অস্ট্রেলিয়ায় কারাগারে বন্দি ও কারারক্ষীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ

mel-riot-25085

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের রাজধানী মেলবোর্নের একটি কারাগারে বন্দি ও কারারক্ষীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।

কারাগারে ধূমপান নিষিদ্ধ করার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বন্দিরা কারারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সহিংসতার এক পর্যায়ে কারাগারের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয় বন্দিরা।

ভয়াবহ এই সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে ভিক্টোরিয়া পুলিশকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে বলে জানায় গণমাধ্যম।

সূত্রঃ http://somoynews.tv/pages/details/%E0%A6%85%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF-%E0%A6%93-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BE


বাংলাদেশঃ জনগণের ওপর লুণ্ঠন নির্যাতনের বাজেট

3.-badghet

বাজেট হলো একটি দেশের আয় ব্যায়ের হিসাবের পরিকল্পনা। এই বাজেট প্রকাশ করার পর বিভিন্ন আঙ্গিকে এর ওপর আলোচনা সমালোচনা হয়ে থাকে। এবারের বাজেটের আকার ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বাড়তি কর সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা। আমাদের দেশের বাজেট মানে প্রত্যেক বছর করের বোঝা নতুন করে জনগণের ওপর চাপানো। সরকার যখন বাজেট পেশ করলো তখন বিএনপি’র পক্ষ থেকে বলা হলো ভোটবিহীন সরকারের এই বাজেট গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাজেট পেশ করবার বৈধতা এই সরকারের নেই। এইসব বক্তব্য বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দের। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। কথা বলার অধিকার নেই; সরকারের কর্মকান্ডের সমালোচনা করে সমাবেশ করার অধিকার নেই এবং সব সময়ে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ আশানুরূপ না এবং বিদেশি বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। এর অর্থ বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। সরকারি বিনিয়োগ যা আছে তা জবাবদিহিতার অভাবের কারণে দুর্নীতি লুটপাট অনাচার চলছে। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে এবং বর্তমান প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ হবে বলা হয়েছে। বাজেট বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে এই বাজেট বাস্তবসম্মত নয় এবং অতি উচ্চাভিলাষী বাজেট যা তার কার্যকরিতা হারাবে।
বাজেট ২০১৫-১৬ তে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা আর ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা যা জিডিপি’র ৫ শতাংশ। বাজেটে বৈদেশিক অনুদান ২ শতাংশ, বৈদেশিক ঋণ ৮ দশমিক ২ শতাংশ, আভ্যন্তরীণ ঋণ ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত কর ২ শতাংশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত কর ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, অনেকে মনে করেন বাজেট উচ্চাভিলাষী বাস্তবায়ন অযোগ্য এবং আমার মত হলো উচ্চাভিলাষ থাকা ভাল এবং উচ্চাভিলাষ না থাকলে ভাল কিছু অর্জন করা যায় না। এই মনোভাব ‘ঋণং কৃতং ঘৃতং পিবেত’ অর্থাৎ ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো। সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা এবং আভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। আভ্যন্তরীণ উৎস একমাত্র ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা SDP ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ব্যাংক থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা যদিও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা করা হয়। সেই হিসাবে প্রস্তাবিত বাজেটে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের থেকে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে স্বল্প মেয়াদে ১৪ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়া হলো, সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ করে তাহলে আমরা ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাতে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত এবং শিল্পবিকাশে ও উৎপাদনে বাধা অবশ্যম্ভাবী।

সরকার কথায় কথায় বলে আমাদের সরকার কৃষি বান্ধব ও শিল্প বান্ধব- এবারের বাজেটে তার কোন প্রতিফলন নেই। কৃষিতে এবার যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তা পূর্বের বছরের তুলনায় আনুপাতিক হারে কম। কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া অর্থ কৃষককে সার বীজ কীটনাশক সংক্রান্ত বিষয়ে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, তাই সস্তা দরে তার পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এ বছর ধানের দাম প্রকারভেদে ৪৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে উঠানামা করছে, যেখানে তার মন প্রতি ধান উৎপাদন খরচ প্রায় ৯০০ টাকা। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ৮৮০ টাকা ধানের দাম নির্ধারণ করলেও কৃষক তা পাচ্ছে না, কারণ হাটে হাটে সরকার ধান ক্রয় করছে না। সরকার ক্রয় করছে মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে। কৃষক তার ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে বাজারে ধান ফেলে প্রতিবাদ করছে। এসব বিষয়ে সরকার উদাসীন। পাকিস্তান আমলে যেমন পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি ছিল যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমঃ আবদুল হক, তখনকার সময়ে কৃষকের সমস্যা নিয়ে যে ধরনের আন্দোলন দেখেছি আজকের দিনের সাথে তুলনা করলে তার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তার কারণ কৃষক সমিতি বিভিন্নরূপে নামমাত্র থাকলেও আন্দোলন সেই মাত্রায় না থাকায় কৃষকের জন্য কার্যকরি কোনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। আজ প্রয়োজন কৃষককে সংগঠিত করে তার সমস্যা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করার মতো কৃষক সংগঠন। তাই আজ কৃষক দিশেহারা, তারপরও জাতীয় আয়ে ভাল ভূমিকা রেখে চলেছে। কৃষকের কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার প্রেক্ষিতে বাজেটে কোন পরিকল্পনা নেই।

বিভিন্ন শিল্প মালিক সমিতি এবারের বাজেট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আমাদের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে আমাদের গার্মেন্টস খাত। এই খাতে পূর্বের চেয়ে বেশি কর বসানো হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এই শিল্পকে রক্ষার্থে সোর্স ট্যাক্স ০.৩ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছিল। এবারের বাজেটে তা তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। ০.৩ শতাংশ থেকে তা বাড়িয়ে একলাফে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি পোশাক শিল্পের মালিকরা বিপদে পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

একমুখী শিক্ষা কার্যক্রম ছাড়া কোন দেশের শিক্ষার উন্নতি সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের দেশে বহুমুখী শিক্ষা কার্যকর রয়েছে। তাতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশের সংসদে যারা বাজেট পেশ করেন তাদের পোষ্যদের শিক্ষা কার্যক্রম চলে বিশেষ কায়দায় অর্থাৎ বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের লেখাপড়া চলে তাই দেশের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ খুবই কম। বাজেটে শিক্ষা খাতে যে টাকা বরাদ্দ হয় তা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়ে ব্যয় হয়ে যায়। গ্রাম গঞ্জে সরকারি বেসরকারি স্কুল কলেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হয়ে থাকে।

এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত কর বসানোর ফলে জনগণের পকেট কাটা যাবে। যেমন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী গ্রাহক, বিমানের টিকেট ও ব্যাংকে আমানত রাখার ওপর অতিরিক্ত কর বসানো হয়েছে। ৪ঠা জুন বাজেট পেশ করার পর থেকে মোবাইল অপারেটরা ৫ শতাংশ হারে শুল্ক কাটা শুরু করেছে। তার ওপর ১ শতাংশ হারে সারচার্জ ধার্য করা হয়েছে। বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। মোবাইল ফোনে ১০০ টাকা ব্যবহারে ১ শতাংশ সারচার্জ, ৫ শতাংশ শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট নিয়ে মোট ২১ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ টাকা মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীকে ২১ টাকা কর দিতে হবে।
আমাদের মতো নয়া ঔপনিবেশিক দেশের পরনির্ভরশীল হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা বিশ্বব্যাংক আইএমএফ এডিবি ইত্যাদি সংস্থার নীতি নির্দেশে বাজেট প্রণীত হয়ে থাকে। দাতা সংস্থা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই বিভিন্ন দেশকে ঋণ প্রদান করে থাকে যা দেশের উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখে না। বরং এই অর্থ সামন্ত, আমলা মুৎসুদ্দি শ্রেণীর পকেট ভারী করতে সহায়তা করে। যেমন পদ্মা সেতু প্রকল্পে সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পূর্বেই দুর্নীতির নীল নকশা ফাঁস হওয়া এই নিয়ে সৃষ্ট কেলেঙ্কারির কথা দেশবাসী জানে।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জিত হবে না। গত কয়েক বছর রাজস্ব আদায়ে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে, এবারও তাই হবে। বিশেষত ভৌত অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের জন্য দেশজ আয়ের অনুপাতে শিক্ষা স্বাস্থ্য কৃষি খাতে বরাদ্দ কম হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে অবহেলিত স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে জিডিপির মাত্র ০.৭৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। বাজেটে সব থেকে বড় ব্যয়ের খাত হলো ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয়। আমাদের ব্যয়ের বড় অংশ যখন ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে তখন বলা যায়- লাভের গুড় পিপড়ায় খাওয়ার মতো অবস্থা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হওয়ার পরও জবাবদিহিতার বিষয়টি যখন প্রশ্নবিদ্ধ তখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে গত বছরের মতো এবারও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পূর্বের মতো আবারও এই বরাদ্দকৃত অর্থ অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজেটে রপ্তানি আয়ের নিম্নাভিমুখী প্রবণতা রোধে কোন পদক্ষেপ নেই। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। বাজেটে উৎস কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও কর্পোরেট ট্যাক্স ও সম্পদশালীদের ওপরে সারচার্জ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বাজেট হচ্ছে ধনীকে আরও ধনী করার আর গরিবকে আরও নিঃস্ব করার বাজেট। এই বাজেটে শ্রমিক কৃষক জনগণের স্বার্থ রক্ষায় একটা পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। সাম্রাজ্যবাদের লগ্নি পুঁজি ও তার দালাল মুৎসুদ্দি পুঁজির শোষণ লুণ্ঠন আরও অবাধ করার লক্ষ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

জনস্বার্থ স্বার্থ বিরোধী সরকারের বাজেট কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবে

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৪ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০১৫-১৬ সালের বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেট পেশ করার উদ্দেশ্যে এর আগে গত ৫ এপ্রিল থেকে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগে শুরু হয় প্রাক বাজেট আলোচনা। এই আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আভাস দিয়েছিলেন, আগামী বাজেটের আকার তিন লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে তার মোট আকার হলো দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই বাজেটে আয়ের যে প্রধান প্রধান খাতগুলো দেখানো হয়েছে সেগুলো হলো- আয় ও মুনাফা থেকে কর ৬৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা; মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ৬৪ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা; সম্পূরক শুল্ক ২৫ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা; আমদানি শুল্ক ১৮ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অন্যান্য আদায় দুই হাজার ৫০৮ কোটি টাকা; কর ব্যতীত রাজস্ব ২৬ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাইরের কর পাঁচ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। সেই সাথে সম্ভাব্য বিদেশি অনুদানকে আয় হিসাবে দেখানো হয়েছে এবং বিদেশি অনুদানের পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

বাজেটে ব্যায়ের যে সমস্ত প্রধান প্রধান খাত দেখানো হয়েছে তা হলো জনপ্রশাসন খাতে ৫৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা; ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ১০৯ কোটি টাকা; শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ২৯ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা; পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা; স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ক্ষেত্রে ২০ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা; জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা; সামাজিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা খাতে ১৫ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা; ভর্তুকি ও প্রণোদনা ১৫ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা; প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা; জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা; স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১২ হাজার ৬০ কোটি টাকা; পেনশন ও গ্রাচুইটির জন্য রাখা হয়েছে ১১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা; কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৪১ কোটি টাকা। আগামী পহেলা জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যে কারণে জনপ্রশাসন খাতে ব্যয় পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি অর্থবছরে এইখাতে ব্যয় হলো মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ১৭ শতাংশ। আর আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ২৩ শতাংশ এই খাতে খরচ হবে। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন ভাতা বাবদ সরকারের বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১৫ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হবে।

প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ সালের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি’র আকার ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন এসেছে বিশাল এই এডিপি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে! তবে বাজেটে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি দেখানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৮০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে বলে দেখানো হয়েছে। আর বাকি অর্থ আভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ করে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও সম্ভাব্য বিদেশি অনুদান বাবদ পাঁচ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আয় হিসাবে দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা আয়ের আওতায় পড়ে না। তাছাড়াও অন্যান্য আভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ করা হবে। এই হিসাব যোগ করলে প্রকৃত বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নের উপরই নির্ভর করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন। তাই এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে। বিদেশ থেকে অনুদান প্রাপ্তির ব্যাপারে যে সম্ভাব্য হিসাবে দেখানো হয়েছে তা মূলত অনুমান ভিত্তিক। চলতি অর্থবছরে বিদেশি অনুদান পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল অর্জিত হয়েছিল তার অর্ধেক। আগামী বাজেটের ক্ষেত্রে বিদেশি অনুদান প্রাপ্তির সরকার যে প্রাক্কলন করেছে তাও অর্জিত হবে না। বিদেশ থেকে ঋণ প্রাপ্তির ব্যাপারে বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জিত হবে না। গোটা পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব জুড়ে চলছে অর্থনৈতিক সঙ্কট। তার ওপর বিভিন্ন প্রশ্নে সরকারের সাথে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর যে টানাপোড়েন চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ঋণ বা অনুদান প্রদানে এই দেশগুলো মোটেও আগ্রহী নয়। চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক ও জাইকা এদেশের তাদের অর্থায়নে চলমান প্রকল্প থেকে ঋণ প্রহ্যাহার করে নিয়েছে। পুঁজিবাদী চীনের বিনিয়োগ করার মতো প্রচুর পুঁজি ও আগ্রহ থাকলেও সরকারের ভূমিকার কারণে চীনের ঋণ দান ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার শুধু ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর ওপর ভরসা করে বসে আছে। ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এদেশকে পরিপূর্ণভাবে নিজেদের কব্জায় নিয়ে যেতে তৎপর রয়েছে। তাই বাংলাদেশে অন্য কোন দেশের বিনিয়োগ হোক ও অন্য দেশের প্রভাব বৃদ্ধি ঘটুক এটা তাদের কাম্য নয়। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর অমতে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এমতাবস্থায় ভারতের ঋণ প্রদান বা বিনিয়োগ ক্ষমতা কতটুকু তা অবশ্যই বিবেচ্য। ২০১০ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে মাত্র ১০০ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের চুক্তি করে। ভারত সরকার আজও সেই ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ ছাড় করতে পারেনি এবং বাংলাদেশে এই ঋণের উপর ভিত্তি করে গৃহীত প্রকল্পসমূহ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময়ে যে ২০০ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের প্রস্তাব করেছে তা কখন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এখনও স্পষ্ট নয়। তাই বিদেশি ঋণ ও অনুদান পাওয়ার ব্যাপারে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে অর্থ সংস্থানের হিসাব করছে তা কতটা বাস্তবায়িত হবে সে প্রশ্নও রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে সঞ্চয়পত্রের ঋণের সুদের হার হ্রাস করেছে। এর আগের বছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নয় হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকার। এর ফলে সুদ পরিশোধের দায় বেড়েছে। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি হার হ্রাস পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তাই সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভর করতে হবে। সরকারের এই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি করবে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারের এই অবস্থান বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চলমান সঙ্কট আরও বৃদ্ধি করবে।
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের অর্থসংস্থান একটি বাধা হিসাবে সামনে আসছে। সরকার বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য রাজস্ব আদায়ের যে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ আট হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা যা মোট জিডিপি’র ১২ দশমিক ১ শতাংশ। গত চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রমের লক্ষ্যমাত্রা হলো এক লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। কাঙ্খিত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে সরকার সংশোধিত বাজেট গ্রহণ করা হয়। এই সংশোধনের পরও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআর এর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় এক লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ শতাংশ। সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত অর্জনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর পর গত তিন অর্থবছরে কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জনের মধ্যে পার্থক্য যথাক্রমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, ১৬ দশমিক ২ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বর্ধিত রাজস্ব সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা এদেশে ইতিপূর্বে কখনও অর্জিত হয়নি বা এই লক্ষ্যমাত্রা ধারে কাছেও যেতে পারে নি। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত দশমিক শতাংশ। চলমান অর্থবছরে বাজেটে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে সরকারের দাবি মতো ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে পর পর কয়েক বছর জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশের ওপরে ধার্য করা হলে এ পর্যন্ত তা অর্জিত হয় নি। বরং বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ গত কয়েক অর্থবছরে ৬ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ বা তার উপরে উঠতে হলে এদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রচলিত অর্থনীতির এক হিসাবে দেখানো হয় জিডিপি’র ৪ শতাংশ বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে প্রবৃদ্ধি এক শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হলে এ পর্যন্ত তা সুফল বয়ে আনতে পারেনি। সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির নানামুখী চেষ্টা করলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। গত কয়েক অর্থবছরে তা ২২ শতাংশের কাছাকাছি উঠানামা করছে। আবার জাতীয় সঞ্চয়ের তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে অনেক কম। চলতি অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ২৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। আর বিনিয়োগের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বাংলাদেশে যে জাতীয় সঞ্চয়ের হার তাতে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপি’র ৩৫ শতাংশ হওয়া সম্ভব। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ না থাকায় বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে না। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় জমা হচ্ছে। আর সরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা সামগ্রিক ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনতে পারছে না। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে তা অর্জিত হবে না।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার বাজেট বক্তৃতায় অনেক আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার এই সব সমস্যার সমাধান না করেই সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ২০১৮ সালের মধ্যে দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশ মধ্যম আয়ের সিঁড়িতে পৌঁছে গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আসন্ন ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাছাড়া দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। সরকারের এই সব দাবি কোন নতুন বিষয় নয়। প্রতিবছর বাজেট আসে, সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট পেশ করা হয়, আর জনগণকে নানা আশার বাণী শুনান হয়। সরকারের কথামতো কোন বাজেটই তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় তাও অর্জিত হয় না। বাজেট প্রণয়ের সময় সরকার জাতীয় উন্নয়নের ও জনগণের উন্নয়নের ভুরি ভুরি ফিরিস্থি হাজির করে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির হিসাব প্রাক্কলন করে। অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে দেখা যায় এই সব হিসাবের কোনটাই কার্যকরী হয় না। এই হচ্ছে এদেশের ধারাবাহিকতা। বর্তমান বাজেটও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বাজেটের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচিকে বাধা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে এ বছরের শুরুতে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীদের ডাকা টানা হরতাল অবরোধ কর্মসূচি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেকার বিরোধের এখনও কোন রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। এই বিরোধ যে কোন সময়ে চাঙ্গা হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নিতে পারে- এই আশঙ্কা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এদেশে সাম্রাজ্যবাদের দালালদের প্রভু বদল ও প্রভুর পরামর্শে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন। তাছাড়া আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে ক্ষতিবিক্ষত এই চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা তাদের নিয়ন্ত্রিত বাজার ছাড়া অন্য কোন স্থানে পুঁজি বিনিয়োগের ঝুঁকি গ্রহণ করছে না। তাই চলমান আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে এদেশ কোন জোটভুক্ত হবে তার ওপর নির্ভর করছে কোন সাম্রাজ্যবাদী প্রভু এখানে পুঁজি বিনিয়োগ করবে, কী পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করবে। বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে। তাই বাজেট বক্তৃতায় দেশি বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের আকাঙ্খা প্রকাশ করলেই এদেশে পুঁজি বিনিয়োগ হবে না; বরং পুঁজি বিনিয়োগ নির্ভর করছে আবশ্যকীয় শর্ত পূরণের ওপর।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হলো মোট জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ। এই বিশাল আকারের বাজেটে অর্থসংস্থানের জন্য শ্রমিক কৃষক জনগণের ওপর শোষণ নিপীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি করে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের যতসব হিসাব নিকাশ কষছে সরকার। প্রতিবারের মতো প্রস্তাবিত এই বাজেটের চরিত্র গণবিরোধী, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর দেশি বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অর্থাৎ উৎপাদক শ্রেণী তথা শ্রমিক কৃষক জনগণের সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ। আমাদের দেশের এই বাজেটের সাথে শ্রমিক কৃষক জনগণের স্বার্থের কোন সম্পর্ক থাকে না। বরং সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসক শোষক শ্রেণী কৌশল করে সকল করের বোঝা জনগণের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। যে কোন প্রকারে জনগণের ঘাড় ভেঙ্গে বেশি বেশি কর আদায় করে নিতে পারলেই শাসক শোষক শ্রেণী স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের সুখ সুবিধার বিষয়টি হিসাবে রেখে সরকার বাজেট প্রণয়ন করে না। প্রস্তাবিত বাজেটেও সেই নীতির প্রতিফলন ঘটেছে। তাই সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের কোন উদ্যোগ থাকে না। প্রতিক্রিয়াশীল সরকারগুলোও জনগণের স্তরে কোন উদ্যোগ সৃষ্টি করতে চায় না। তাই প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় বাজেটের গণবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর চরিত্র প্রস্তাবিত বাজেটেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশের ঋণ ও অনুদান প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার প্রস্তাব করেছে। আর আভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ করার প্রস্তাব রয়েছে। তাই সব মিলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৮৮ শতাংশই দেশি বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী দেশ আমাদের মতো নয়া ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে তাদের একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে; এই সব ঋণ ও অনুদান আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে না। তাই সাম্রাজ্যবাদীদের ঋণ অনুদান দিয়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে এটা স্বপ্ন বিলাস ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করে একদিকে যেমন জাতীয় স্বার্থ জনগণের স্বার্থ রক্ষিত হবে না; অপরদিকে তেমনি সরকারও তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৪, রোববার।। ২৮ জুন ২০১৫।।


‘নতুন অর্থনীতির মৌলিক পদক্ষেপ হল কর্পোরেট কর্তৃক ভূমি দখল’- অরুন্ধতী রায়

36175-a-roy

লেখক-মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় ৪ঠা মে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এতে তিনি কথা বলেছেন জাতপ্রথা, ভূমি সমস্যা ও প্রগতিবাদী বা বিপ্লবী আন্দোলন নিয়ে।

অরুন্ধতী মনে করেন, ভারতীয় সমাজে জাতিপ্রথা যে ভূমিকা পালন করছে, বামপন্থীদের এখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন করে বামদের ভাগ্যে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসবে না।

ডানপন্থী হিন্দু রাজনীতিতে বামদের গ্রহণযোগ্য বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসার ব্যাপারে আশাবাদী নন অরুন্ধতী।

‘জাতি ইস্যু মোকাবিলায় বামরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জাতকে শ্রেণী বলে বামরা নিজেরাই নিজেদের পরাস্ত করেছে এবং নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে বোম্বের কারখানা শ্রমিকদের অধিকার ইস্যুতে ১৯২০-এর দশকের ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে ও ড. আম্বেদকরের দ্বন্দ্বটা গুরুত্বপূর্ণ। আম্বেদকর সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন, শ্রমিকদের মধ্যেও সমতা নেই। কারণ দলিতরা কেবল নিম্ন মজুরির কাজ পায়। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির যাত্রা শুরুর পর থেকে ঘটনা এটাই,’ মন্তব্য অরুন্ধতীর।

‘জাতের বিরুদ্ধে লড়াইটা বেশ জটিল’ মনে করেন প্রখ্যাত এই লেখক। তাঁর মতে, ‘দার্শনিকভাবে বলতে গেলে, অধীনস্ত জাতগুলোকেও তাদের পরিচয়ে গর্ববোধ করতে হবে এবং জাতিগত শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেই গর্বকে কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু তখনই মূল বিষয়টা চলে আসে, যেখানে এর বিরুদ্ধে সেই বিপ্লবী অবস্থানই ব্যবহৃত হয় একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে এবং এটি সুবিধাভোগীদের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

নতুন নয়

অরুন্ধতীর মতে, হিন্দু ডানপন্থীদের ঘর বাপসি প্রচারণা, যেখানে ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘ফেরত নেওয়া’ হয়। এর মাধ্যমে অধঃস্তন জাতকে ‘বড় বাড়িতে আনা হয়, কিন্তু রাখা হয় চাকরের ঘরে’। তিনি বলেন, ঘর বাপসি কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে অশুদ্ধদের শুদ্ধ করে, ধর্মান্তরিতদের হিন্দু দুনিয়ায় আনার মধ্য দিয়ে আর্য সমাজ ও শুদ্ধি আন্দোলন এটি শুরু করেছিল।’

অরুন্ধতী মনে করেন, সাম্রাজ্যের রাজনীতি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের রাজনীতিতে রূপান্তরের মুহূর্তে এটা ছিল জনসাধারণকে প্রভাবিত করার জন্য হিন্দু ডানপন্থীদের সুচতুর পাল্টা পদক্ষেপ।

‘তখন পর্যন্ত কেউ অধঃস্তন জাতগুলোর ইসলাম, খ্রিস্টান বা শিখধর্ম গ্রহণের বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। তারপর, হঠাৎ সেই জনসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। এই ইতিহাসে, যেখানে আর্য সমাজের মতো গোষ্ঠী যুক্ত হয়েছিল, গান্ধীও এ ধারার উত্তরাধিকারী ছিলেন – তখন অস্পৃশ্যতার ব্যাপারে অনেক কথা হতো, কিন্তু জাতপ্রথা নিয়ে কোনো কথাবার্তা হতো না। জমি, সম্পদ, নির্দিষ্ট কাজের অধিকার নিয়ে কথা হতো না। এসবই ছিল জাত ব্যবস্থার সত্যিকারের ভিত্তি। এখন তারা এটাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে, কারণ এটা কেবল দলিত সম্প্রদায়ের ব্যাপার নয়, আদিবাসীরাও এ নিয়ে লড়ছে,’ বলেন অরুন্ধতী।

মূলধারার বুদ্ধিজীবীরা যেখানে বিশ্বায়ন ও অতি-পুঁজিবাদিতাকে জাতপ্রথা ও অন্যান্য বৈষম্যের সমাধান মনে করছেন, সেখানে অরুন্ধতী রায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘পুঁজিবাদিতাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে জাতপ্রথার কাঠামো ভেঙে পড়বে না, বরং আরো শক্তিশালী করবে।’

বিষাক্ত মিশ্রণ

‘প্রকৃত ঘটনা হলো, এটা উল্লেখযোগ্য হারে ঘটেনি। টমাস পিকেটি তাঁর ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি বইয়ে দেখিয়েছেন, যাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পেয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে তাঁদের সাফল্য অর্জনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এটাই জাতপ্রথাকে পুঁজিবাদের মা-তে পরিণত করে, কারণ জাতপ্রথা বংশানুক্রমিক অধিকারেরই ব্যাপার, যা ঈশ্বরের ইচ্ছায় নির্ধারিত। জাতপ্রতা ও পুঁজিবাদ এক বিষাক্ত মিশ্রণে মিলিত হয়েছে। বেসরকারীকরণ দলিতদের সামান্য নিরাপদ অবস্থানটুকু, যা সংরক্ষণের কারণে প্রচলিত ব্যবস্থায় রয়েছে, তা-ও ধ্বংস করে দেবে,’ উল্লেখ করেন অরুন্ধতী রায়।

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির উত্থাপন করা ভূমি অধিগ্রহণ বিলের কঠোর সমালোচনা করেন অরুন্ধতী রায়। এর ফলে অধিক কর্মসংস্থানের দাবিও তিনি উড়িয়ে দেন। বলেন, ‘নতুন অর্থনীতির মৌলিক পদক্ষেপ হলে করপোরেট কর্তৃক ভূমি দখল। তা হতে পারে আইটি, কয়লা কিংবা ইস্পাত কোম্পানি, প্রথম কাজ হলো ভূমি, জলাশয় নিয়ে নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা।

এটাকে মানতে বলা হচ্ছে এই যুক্তিতে যে এতে কর্মসংস্থান বাড়বে; আসলে তা রূপকথা। পরিসংখ্যান বলে, আমরা কেবল বেকার বাড়তেই দেখছি।’

অরুন্ধতী বিষাদ নিয়ে বলেন, ষাটের দশক ও সত্তরের দশকের তুলনা করলে এখনকার ভূমি ঘিরে চলা বিতর্ককে আর বিপ্লবী বলা যায় না।

“যখন নকশাল আন্দোলন শুরু হয় এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধীর এক সমালোচক বলেছিলেন, তারা কী বলছে? তারা সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলছে, জমির পুনর্বণ্টনের কথা বলছে, কৃষকের কাছে জমি দেওয়া এবং এ রকম আরো অনেক কথা বলছে। আর এখন, এমনকি সবচেয়ে ‘বিপ্লবী’ আন্দোলনও কেবলে আদিবাসীদের জমি তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়ার দাবি করছে,” বলেন অরুন্ধতী।

সূত্রঃ http://www.ntvbd.com/opinion/8117/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%AC%E0%A7%80-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%87–%E0%A6%85%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A4%E0%A7%80-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F


‘বিনোদ, আপনি কোথায় ?’- অরুন্ধতী রায়

2_128635

আমি বিনোদকে খুব মিস করব। আমার লেখক জীবনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এমন নয় যে, সব বিষয়েই আমরা একমত হতাম। কংগ্রেস পার্টি, কাশ্মীর, বর্ণপ্রথার রাজনীতি কিংবা মীনা কুমারির জীবনী (বিনোদের লেখা) নিয়ে তার সঙ্গে আমার মতভিন্নতা ছিল। কিন্তু এবারের এ বিচ্ছেদ স্থায়ী এবং যা আর কোনো দিন বদলানো যাবে না। ১৯৯৭ সালে যখন দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশিত হয় তখন বুঝতে পেরেছিলাম, আমি পশ্চিমা মিডিয়ার জন্য পূর্বের একজন দোভাষী হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছি। আমাকে এভাবে মূল্যায়ন করা হোক এটা আমি চাইনি। কারণ যা লিখি, যে যুক্তি দেই কিংবা যে গু-ামিতেই যোগ দেই না কেন, আমি চাই সেটা এদেশেই হোক। আমি বিরাট জাতীয়তাবাদী বা এটা আমার দেশ তাই এমনটা চাই তা কিন্তু নয়, বরং খুব সরলভাবে, কারণ আমি এখানে বাস করি। এসব কাজে বিনোদ ছিলেন আমার পার্টনার। ১৯৯৮ থেকে আমি যা-ই লিখি সেগুলো প্রথম প্রকাশিত হয়েছে আউটলুকে।

বিনোদের শেষকৃত্যের সময় আমি বেশ অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম এবং সে সময়ে কী করতে হবে সেটাও আমি বুঝতে পারিনি। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমি লালকৃষ্ণ আদভানির মুখোমুখি হয়েছিলাম। বিনোদের ফুলশোভিত মৃতদেহটিই ছিল আমাদের মধ্যকার ব্যবধান। আদভানি বিনোদের পায়ের কাছে একটি পুষ্পমাল্য রাখলেন। আমার মাথায় তখন বিনোদকে বিদায় জানানো (বা না জানানোর) চিন্তা ঘুরছিল। জীবনে বিনোদ আমাকে শুধু একবারের জন্য সতর্ক হতে বলেছিলেন। সময়টা ছিল ২০০৬ সাল। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো, ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট ভবনে হামলার দায়ে দণ্ড-প্রাপ্ত আফজাল গুরুর ফাঁসি কয়েক দিনের মধ্যে কার্যকর করা হবে। খবরটা শুনে আমি আতঙ্কিত বোধ করছিলাম। কারণ কয়েক বছর ধরে আমি কেসটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। আমি জানতাম, আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে উপস্থাপন করা বেশিরভাগ প্রমাণ হয় খুবই দুর্বল নয় তো সাজানো। (বরং এমন অনেক বিষয় আছে যা থেকে এমনও বলা যেতে পারে যে, এ হামলাটি ছিল একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ অ্যাটাক’)।

আফজালকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মানে ছিল কিছু হিসাব না মেলা প্রশ্নের জবাব পাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়া। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, যদিও আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই; কিন্তু ‘সমাজের সামষ্টিক ন্যায়বোধ’কে সন্তুষ্ট করতেই এ ফাঁসির রায় দেয়া হলো। এর মধ্যে বিজেপি বেশ শোরগোল তুলে এক প্রচারণা শুরু করল_ দেশ আভি শারমিন্দা হ্যায়, আফজাল আভি ভি জিন্দা হ্যায় (দেশ আজ লজ্জিত কারণ আফজাল এখনও জীবিত)। সেই প্রচারণার সম্মুখভাগে ছিলেন আদভানি। জানতাম, আমি যা জানি সেটা প্রকাশ করতে না পারলে আমি বেঁচে থাকতে পারব না। বিনোদকে বললাম আমি কিছু লিখতে চাই এবং সেই প্রথম ও শেষবারের মতো বিনোদ আমাকে বলল, ‘অরুন্ধতী লিখো না। পরিস্থিতি খুব কুৎসিত। তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তারা তোমার ক্ষতি করবে।’ অবশ্য আমরা চুপ করে থাকতে পারি না, এটা তাকে বোঝাতে খুব সময় লাগেনি। অ্যান্ড হিজ লাইফ শুড বি মেইড এক্সিটিঙ্কট- শিরোনামে আমি একটি দীর্ঘ লেখা লিখলাম। এ শিরোনামটি ছিল সুপ্রিমকোর্টের রায়ের একটি উক্তি। আউটলুকের প্রচ্ছদে লেখা হলো, ডোন্ট হ্যাং আফজাল। (কয়েক বছর পর বিজেপি নয় বরং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার ভীরুর মতো অবৈধভাবে আফজালকে ফাঁসি দেয়)।

আউটলুকের সেই সংখ্যাটি প্রকাশের পর কয়েক সপ্তাহ ধরে আবারও একবার পত্রিকার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপমানমূলক কর্মকা- হলো। আমি যা লিখতাম বিনোদ সেটা প্রকাশ করতেন। সে সময় বিনোদ আউটলুকের বিরুদ্ধে আসা বিভিন্ন অবমাননাকর চিঠিও নিজের পত্রিকায় ছাপিয়েছিলেন। আমার জানামতে আর কোনো ম্যাগাজিন তার সম্পাদক, প্রদায়কের প্রতি এমন অপমানজনক চিঠি এত সহজভাবে প্রকাশ করে না। (বিনোদের ২৫ বছর বয়সী সেক্রেটারি শশী ২০০৮-এর মুম্বাই হামলার পর সম্পাদক বরাবর আসা অনেক বিক্ষুব্ধ চিঠি দেখিয়েছিল, আমি অবশ্য তখন কিছুই লিখিনি)। দেখে মনে হতো এসব চিঠি দেখে বিনোদ আনন্দ পেত। মাঝে মাঝে সে তার পছন্দের এমন একটি চিঠি নিয়ে আমার সঙ্গে রসিকতা করত। আফজাল গুরু ইস্যুতে আসা চিঠিগুলোর মধ্যে বিনোদের প্রিয় ছিল, আফজাল গুরুকে ছেড়ে অরুন্ধতী রায়কে ফাঁসি দাও। অতি অবশ্যই এ চিঠিটাও সে প্রকাশ করেছিল।

আর এখন বিনোদের শেষকৃত্যে আমি এবং আদভানি দুজনই শোক প্রকাশ করছি। আমি শক্তিহীন হয়ে পড়েছিলাম। সম্ভবত আদভানি শক্তসমর্থ ছিলেন। আমি জানি না। বিনোদ কী ভাবতে পারে সেটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না।

আউটলুকের সম্পাদক পদ থেকে বিনোদ অবসর নেয়ার আগে সেখানে আমার প্রকাশিত লেখাটি ছিল, ওয়াকিং উইথ কমরেডস। লেখাটা ছিল বস্তারের জঙ্গলে মাওবাদী গেরিলাদের সঙ্গে কাটানো সপ্তাহের বিবরণ নিয়ে। সম্প্রতি ইহলোক ত্যাগ করা বি. জি. ভারগীস আমার সেই লেখার একটা জবাব দিয়েছিলেন। ভারগীসের সেই লেখার জবাব হিসেবে বিনোদ প্রকাশ করেছিলেন চেরুকুরি রাজকুমার ওরফে কমরেড আজাদের একটি লেখা। এটি নিঃসন্দেহে বিনোদের একটি অসাধারণ কাজ। কারণ আজাদ ছিলেন সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য। আজাদের সেই জবাব (আ লাস্ট নোট টু এ নিও- কলোনিয়ালিস্ট) প্রকাশ হতে হতে সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে নাগপুর থেকে অপহরণ করে এবং অন্ধ্র-ছত্তিশগড় সীমান্তে দন্ড কারণ্য জঙ্গলে তাকে হত্যা করা হয়।

বিনোদ অসুস্থ হয়ে পড়ার কিছুদিন আগে আমি তার একটা ফোন পেয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘অরুন্ধতী শুনুন, আমি কোনো দিন আপনার কাছে কিছু চাইনি; কিন্তু আজ চাইছি। আসলে চাইছি না, আপনাকে বলছি। আপনাকে আমার নতুন বই এডিটর আনপ্লাগড এর মোড়ক উন্মোচন করতে হবে। আমি জানি, আপনি এসব কাজ করেন না; কিন্তু এবার আপনাকে করতে হবে।’ আমি হেসে বললাম, আমি করব।

বিনোদ আজ কোথায় চলে গেছেন। এভাবে তার চলে যাওয়া উচিত হয়নি। সত্যিই আমার তার সঙ্গে কথা বলা দরকার।

অরুন্ধতী রায় : ভারতের লেখিকা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

(বিনোদ মেহতা ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি আউটলুক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। এ মাসের ৮ তারিখ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন)

আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : শানজিদ অর্ণব, 

১৯ মার্চ, ২০১৫


আজ সিপিআই(মাওবাদী)এর কেন্দ্রীয় সদস্য ও মুখপাত্র কমরেড চেরুকুরি রাজকুমার ওরফে আজাদের ৫ম শাহাদাৎ দিবস। লাল সালাম।

Azad-photo-03

chemkuri_azad_rajkumar_201009061

chumkuri_azad_20110131.jpg

download

চেরুকুরি রাজকুমার আজাদ (ওরফে আজাদ) (১৯৫২ – ১ জুলাই, ২০১০) ছিলেন  ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)র জ্যৈষ্ঠ সদস্য, পার্টির কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরো সদস্য এবং পার্টির মুখপত্র। ২০১০ সালের ১ জুলাই মহারাষ্ট্রের সীমান্তের নিকটে অন্ধ্র প্রদেশের পুলিশ তাকে আদিলাবাদ জেলার সরকাপল্লীতে হত্যা করে। তিনি মাঠ-কৌশলে বিশেষজ্ঞ এবং ভাবাদর্শের জন্য আদর্শ ছিলেন। আজাদ ১৯৭৯ সালে গোপন জীবনে চলে যান। তিনি ১৯৭৫ এবং ১৯৭৮ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং জামিনে বেরিয়ে আসেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বে তার মাথার উপর ১২ লাখ রুপির পুরস্কারের ঘোষণা বহন করছিলেন। তিনি কোরুকন্ড সৈনিক স্কুল এবং জাতীয় ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি, ওয়ারাংগালের ছাত্র ছিলেন, যোগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নে, যেটি ছিল অনেক নকশালবাদীদের জন্মভূমি।

সূত্রঃ  উইকিপিডিয়া


তুরস্কের মাওবাদী সংবাদঃ গিরে স্পি এর বিজয় উদযাপন করল TKP/ML-TIKKO

11377345_740202982755654_3204529698831156200_n

গিরে স্পি তে স্বাধীনতা অর্জন উপলক্ষে TKP/ML-TIKKO(Turkish Communist Party/Marxist-Leninist) এর মধ্যপ্রাচ্য আঞ্চলিক কমিটি একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, “সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট দায়েশ (DASH) ফ্যাসিবাদি জঙ্গি গোষ্ঠীকে নির্মূল করে গিরে স্পিতে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তা নিপীড়িত জনগণ বিশেষ করে আরব ও কুর্দিশদের সংগ্রামের ফল। কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। জনগণের ভ্রাতৃত্বপূর্ণভাবে ও স্বাধীনভাবে একত্রে বসবাস করার অভিপ্রায় ও স্থির সিদ্ধান্তকে আমরা সালাম জানাই।”

যেসকল যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছেন TKP/ML-TIKKO শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করে ও তাদের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা করে বলে, “যারা মুক্তির জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে ও লড়াই করে, তারা জয়লাভ করবেই। সাম্রাজ্যবাদ ও প্রক্রিয়াশীলতা পরাজিত হবেই।”

সূত্রঃ

Nouvelle Turquie