কিউবার বিপ্লবী নায়ক হোসে মার্তি

cuba___jose_marti_by_utico-d5ajtgm

হোসে মার্তি। একজন কিউবান দেশপ্রেমিক। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। একজন কবি। স্বপ্ন ছিল কিউবার মুক্তি। জীবদ্দশায় তিনি এই মুক্তির সাক্ষী হতে পারেননি। কিন্তু ইতিহাসে তিনি জাতির আদর্শ পুরুষ রূপে অমর।

ঊনিশ শতকের শেষ দিকে বিপ্লবের ধারণা মানুষের মনকে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময় স্পেনের আধিপত্য ছিল কিউবার উপর। অনেকেই স্পেনের পক্ষে ছিলেন কিন্তু কেউ কেউ এমনও ছিলেন যাঁরা বুঝতেন কিউবার উপর এই প্রভাবের পরিণতি — তাঁদের মধ্যে অন্যতম হোসে মার্তি। তাঁর অসাধারণ লেখা, বাগ্মীতা এবং অনমনীয় অদম্য মনোবল কিউবার মানুষদের স্বাধীনতার লক্ষ্যে উদ্দীপিত করে।

36113-004-7559FEF5 (1)
হোসে মার্তির জন্ম কিউবার হাভানায়। ২৮শে জানুয়ারি, ১৮৫৩-তে। তাঁর প্রথম জীবন অতিবাহিত হয় স্পেনে। বাবা মারিয়ানো মার্তি ও মা লেনোরের সঙ্গে। তিনি খুব আহত হতেন কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের প্রতি অমানবিক ব্যবহারে এবং তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। দশ বছরের যুদ্ধের শুরুতে মার্তির দৃঢ় প্রভাবশালী মন্তব্য প্রকাশের ফলশ্রুতিস্বরূপ তাঁকে কারারুদ্ধ হতে হয় এবং তিনি পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পান।

এসবের সূত্রপাত ১৮৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে যখন একটি কিউবান ছাত্র নিহত হয় স্পেনীয় অফিসারের হাত থেকে বেরোতে না পেরে। কালচক্রে ঠিক তার পরের দিন মার্তির প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় তাঁরই বন্ধু ফেরমিন ভালদেস দোমিনগেজের সহায়তায়। এই কবিতাটির জন্য মার্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বন্ধু দোমিনগেজের বাড়ি তল্লাশি করে মার্তির একজন সহপাঠীকে লেখা চিঠি পাওয়া যায়। সেই চিঠিতে তাঁর এক বন্ধুকে স্পেনীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য প্রতারক বলা হয়। চিঠিটিকে সাক্ষ্য প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হয় যখন তাঁদের আদালতে পেশ করা হয়। যখন বিচারক দোমিনগেজ ও মার্তিকে সওয়াল করেন তাঁর উত্তরে মার্তি কিউবার স্বাধীনতার অধিকারের প্রসঙ্গে ভাষণ দেন এবং ছয় বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

এই সময়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাঁকে এবং চিরজীবনের জন্য বেতের লাঠি তাঁর সঙ্গী হয়। স্পেনে থাকাকালীন তিনি ‘স্পেনের রাজনৈতিক কারাগার’ লেখেন। রাজনৈতিক কারারুদ্ধ হবার বিভীষিকা সম্পর্কে লিখেছেন।

জেল থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি পড়াশুনো চালু রাখেন এবং মাদ্রিদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে জারাগোজা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন, দর্শন ও সাহিত্যে ডিগ্রি পান। খুব সামান্য সময়ের জন্য ফ্রান্সে ছিলেন যেখানে তিনি ‘ভালবাসাই ভালবাসা দেয়’ লেখেন স্পেনীয় অভিনেত্রী বঞ্চা পাদিইয়ার জন্য যা একযোগে বিতর্ক ও সাফল্য আনে।

১৮৮৭ সালে হোসে মার্তি মধ্য নাম হুলিয়ান এবং তাঁর মায়ের বিবাহ পূর্ববর্তী পদবি পেরেস ব্যবহার করেন, কারণটা ছিল কিউবায় প্রত্যাবর্তন। কিউবায় এসে তিনি কোন চাকরি খুঁজে পাচ্ছিলেন না এবং তার কারণটাও অনুধাবন করলেন যে কিউবার স্বাধীনতার উদ্দেশ্য হারাতে বসেছিল সে সময়। তিনি গুয়াতেমালা চলে যান। সেখানে ইতিহাস এবং সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এই সময়ে তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হয় এবং তিনি দাসত্বের তীব্র বিরোধিতা করেন। গণতান্ত্রিক সমতার কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন। তাঁর বিপ্লবী লেখা তাঁকে প্রবল শত্রুতার সম্মুখীন করে। কিন্তু ক্রমশ তাঁর প্রভাবশালী লেখা জনগণকে প্রভাবিত করে ফলস্বরূপ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেন। স্পেন ছাড়ার আগে তিনি কিউবার এক ধনী নির্বাসিত মানুষের কন্যা কারমেন জায়াস বাজানের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন।

১৮৭৮ সালে মার্তি তাঁর স্ত্রী কারমেনের সাথে কিউবায় ফেরেন জানহোনের সন্ধির পর দশ বছরের যুদ্ধের (১৮৬৮-১৮৭৮) শেষে এবং রাজনৈতিক নির্বাসিতদের মুক্তির প্রতিবিধান হয়। এই সন্ধি যদিও সামান্য পরিবর্তিত করেছিল কিউবার জনগণকে তার ছোটো যুদ্ধের (১৮৭৯—১৮৮০) শুরুতে ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৮৭৯ সালে সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগে মার্তিকে নির্বাসিত করা হয়। তিনি স্পেনীয় জেল থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্কে চলে যান যেখানে তিনি চার বছর অতিবাহিত করেন।

মার্তি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন কিউবার স্বাধীনতার জন্য। কিউবা শাসিত ও শোষিত হবে স্পেনীয় সরকারের দ্বারা তা তিনি কিছুতেই মানতে পারতেন না এবং অস্বাভাবিক বলে মনে করতেন। কারণ কিউবার নিজস্ব স্বাতন্ত্র এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ সালে একটি পুস্তিকা ‘‘স্পেনীয় প্রজাতন্ত্র এবং কিউবার বিপ্লব’’ বের করেন। তিনি বলেন, ‘‘কিউবার মানুষ স্পেনীয়দের মতো থাকতে পারেন না, তারা অন্যরকম জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, বিভিন্ন দেশগুলির সাথে যোগাযোগ আছে এবং তাদের আনন্দ প্রকাশের রীতিও সম্পূর্ণ বিপরীত, তাদের মধ্যে কোন সার্বজনীন বাসনা অথবা তাদের লক্ষ্য এক নয় যা দুই জাতিকে সুখ স্মৃতিতে একত্রিত করে। মানুষ একত্রিত হয় ভালবাসায় ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে।’’

মার্তি দাসত্বের তীব্র বিরোধিতা করতেন এবং দাসত্ব মোচনে অসাফল্যের জন্য স্পেনের তীব্র সমালোচনা করেন। ২৪শে জানুয়ারি, ১৮৭৯ সালে নিউ ইয়র্কের স্টেক হলে স্পেনের বিরুদ্ধে লড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, তিনি মনে করিয়ে দেন দশ বছরের যুদ্ধের দেশপ্রেম ও যন্ত্রণা, তিনি ঘোষণা করেন কিউবার প্রকৃত রাষ্ট্রের মতো স্বাধীনতার অধিকার আছে। স্পেন শান্তি চুক্তির শর্তগুলি অনুমোদন করেনি, নির্বাচনের মিথ্যা প্রহসন, করের বোঝা বাড়ানো, দাসত্ব মোচনে অসফল, কিউবার মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

মার্তি চেয়েছিলেন কিউবাকে গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে দেখতে। এর জন্য কিছু বৈধ রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। তিনি মাক্সিমো গোমেজকে ১৮৮২ সালে একটি চিঠি লেখেন বিপ্লবী দল তৈরির প্রস্তাব পেশ করে। তিনি কিউবাকে হোমরুল পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে আটকাবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। হোমরুল পার্টি ছিল শান্তিকামী দল যা কিউবার আশু স্বাধীনতা লাভের অদম্য ইচ্ছাকে বিলম্বিত ও দমিত করতে পারতো। উনি জানতেন যে কিউবায় সামাজিক বিভাগ ছিল বিশেষত জাতিগত বিভাগ। ১৮৮২ সালে ২০শে জুলাই তিনি মাসেওকে চিঠিতে লেখেন, ‘‘কিউবার সমস্যা আছে, তবে তার রাজনৈতিক সমাধানের থেকে সামাজিক সমাধানের প্রয়োজন যা অর্জন করা যাবে না দুই জাতির মধ্যে পারস্পরিক প্রীতি ও সৌহার্দ্য ছাড়া। কোন দেশ গড়ে তুলতে যেখানে প্রবল ঘৃণার পরিবেশ ছিল, বিভিন্ন উপাদানগুলি(?) তাদের প্রকৃত অধিকার ভোগ করবে।’’

তিনি নিউ ইয়র্ক এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলি থেকে প্রকাশিত অসংখ্য সংবাদপত্রে লেখেন। তিনি আমেরিকান নেশানসে বিদেশী সংবাদ প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেন এবং সম্পাদকীয়ও লিখতেন। এই সময় তিনি কবিতার কতগুলি ছোট সংস্করণ প্রকাশ করেন যা তাঁর জীবনের সব থেকে সেরা রচনা বলে বিবেচিত হয়। তিনি ‘মন্তেক্রিস্টির ঘোষণা’ লেখেন। কিউবাকে মুক্ত করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তা থেকে তিনি কখনোই সরে আসেননি। তিনি অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন কিউবান নির্বাসিতদের সাথে কথা বলে, চেষ্টা করেছেন স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থন বাড়ানোর।

১৮৯৪ সালে মার্তি কয়েকজন নির্বাসিত মানুষকে একত্রিত করে বিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্যে কিউবায় ফেরেন। কিন্তু তাঁর এই অভিযান ব্যর্থ হয়। পরের বছর বৃহৎ আকারে বিদ্রোহ দেখা দেয়। একদল নির্বাসিত মানুষ সৈনাপত্য বিদ্যা বিশারদ মাক্সিমো গোমেজ ও আন্তোনিও মাসেও ঐ দ্বীপে অবতরণ করেন এবং পাহাড়ে লুকিয়ে থেকে একটি ছোটখাটো সেনাদল জমায়েত করেন। মার্তি দীর্ঘদিন এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সক্ষম হননি, কারণ এই উত্থানের প্রথম সংঘর্ষেই তিনি প্রাণ হারান ১৮৯৫ সালে। বিদ্রোহের ফলে প্রাথমিক লাভ হয় বটে কিন্তু এই বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৮৯৮ সালে স্পেনীয় আমেরিকান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত স্পেনের আধিপত্য থেকে কিউবা মুক্ত হয়নি।

১৯০২ সালে কিউবাকে স্বাধীন ঘোষণা করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের নিজস্ব সরকার গঠিত হয়। মাত্র ষোলো বছর বয়স থেকে মার্তির একমাত্র লক্ষ্য ছিল কিউবার স্বাধীনতা লাভ, দাসত্বহীন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। হোসে মার্তির উদ্দীপক ভাষণ, কাজ এবং বলিষ্ঠ লেখার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তরবারির চেয়ে কলমের শক্তি অনেক বেশি।

হাভানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিও তাঁর নামে নামাঙ্কিত। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নায়ক হিসেবে উনি আজ অবধি কিউবার মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।

লেখকঃ দেবদত্তা মৈত্র



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.