গ্রীস সংকট ও গণভোট সম্পর্কে ইতালির মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (PCm Italy)

2015-02-04t160405z_905415275_pm1eb241aae01_rtrmadp_3_eurozone-greece-france.jpg_1718483346

গ্রীসের প্রলেতারিয়েত জনগণ যারা ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাদের সাথে সংহতি জানাচ্ছে ইতালির মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। সিরিজা সরকার ও ‘ত্রৈকা’র মধ্যে যে কোন চুক্তি গ্রীসের জনসাধারণের জীবনযাত্রা ও কাজকর্মের অবনতি সাধন করবে; তাই  সাধারণ সংগ্রাম ও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই আক্রমণের জবাব দিতে হবে ও যে কোন মূল্যে একে প্রতিরোধ করতে হবে। সিরিজার গণভোটের সিদ্ধান্ত একটি অদূরদর্শী কৌশলগত চাল যার কোন পরিপ্রেক্ষিত নেই।

যদি ‘না’ জয়ী হয় (যেটা আমরা নিশ্চিতভাবে চাই), পরিস্থিতি কিছুই বদলাবে না; ত্রৈকার ব্ল্যাকমেইল চলতেই থাকবে এবং আরো বৃদ্ধি পাবে। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী সরকারদের মদদে ব্ল্যাকমেইল যদি চলতেই থাকে এবং ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয় তবে সেটি হবে জীবন্ত আত্মহত্যার শামিল এবং এতে করে সরকারের পতনের রাস্তা উন্মুক্ত হবে, ত্রৈকা ও গ্রীক বুর্জোয়াদের হাতে নতুন একটা সরকার তৈরী হবে। কিন্তু সর্বোপরি সিরিজা সরকার এর ব্যর্থতার দায়ভার জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ পাবে।

সুতরাং, PCm Italy সংহতি জানাবার সব উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু ‘না’ এর ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছে এবং গ্রীসের কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শক্তিকে সমর্থন জানাচ্ছে যাদের সাথে সিরিজার নির্বাচনী, সংসদীয় ও সরকারতন্ত্রীয় কর্মকাণ্ডের কোন মিল নেই।

PCm Italy

সূত্রঃ

http://www.signalfire.org/2015/07/01/pcm-italy-about-greece-crisis-and-referendum-unofficial-traslation/

Advertisements

সিরিয়ায় প্রথম ‘প্রশিক্ষিত জঙ্গি’র চালান পাঠাচ্ছে আমেরিকা

363074302e3ac8768ea3da49126a722d_XL

সিরিয়ায় প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষিত জঙ্গি পাঠাতে যাচ্ছে আমেরিকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট এ খবর দিয়েছে।

ওই কর্মকর্তা দৈনিকটিকে বলেছেন, আমেরিকা ও তার মিত্র বাহিনী তুরস্কে তথাকথিত ‘নরমপন্থি’ জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ শেষ করতে যাচ্ছে। প্রথম গ্রুপের এসব জঙ্গির সংখ্যা ১০০ জনের কম এবং তাদেরকে চলতি গ্রীষ্মের শেষদিকে তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী সিরিয়ায় ঢুকিয়ে দেয়া হবে।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সিরিয়ার জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও সশস্ত্র করে তোলার কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগুচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, প্রাথমিকভাবে আমেরিকা বছরে ৫,৪০০ জঙ্গিকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ কাজে ৫০ কোটি ডলার বাজেট বরাদ্দ দেয় মার্কিন কংগ্রেস।

ওই সেনা কর্মকর্তা মার্কিন দৈনিকটিকে বলেন, জঙ্গি প্রশিক্ষণের কাজে ধীরগতি অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক। তবে সঠিক পদ্ধতিতে বাছাই করে ‘অনুপযুক্ত’ ব্যক্তিদেরকে প্রশিক্ষনার্থীদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার জন্য এ সময় নিতে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা বলেন, “দীর্ঘমেয়াদে এ পরিকল্পনা সাফল্য পাবে বলে আমরা মনে করি। কারণ, এর গুণগত মান বজায় রেখেছি আমরা। সংখ্যার চেয়ে আমরা গুণগত মানকে প্রাধ্যন্য দিচ্ছি।”

গত সপ্তাহে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তারা সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৩,০০০ ‘নরমপন্থি’ জঙ্গিকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন। কিন্তু বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাঝপথে এসে মার্কিন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, তারা ভুলপথে এগুচ্ছেন। বুধবার পেন্টাগনে মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসি বলেন, প্রশিক্ষণের মাঝখানে এসে অনেকে যার যার বাড়ি চলে গেছে। বিশেষ করে রমজান মাস শুরু হওয়ার পর বহু প্রশিক্ষণার্থী পরিবারকে সময় দিতে বাড়ি চলে গেছে।

মার্কিন সরকার যখন ইরাক ও সিরিয়ায় তৎপর উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএলের বিরুদ্ধে লড়াই করার দাবি করছে তখন এসব জঙ্গিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আমেরিকার দ্বিমুখী নীতি ফুটে উঠল বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

সূত্রঃ http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/2010-04-21-08-29-54/item/75006-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE-%E2%80%98%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%9C%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BF%E2%80%99%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%BE


বাংলাদেশে গত ৬ মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় দু’শোরও বেশি শ্রমিক নিহত

150702031019_bangla_bd_worker_construction_bulding_640x360_getty

বাংলাদেশে গত ৬ মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় দু’শোরও শ্রমিক মারা গিয়েছে বলে একটি বেসরকারী সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে।

সেফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি নামের সংস্থাটি বলছে, নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ৭৬ জনই নির্মাণশিল্পের শ্রমিক।

সংস্থাটির ২০১৪ সালের জরিপে দেখা গেছে বছরের প্রথম ছয় মাসে ১২৯টি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মোট ১৫৮ জন শ্রমিক নিহত হন।

গতবছরেও তাদের জরিপে সর্বোচ্চসংখ্যক নিহত শ্রমিক ছিল নির্মাণ খাতেই।

সেফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সেকান্দার আলী মিনা বলছেন, “নির্মাণ সেক্টর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু নির্মাণ কাজে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি অবহেলার কারণেই এই শিল্পে হতাহতের সংখ্যা এতটা বেশি। তাছাড়া আইন মেনে করা হয়না বলে ঝুঁকিটা রয়ে যায়”।

150702031145_bangla_bd_worker_construction_bulding_640x360_getty

ভূমি থেকে উপরে উঠে যে কাজগুলো করতে হয় সেগুলোর সঠিক মাপ না নেয়ার কারণেও ঝুঁকিটা থাকে বলে জানাচ্ছিলেন সেকান্দার আলী মিনা।

তিনি আরও বলছেন, “বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড আছে যেখানে বলা হয়েছে কোন কাজটা কিভাবে করা হবে, কিন্তু আইনের প্রতি একধরনের অবহেলা থাকার কারণে হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটে”।

মিঃ আলী বলছেন তারা গবেষণা করে দেখেছেন বিল্ডিংকোড ও সেফটি কোড নিয়ে মালিকপক্ষ খুব একটা আগ্রহী থাকেনা কারণ তারা মনে করে খরচ বেড়ে যাবে, আর অন্যদিকে শ্রমিকরাও নিরাপত্তা বিষয়ে অবগত নয়।

এ বিষয়ে সরকার থেকে সেফটি কোড পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সংস্থা থাকার কথা, কিন্তু সেটি এখনও গঠন করা হয়নি বলে জানালেন সেফটি এন্ড রাইটস সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সেকান্দার আলী মিনা।

সূত্রঃ http://www.bbc.com/bengali/news/2015/07/150702_an_garments_worker_dead_stats


‘মাওবাদীদের জনসংযোগের বিভিন্ন ধারা’ – শুভজিৎ বাগচী(বিবিসির সরেজমিন প্রতিবেদন)

কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট)-এর বেশ কয়েকটি গণ সংগঠন রয়েছে ছত্তিশগড়ে। যে কোনও কমিউনিস্ট পার্টিতে যেমনটা হয়, এই গণ সংগঠনগুলিই মাওবাদীদের শক্তির কেন্দ্র। এই গণ সংগঠনগুলিই সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, তাঁদের পার্টির কাজকর্ম সম্পর্কে বোঝায়, তাঁদের দাবিদাওয়া শোনে এবং নানান অভিযান চালায় যাতে পার্টিতে আরো বেশি মানুষ এসে যোগ দেন। ছত্তিশগড়ে রয়েছে কৃষক ও শ্রমিকদের একটি সংগঠন, রয়েছে মহিলা ও শিশুদের সংগঠন।

তবে সাধারণ মানুষকে দলে টানতে বা দলের সদস্যপদ গ্রহণ করতে যে গণ সংগঠনটির ভূমিকা সবচেয়ে সেটি হলো মাওবাদীদের সাংস্কৃতিক শাখা, চৈতন্য নাট্য মঞ্চ (সি এন এম)।

মাওবাদীরা ছত্তিশগড়ের যে জায়গাটিতে বর্তমানে তাঁদের ঘাঁটি অঞ্চল স্থাপন করেছেন সেই জায়গাটি ভারতের একটি আদি জনজাতির বাসগৃহ। গোণ্ড নামের এই জনজাতির মানুষ গান ও বাজনা ছাড়া জীবনযাপন করছেন এটা ভাবা যায় না। এদের প্রায় প্রতেক্যের বাড়িতে আমি দেখেছি মাদল, বিভিন্ন ধরনের ঢোল এবং গানবাজনার সরঞ্জাম। একটু সন্ধ্যা হলেই প্রায় প্রতিটি বাড়ির সব সদস্য সদলবলে শুরু করে দেন গানবাজনা আর মদ্যপান।

maoists performers at the camp

পার্টির গোন্ডি ছেলেমেয়েদের রয়েছে গান গাইবার সহজাত প্রবণতা

মাওবাদীরা তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সুচিন্তিত ভাবে এই গানবাজনার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। পার্টির গোণ্ডি ছেলেমেয়েদের গান গাইবার সহজাত প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে গান। যে গানের সুর মূলত স্থানীয় হলেও কথার মধ্যে দিয়ে মাওবাদীরা প্রচার করছেন তাঁদের রাজনীতি।

সি এন এম-এর রাজ্য শাখার সদস্য চান্দু আমায় বললেন, শহীদদের মৃত্যু থেকে জঙ্গল ও জমির উপরে মানুষের অধিকার বা অতীতের আন্দোলনের গল্প সবই উঠে এসেছে তাঁদের গানে।

“তবে শুধু গোণ্ডি ভাষার গান নয়, তেলেগু, বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবী সব ভাষার গান শোনার রেওয়াজ পার্টিতে রয়েছে। অনেক সময়ে গানটির সুর পরিবর্তন না করে আর মূল বক্তব্যকে খানিকটা সাজিয়ে নিয়েও আমরা পরিবেশন করার চেষ্টা করি,” বলছিলেন চান্দু।

মাওবাদীদের মোবাইল হসপিটাল’

মানুষের কাছাকাছি পৌঁছতে গান যদি একটা মাধ্যম হয় তবে অপর মাধ্যমটা সম্ভবত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। গ্রামে গ্রামে যে ‘জনাতন সরকার’ বা জনগণের সরকার মাওবাদীরা স্থাপন করেছেন তার বিভিন্ন শাখা রয়েছে। শিক্ষা, সুরক্ষা, মহিলা কল্যাণ প্রভৃতি সব মিলিয়ে মোট ন-টি শাখা রয়েছে জনাতন সরকারে। এর মধ্যে একটি হলো, স্বাস্থ্য। আর মাওবাদীদের জনসংযোগের জন্যে এটি যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা গেলো ইন্দ্রাবতী নদীর কাছে বেঢ়মা নামের একটি গ্রামে গিয়ে।

একটি বছরতিনেকের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর পিসি, জৈমু। বললেন শিশুটির নাম চন্দ্রপ্রকাশ। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, জ্বরে শিশুটির গা পুড়ে যাচ্ছে। জৈমু জানালেন, গত ১৫ দিন ধরে পেটের রোগে ভুগছে শিশুটি। বমিও করে চলেছে সমানে।

চন্দ্রপ্রকাশকে কিছু স্থানীয় টোটকা দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তাতে কোনও কাজই হয়নি। কাছাকাছি কোনও ডাক্তার বা ওষুধপত্রেরও ব্যবস্থা নেই বলে আমায় জানালেন জৈমু।

সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সাত কিলোমিটার দূরে। তাও অধিকাংশ সময়েই বন্ধ থাকে। জানিনা কি করবো?———জৈমু

“সবচেয়ে কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সাত কিলোমিটার দূরে। তাও অধিকাংশ সময়েই বন্ধ থাকে। জানিনা কি করবো,” বললেন জৈমু।

আমাদের কাছাকাছিই ছিলেন মাওবাদীদের আটটি ডিভিশনের অন্যতম মাড় ডিভিশনের সচিব রাজমন। তিনি বললেন, চন্দ্রপ্রকাশকে দেখার জন্যে স্থানীয় চিকিৎসককে তিনি আজই পাঠাবেন। এই যে চিকিৎসককে রাজমন পাঠানোর কথা বললেন, তিনি কিন্তু কোনও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক নন। তিনি হলেন, মাওবাদী পার্টির ডাক্তার।

অনেক রাতের দিকে আমার শিবিরে এলেন এক চিকিৎসক, ডা: প্রকাশ। বললেন, চন্দ্রপ্রকাশকে তিনি দেখে এসেছেন।

“বাচ্চাটির ম্যালেরিয়া হয়েছে বলে মনে হয়। কিছু ওষুধ দিলাম। দেখা যাক কি হয়,” বললেন প্রকাশ।

Maoist doctor

এই মাওবাদী চিকিৎসকরাই ভরসা সাধারণ মানুষের

সব ডিভিশনেই ডা: প্রকাশের মতো পার্টির দুই বা তিনজন ডাক্তার থাকেন। এখানকার মানুষ এদেরই বলেন ‘মোবাইল হসপিটাল’। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অনেকটা দূরে হওয়ার ফলে বা কেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকার ফলে এই মাওবাদী চিকিৎসকরাই ভরসা সাধারণ মানুষের। আর এরা যে জনসংযোগের কাজটা পার্টির জন্যে করেন তার মূল্য কতোটা তা বোঝা যায় এখানকার জনজাতীর মানুষের সঙ্গে সামান্য কথাবার্তা বললেই।

যে কোনও গ্রামেই দেখেছি বহু মানুষ আসছেন মাওবাদীদের কাছে। নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা নিয়ে। এঁদের প্রত্যেকে আমায় জানিয়েছেন, মাওবাদীদের কাছ থেকে ওষুধপত্র না পেলে তাঁদের সমস্যা আরো বাড়তো।

ছত্তিশগড় সরকার ২০০৪ সালে একটি মানব উন্নয়ন রিপোর্ট তৈরি করেন। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবায় ছত্তিশগড় অন্যান্য রাজ্যের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

“জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে ছত্তিশগড়,” বলা হয়েছে রিপোর্টে।

সন্দেহ নেই এই খামতিই কাজে লাগিয়েছেন মাওবাদীরা

জনসংযোগের আরো একটি প্রচেষ্টা: মাওবাদী স্কুল

মাওবাদীরা ছোট আকারে কিছু স্কুলও চালানোর চেষ্টা করছেন অরণ্য অঞ্চলে। সাধারণত চার বা পাঁচ মাস চলে এই স্কুল। তবে কতোদিন টানা স্কুল চলবে তার অনেকটাই নির্ভর করছে জঙ্গলে কতোটা শান্তি আছে তার উপরে।

মাওবাদীরা ছোট স্কুলও চালানোর চেষ্টা করছেন অরণ্য অঞ্চলে

স্কুলগুলিকে বলা হচ্ছে ‘বুনিয়াদী সাম্যবাদী প্রশিক্ষণ পাঠশালা।’ এখনও পর্যন্ত সাম্যবাদী প্রশিক্ষণ পাঠশালার দুটি মাত্র ‘সেসন’ হয়েছে।

এই স্কুলগুলিও মাওবাদীদের জনসংযোগের জন্যে একটা নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে। যে সমস্ত ছেলেমেয়ে খানিকটা পড়াশোনা করেছে, যাদের কিছুটা অক্ষরজ্ঞান আছে তাদের ভর্তি করা হচ্ছে এই পাঠশালায়। রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, শরীর-স্বাস্থ্য বিষয়ক কিছু সাধারণ জ্ঞানের বাইরে মৌলিক মার্ক্সবাদ বা মাওবাদও রয়েছে পাঠ্যক্রমে।

‘স্টেট’ বা রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করে, সাধারণ মানুষ বা গরীব মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কি, বারো, তেরো, চোদ্দ বা পনেরো বছরের ছেলেমেয়েদের বোঝানো হচ্ছে তাও।

আমার ইচ্ছে পার্টির মধ্যে থেকে আরও একটু পড়াশোনা করার। আর তারপরে ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার, পার্টির ডাক্তার।

…………সমর, সাম্যবাদী পাঠশালার ছাত্র

সবেমাত্র সাম্যবাদী পাঠশালা থেকে পাশ করে বেরিয়েছে তেরো বছরের রঞ্জিত ওরফে সমর। পার্টিতেই জন্ম হয়েছে সমরের।

“না ভারতের হয়ে কোনও কাজকর্ম করার ইচ্ছে আমার নেই। দেশটা বড় নোংরা। আমার ইচ্ছে পার্টির মধ্যে থেকে আরও একটু পড়াশোনা করার। আর তারপরে ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার, পার্টির ডাক্তার,” বললো সমর।

একদিকে জনসংযোগ আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়িয়ে তাঁদের সংগঠিত করা এই দুয়ের মিশ্রণে দক্ষিণ ছত্তিশগড় শক্তিশালী করেছে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওয়িস্ট)-কে।

তবে, কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব এই পথে আসবে কি না সেটা অবশ্য অন্য প্রশ্ন।

সূত্রঃ http://www.bbc.com/bengali/multimedia/2011/01/110102_mb_maoist_pt7


‘বিপ্লবীদের দঙ্গলে’ – শুভজিত বাগচী(মাওবাদীদের নিয়ে BBC বাংলার প্রতিবেদন)

94d78effcc6a574fbe8aef180218675e1594800f

বিবিসি বাংলার হয়ে কাজের সুবাদে গত আট বছর যাবত নানান জায়গায় যেতে হয়েছে আর সাংবাদিকতায় যেমনটা হয়ে থাকে নানান সমস্যাতেও পড়তে হয়েছে। কোনও না কোনও নতুন সমস্যার সুবাদে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রতিবারই। কিন্তু ২০১০-এর আগস্ট মাসে যেমন হলো তা গত ১৫-১৬ বছরের সাংবাদিক জীবনে হয়নি।

আগস্টের এক তারিখে সশস্ত্র কমিউনিস্ট পার্টি – ভারতে যাদের মাওবাদী বা নকশাল বলা হয় – তারা আমায় নিয়ে গিয়েছিলো মধ্য ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের দক্ষিণ অংশে, অরণ্য-পাহাড়ে ঘেরা তাদের গোপন আস্তানায়। ৩৪ দিনের জন্যে।

মাওবাদীদের সঙ্গে অরণ্য অঞ্চলে ঘোরার ধারাবাহিক প্রতিবেদন – মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চলে – হয়তো বিবিসি বাংলায় আপনারা শুনেছেন ২০১০ সালের শেষের দিকে। কিন্তু ধারাবাহিকের নেপথ্যের গল্প সেখানে তুলে ধরা যায়নি। যেমন, প্রথম বড় সমস্যাটার কথাই বলা যায়নি ধারাবাহিকে৻ নিরাপত্তা বাহিনীর নজর এড়িয়ে কীভাবে প্রবেশ করলাম গেরিলাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তা নিয়েই হয়তো আর একটা ধারাবাহিক হতে পারে।

আমাকে খানিকটা যেন ‘স্মাগল’ করেই মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চলে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আমার সঙ্গে ছিলেন বছর পঁচিশের স্থানীয় গোণ্ড জনগোষ্ঠীর দু’জন ছেলে, তাঁদের কাজটা ছিলো গাইডে। তারিখটা ছিলো ১লা অগাস্ট, ২০১০।

কিছুটা হেঁটে, কিছুটা গাড়িতে দক্ষিণ ছত্তিশগড়ের মাওবাদী এলাকায় প্রবেশের সময়ে আধাসামরিক বাহিনী দু’বার গাড়ি থামিয়ে চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আমরা কারা, কোন অঞ্চলের লোক, কোথায় যাবো ইত্যাদি৻ জিজ্ঞাসাবাদের মিনিট পাঁচেক আমি বসে ছিলাম পিছনের আসনে, মনে হচ্ছিলো শরীরের নিচের অংশটা অসাড় হয়ে যাবে। পায়ের দিক থেকে রক্ত মাথার দিকে উঠে আসছে। আমাদের উদ্দেশ্য জানতে পারলে নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের আটকাবেই। আর আমাকে ছেড়ে দিলেও, নি:সন্দেহে এই দুই গোন্ডি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে তারা গ্রেফতার করবেই, হয়তো মারধরও করবে। আমার সেই মুহুর্তে মনে হচ্ছিলো ভিতরে ঢোকার ঝুঁকিটা না নিলেই হয়তো ভালো হতো।

মাওবাদী বিদ্রোহীদের ঘেরাওয়ে শুভজিত বাগচী

মাওবাদী বিদ্রোহীদের ঘেরাওয়ে শুভজিত বাগচী

দুই আদিবাসী যুবকের সঙ্গে দীর্ঘ যাত্রা অবশ্য একটা সময়ে শেষ হলো, আমাকে তাঁরা তুলে দিলেন মাওবাদীদের সেনাবাহিনী পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মির (পিএলজিএ) হাতে। অপহৃত হিসাবে নয় সাংবাদিক হিসাবে।

মাওবাদীদের শিবিরে থাকার সময়ে আরও একটা বিপদ হয়েছিলো আমার, যার কথাও বলা হয়নি বাংলা বিভাগের ধারাবাহিকে। না, অর্তকিতে কোনও পুলিশের হামলা নয়। বস্তুত, আমি কোনও পুলিশ ক্যাম্পই দেখিনি ৩৪ দিনে। আক্রমণটা এসেছিলো মশাদের কাছ থেকে। জঙ্গলে প্রবেশের পরে ঠিক একুশ দিনের মাথায় আমার জ্বর আসে। রক্ত পরীক্ষা করানোর কোনও উপায় ছিলো না।

“একদিন অন্তর জ্বর আসা মানেই হলো ম্যালেরিয়া,” বললেন দক্ষিণ ছত্তিশগড়ে মাওবাদী পার্টির উত্তর আঞ্চলিক কমিটির সচিব পাণ্ডু বা বিজ্জে৻ তারপরে তিনিই আমায় দিলেন, রেজিজ বলে একটি ওষুধ। বিপজ্জনক গোত্রের ম্যালেরিয়া যা সরাসরি মাথায় ভিতরে আঘাত করে আর যে ম্যালেরিয়ার জন্ম দেয় ‘প্ল্যাসমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স’ ঘরানার প্যারাসাইট, তার বিরুদ্ধেই লড়াই করে রেজিজ। ফলে রেজিজ এটা নিশ্চিত করে রোগীর যাতে মৃত্যু না হয়।

কিন্তু রেজিজের সমস্যা অন্য জায়গায়। রেজিজ দেহের জলকে দ্রুত ঘামে পরিণত করে। এতোটাই দ্রুত সেটা ঘটতে থাকে যে রোগী ‘ডিহাইড্রেটেড’ হয়ে পড়ে। সে অবসন্ন হয়ে পড়ে, তাঁর হাঁটার ক্ষমতা চলে যায়, সে খালি চেষ্টা করে কোথাও ঘুমিয়ে নেওয়ার। ঠিক এই রকম অবস্থাই হয়েছিলো আমার। আর এটা হয়েছিলো এমন একটা সময়ে যখন দক্ষিণ ছত্তিশগড়ের উপরের অংশ থেকে ইন্দ্রাবতী নদী পেরিয়ে নিচের অংশে আমায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন মাওবাদীরা।

সেই যাত্রা স্থগিত হয়ে গেলো। মাওবাদীদের একটি প্ল্যাটুন রওনা হয়ে গেলো ইন্দ্রাবতীর দিকে আর আমায় রাখা হলো একটি শিবিরে, অপর এক প্ল্যাটুনের তত্ত্বাবধানে। এরপরে দিনচারেক ওই শিবিরে শুয়ে রইলাম, প্লাস্টিকের একটি চাদরের উপরে। মাথার উপরে গাছের সঙ্গে চার কোণ বাঁধা আর একটি প্লাস্টিকের চাদর, আমার ছাদ। আর তার উপরে, গোটা শিবির ঘিরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। ছত্তিশগড়ে আমি গিয়েছিলাম ভরা বর্ষায়। ফলে একটা অদ্ভূত সুন্দর জঙ্গলকে আমি দেখেছিলাম। ম্যালেরিয়ার অবসাদকে খানিকটা প্রশমিত করেছিলো বন্য বৃষ্টি, বিশেষ করে দিনের বেলায়।

সড়কে মাওবাদী প্রতিবন্ধক

সড়কে মাওবাদী প্রতিবন্ধক

আর তেমনই যন্ত্রণাদায়ক ছিলো রাত। চারদিক খোলা টেন্টের মাথার উপর শুধু বৃষ্টি, তার চারদিক ঘিরেও শুধু জল আর জল। আর রয়েছে অন্ধকার – এমন সে আঁধার নিজের হাতও দেখা যায় না ভালো করে। আর এর মধ্যে আমি শুয়ে রয়েছি প্লাস্টিকের চাদরের শিবিরে। আমার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে রয়েছেন মাওবাদীরা, গ্রেনেড আর ‌ এ কে ৪৭ মাথার নিচে রেখে। কেউ নাক ডাকছেন আর কেউ বা মনোযোগ দিয়ে বিবিসি-র খবর রেডিওতে ধরার চেষ্টা করছেন। এদেরই প্রধানমন্ত্রী ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যে সবচেয়ে বড় হুমকি’ বলে চিহ্নিত করেছেন ভেবে আমার বেশ মজাই লাগতো। আর আমি স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে ঢুকেও কাঁপছি, বিষধর মশার কামড়ের ফলে।

এর মধ্যে মাঝে মাঝে আবার প্লাস্টিকের ছাদ ফুটো হয়ে তোড়ে জল ঢুকতো অস্থায়ী বাসস্থানে। সেই সময় জিনিষপত্র নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছাতা মাথায় শিবিরের বাইরে দাড়িয়ে মাওবাদীদের আলোচনা শুনতাম : “নদীর জল বাড়ছে, আজ রাতেই অন্য কোথাও চলে যাওয়া ভালো। এই অবস্থায় একটাই চিন্তা আমার মাথায় ঘুরতো। ‘মাওবাদীদের জীবনযাপনের কোনও ভদ্রস্থ উপায় থাকলে কি ছেলেমেয়েরা বিপ্লবের এই জীবন বেছে নিতেন ?’

এই সময়েই এক দিন পার্টির নেতৃত্ব আমায় বললেন, আমি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছি, আমার আর থাকার চেষ্টা করাটা উচিত নয়। কোনও সময়ে আধাসামরিক বাহিনী এসে পড়লে সমস্যা হবে। আমি দৌড়তে পারবো না হয়তো – বিপদ বাড়বে সবারই।

আত্নবিশ্বাসটা কমছিলো ফলে পরামর্শ আর অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। শেষ হলো ৩৪ দিনের সংগ্রাম। আর কীভাবে বেরোলাম মাওবাদী-নিয়ন্ত্রিত অরণ্য আর পাহাড়ে ঘেরা আস্তানা থেকে সেটা আর একটা গল্প। সেটা না হয় বলা যাবে আর এক সময়ে, অন্য কোনও দিন।

সূত্রঃ http://www.bbc.com/bengali/in_depth/2011/12/111214_bangla_mag_suvojit_bagchi