরে আবিষ্কার করেছে। অবশ্যই তাদের মধ্যে একজন হলেন বেটি ফ্রাইডেন। তিনি ‘The Feminine stique’ বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি বইটি পড়েছেন, আর হয়তো একটু হলেও কোনো দিকে প্রভাবিত হতে পারেন। কিন্তু অন্যরা, সবাই সে রকম নয়। উদাহরণ হিসেবে কেট মিলেটকে ধরি। তাঁর কোনো কাজে আমার জন্য সামান্য সময়ও তিনি ব্যয় করেননি। ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এ ব্যাখ্যা করেছি, এমন কোনো কারণে তাঁরা হয়তো নারীবাদী হতে পারেন, কিন্তু তাঁরা সেই কারণগুলো তাঁদের নিজেদের জীবন-অভিজ্ঞতায় আবিষ্কার করেছেন; আমার বইয়ে নয়।

জন গেরাসি :  আপনি বলেছিলেন, আপনার নারীবাদী চেতনা ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লেখার অভিজ্ঞতা অবলম্বন করে বেড়ে উঠেছে। আপনার নিজের জীবনচক্রের অবয়বে এটা প্রকাশিত হওয়ার পর আন্দোলনের উন্নতি হওয়ার বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন এবং কিভাবে তা বেড়ে উঠেছে বলে মনে করেন?

সিমোন দা বুভোয়ার :  ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লেখার সময় আমি সচেতন ছিলাম। সেই প্রথমবারের মতো আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি আসলে একটি মিথ্যা জীবন যাপন করছি। অথবা অন্যভাবে বলা যায়, আমি পুরুষ প্রভাবিত সমাজকে না চিনে এর কাছ থেকে উপকার নিচ্ছিলাম। আমার জীবনের প্রথম দিকে যা হয়েছিল, আমি পুরুষদের নীতিবোধগুলো স্বীকার করে নিয়েছিলাম। আর তার সবগুলো মেনে নিয়ে এর মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছিলাম। আমি অবশ্যই কিছুটা সফল ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, পুরুষ ও নারী সমান হতে পারে, যদি নারী তেমন সমানাধিকার চাইতে পারে। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, আমি একজন বুদ্ধিজীবী ছিলাম। সমাজের এক বিশেষ শ্রেণী বুর্জোয়া শ্রেণী থেকে আমার আসার সৌভাগ্য হয়েছে। এটা আমাকে সবচেয়ে ভালো স্কুলে পাঠিয়েছে এবং অবসরে চিন্তা করার সুযোগ দিয়েছে। একই কারণে খুব বেশি জটিলতা ছাড়াই আমি পুরুষ-জগতে ঢুকতে সক্ষম হয়েছি।

আমি দেখিয়েছি, আমি দর্শন, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে পারি। নিজের নারীসুলভ যা আছে, তা নিজের মধ্যেই সীমিত রাখতে পেরেছিলাম; সেই সময় আমি আমার সাফল্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলাম যেমনটা আমি করেছিলাম, আমি দেখলাম, পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের মতো জীবনযাপনের জন্য ভালো আয় আমি করতে পারি। পুরুষ সহযোগীদের মতোই আমি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমি যেমন ছিলাম, তেমন হয়ে ওঠার পর বুঝতে পারলাম, যদি চাই তাহলে আমি একা একা ভ্রমণ করতে পারি, ক্যাফেতে বসতে পারি, লিখতে পারি, যেকোনো পুরুষ লেখকের মতো সমান সম্মান-শ্রদ্ধা আদায় করতে পারি এবং আরো অনেক কিছু। প্রতিটি অংশ আমার স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের ধারণা আরো শক্তিশালী করল। এটা হয়ে গেল। এরপর আমি খুব সহজেই ভুলে গেলাম, একজন সেক্রেটারির এই অধিকার ভোগ করার কোনো সুযোগ নেই। সে উত্ত্যক্ত হওয়া ছাড়া কোনো ক্যাফেতে বসে বই পড়তে পারত না। সে যে একজন ব্যক্তি, তার যে বুদ্ধিমত্তা আছে, তার কোনো মূল্য না দিয়ে তাকে সম্ভোগযোগ্য প্রাণী বলে মনে করা হতো। চিন্তাসামর্থ্যের জন্য খুব কম জায়গায় সে আমন্ত্রণ পেত। সে নিজস্ব পুঁজি গড়ে তুলতে বা সম্পত্তি করতে পারত না। আমি পারতাম। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে তখনো। যারা পুরুষের কাছে নিজ স্বাধীনতা প্রকাশ করার জন্য নিজেদের অর্থনৈতিক ও মানসিক দিক দিয়ে সামর্থ্যহীন মনে করে, এ ধরনের নারীদের আমি সেই সময় অবজ্ঞা করতাম। তাই আমি চিন্তা করতে পারি, নিজেকে এটা না বলেও যে ‘যদি আমি পারি, তাহলে তারাও পারবে।’

‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লিখতে এবং গবেষণা করতে গিয়ে আমি বুঝতে পারলাম, আমার প্রাপ্ত অধিকারগুলো আসলে আমার ছেড়ে দেওয়া দাবির বিনিময়ে পাওয়া। নিজ নারীজীবনকে যদি সামান্যতম শ্রদ্ধাও করি, তাহলেও এ কথা বলা যায়। যদি আমরা এটাকে অর্থনৈতিক শ্রেণীর ধারণায় ফেলি, তাহলে আপনি খুব সহজে এটা বুঝে যাবেন আমি এক শ্রেণী সহযোগীবাদীতে পরিণত হয়েছিলাম।

‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এর মাধ্যমে আমি লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার যা ছিল, তা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা বেশির ভাগ নারীর ছিল না। আসলে পুরুষ প্রভাবিত সমাজ কর্তৃক দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে বর্ণিত ও চিহ্নিত হওয়ার; সেই সমাজে পুরুষ প্রভাবের জায়গাটিকে ধ্বংস করতে পারলে কথিত সমাজ-কাঠামো ধসে পড়বে। অর্থনীতি ও রাজনীতি প্রভাবিত মানুষ সবখানেই আছে। উন্নতির জন্য বিদ্রোহ করা খুব কঠিন আর ধীর হয়ে পড়বে। প্রথমে সেই ধরনের মানুষকে প্রভাবের জায়গাটা চিনতে হবে, সেই সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এরপর একে পরিবর্তন করার জন্য নিজ শক্তির ওপর আস্থা রাখতে হবে। যারা ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’র কারণে লাভবান হচ্ছে, তাদের বিশ্বাসঘাতকতার প্রকৃতি বুঝতে হবে; এবং পরিশেষে তাদেরও চিনতে হবে, যারা কোনো পদক্ষেপ নেওয়ায় অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকিতে আছে। এর অর্থ হলো, আমার মতো নারী, যারা একটি সফল কর্মভারহীন মর্যাদাপূর্ণ পদ এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের জন্য একটু বাঁকা হয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা বহন করাকে স্বীকার করেছে…কিন্তু এটা আত্মপ্রশংসার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য নিজেকে শুধু উপহাসস্পদ করে তোলা মাত্র; এবং তাদের এটা বুঝতে হবে, তাদের যেসব বোন সবচেয়ে বেশি শোষণ করেছে, তারা সবার শেষে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে। উদাহরণ হিসেবে একজন শ্রমিকের স্ত্রীকে ধরি।…এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য ততটা স্বাধীন সে নয়। সে জানে, তার স্বামী নারীনেতাদের চেয়ে বেশি শোষিত; এবং সে তার গৃহকর্ত্রী ভূমিকার ওপর অনেক বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল। যা হোক, এসব কারণে নারীরা আন্দোলন করতে পারে না। আর হ্যাঁ, রাজনৈতিক সফলতার জন্য, সরকারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কিছু ছোট আকারের বুদ্ধিদীপ্ত আন্দোলন আছে। এসব দলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। এরপর ১৯৬৮ এল এবং সব কিছু বদলে গেল। আমি জানি, এর আগেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। যেমন বেটি ফ্রাইডেনের বই। ১৯৬৮ সালের আগেই প্রকাশিত হয়েছে।

আসলে আমেরিকার মেয়েরা সেই সময় থেকে আন্দোলনে উন্নতি করছিল। তারা অন্য মেয়েদের চেয়ে বেশি বুঝত। তারা সুস্পষ্ট কারণে রান্নাঘরে মেয়েদের রেখে দেওয়ার রক্ষণশীল ভূমিকার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির বৈপরীত্য সম্পর্কে বেশি সচেতন ছিল। প্রযুক্তি ছড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি পেশিশক্তির নয়, মগজের শক্তির বশীভূত হয়েছে।…পুরুষতান্ত্রিক নীতি হলো, মেয়েরা দুর্বল এবং সে জন্য তাকে অবশ্যই নিম্নতর ভূমিকা পালন করতে হবে; এদের কখনো যুক্তি দিয়ে পরিচালনা করা যায় না। একই সময়ে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির আবিষ্কারে আমেরিকা ভরে যাচ্ছিল যে মেয়েরা পরস্পরবিরোধিতা থেকে মুক্ত হতে পারছিল না। এরপর এটাই স্বাভাবিক যে পুঁজিবাদের রাজধানীর মধ্যভাগে বসেই নারীবাদী আন্দোলন সবচেয়ে বেশি প্রেরণা পেয়েছে; এমনকি এই প্রেরণা যদি শুধু অর্থনৈতিক কারণেও হয়। অর্থাৎ সমান কাজের জন্য সমান মজুরি চাওয়া। কিন্তু আসলে সত্যিকারের নারীবাদী সচেতনতার উন্নতি ঘটেছে পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে। আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে কিংবা ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় অন্য দেশগুলোতে ১৯৬৮ সালের বিদ্রোহের ফলাফল হিসেবে মেয়েরা নিজ শক্তি অনুভব করতে পারল। তারা বুঝতে পারল, পুঁজিবাদ স্বভাবগতভাবেই সারা পৃথিবীর গরিবদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায়। শ্রেণীসংগ্রামের ধারণা পুরোপুরি মেনে না নিলেও নারীরা দলে দলে শ্রেণীসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারা সক্রিয় হলো। তারা মিছিলে, বিভিন্ন উপস্থাপনায়, প্রতিবাদ সভাগুলোতে গোপন দলে, সশস্ত্র বাম দলগুলোতে যোগ দিয়েছিল। অন্য পুরুষদের মতো তারাও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে শোষণহীন অবিচ্ছেদ্য (Nonalienting) ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করেছিল। কিন্তু কী ঘটল? তারা আবিষ্কার করল, যে সমাজকে তারা ধ্বংস করতে চায়, সেই সমাজে তারা যেমন ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ ছিল, একই অবস্থা ছিল যেসব দল বা প্রতিষ্ঠানে তারা যোগ দিয়েছিল, সেখানেও। এখানে ফ্রান্স ও আমেরিকায়ও প্রায় একই অবস্থা। তারা দেখল, পুরুষরা সব সময় নেতা হচ্ছে। এসব ছদ্মবিপ্লবী দলে নারীরা হচ্ছে টাইপিস্ট বা কফি প্রস্তুতকারক। আমার ‘ছদ্ম’ বলা উচিত নয়। পুরুষ প্রাধান্য রয়েছে এমন অনেক আন্দোলনের কর্মীরা সত্যিকারের বিপ্লবী। কিন্তু এগুলো পুরুষ প্রভাবিত সমাজে সৃষ্টি, প্রচারিত ও বিকশিত হয়েছে। এসব বিপ্লবীর মধ্যে কেউ কেউ সেই প্রভাবকে আন্দোলনে নিয়ে গেছেন। বুঝতে হবে, এসব পুরুষ স্বেচ্ছায় ‘প্রভাব’কে পরিত্যাগ করবে না, যেমন বুর্জোয়া শ্রেণী নিজ শক্তিকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দেবে না। অতএব গরিব মানুষকে যেমন ধনীদের শক্তি ছিনিয়ে নিতে হবে, তেমনি নারীদেরও পুরুষদের কাছ থেকে শক্তি ছিনিয়ে নিতে হবে। এর মানে, পুরুষদের ওপর উল্টো কর্তৃত্ব ফলানো বোঝায় না। সমাজতন্ত্রে যেমন, সত্যিকারের সমাজতন্ত্রে সব মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ থেকে নারীবাদী আন্দোলন শিখেছে যে শাসকশ্রেণী অর্থাৎ পুরুষের কাছ থেকে শক্তি ছিনিয়ে এনে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আরেক দৃষ্টিতে দেখুন। শ্রেণীসংগ্রামের ভেতর থেকে দেখা যাক। নারীরা বুঝতে পেরেছিল, শ্রেণীসংগ্রাম লৈঙ্গিক সংগ্রামকে বাদ দিতে পারেনি। এটাই সেই পয়েন্ট, যেখানে এসে আমি যা বলতাম, সেই সম্পর্কে সচেতন হতাম। এর আগে আমি মনে করতাম, একবার পুঁজিবাদ ধ্বংস হয়ে গেলে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব হবে। তারপর, হ্যাঁ, এই ‘তারপর’ একটা প্রতারণামূলক টাইপের কিছু। আমাদের প্রথমে অবশ্যই শ্রেণীসংগ্রাম করতে হবে। এটা সত্য যে পুঁজিবাদের অধীনে লিঙ্গসমতা আসা অসম্ভব। যদি সব নারী পুরুষদের সমান কাজ করে, তাহলে পুঁজিবাদ নির্ভর করে এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে? সে রকম কিছু প্রতিষ্ঠান হলো চার্চ, সেনাবাহিনী এবং লাখ লাখ কারখানা, দোকান, গুদাম ইত্যাদি। এগুলো তো আবার খণ্ডকালীন, অতিরিক্ত সময়কালীন এবং স্বল্প বেতনের শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। কিন্তু এটা সত্য নয় যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব স্বভাবগতভাবে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করে। সোভিয়েত রাশিয়া বা চেকোস্লোভাকিয়ার দিকে তাকান। এসব দেশে (আমরা হয়তো এসব দেশকে সমাজতান্ত্রিক বলি, যদিও আমি বলি না) সর্বহারা ও নারীমুক্তি নিয়ে গভীর বিভ্রান্তি আছে। যেভাবেই হোক না কেন, প্রলেতারিয়েত শেষ পর্যন্ত পুরুষের দ্বারাই নির্মিত হয়। সেসব দেশেও এখানকার মতো পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ অবিকৃত থেকে গেছে। এক নতুন ভাবনা সচেতন মেয়েদের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে যে শ্রেণীসংগ্রাম লৈঙ্গিক সংগ্রামকে প্রতিস্থাপন করে না। এখন লড়াইরত বেশির ভাগ মেয়ে সে কথা জানে। নারীবাদী আন্দোলনের এ এক পরম পাওয়া। এটা তা-ই, যা আগামী দিনের ইতিহাস পাল্টে দেবে।

2

জন গেরাসি :  কিন্তু এই সচেতনতা শুধু বাম মনোভঙ্গির নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এরা সেই সব মেয়ে, যারা গোটা সমাজকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে।

সিমোন দা বুভোয়ার :  হ্যাঁ, অবশ্যই। কারণ বাকি সবাই রক্ষণশীল। এর অর্থ হলো, যা চলে আসছে এবং ছিল, তাকে তারা রক্ষা করতে চায়। ডানপন্থী মেয়েরা বিপ্লব চায় না। তারা মা, স্ত্রী। কিংবা পুরুষদের প্রতি উৎসর্গিত। অথবা তারা যদি খুব বেশি বিক্ষুব্ধ থাকে, তাহলে আসলে ভাগের বড়টা চাইছে। তারা আরো বেশি আয় করতে চায়। সংসদে আরো বেশি নারীকে নির্বাচিত করতে চায়। নারী প্রেসিডেন্ট হয়েছে এমনটি দেখতে চায়। তারা মূলগতভাবে সমতাকে বিশ্বাস করে না নিচে থাকার চেয়ে ওপরে থাকার ক্ষেত্র ছাড়া। কিন্তু তারা এই সিস্টেমে খুব সুন্দরভাবে খাপ খেয়ে যায়, যদি সমাজকে সেই চাহিদার উপযোগী করে সামান্য বদলে নেওয়া যায়। পুঁজিবাদ নারীকে সেনাবাহিনীতে যোগদান করার, সরকারে আরো বেশিসংখ্যক মেয়েকে সুযোগ দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। পুঁজিবাদ আরো বেশি মেয়েকে সরকারে যোগ দিতে সুযোগ দেওয়ার মতো বুদ্ধিমান। ছদ্ম সমাজতন্ত্র পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল হওয়ার জন্য মেয়েদের ছাড় দেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখে। এগুলো নতুন সাজানো পদ্ধতির অংশ মাত্র। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা টাকার বিনিময়ে ছুটি কাটানো। টাকার বিনিময়ে ছুটি কাটানোর প্রাতিষ্ঠানিকতাকরণ কি পুঁজিবাদের অসমতা দূর করতে পেরেছে? পুরুষদের মতো সমান মজুরিতে কারখানাগুলোতে কাজ করতে পারার অধিকার কি চেকোস্লোভাকিয়ার সমাজে পুরুষ প্রভাব পরিবর্তন করতে পেরেছে? কিন্তু মাতৃত্বের ধারণা ধ্বংস করে ফেলা তথা সমাজের সমস্ত মূল্যবোধ পাল্টানো এটা বৈপ্লবিক। একজন নারীবাদী নিজেকে বামপন্থী বলুন আর না-ই বলুন, সংজ্ঞাগতভাবে তিনি বামপন্থী। তিনি একজন মানুষ হিসেবে, গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে, সম্পর্কিত হিসেবে সবার জন্য সমান অধিকারের জন্য লড়াই করছেন। শ্রেণী-সমতার চাহিদার মাধ্যমে লৈঙ্গিক সমতার বিদ্রোহ মূর্ত করে তুলছেন। এমন একটি সমাজ চান, যেখানে পুরুষরা ‘মা’ হতে পারবে। এখানে নীতিবোধগুলো নিয়ে বিতর্ক হতে হবে, যেন এগুলো পরিষ্কার হয়। তথাকথিত ‘নারী প্রবণতা’র গুরুত্ব ‘পুরুষের জ্ঞান’-এর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সমকালের হাস্যকর ভাষার ক্ষেত্রে এখানে কঠিন এবং কর্কশতার চেয়ে কোমল ও নরমকে বেশি ভালো বলা হয়। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, এমন একটি সমাজের জন্য, যেখানে প্রতিটি অভিজ্ঞতা অন্যদের মতো একই হবে। আপনাকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আরো নানা দিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমতা নির্ধারণ করতে হবে। তাহলেই লৈঙ্গিক সংগ্রাম শ্রেণীসংগ্রামকে স্পষ্টতর করবে। কিন্তু শ্রেণীসংগ্রাম কখনো লৈঙ্গিক সংগ্রামকে রূপায়িত করবে না। নারীবাদীরাই আসলে সত্যিকারের বামপন্থী। আসলে তারা সেই বামপাশেই আছে, যাকে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিক বাম বলি।

জন গেরাসি :  কিন্তু ইতিমধ্যে বাম মনোভঙ্গির অভ্যন্তরে থেকে লৈঙ্গিক সংগ্রামকে অনবরত চালিয়ে নিয়ে যাওয়া, সেই তখন থেকে, যেমনটা আপনি বলেছিলেন, লৈঙ্গিক সংগ্রাম অস্থায়ীভাবে হলেও অন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কহীন। নারীবাদীরা কি বাম রাজনীতিকে দুর্বল করে ফেলছে না? সুতরাং যারা বাড়ির স্ত্রী এবং দুর্বল মানুষকে অত্যাচার করে, তাদের হাতকে আরো শক্তিশালী করছে কি?

সিমোন দা বুভোয়ার :  না, সুদূরপ্রসারী প্রভাব হিসেবে এটা শুধু বামতত্ত্বকে শক্তিশালী করবে।…

একটা বিষয় বলি, বামপন্থী হিসেবে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে গিয়ে দেখি, এটা অনেকটা স্বার্থপরতার বিপরীতে দাঁড়ানোর মতো ব্যাপার। ভাবমগ্নতা কাটানোর জন্য বামপন্থী পুরুষদের জোর করতে হয়। দলগুলো তাদের কর্মদীপ্ত পুরুষ নেতাকে পযর্বেক্ষণাধীন রাখার প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি অনুভব করতে বাধ্য হয়েছে। এটাই উন্নতি। এখানে আমাদের পত্রিকা ‘লিবারেশন’-এর পুরুষতন্ত্র প্রভাবিত বেশির ভাগ কর্মী একজন মহিলাকে পরিচালক পদে মেনে নেওয়াটাকে অনুভব করতে নীতিগতভাবে বাধ্য। এটাই উন্নতি। বামপন্থী পুরুষরা নিজেদের ভাষার দিকে তাকাতে শুরু করেছেন।

4

জন গেরাসি :  কিন্তু এটা কি সত্য? আমি বলতে চাইছি, আমি শিখেছি। যেমন ধরুন, কোনো দলগত আলোচনা চলাকালীন, বাসনকোসন ধোয়াকালীন, ঘর পরিষ্কার করাকালীন, বাজার করাকালীন কোনো মহিলার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ‘ঈযরপশ’ শব্দটি ব্যবহার না করা উচিত। কিন্তু আমি কি আমার চিন্তায় কম লৈঙ্গিক? আমি কি পুরুষতান্ত্রিক নীতিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছি?

সিমোন দা বুভোয়ার :  আপনি কি মন থেকে বলছেন? স্পষ্টবাদী হয়ে দেখুন, কে পাত্তা দেয়? এক মিনিটের জন্য চিন্তা করুন, আপনি একজন দক্ষিণের বর্ণবাদী ব্যক্তিকে চেনেন, আপনি তাকে বর্ণবাদী হিসেবে জানেন। কারণ, সারা জীবন ধরে তাকে দেখেছেন। কিন্তু এখন সে আর ‘নিগার’ শব্দটি বলে না। সে সব কালো মানুষের অভিযোগ শোনে এবং নিজের পক্ষ থেকে সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। সে অন্য বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতা চালায়। সে জোর গলায় দাবি জানায়, কালো শিশুদের শিক্ষাহীন বছরের চেয়ে গড়পড়তা মানের শিক্ষার স্বাদ দেওয়া হোক। সে কালো মানুষদের ঋণের আবেদনপত্রে জামিনী হয়। তার নিজ জেলায় টাকা ও ভোটটা দিয়ে কালো প্রার্থীকে ফিরিয়ে এনেছে। আপনি কি মনে করেন, কালো মানুষরা তাকে আগে যেমন দেখেছিল, তেমনটি ভেবে তাকে এখনো বর্ণবাদী বলবে? আমাদের অনেক প্রায়োগিক স্বার্থপরতা আসলে বদ অভ্যাস মাত্র। যদি নিজের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে এমনটা তৈরি হয়ে যাবে যে বিপ্রতীপ অভ্যাস থাকাটাও ‘প্রাকৃতিক’ বলে মনে হবে। এটাই একটা বিশাল পদক্ষেপ। যদি আপনি বাসনকোসন ধোন, বাড়ি পরিষ্কার করেন এবং এমন একটা মনোভঙ্গি তৈরি করেন যে এ কাজগুলো করায় আপনি নিজেকে একটু ‘কম পুরুষালি’ বলে মনে করেন না, তাহলে আপনি একটি নতুন অভ্যাস সৃষ্টিতে সাহায্য করছেন। যদি বেশ কয়েকটি জেনারেশন এটা অনুভব করে যে তারা সবাই বর্ণবাদবিরোধী হিসেবে সব সময় জীবনযাপন করবে, তাহলে এর ফলে তৃতীয় প্রজন্ম বর্ণবাদবিরোধী হিসেবে জন্ম নেবে। অতএব শুরুতেই লিঙ্গবাদের বিরোধিতা করুন এবং তা চালিয়ে যেতে থাকুন। একে একটা খেলার মতোই ভেবে নিতে পারেন। আপনার ব্যক্তিগত চিন্তায় যা খুশি তা-ই ভাবুন, নিজেকে নারীর চেয়ে উচ্চতর কিছু একটা কল্পনা করুন। কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যয় নিয়ে এই খেলা যত দিন সম্ভব খেলে যেতে থাকুন। অর্থাৎ বাসনকোসন মাজতে থাকুন, বাজার করুন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার করুন, বাচ্চাদের দেখাশোনা করুন। নিজ পদমর্যাদা আপনার নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে। আপনার মতো মানুষ, যিনি নিজের পুরুষত্বকে আপাতত থামিয়ে রেখেছেন। সমস্যা হচ্ছে, আমি বিশ্বাস করি না। আপনি যা বলছেন, তা সত্যিই করবেন এমনটা আমি মনে করি না। এটা বাসনকোসন মাজার বিষয় হতে পারে কিংবা দিনে-রাতে বাচ্চার কাপড় পাল্টানোর কাজও হতে পারে।

জন গেরাসি :  যাক, আমার কোনো বাচ্চা নেই।

সিমোন দা বুভোয়ার :  কেন নেই? আপনি কি না থাকাটাকে বেছে নিয়েছেন? আপনি কি মনে করেন, মায়েদের আপনি চেনেন, তারা বাচ্চা হওয়া বেছে নিয়েছে? অথবা তাদের কি বাচ্চা নেওয়ার জন্য ভয় দেখানো হয়েছে? অথবা সংক্ষেপে বললে, তারা কি এই চিন্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ যে বাচ্চা থাকা এবং বাচ্চা থাকাকে পছন্দ করা একটি সহজাত, স্বাভাবিক এবং নারীসুলভ গুণ? কিন্তু কে এই পছন্দকে অবশ্যম্ভাবী তৈরি করেছে? এই নীতিবোধগুলোকেই পরিবর্তন করতে হবে?

3

জন গেরাসি :  দারুণ! সেই কারণে আর আমি এটা বুঝতে পারছি যে অনেক নারীবাদীর বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে যাওয়ার জন্য জেদ ধরা দরকার ছিল। কিন্তু বিপ্লবের নিয়ম অনুযায়ী আমার মতো অন্যরাও ছিল। যদি আমরা সম্পূর্ণ আলাদা দলে বিভক্ত হতাম, তাহলে কি জিততে পারতাম? সংগ্রাম থেকে পুরুষদের বাদ দিয়ে নারীবাদী আন্দোলন কি তার লক্ষ্যে পেঁৗছতে পারত?

সিমোন দা বুভোয়ার :  এক মিনিট, তারা কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী, তা আমাদের পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। আমি আমেরিকার কথা বলতে পারব না। কিন্তু এই ফ্রান্সে এমন অনেক দল আছে, সচেতন দল। এরা পুরুষদের একেবারে বাদ দিয়ে দিয়েছে। কারণ, নিজেকে মহিলা হিসেবে বুঝতে সক্ষম এমন একজন মহিলা হিসেবে আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করাকে তারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা শুধু নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় এমন করতে পারে। নিজেরা বলাবলি করতে পারে যে তারা স্বামী, প্রেমিকা, ভাই, বাবা। অথবা কোনো পৌরুষেয় শক্তিকে পরোয়া করে না। তাদের সততা এবং কথা বলার জন্য তীব্র আবেগ শুধু এ পদ্ধতিতেই সম্ভব হতে পারে। তারা এমন এক গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করত যে যখন আমার বয়স ২৫ ছিল, তখন এর বাস্তবতা আমার কল্পনাতীত ছিল। যে সময় আমি আমার নারী বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সেই সময় সত্যিকারের নারীবাদী সমস্যাগুলো আলোচনা করা হতো না। অতএব তখন প্রথমবারের মতো এসব হচ্ছিল। এসব সচেতন দলের কারণে এবং এসব দলের মধ্যে নারীবিষয়ক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার জন্য যে প্রত্যাশা, তার রুক্ষতার কারণে, নারীদের মধ্যে সত্যিকারের বন্ধুত্বের উন্নতি হচ্ছে। তার মানে আমি বলতে চাইছি, অতীতে, আমার যৌবনে, এই সেদিন পর্যন্ত মহিলারা আরেকজন মহিলার সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধুত্ব করার জন্য কখনো উৎসাহী হতো না। তারা পরস্পরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবত, এমনকি শত্রুও। কিংবা অন্তত প্রতিযোগী মনে করত। এখন সেই সচেতন দলগুলোর কারণে মহিলারা যে শুধু সত্যিকারের বন্ধু হতেই সক্ষম, তা নয়, বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে উষ্ণ, খোলামেলা, গভীর অনুভূতিময় থাকতে শিখে গেছে। তারা বোন পাতাতে শিখেছে এবং সেই ভগি্নত্বকে বাস্তব রূপ দিতে এবং কোনো ধরনের সম্পর্ক তৈরি না করেও তারা সমকামী যৌনতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অবশ্যই অনেক লড়াই আছে, এমনকি সামাজিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে কঠোর নারীবাদী সংঘর্ষও হয়েছে। সেগুলোতে মহিলারা পুরুষদের যোগদান প্রত্যাশা করেছে এবং অনেকে করেছেও। আমি মনে করি, এখনকার একটি সংগ্রাম গর্ভপাতকে আইনি বৈধতা দেওয়ার কথাই ধরুন। তিন-চার বছর আগে যখন আমরা এ বিষয়টি জনগণের সামনে উপস্থাপন করি, আমার মনে আছে, বেশ বড়সংখ্যক পুরুষ সেখানে উপস্থিত ছিল। এর মানে এই নয় যে তারা লিঙ্গবাদী নয়। কিংবা শৈশব থেকে দশকের পর দশক ধরে যে নীতিকাঠামোতে তারা বড় হয়েছে, তাদের অন্তরে যা গেঁথে গেছে, সেই অভ্যাসের বৈশিষ্ট্য উপড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু এসব পুরুষ হলো তারা, যারা অন্তত সমাজের লিঙ্গতন্ত্রের ব্যাপারে সচেতন; এবং রাজনৈতিকভাবে এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে পুরুষদের আমি স্বাগতম জানাই আর সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য আন্তরিক উৎসাহ জানাই।

জন গেরাসি :  কিন্তু আরো কিছু বিশেষ দল আছে। বিশেষ করে এই ফ্রান্সে, যারা নিজেদের বিচ্ছিন্নতাকে গর্বভরে প্রচার করে এবং নিজেদের সংগ্রামকে নিয়ন্ত্রিত সমকামিতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

সিমোন দা বুভোয়ার :  বিষয়টি স্পষ্ট করতে দাও। গখঋ (ডড়সবহ’ং খরনবৎধঃরড়হ গড়াবসবহঃ)-এর মধ্যে এমন অনেক দল আছে, যারা নিজেদের সমকামী বলে। এসব মহিলার অনেককে, গখঋ এবং সচেতন দলগুলোকে ধন্যবাদ, এখন প্রকাশ্যে বলতে পারছে যে সে একজন সমকামী। এটা দারুণ।

এমন কিছু মহিলা আছে, যারা রাজনৈতিক জ্ঞানস্বল্পতার কারণে সমকামী হয়েছে। এর অর্থ, তারা মনে করে, সমকামী হওয়াটা একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কালোদের লৈঙ্গিক সংগ্রামের মধ্যেও শ্রেণী সংগ্রামকে সুপারিশ করার মতো প্রায় একই রকম রাজনৈতিক সংগ্রাম রয়েছে। এবং এটা সত্য যে এসব মহিলা তাদের সংগ্রাম থেকে পুরুষদের বিতাড়িত করার মতবাদে বেশি আগ্রহী। কিন্তু তার মানে এই নয়, সবখানে চলা নির্যাতনবিরোধী লড়াই-সংগ্রামের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াকে তারা অবজ্ঞা করে। উদাহরণ হিসেবে চরবৎৎব ঙাবৎৎবু-এর কথা বলি। এই তরুণ মাওবাদী এক প্রতিবাদ সভা চলাকালে পালিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়ায় জবহধঁষঃ ফ্যাক্টরির এক পুলিশের দ্বারা ঠাণ্ডা মাথায় খুন হয়েছে। এতে সব বামপন্থী প্যারিসজুড়ে বিরাট বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। এসব তথাকথিত সমকামী বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিয়েছে এবং তার কবরে ফুল দিয়েছে। এটা অন্যভাবে বললে এমন বোঝায় না যে তারা পুরুষকে বাদ দেওয়ার কারণে সৃষ্ট নিজেদের একাকিত্বকে প্রদর্শন করছে। কিন্তু তারা আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন একটি প্রতিবাদে নিজেদের খুঁজে পেয়েছে, যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ধরনের অত্যাচার এবং অপমানবিরোধী।

জন গেরাসি :  সাম্প্রতিককালে আমেরিকার ক্যাম্পাসে চালানো জরিপে দেখা গেছে, নারীদের স্বাধীনতার কারণে পুরুষদের পুরুষত্বহীনতার হার অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সেসব তরুণ পুরুষের মধ্যে, যারা তাদের লৈঙ্গিক মনোভঙ্গির সামনে।

সিমোন দা বুভোয়ার :  এটা তাদের নিজেদের ভুল।

জন গেরাসি :  কিন্তু এটাই সত্য যে এটা তাদের জানতে হবে, কোন ভূমিকা অনুযায়ী আচরণ কেমন হওয়া প্রয়োজন। এর মানে, পৌরুষদীপ্ত হওয়া খুব সহজ। সঙ্গে এটাও সহজ যে অন্যরা বিশ্বাস করবে, তারা পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের, স্বার্থপর। তারা তখন বুঝতে পেরেছে, ভালোবাসার প্রয়োজনীয়তা তারা প্রায়ই অনুভব করে। অথবা একজন মহিলাকে বিপথে চালিত করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। কারণ, এটাই আশা করা হয়েছিল।

সিমোন দা বুভোয়ার :  যে ভূমিকা তারা পালন করছে, সে সম্পর্কে সতর্ক হয়ে নিলাম। এটা তাদের কোনোদিন তৃপ্ত করবে না। উভয়পক্ষের প্রতিই সম্মান রেখে বলি, এটা সহজ। এবং এটা তাদের যৌনতার দিক দিয়ে তৃপ্ত রাখবে, আবার এটাই তাদের বিষণ্ন করে তুলবে। মহিলাদের তৃপ্ত করার ব্যাপারে তারা দুঃখিত থাকবে, আবার নিজেদেরও তৃপ্ত করতে তারা সক্ষম হবে না। খুব খারাপ, আমি এটাই বলতে চাইছি। যদি তারা সঙ্গে থাকা মেয়েটির প্রতি সত্যিকারের আকর্ষণ বোধ করে, যদি তারা নিজের এবং সঙ্গীর কাছে সৎ থাকে, তাহলে তারা উভয়কে তৃপ্ত করার কথা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাবতে শুরু করবে। এখন তারা নারীদের তৃপ্ত করতে না পারায় যৌনবাদী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আর তাই তারা সঠিক আচরণ করতে পারছে না। কিন্তু এটাও তো আচরণ, তাই না? যে জীবন তারা যাপন করে, তার বৈপরীত্যের কারণে কিছু পুরুষ অক্ষম। এটা খুব খারাপ যে এটা সেই ধরনের পুরুষদের দল, যারা অন্তত লিঙ্গবাদ সম্পর্কে সচেতন। নারী আন্দোলন তাদের বেশি ভুগিয়ে থাকে। কিন্তু বাকি অন্য বেশির ভাগ পুরুষ এর থেকে নারীর জন্য জীবন আরো বেশি অসহনশীল করে তোলার মাধ্যমে লাভ পাচ্ছে।

5

জন গেরাসি :  লাভ?

সিমোন দা বুভোয়ার :  মেয়েদের পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো। ভগি্নত্ব তৈরি করতে যে সাহায্য করেছে, এ কথা আমরা কিছুক্ষণ আগেই আলোচনা করেছি। এ অবস্থা এমন একটি আবহ সৃষ্টি করেছে যে আমি ভেবেছিলাম, মেয়েরা এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। কিন্তু না, সংগ্রাম মাত্র শুরু হলো; এবং প্রাথমিক অবস্থায় এটা জীবনকে আরো বেশি কঠিন করে তুলবে। মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতনের জন্য ততটা নয়, যতটা বরং প্রত্যেক পুরুষের জিহ্বার ডগায় থাকা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির জনপ্রিয়তার কারণে। এখনকার পুরুষদের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, ‘ও, তুমি তাহলে স্বাধীন। ঠিক আছে, এখন বিছানায় চলো।’ অন্যভাবে বললে বলা যায়, পুরুষরা এখন আরো বেশি আক্রমণাত্মক, অশ্লীল ও সহিংস হয়ে উঠেছে। আমার যৌবনকালে পায়চারি করতে যেতে পারতাম কিংবা উত্ত্যক্ত না হয়েই ক্যাফেতে বসতে পারতাম। ওহ, আমরা নানা কিছু পেতাম মিষ্টি হাসি, চোখ টেপা, চোখ রাঙানো এবং আরো অনেক কিছু। কিন্তু এখন একজন মহিলার পক্ষে একা একা কোনো ক্যাফেতে বসে বই পড়া অসম্ভব। এবং যদি কোনো পুরুষ উপযাচক হয়ে পরিচিত হওয়ার পরও সেই মহিলা একা থাকার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞ থাকে, তাহলে তাকে সহজেই দুশ্চরিত্রা অথবা বেশ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখন আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। সাধারণভাবে পুরুষদের আক্রমণাত্মক আচরণ ও দখলপ্রবণতা এত বেশি বেড়ে গেছে যে কোনো মহিলাই আর এই শহরে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছে না। এমনকি আমি আমেরিকার শহরগুলো সম্পর্কেও এ কথা শুনেছি। অবশ্যই, মহিলারা বাড়িতে থাকে। এটা তা-ই, যা পুরুষদের আক্রমণ প্রবণতার আড়ালে লুকিয়ে আছে হুমকি, যা পুরুষের চোখে, নারীর স্বাধীনতা তার নিরাপত্তাহীনতাকে সবার সামনে প্রকাশ্য করে ফেলেছে। এর ফলে সৃষ্ট রাগ শেষে এই ফল দেয় যে তারা এখন একটি নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ শুরু করেছে। এটা এ রকম যে শুধু যেসব মহিলা বাড়িতে থাকে, তারা শুদ্ধ। আর অন্যদের সহজেই চিহ্নিত করা যায়। যখন কোনো মেয়ে এ ধরনের সহজ চিহ্নিতকরণের শিকার হতে চায় না, তখন তারা একই কথা বলতে শুরু করে ‘মেয়েটিকে নিয়ে নাও।’ তাদের সবার আইডিয়া একটাই।

জন গেরাসি :  তাহলে সেই উপকথার কী হলো? প্রত্যেক ফ্রেঞ্চ পুরুষকে নিজের আচরণ বহাল রাখতে হবে, কিন্তু কোনটা? অবশ্যই এটা সত্য নয় যে ভালোবাসাবাসি একটা শিল্প, আর তারা অন্য সবার চেয়ে বড় শিল্পী।

সিমোন দা বুভোয়ার :  সমাজের পরজীবী স্তরের মতো কিছু অতি ধনী পরিবার বাদে এই উপকথার মৃত্যু ঘটেছে। যেমনটা বলা হয়, তাতে মনে হয়, ফ্রেঞ্চ পুরুষরা এখন আমেরিকা অথবা ইতালীয় পুরুষদের মতো আচরণ করতে শুরু করেছে। তারা শুধু ‘বিজয়ী’ হতে চায়। এবং তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক পুরুষ বাদ যাবে, যারা নিজেদের লিঙ্গবাদী মনোভাবকে (ঝবীরংস) নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তাদের মনোভাব এমন যে, মুক্ত নারীদের হওয়া উচিত এমন নিজের ক্যারিয়ারের শর্ত মেনে এবং বস্তুগত বিষয়ে একজন নারী যত বেশি লড়াইয়ের চেষ্টা করবে, তার নিজের পৃথিবীতে, পুরুষের পৃথিবীতে, তত সহজেই যেন তার বিছানায় যাওয়া উচিত।



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.