কাস্ত্রোর তিনটি প্রবন্ধ

1429204323

জৈব জ্বালানী (১)

মাত্র পাঁচ-শ বছর আগের কথা। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সময়। আজকের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু নগর ছিলই না তখন। আর, কয়েকটি নগরের জনসংখ্যা কয়েক লাখের বেশী হবে না। কারো বাড়িতেই তখন আলো জ্বালাতে এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎও খরচ হতো না। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা সম্ভবত ৫০ কোটির বেশী ছিল না। বিশ্বের জনসংখ্যা শত কোটির কোঠায় প্রথমবারের মত পৌঁছালো ১৮৩০ সালে। এর একশ ত্রিশ বছর পরে সেই সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে গেলো। এর ছেচল্লিশ বছর পরে এই গ্রহে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ালো সাড়ে ছয়শ কোটিতে। এই জনসংখ্যার বিপুল অংশ গরিব। এদেরকে পশুর সাথে খাদ্য ভাগ করে নিতে হয়। আর এখন ভাগ বসাতে হচ্ছে জৈব — জ্বালানীতে বা বায়োফুয়েলে।

আজ কম্পিউটার আর যোগাযোগ মাধ্যম ক্ষেত্রে যেসব অগ্রগতি ঘটেছে, সেদিন মানুষ জাতির সেসব হয় নি। তবে দুটি বিশাল মানব বসতির ওপর ততদিনে প্রথমবারের মত আণবিক বোমা ফেলা হয়ে গেছে। সেটা ছিল প্রতিরাষ্ট্র ব্যবস্থাহীন বেসামরিক জনসাধারণের বিরুদ্ধে এক নির্মম সন্ত্রাসবাদী কাজ। যে কারণে এমন কাজ করা হলো, তা একেবারেই রাজনৈতিক।

আজ, পৃথিবীতে আছে হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা। এসব বোমা প্রথমবারের মত ফেলা আণবিক বোমার চেয়ে পঞ্চাশ গুণ শক্তিশালী। এসব বোমা বহনের যে ব্যবস্থা, সে বাহনগুলোর গতি শব্দের গতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশী। এগুলো নিশানায় একেবারে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। এগুলো দিয়ে অগ্রসর প্রজাতি নিজেকেই ধ্বংস করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণ লড়াই করেছেন। সেই বিশ্বযুদ্ধশেষে উত্থান হলো এক নতুন শক্তির। সেই শক্তি গোটা দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলো। আর চাপিয়ে দিলো নিরঙ্কুশ পদ্ধতির নিষ্ঠুর এক ব্যবস্থা। আজো জনগণ সেই ব্যবস্থার মধ্যেই বাস করছেন।

বুশের ব্রাজিল সফরের আগেই এই সাম্রাজ্যের নেতা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, জৈবজ্বালানী তৈরীর জন্য শস্য ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যই হবে উপযুক্ত কাঁচামাল। ব্রাজিলের নেতা লুলা বললেন যে, আখ থেকে তৈরী জৈবজ্বালানীর যতটুকু দরকার, তার সবটুকুই ব্রাজিল যোগাতে পারবে। তিনি এই ফর্মুলার মধ্যে তৃতীয় বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখলেন। সমস্যা কেবল থাকলো আখ ক্ষেতের মজুরদের জীবনমান উন্নত করার। তিনি একটি বিষয়ে ভালভাবেই সজাগ ছিলেন। তিনি বললেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইথানল রফতানিতে বাধা দিচ্ছে যেসব শুল্ক বিধিনিষেধ ও ভর্তুকি, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তুলে নিতে হবে।

বুশ জবাবে জানালেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশে শুল্ক বিধিনিষেধ ও উৎপাদকদের দেয়া ভর্তুকি এমনই বিষয়, যেগুলোতে হাত দেয়া যায় না। শস্য থেকে ইথানল উৎপাদক দেশ ত’ যুক্তরাষ্ট্রও।

হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বিপুল গতিতে এই জৈবজ্বালানী তৈরী করে যেসব বিশাল আমেরিকান ট্রান্সন্যাশনাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তারা মার্কিন বাজারে প্রতি বছর তিন হাজার পাঁচ শ কোটি গ্যালন জৈবজ্বালানী বিপণন করতে দেয়ার জন্য সাম্রাজ্যের নেতার কাছে দাবী জানালো। সংরণমূলক শুল্ক সুবিধা ও ভর্তুকি মিললে এই পরিমাণ দাঁড়াবে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি গ্যালনে।

এ সাম্রাজ্যের চাহিদার শেষ নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্বালানী — ভোক্তা এই সাম্রাজ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সাম্রাজ্যকে তেল — গ্যাসের জন্য অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করতে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিল জৈবজ্বালানী তৈরীর স্লোগান।

ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, একক ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে আখের সাথে আফ্রিকানদের দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আফ্রিকার মানুষদেরকে নিজ বসত থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে আসা হয়েছে কিউবায়, হাইতিতে, ক্যারিবীয় সাগরের অন্যান্য দ্বীপে। আখ আবাদের ক্ষেত্রে ব্রাজিলেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে।

আজ, সে দেশে আশি ভাগ আখ কাটা হয় হাত দিয়ে। ব্রাজিলের গবেষকদের বিভিন্ন সমীা এবং অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য জানাচ্ছে যে, একজন আখ কাটুরে, যে ফুরনে কাজ করে, তাকে খাদ্য বস্ত্রসহ মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে ১২ টনের কম আখ কাটলে চলবে না। এ পরিমাণ কাজ করতে গিয়ে এই মজুরকে পা নাড়াতে হয় ৩৬,৬৩০ বার, দু হাতে ১৫ কিলোগ্রাম করে আখ নিয়ে ৮০০ বার এখান থেকে ওখানে হাঁটতে হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৮,৮০০ মিটার। এ কাজ করতে গিয়ে তার শরীর থেকে প্রতি দিন বেরিয়ে যায় গড়ে ৮ লিটার পানি। সেই সাথে, আখের পাতা পুড়িয়েই কেবল মানুষের কাছ থেকে এই পরিমাণ উৎপাদনশীলতা আশা করা যায়। আখ মানুষ হাতে কাটুক বা যন্ত্রে কাটুক, তা কাটার সময় পোকামাকড়ের কামড় থেকে রা পেতে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে সচরাচর আখের কাটা পাতা পোড়াতে হয়। কাজের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বলে নিয়ম থাকলেও ফুরনে কাজ করলে কাজ করতে হয় দিনে ১২ ঘণ্টা। এ সময় দুপুরে তাপমাত্রা কখনো কখনো পৌঁছায় ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে।

যুক্তরাষ্ট্রে কৃষির ফলন বিপুল মাত্রায় বেড়েছে দানা শস্য, ওট বা জই, জোয়ার, ভুট্টা, ইত্যাদি এবং সয়া, আলফালফা, সীম, ইত্যাদি ফসল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আবাদ করার ফলে। এভাবে এসব শস্য একের পর এক আবাদ করলে জমিতে নাইট্রোজেন এবং অন্যান্য জৈব সামগ্রী যোগ হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও অথবা ফাও) হিসাব অনুসারে ২০০৫ সালে দানা শস্যের ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৯.৩ টন।

অথচ, ব্রাজিলে একই পরিমাণ জমিতে ঐ ফসলই ফলে মাত্র তিন টন। এই ভ্রাতৃপ্রতীম দেশটিতে ২০০৫ সালে মোট ফসল উৎপাদন হয়েছিল তিন কোটি ছেচল্লিশ লাখ টন। এর পুরোটাই লেগেছে নিজস্ব চাহিদা মেটাতে। বিশ্ববাজারে শস্য বিক্রি করতে পারে নি।

এই অঞ্চলের অনেক দেশে প্রধান খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। লাখ লাখ টন শস্য না ফলিয়ে যদি জৈবজ্বালানী আবাদ করা হয়, তাহলে কি ঘটবে? শিল্পায়িত দেশগুলো তাদের কলকব্জা চালানোর জন্য জ্বালানীর উৎস হিসেবে যখন গম, ভুট্টা, ওট, বার্লি, সরগম ও অন্যান্য দানাশস্য ব্যবহার করবে, তখন যা ঘটবে সেটা উল্লেখ না করাই আপাতত স্বস্তিদায়ক।

এর সাথে এ কথাটিও উল্লেখ করা দরকার হয়, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শস্য আবাদ করা ব্রাজিলের জন্য খুব কষ্টসাধ্য। ব্রাজিলের যে অঙ্গরাজ্যগুলোতে এতদিন ধরে শস্য আবাদ হয়, সেগুলো মধ্যে আটটি অঙ্গরাজ্যে উৎপাদিত হয় ফসলের নব্বই শতাংশ। এর পাশাপাশি, আখের ষাট শতাংশ উৎপাদিত হয় চারটি অঙ্গরাজ্যে। আখ এমনই ফসল, যা অন্যান্য ফসলের সাথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আবাদ করা যায় না।

যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফসল তোলার জন্য যে ভারি যন্ত্র দরকার হয়, সেগুলো আর ট্রাক্টর, ইত্যাদি যন্ত্র চালাতে অনেক তেল লাগবে। যন্ত্রের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে না। আর, পৃথিবী যে গরম হচ্ছে, সেটা ত’ বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন। তারা গত দেড় শ বছরের বার্ষিক তাপমাত্রার হিসেব বের করেছেন।

অথচ, ব্রাজিলে উৎপাদিত হয় চমৎকার একটি খাদ্যশস্য, যেটিতে প্রোটিন প্রচুর, ফসলটি হচ্ছে সয়। উৎপাদিত সয়ের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ১ লাখ ১৫ হাজার টন। ব্রাজিলে ভোগে লেগেছে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টন। বাকিটুকু হয়েছিল রফতানি। এই বিপুল পরিমাণ সয় কি জৈবজ্বালানীতে রূপান্তরিত হবে?

মাংস উৎপাদনের জন্য গবাদিপশুর মালিকরা অভিযোগ করতে শুরু করেছেন যে, গো — চারণ জমিগুলোকে আখ তে বানানো হচ্ছে।

ব্রাজিল সরকারের বর্তমান মত — অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক সে দেশের সাবেক কৃষিমন্ত্রী রবার্টো রডরিগুয়েজ। তিনি আন্তঃআমেরিকা ইথানল কমিশনের যুগ্ম — সভাপতি। কমিশনটি গঠিত হয়েছে ২০০৬ সালে। আমেরিকা মহাদেশে জৈবজ্বালানী ব্যবহার প্রসারে যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডা অঙ্গরাজ্য এবং আন্তঃআমেরিকান উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) মধ্যে এক চুক্তির পরে এই কমিশন গঠিত হয়। সেই রবার্টো রডরিগুয়েজ জানিয়েছেন যে, আখ আবাদ যান্ত্রিক করার কর্মসূচী অতিরিক্ত কর্মসংস্থান করবে না। বরং, এর ফলে অদ জনশক্তি উদ্বৃত্ত হয়ে পড়বে।

ব্রাজিলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে গরীব মজুররা পেটের দায়ে আখ কাটার কাজ করেন। এ কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো তাদেরকে পরিবার — পরিজন ফেলে দূরে থাকতে হয় অনেক মাস। বিপ্লবী বিজয়ের আগে কিউবাতেও এমনই হতো। সে সময় কিউবাতেও আখ কাটা হতো হাতে, গাট বেঁধে টেনে নিয়ে গাড়ীতে তোলা হতো হাতে, যান্ত্রিক আবাদ ও পরিবহণ বলতে গেলে ছিলই না। কিউবার সমাজের ওপর চাপিয়ে — দেয়া নির্মম ব্যবস্থাটির মৃত্যুর সাথে সাথে আখ — কাটুরেদের লিখতে — পড়তে শেখানো হলো জোরেসোরে; তারা কয়েক বছরের মধ্যে আখ খেতে হেঁটে বেড়ানোর কাজটি ছেড়ে দিলেন। ফলে, দরকার পড়লো হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী।

এবার, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জাতিসংঘের সামপ্রতিক একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করি। পৃথিবী গরম হতে থাকলে হিমবাহ গলে যাওয়া জল আর আমাজনের জল মিলে দণি আমেরিকায় যা ঘটবে, সে কথা এ প্রতিবেদনে আবার উল্লেখ করা হয়েছে।

জৈবজ্বালানী তৈরীর পেছনে অর্থ যোগানোর কাজে মার্কিন ও ইউরোপীয় পুঁজিকে ঠেকাতে পারবে না কোনো কিছুই। বরং, এ পুঁজি ব্রাজিল এবং লাতিন আমেরিকায় উপহার হিসেবে তহবিল পাঠাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি আর ক্ষুধা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মার্কিন, ইউরোপীয় এবং অন্যান্য শিল্পায়িত দেশ বছরে ১৪ হাজার কোটি ডলার বাঁচাতে পারবে। ক্ষুধা ত’ সবার আগে ছোবল দেবে তৃতীয় বিশ্বে। আর, জৈবজ্বালানী এবং বিশ্ববাজারে থাকা সামান্য খাদ্য যে কোনো দামে কেনার মত অর্থ ঐসব শিল্পায়িত দেশের হাতে থাকবে।

তাই, এখনই একটি জ্বালানী বিপ্লব দরকার। যে ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ বেশী খরচ হয়, এমন বাল্বগুলোই কেবল বদলে ফেলা নয়, সেই সাথে পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার করার দরুন দুই তিন গুণ বেশী জ্বালানী লাগে, এমন সব গৃহস্থালী, বাণিজ্যিক, শিল্প, পরিবহণ ও সামাজিক কাজে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যাপকভাবে পাল্টে ফেলতে হবে।

প্রতি বছর এক হাজার টন জীবাশ্ম জ্বালানী খরচ করা হয়, এ কথা মনে পড়লে যন্ত্রণা হয়। এমন খরচের অর্থ দাঁড়ায় : যা তৈরী করতে প্রকৃতির লেগেছিল লাখ লাখ বছর, সেটাই লোকেরা শেষ করে ফেলছে প্রতি বছরে। এমন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের কলকারখানা বিপুল সব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এমনই একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বেকারত্ব হ্রাস।

আজ পৃথিবী আরেক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সে ঝুঁকি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা। সাম্প্রতিককালে ডলারের দাম হ্রাসের ধারা অব্যাহত রয়েছে। কখনো তা নিম্নগামিতার রেকর্ড ছুঁয়েছে। অথচ, প্রত্যেক দেশের অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ এই কাগুজে মুদ্রায় আর মার্কিন বন্ডে।

সুত্রঃ  এ প্রবন্ধে আসন্ন জৈবজ্বালানী বিপ্লব এবং সেই প্রেক্ষিতে জৈবজ্বালানী সম্পদের ওপর মার্কিন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজ ভাবনা প্রকাশ করেন কাস্ত্রো, ২০০৭ সালের মে দিবসের প্রাক্কালে। এর অংশবিশেষ মুদ্রিত হয় কলকাতার ইংরেজী সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ারের জুন ১৭ — ২৩, ২০০৭ সংখ্যায়।

images

ক্ষেপণাস্ত্র — বিধ্বংসী ব্যবস্থা (২)

বুশ আমাকে মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছেন বা এ কাজে অনুমোদন দিয়েছেন; আমার একটি স্মৃতিকথায় এমন দাবী আমি একবার কেন করেছিলাম?

আমার সে কথা দ্ব্যর্থতাবোধক ও অস্পষ্ট মনে হতে পারে। তিনি আমাকে মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছেন ও সেই আদেশ অনুমোদন করেছেন; এমন কথা বলাটাই হয়ত আগের কথার চেয়ে সঠিক হতো। তবে সেই কথা বলাটা হতো আরো বিভ্রান্তিকর। তাই, কথাটি এখনই ব্যাখ্যা করার সুযোগ আমাকে দিন।

জুয়াচুরির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে তিনি নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে নেন। তবে সেই ছিনিয়ে নেয়ার আগেই আমাকে হত্যার জন্য তার পরিকল্পনার নিন্দা জানানো হয়।

আমি ২০০০ সালের ৫ আগস্ট পিনার দেল রিও’তে এক বিশাল সমাবেশে সেই পরিকল্পনার নিন্দা জানাই। ছাব্বিশে জুলাই [ কিউবায় বিপ্লবী আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিন — অনু.] উদযাপন উপলক্ষে ঐ প্রদেশে এত দিন ধরে যে অনুষ্ঠান হয়ে আসছে, তারই অংশ হিসেবে এ সমাবেশ হয়েছিল।

আমাকে হত্যার জন্য শত শত পরিকল্পনার দায়িত্ব যাদের ছিল, সে লোকদের চিহ্নিত করার চেষ্টা সফল হয় নি। আমাকে সরিয়ে দেয়ার সব ধরনের প্রত্য — পরো চেষ্টা চালানো হয়েছে। পন্থাটি নৈতিকভাবে বাদ দিতে নিঙনকে বাধ্য করার পরে ফোর্ড হত্যা কর্মকাণ্ড গুলোতে সরকারী কর্মচারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে দেন।

আমার স্থির ধারণা যে, আমার বিরুদ্ধে এমন আদেশ কার্টার দিতেন না। তাঁর নীতিগত বিশ্বাসগুলো ছিল ধর্মীয় প্রকৃতির। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে একমাত্র তিনিই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কিউবার প্রতি বন্ধুত্বের মনোভাব দেখিয়েছিলেন। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে একটি ছিল কিউবায় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভাগটি প্রতিষ্ঠা।

ক্লিনটন আমাকে হত্যার আদেশ কখনো দিয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। তাই, এ ধরনের কাজের জন্য তাঁকে দায়ী করতে পারি না। কিউবা থেকে অপহরণ করে আনা শিশুটিকে তার বাবা ও নিকট — আত্মীয়দের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মার্কিন আদালতের রায় মেনে নিয়ে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন এবং রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানের সাথে কাজ করেছেন। সে সময় আমেরিকান জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আদালতের রায়টি সমর্থন করেছিলেন।

তবে, এটাও সত্যি যে, তাঁর সরকারের আমলেই হাভানা ও ভারাদেরোসহ বিভিন্ন নগরের হোটেলগুলোতে ও অবকাশ কেন্দ্রে বোমা পেতে রাখার জন্য পোসাডা ক্যারিলেস মধ্য আমেরিকান ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়োগ করেছিল। এ কাজের উদ্দেশ্য ছিল কিউবার অর্থনীতিতে আঘাত হানা। অর্থনৈতিক অবরোধ ও বিশেষ পর্বের [সোভিয়েত ইউনিয়ন, প্রভৃতি দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনহেতু কিউবার বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে তৈরী সংকট — অনু.] কারণে কিউবার অর্থনীতি তখন নাজুক অবস্থায়। পেতে — রাখা বোমায় বিস্ফোরণের কয়েকটি ঘটনা ঘটে। এমন একটি ঘটনায় মারা যান ইতালির তরুণ এক পর্যটক। সেই তরুণের মৃত্যুতে সন্ত্রাসবাদীরা বলেছিল, পর্যটকটি ‘অসময়ে অ — জায়গায় ছিল।’ এ কথা বলতে তাদের এতটুকু বাধে নি। বুশ কিছু দিন আগে কবিতার চরণ আবৃত্তির মত করে এ কথাটি আবার আওড়েছেন। এসব বোমা বানানোর জন্য অর্থ, এমনকি বোমাগুলো বানানোর জন্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী যুগিয়েছিল কিউবার আমেরিকান ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন (সিএএনএফ)। এ ফাউন্ডেশনের হাতে বেশ অর্থকড়ি আছে। নির্লজ্জভাবে লবিং করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে বিভিন্ন দলের সদস্যদের মধ্যে ফাউন্ডেশন এই অর্থ বিলি করে।

লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সপ্তম সভা হওয়ার কথা ছিল ভেনেজুয়েলার আয়লা মার্গারিতায়, ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে। শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়া আমার দায়িত্ব।

সে বছরের ২৭ শে অক্টোবর ‘লা এসপেরানজা’ নামে একটি নৌযান এগিয়ে যেতে থাকে আয়লা মার্গারিতার দিকে। নৌযানটি পুর্টোরিকো উপকূলের খুব কাছাকাছি চলে এলে সেই দখলকৃত দ্বীপের [পুর্টোরিকোকে বোঝানো হয়েছে; সেখানকার জনগণের একাংশের দাবী স্বাধীনতা — অনু.] উপকূল রী ও শুল্ক বিভাগ নৌযানটির গতিরোধ করে। তাদের সন্দেহ ছিল যে, নৌযানটি মাদকদ্রব্য চোরাচালান করছে। দেখা গেল, নৌযানটিতে রয়েছে কিউবায় — জন্মেছিল — এমন চার সন্ত্রাসী। আর তাদের সাথে রয়েছে ৫০ ক্যালিবারের দুটি আধা — স্বয়ংক্রিয় এসল্ট রাইফেল, যেগুলোতে আবার ইনফ্রারেড রশ্মিচালিত দূরবীণ যন্ত্র যুক্ত ছিল। এই রাইফেলের গুলি হাজার মিটারের বেশী দূর থেকে লোহার পাত দিয়ে ঢাকা গাড়ীতে অথবা আকাশে উড়ে — চলা বা উড়তে বা নামতে চলেছে — এমন অবস্থায় বিমানে আঘাত হানতে পারে। আর দূরবীণ যন্ত্রের সাহায্যে রাইফেলের নিশানা ছিল নির্ভুল। আটক — করা লোকদের সাথে সাত বাঙ গুলিও ছিল।

এই আধা — স্বয়ংক্রিয় রাইফেলগুলো কিউবান আমেরিকান ন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সভাপতি ফ্রাঁসোয়া হোসে হার্নান্ডেজের। ‘লা এসপেরানজা’ নামের এই নৌযানটি ঐ প্রতিবিপ্লবী সংগঠনের অন্যতম পরিচালক হোসে আন্তেনিও লামাসের রেজিস্ট্রি — করা সম্পত্তি। তিনি কিছুদিন আগে ঘোষণা করেছেন যে, কিউবার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কাজ চালানোর মতলব নিয়ে সিএএনএফ মালামাল বহন করতে পারে — এমন একটি হেলিকপ্টার, দূর — নিয়ন্ত্রণযোগ্য খুব হাল্কা দশটি বিমান, সাতটি জাহাজ ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য কিনেছে। সংগঠনটির হাতে আগে থেকেই একটি নৌযান আছে। সেটির নাম ‘মিডনাইট এঙপ্রেস’। লামাসের কথা অনুসারে ফিদেলকে হত্যা ও তার সরকারকে উৎখাত করার পরে সর্দারদের সর্দার, চেয়ারম্যান মাস কানোসাকে এই নৌযান কিউবায় নিয়ে যাবে আর তখন সে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করবে।

এই চার সন্ত্রাসীকে আদালতে সোপর্দ করা ছাড়া পুর্টোরিকোয় মার্কিন কর্তাদের গত্যন্তর ছিল না। গোটা ষড়যন্ত্রটি সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল ভেনেজুয়েলায় পোসাডা ক্যারিলেসের। কথা ছিল, সে ভেনেজুয়েলায় যে কোনো সময় পৌঁছাবে।

মার্কিন কর্তৃক এই ফাউন্ডেশনকে সরকারী তহবিল দিয়েছে, কোটি ডলারের ব্যবসা দিয়েছে। এসব তথ্য কি তাদের অজানা ছিল?

একদিকে টলে — থাকা জুরি ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘সাীসাবুদের অভাবে’ বেকসুর খালাস করে দেয় আটককৃতদের। কারচুপি — করে — চালানো এই মামলা ইচ্ছেমতো মোচড়ায় হেকতর পেসকুরা নামে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) দুর্নীতিবাজ এক কর্তা। পরে, তাকে মিয়ামিতে এফবিআই’র সদর দফতরে পরিচালক পদে বসিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। কিউবায় সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাবিরোধী পাঁচ কর্মীকে ফোরিডায় গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা ছিল এই লোকটির।

কুখ্যাত কিউবান — আমেরিকান মাফিয়া ২০০০ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য কোমর বাঁধছিল। দু দলই [ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি — অনু.] ফোরিডায় এ মাফিয়ার সমর্থন পাওয়ার জন্য দৌড় শুরু করে। কারণ ফোরিডা রাজ্যের ভোট জয় — পরাজয় নির্ধারণ করে দিতে পারতো। এ চক্রের সর্দাররা এক্কেবারে নির্ভেজাল বাতিস্তা জাতের। ভোটের কারচুপিতেও তারা ওস্তাদ। এক ভাষণে আমি বলেছিলাম:

‘তথাকথিত রিপাবলিকান কনভেনশন সবেমাত্র শেষ হয়েছে। এ কনভেনশন হয়েছে ফিলাডেলফিয়ায়, অন্যকোথাও নয়। আর ফিলাডেলফিয়া হচ্ছে ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্বাধীনতা ঘোষণার সূতিকাগার।…যে দাস — মালিকরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, তারা প্রকৃতপক্ষে অমর্যাদাকর দাসপ্রথা বিলোপ করে নি। দাসপ্রথা প্রায় এক শ বছর বহাল ছিল।

…রিপাবলিকান দলের বিখ্যাত প্রার্থীর নেতৃত্বে ফিলাডেলফিয়ার সদ্যসমাপ্ত দলের সম্মেলনে প্রথম ঘোষণাটি ছিল সামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি এবং গোটা দেশজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র  প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সংক্রান্ত। এ ক্ষেপণাস্ত্র  প্রতিরোধ ব্যবস্থায় থাকবে জালের মত ছড়িয়ে রাখা অনেক র্যাডার, যা মার্কিন ভূ — খণ্ড অভিমুখী শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র  চিহ্নিত করে মাঝ — আকাশে তা ধ্বংস করবে।

এসব ইচ্ছা যাদের, তারা বুঝতে অম যে, এমন নীতি ইউরোপসহ সারা পৃথিবীর প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়বে। চুম্বক যেভাবে লোহার সব টুকরো এক জায়গায় টেনে নেয়; এমন রণনীতির ফলে যেসব দেশ মার্কিন হুমকির মুখে পড়বে, সেই দেশগুলো সেভাবেই এক সাথে হবে, এর সাথে সাথে শুরু হবে একটি নতুন, বিপজ্জনক ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্রপ্রতিযোগিতা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অস্ত্রের বিস্তার কোনোভাবেই প্রতিহত করা যাবে না।

বুশের সামপ্রতিক আলবেনীয় রাজধানী সফরের সাত বছর আগে আমি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে এ সতর্কবাণী উচ্চারণের সাহস দেখিয়েছিলাম। এ সফর সম্পর্কেও আমি কিছু ভাবনা প্রকাশ করেছি অন্যলেখায়।

আমার সেই ভাষণে আমি আরো বলেছিলাম :

এ পরিকল্পনার রচয়িতারা খুব ভালভাবে জানেন যে, আমেরিকান জনগণের অর্ধেকের সামান্য বেশী সংখ্যক বিশ্বাস করেন যে, তাদের দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এ পরিকল্পনাটি সবচেয়ে উপযুক্ত। অথচ, এই অর্ধেকের বেশী সংখ্যক মানুষ এখনো এই জটিল বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারেন নি; তাদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে সামান্য। এই প্রার্থীর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা আরো বেশী কাণ্ডজ্ঞান বিশিষ্ট বা যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু, সেসব প্রস্তাবের চেয়ে এই প্রার্থীর এ প্রস্তাবটিই ভোটদাতাদের কাছে তাকে দৃঢ়চেতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও কঠোর মনোভাবের মানুষ হিসেবে তুলে ধরবে; ভোটাররা মনে করবেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত বা কল্পিত যত বিপদের মুখে রয়েছে সেগুলো মোকাবিলায় এমন লোকেরই দরকার। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে তারা ফিলাডেলফিয়া থেকে এই সুসমাচারই পাঠিয়েছে।

আফগানিস্তান দখল এবং ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনার আগে পর্যন্ত এতটুকুও ভাল ছিল।

লাতিন আমেরিকা নিয়ে বুশের কর্মসূচীরও আমি নিন্দা জানাই। ঐ ভাষণে আমি বলি:

এই চৌকষ রাজনৈতিক মঞ্চ লাতিন আমেরিকার, বিশেষ করে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য কি দেয়ার প্রস্তাব করেছে? একটা আপ্তবাক্য বলা হয়ে থাকে, যে বাক্যটি গোটা ফন্দিটি ফাঁস করে দেয়। এ বাক্যটি হচ্ছে, ‘আগামী আমেরিকান শতাব্দীতে গোটা আমেরিকান গোলার্ধ একাকার হবে।’ এই সরল — সোজা কথাটির অর্থ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ওপর মার্কিন মালিকানা অধিকার ঘোষণা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

এ ঘোষণায় আরো বলা হয়েছে : ‘কংগ্রেসের সাথে মিলে প্রেসিডেন্ট প্রধান প্রধান গণতান্ত্রিক দেশ এবং সর্বোপরি, মেক্সিকোর সাথে কাজ করবেন।’ বিশেষ করে যে শব্দগুলো চোখে পড়ে, তা হচ্ছে : ‘এবং, সর্বোপরি, মেক্সিকো’। কারণ, একটি অন্যায়, সমপ্রসারণবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে এই মেক্সিকোর অর্ধেক ভূ — খণ্ড তারা কেড়ে নিয়েছে। এখন এদের শেষ উদ্দেশ্যটুকু হচ্ছে এ দেশটির অর্থনীতিকে নিজেদের অর্থনীতির সাথে একীভূত করা দিয়ে শুরু করে দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে পরিপূর্ণরূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন করা এবং এর পরে আমাদের অঞ্চলে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে এসব দেশের ওপর অবাধ বাণিজ্য চুক্তি চাপিয়ে দেয়া। ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট দ্বীপটিও এ থেকে রেহাই পাবে না। জনগণ নয়, পুঁজি ও পণ্যের অবাধ চলাচলের সুযোগ তারা চায়।

যা হওয়াটা স্বাভাবিক, সেভাবেই ফিলাডেলফিয়ার এই রাজনৈতিক মঞ্চ লাতিন আমেরিকা সংক্রান্ত বক্তব্যে কিউবার প্রসঙ্গটি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কথাবার্তা বলেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে যে, কিউবার বর্তমান শাসকবর্গ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিলে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর সুযোগকে আইনসম্মত করলে, বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে দিলে, মতপ্রকাশের সুযোগ দিলে এবং অবাধ নির্বাচনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে কিউবা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক পাল্টাবে। এই বাগাড়ম্বর রচয়িতাদের কাছে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একটি সেকেলে, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা, যেখানে কেবল টাকাই সব নির্ধারণ করে আর শূন্য সিংহাসনে উত্তরাধিকারী বসানোর মত করে তড়িৎ গতিতে মনোনীত করা যায় একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে।”

বার্তা সংস্থার একটি খবরে বলা হয়েছে : ‘এই রাজনৈতিক মঞ্চ বিপ্লবের শত্রুদের সক্রিয় মদদ দেয়া ছাড়াও ক্যারিবীয় দেশটির [ কিউবা — অনু. ] উদ্দেশে মার্কিন দেশ থেকে বেতার সমপ্রচার করবে।’ মার্কিন ভূখণ্ডে স্থাপিত অন্তর্ঘাতী কাজে ব্যবহৃত বেতার কেন্দ্র থেকে কিউবার বিরুদ্ধে নোংরা — আবর্জনা তারা ছড়িয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখতে চায়। কিউবার বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারী সম্প্রচার কাজে হোসে মার্তির নাম তারা রুচিহীনভাবে ব্যবহার করা চালিয়ে যাবে। অথচ, হোসে মার্তি নামটি আমাদের দেশের জনগণের কাছে গৌরবমাখা, পবিত্র।

এর পরে, কিউবার বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনসভা সদস্যরা এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বললেন, ‘নজিরবিহীন ভাষ্য। রিপাবলিকান দল এর আগে কখনো এত বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি দেয় নি।’

রিপাবলিকান মঞ্চে আবর্জনা স্তূপের একেবারে ওপরে আরেকটু ছিল। এ মঞ্চ থেকে বলা হলো, ‘রিপাবলিকান দলের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, ১৯৬৬ সালের কিউবান এডজাস্টমেন্ট এ্যাক্টের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণ করে যাওয়া উচিত। কমিউনিস্ট স্বৈরশাসন থেকে পালিয়ে — আসা কিউবান উদ্বাস্তুদের অধিকারগুলোকে এই আইনে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।’

সাম্রাজ্যবাদী নীতির সম্মান এমনভাবে গুঁড়িয়ে যাবে যে, তার ধুলোর রেশটুকুও থাকবে না। ভণ্ডামি আর মিথ্যা আমরা একের পর এক সুসমন্বিতভাবে উন্মোচন করব। বিপ্লবের এই চল্লিশ বছরে কেমন মানুষ তৈরী হয়েছে, সে সম্পর্কে তাদের একেবারেই কোনো ধারণা নেই।

আমাদের বার্তা পৃথিবীর প্রতি কোণে পৌঁছাবে, আমাদের সংগ্রাম হয়ে উঠবে উদাহরণ। এ পৃথিবীকে দমিত রাখা হবে আরো কঠিন। জনগণকে অধীন রাখার ব্যবস্থা পুরোপুরি ভঙ্গুর না — হয়ে ওঠা পর্যন্ত এ দুনিয়া লড়াই চালিয়ে যাবে।

সাম্রাজ্যের নেতা যে – ই নির্বাচিত হন, তার ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, প্রাণঘাতী কিউবান এডজাস্টমেন্ট এ্যাক্ট, অপরাধমূলক বিভিন্ন আইন এবং গণহত্যামূলক অর্থনৈতিক অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান কিউবার দাবী। এসব আইনের সাথে জড়িয়ে আছে টোরিসেইলি এবং হেল্মস — বার্টনের কুখ্যাত নাম। উল্লেখ করা দরকার যে, এসব আইন ও নীতি যারা প্রণয়ন করেছেন, প্রচার করেছেন, বলবৎ করেছেন, তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নির্ধারিত ও নিন্দিত গণহত্যার অপরাধে দোষী। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা, দু দেশই এসব চুক্তিতে সই করেছে।

তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, এসব তির জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে এখনো কোনো মামলা করা হয় নি। ক্ষতিপূরণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। এসবের আগে থেকেই মার্কিন সরকারের কাছে কিউবার জনগণের তিন শ বিলিয়ন [৩০ হাজার কোটি — অনু. ] ডলারের বেশী পাওনা রয়েছে। ভাড়াটে সৈন্যদের দিয়ে বে অভ পিগস আক্রমণের, বিভিন্ন অন্তর্ঘাতী তৎপরতার ও অন্যান্য অপরাধের সময় মানুষের যে য়তি হয়েছে, সেটা থেকেই এ ক্ষতিপূরণ পাওনা।

চীন ও ভিয়েতনামের মত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে কিউবার সম্পর্ক এখন যেমন আছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার সম্পর্ক সেভাবেই কখনো স্বাভাবিক হয়, তাহলে কিউবার মতাদর্শিক — অবস্থান সম্পর্কে তাদের যেন কোনো বিভ্রান্তি না থাকে। অন্যান্য দেশের জনগণের বিরুদ্ধে চালিত অপরাধমূলক কোনো তৎপরতা, কোনো আগ্রাসন বা অন্যায়ের মুখে আমরা নীরব থাকব না। এখনকার সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী ও এক মেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা যত দিন অটুট আছে, মানবতার ওপরে অভিশাপ হয়ে আছে, মানবজাতির অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে আছে, ততদিন চিন্তা — ভাবনা নিয়ে আমাদের লড়াই থামবে না।

পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দেয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভয়াবহ দিক সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় আমেরিকান জনগণ সজাগ হয়ে উঠছেন।

কিউবার বিপ্লব কেবল নিজ দেশের জনগণের নৈতিক সংহত চরিত্র এবং দেশপ্রেম ও বিপ্লবী চেতনার এবং টিকে — থাকার জন্য মানুষের সহজাত বোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজ মানুষের টিকে — থাকাটাই হুমকির মুখে। আমেরিকান জনগণের ঐতিহ্যবাহী আদর্শগুলো থেকেও কিউবার বিপ্লব শিা নেয়, সেসবে বিশ্বাস করে। কেবল স্থূল প্রতারণা দিয়েই আমেরিকান জনগণকে অন্যায় যুদ্ধে ও নির্লজ্জ আগ্রাসনে জড়িয়ে ফেলা যায়। বাগাড়ম্বরপূর্ণ সব কথা আর যত মিথ্যা উন্মোচিত হয়ে গেলে, সেগুলোকে পরাস্ত করা হলে পরে আমেরিকান জনগণকে বিশ্ব চমৎকার মিত্র হিসেবে পাবে। যে ঘৃণ্য যুদ্ধে লাখ লাখ ভিয়েতনামী ও অর্ধ লাধিক তরুণ আমেরিকান প্রাণ হারিয়েছেন, সেই যুদ্ধের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছিল। খুব সামপ্রতিক উদাহরণ হচ্ছে কিউবার এক শিশু ও তার পরিবারের প্রতি আমেরিকান জনগণের মহতী সমর্থন। এই শিশু ও তার পরিবার একদল দুর্বৃত্তের নিষ্ঠুর দুষ্কৃতির শিকার। ওই দুর্বৃত্ত দল যুক্তরাষ্ট্রের আতিথেয়তার সুযোগ নিয়েছে আর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পদদলিত করে, তাতে আগুন ধরিয়ে দেখিয়েছে তাদের ঘৃণা ও ক্ষোভে।

কিউবার ব্যাপারে মার্কিন নীতি একতরফাভাবে পাল্টাতে হবে। কারণ, কিউবার বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ মার্কিন নেতারা একতরফাভাবে শুরু করেছিলেন।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতে চাই : আপনারা বোকা। কিউবা অজেয়, কিউবার বিপ্লব ধ্বংস করা যায় না, কিউবার জনগণ কখনোই নতজানু হবেন না বা আত্মসমর্পণ করবেন না। আপনারা কি এটা বুঝতে পারেন না? প্রায় ৪২ বছর ধরে চালিত এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিধরের অবরোধ ও আগ্রাসনের মুখে সফলভাবে টিকে আছে যে দ্বীপ, যে দ্বীপের নাম কিউবা, সেই দ্বীপের আগ্নেয়শিলার মধ্যে থাকা খনিজ দ্রব্যের মতই আমাদের হৃদয় — মনের গভীরে দৃঢ় প্রোথিত আমাদের দেশপ্রেম, আমাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ। আপনারা কি এটা উপলব্ধি করেন না?

মর্যাদার শক্তি আমাদের রা করে। আমরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি, যে ন্যায়বিচার আমাদের অপরাজেয় ইস্পাতব্যূহ, যে সত্য ও নৈতিকতা আমাদের অনির্বাণ শিখা এবং চিন্তা — ভাবনা ও আদর্শের যে দু’সারি প্রতিরা ব্যূহ আমরা গড়ে তুলেছি, তা দুর্ভেদ্য।”

তাই, যা আর প্রজাতন্ত্র নয়, যাকে আর প্রজাতন্ত্র বলা যায় না, যেটি নেহাৎ একটি সাম্রাজ্য, তারই নেতা যদি আপনি বুশ সাহেব হয়ে যান, তখন একজন সৎ বৈরী পরে চেতনা থেকে আপনাকে পরামর্শ দেব আপনার কনভেনশনের আনন্দ — উল্লাস — মাতোয়ারা মেজাজ ঝেড়ে ফেলে নিজের মতাদর্শিক — অবস্থান আবার বিবেচনা করুন, যাতে আপনি এমন প্রেসিডেন্ট না হন, যিনি আগের নয়জন প্রেসিডেন্টের মতই এলেন আর কেবল নিস্তেজ ও অপ্রয়োজনীয় তিক্ততা নিয়ে একটি বিপ্লবকে দেখে দেখে চলে গেলেন, যে বিপ্লব নতজানু হবে না, আত্মসমর্পণ করবে না, যাকে কখনো ধ্বংস করা যাবে না।

জড়ো হওয়া কিউবান — আমেরিকান লোকদের, যারা আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আপনি যা বলেছেন, সে ব্যাপারে আমি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। আপনি বলেছেন যে, আপনি খুব সহজে কিউবা সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এ হচ্ছে সেই ঘৃণ্য সময়ের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, যে সময়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের দেশের নেতাদের হত্যা করার ষড়যন্ত্রের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। কিন্তু ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আমি পোষণ করি না। আমি আপনার প্রতি আবেদন জানাব যে, আপনি যেন ভুলে না যান যে, একেকজন বিপ্লবী নেতাকে আপনি দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই প্রতি জন বিপ্লবী নেতার স্থান নেয়ার মত লাখ লাখ নারী — পুরুষ কিউবায় রয়েছে আর আপনি যত জনকে সরাতে পারবেন বা আপনার বিপুল — বিশাল — বিস্তৃত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি পরাস্ত করতে পারবে, তাদের স্থান নেয়ার জন্য সরিয়ে — দেয়া নেতাদের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশী নারী — পুরুষ আছেন কিউবায়।”

সুত্রঃ ফ্রন্টিয়ার, আগস্ট ৫-১১, ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত।

images (1)

তিরানা যাত্রা (৩)

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় বুশ সফরে গিয়েছিলেন। এই অদ্ভুত সফরের খবর আমরা তখন জানতে পারি। তিনি সেখানে কসোভোর স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে বক্তব্য পেশ করেছেন। এ বক্তব্য পেশ করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট সার্বিয়া, রাশিয়া এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের স্বার্থের কথা একটুও বিবেচনা করেন নি। অথচ এই প্রদেশটির ব্যাপারে যা ঘটতে চলেছে, সে বিষয়ে এসব দেশ খুবই উদ্বিগ্ন। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই প্রদেশটিতেই উত্তর আটল্যান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটো মাত্র ক’দিন আগে যুদ্ধ করেছে। বুশ সার্বিয়াতে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, কসোভোর স্বাধীনতাকে সমর্থন করলে সার্বিয়া পাবে অর্থনৈতিক সাহায্য। অথচ সার্বিয়ার সংস্কৃতির জন্মস্থান হচ্ছে কসোভো। তাঁর প্রস্তাবটি এমন যে, হয় রাজি হও, নয় অ — রাজি, মাঝামাঝি কিছু নেই!

বুশ যেন মমতা চেয়ে বেড়াচ্ছেন। বুলগেরিয়ায় তাকে যে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে, তা তিনি পুরোদমে উপভোগ করেছেন। সেখানে কোনো প্রতিবাদ — বিাক্ষোভ হয় নি। বুলগেরিয়ার যে সৈন্যরা ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তাদের সাথেও বুশ কথাবার্তা বলেছেন। এসব শান্তিপূর্ণ যুদ্ধে আরো উদারভাবে যাতে এই সৈন্যরা রক্ত ঢেলে দেন, সে উদ্দেশ্যে তাদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করারও চেষ্টা করেছেন বুশ।

পারমাণবিক হামলারোধের ব্যবস্থার মধ্যে বুলগেরিয়াকে নেয়া হচ্ছে না বলে সে দেশের নেতারা অনুযোগ করলে বুশ তাৎণিকভাবে ঘোষণা করলেন : মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র  থেকে নিজেদের রার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আপনারা পাবেন।

এই সাম্রাজ্য [ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র — অনু. ] বুলগেরিয়ায় যে তিনটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে, সেগুলোতে বুশের দু হাজার থেকে পাঁচ হাজার সৈন্য সবসময় থাকবে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হয়, আমরা যেন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী জায়গায় বাস করছি।

আলবেনিয়াতে বুশ ৱেহের কিছু পরশ পেয়েছেন। বুলগেরিয়ায় কয়েক হাজার লোক ছোট ছোট মার্কিন পতাকা নেড়ে বুশকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু আলবেনিয়ায় তিনি যে আন্তরিকতা পেলেন, সেটির তুলনায় বুলগেরিয়ার সংবর্ধনা ছিল শীতল।

আর দেরি না করে আলবেনিয়াকে সামরিক জোট ন্যাটোতে ভুক্ত করে নেয়ার প্রস্তাবে এবং কসোভোর স্বাধীনতার দাবীর প্রতি বুশের সমর্থন আলবেনিয়ার কিছু লোককে কিছুটা পাগল করে তুলেছে।

বিভিন্ন খবরের কাগজ ও তথ্য মাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায় : এসব পাগল — প্রায় লোককে প্রশ্ন করলে তারা জবাব দিয়েছে :

“বুশ গণতন্ত্রের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র জনগণের স্বাধীনতার রক।” বিমানবন্দর থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিশ কিলোমিটারের বেশী পথের দু ধারে পাহারায় দাঁড়িয়েছিল কয়েক হাজার আলবেনীয় সেপাই ও পুলিশ। মার্কিনীদের দাবী ছিল যে, পাহারায় থাকা সেপাই পুলিশদের সকলে থাকবে নিরস্ত্র।

সার্বিয়ার একাংশের স্বাধীনতার বিষয়টি কণ্টকাকীর্ণ সমস্যা। বিষয়টি ইউরোপে খুব বিতর্কিতও। এটা এমনই এক নজির হয়ে দাঁড়াবে, যেটার অনুসরণ করে অন্যান্য অঞ্চলে কয়েকটি দেশের সীমানার মধ্যেই সার্বভৌমত্বের দাবী তোলা হতে পারে।

এবং আলবেনিয়া চরম বাম অবস্থান থেকে চরম ডান অবস্থানে চলে গিয়েছে।

সার্বিয়া কেবল যে রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের আঘাত পাবে, তাই নয়; অর্থনৈতিক দিক থেকেও আঘাতটি হবে বড়। সার্বিয়ার মজুদ ইন্ধনের ৭০ শতাংশ কসোভোতে। উনিশ শ আঠাশ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দস্তা ও রূপার ৭০ শতাংশ এসেছে কসোভো থেকে। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। দস্তা ও রূপার সম্ভাব্য মজুদের ৮২ শতাংশ কসোভোতে। বঙাইট, নিকেল ও কোবাল্টের সবচেয়ে বেশী মজুদও সেখানেই।

সার্বিয়া হারাবে কলকারখানা, জমি ও অন্যান্য সম্পদ। সার্বিয়ার থাকবে কেবল বিপুল বিদেশী দেনা শোধের দায়। কসোভোতে ১৯৯৮ সালের আগে পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে গিয়েই সার্বিয়ার ঘাড়ে চাপে এ দেনা।

মাত্র কিছুণ আগে বার্তা সংস্থা এএফপি’র একটি খবর পেয়েছি। সেই খবরের প্রেতিে আরো ক’টি লাইন লিখতে বাধ্য হচ্ছি।

খবরটি এমন :

“মস্কো, ১৩ই জুন, ২০০৭।”

“কসোভোর স্বাধীনতা প্রশ্নে গোপনে আলোচনা চালাচ্ছে বলে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে রাশিয়া অভিযোগ করেছে।”

“রুশ বৈদেশিক সম্পর্ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক ইশতেহারে বলা হয় যে, কসোভোর স্বাধীনতার প্রস্তুতির জন্য গোপনে ও ‘একতরফাভাবে’ পাশ্চাত্য কাজ করছে বলে বুধবার পশ্চিমা দেশগুলোর নিন্দা করেছে রাশিয়া।”

“মঙ্গলবার প্যারিসে মস্কোকে অনুপস্থিত রেখে পশ্চিমা শক্তিবর্গের সভা প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিখাইল কামিনিভ ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন যে, এই ‘গোপন আলোচনা থেকে আমরা সন্দেহ করছি যে, কসোভোর স্বাধীনতার জন্য একতরফাভাবে প্রস্তুতি চলছে।”

“তিনি আরো বলেন যে, এ মনোভাব ‘অসহনীয়’। তিনি বলেন, ‘তাছাড়া, এ সভায় রাশিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নি। গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা চালানো হবে বলে দেয়া ঘোষণার সাথে এ মনোভাবের মিল নেই’।”

সুত্রঃ  মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের আলবেনিয়া সফর উপলক্ষে ফিদেল কাস্ত্রোর বিবৃতির অংশবিশেষ। সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ারের জুলাই ২২ — ২৮, ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.