শিক্ষা ও প্রলেতারিও একনায়কত্বঃ রাসেল কে মাও এর জবাব

wpid-mao-big

চাংশায় রাখা তাঁর অভিভাষণে রাসেল কমিউনিজমের সপক্ষে অবস্থান নিলেও, শ্রমিক কৃষকের একনায়কত্বের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ না করে বা কারোর স্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব না করে, বরং বিত্তশালী শ্রেনিকে শিক্ষিত করে তোলার মধ্য দিয়ে তাদের চেতনার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। রাসেলের এই বক্তব্য সম্পর্কে আমার মতামত কয়েকটি মাত্র শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করব। এবং তা হল এই যে, ‘তত্ত্বগতভাবে এই যুক্তি শুনতে খুব ভালো লাগলেও এটা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়।’ কারণ, প্রথমত, শিক্ষার জন্য অর্থ সহ অন্যান্য নানান আনুষাঙ্গিক জিনিস প্রয়োজন। আর বর্তমান সময়ে অর্থের মালিকানা সম্পূর্ণভাবে পুঁজিপতিদের হাতে। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার দুটি অন্যতম গুরুপ্তপূর্ণ অঙ্গ, বিদ্যালয় এবং ছাপাখানা, এই দুইয়েরই নিয়ন্ত্রন রয়েছে পুঁজিপতিদের হাতে। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা হল পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা। যারা এই পুঁজিবাদী শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়, পরবর্তীকালে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করার সময় তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে খুব স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাদী শিক্ষাতেই শিক্ষিত করে তোলে। আর এইভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে থাকে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রনে। পুজিবাদীরা তাদের পার্লামেন্টে নিজেদের সুবিধার্থে আইন তৈরি করে, সর্বহারার শ্রেনীস্বার্থকে খর্ব করে; এবং এই আইনকে প্রয়োগে নিয়ে যাওয়ার জন্য ও জবদরদস্তি সমাজের অন্য সমস্ত অংশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে পুঁজিপতিদেরই ‘সরকার’; নিজেদের সুরক্ষার জন্য এবং সর্বহারার উপর শোষণ চালানোর জন্য পুঁজিপতিদের রয়েছে ‘পুলিশ’ ও ‘সৈন্যবাহিনী’; অর্থের চলাচল যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে, তার জন্য পুঁজিপতিদের রয়েছে নিজেদের ব্যাংক তাদের হাতে রয়েছে সামাজিক উৎপাদনের উপকরণগুলির মালিকানা, যার মাধ্যমে তারা উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই পুঁজিপতিরাই এই শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং যাতে সর্বহারার মতাদর্শ বিকাশ লাভ করতে না পারে, তার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থা্র সপক্ষে যতরকমভাবে সম্ভব, তারা প্রচার চালাবে। এরকম পরিস্থিতিতে কি আদৌ কারুর পক্ষে শিক্ষাব্যবস্থাকে সর্বহারা শ্রেনীর স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব? সম্ভব নয়। তাই কমিউনিস্টদের কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা খোলা নেই।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মাধ্যমে পুঁজিপতিদের চেতনার পরিবর্তন করাটা অসম্ভব। মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত জানা বোঝা এবং মানব সভ্যতার ইতিহাস অন্তত সেটাই বলে। শিক্ষার মাধ্যমে পুঁজিপতিদের শ্রেণীচেতনার পরিবর্তন ঘটানো যাবে ভাবলে ভুল করা হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ-বিদ্যালয় আর ছাপাখানা, এই দুটোই সম্পূর্ণভাবে পুঁজিপতিদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। আর কারুর কাছে কয়েকটি বিদ্যালয় ও আনুষাংঙ্গিক কিছু বিষয়ের ও সংবাদপত্রের মালিকানা থাকলেও, তা দিয়ে কোনোভাবেই পুঁজিপতিদের মানসিকতা এতটুকুও পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এটা যেমন সত্য, তেমনই ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখব যে অতীতে কোনো সাম্রাজ্জ্যলোভী শাসক, সামরিক নেতা, কেউই স্বেচ্ছায় ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে দেয়নি। বরং জনগণই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতার তখ্ত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বারবার। প্রথম নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে ব্যর্থ হন এবং পরে তাঁর স্হলাভিষিক্ত হন তৃতীয় নেপোলিয়ন। একইভাবে ইয়ুয়ান শিহ্-কাই এর পতনের পর ক্ষমতাসীন হন হুয়ান শি-হুই….তাহলে দেখা যাচ্ছে যে মনোবিজ্ঞান বা ঐতিহাসিক দৃস্টিভঙ্গি-দুটো থেকেই এই সিদ্ধান্তে পৌছানো যায় যে, শুধুমাত্র কিছু শিক্ষাগত উদ্যোগ নিয়ে পুঁজিবাদকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

এছাড়া তৃতীয় আরেকটা কারন রয়েছে, এবং সেটাই সবথেকে বাস্তব কারন। যদি সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য আমরা শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নিই, তাহলে সেটা অর্জন করতে অনেক সময় লেগে যাবে। ধরে নেওয়া যাক এক শতাব্দী লাগবে। তার মানে, এক শতাব্দী ধরে সর্বহারাশ্রেণী চরমভাবে শোষিত ও নিস্পেষিত হবে। তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কি? সমাজে সর্বহারারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বুর্জোয়াদের তুলনায় সংখ্যায় তারা অনেক অনেকগুন বেশি। যদি হরে নিই যে মানবজাতির দুই-তৃতীয়াংশ হল সর্বহারা শ্রেনীর মানুষ, তাহলে পৃথিবীর দেড়শো কোটি জনসংখ্যার মধ্যে একশো কোটি (যদিও প্রকৃত সংখ্যাটা আদতে এর অনেক বেশি) হল সর্বহারা, শোষিত মানুষ। এবং এই একশো কোটি মানুষ এক শতাব্দী ধরে চরমভাবে শোষিত হবে বাকি এই এক তৃতীয়াংশ পুঁজিপতিদের দ্বারা। এটা কি করে মেনে নেওয়া যায়? সরবহারাশ্রেনী আজ এটা উপলব্ধি করছে যে তাদেরও সম্পদের মালিকানা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তারা এই শোষনের শৃঙ্খল চাইলেই ভেঙে ফেলতে পারে। বর্তমান শোষণমূলক সমাজব্যবস্থাকে তারা আর মেনে নিতে পারছে না এবং তারা সমাজতন্ত্রের দাবীতে ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছে। এটাই বাস্তব পরিস্থিতি এবং কোনোভাবেই এটাকে অস্বীকার করা যায় না। আর যখনই আমরা এই বাস্তব পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠি, তখনই আমরা সেটাকে বদলানোর জন্য উদ্যোগ নিই। আর তাই আমার মনে হয়, যত সময় যাবে, রাশিয়া, তথা সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাডিকাল কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলি আরো বেশি শক্তিশালী ও সংগঠিত হয়ে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে আমরা আরো একটা বক্তব্য রয়েছে। এবং সেটা শুধুমাত্র এই নয় যে, ক্ষমতার প্রয়োগ ও সংগঠনবিহীন কোনো সমাজের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। আমি কেবলমাত্র এই ধরনের কোন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি….এতক্ষণ যা কিছু বললাম, তা থেকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হওয়া যায় যে নৈরাজ্যবাদ, সম্পূর্ণ উদারনীতির অনুশীলন, বা সর্বব্যাপী গনতন্ত্র, প্রভৃতি বিষয়গুলো তত্তগতভাবে শুনতে খুব ভালো লাগলেও, কোনোভাবেই এগুলো বাস্তবসম্মত নয়।
                                                         
   [প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯২০-জানুয়ারি ১৯২১। marxists.org থেকে  সংগৃহীত, অনুবাদক- সন্মিত]

সুত্রঃ  https://usdfeimuhurte.wordpress.com/2015/06/12/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%93-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%BE/

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.