অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৩য় পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

তৃতীয় পর্ব :

 এ এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প।)

মাওবাদীদের ক্যাম্পে নিজেদের ভেতরে বিয়ের অনুমতি রয়েছে; পার্টিতে যোগ দেয়ার দুই বছর পর একজন নারী বা পুরুষ তার সঙ্গীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে এবং বিবাহিত জীবনেও ‘বিপ্লবের প্রয়োজনকে’ অবশ্যই মেনে চলতে হয়। এর অর্থ পুরুষ ক্যাডারদেরকে বাধ্যতামূলক বন্ধ্যাত্বকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আত্মসমর্পণ করা মাওবাদীরা প্রায়ই যে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ তা হল পার্টিতে সন্তান নেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু ক্যাডাররা একে বিপ্লবী পার্টির জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। একজন নারী যোদ্ধা বললেন, “আমার সাথে যদি একজন শিশু থাকে তাহলে তো আমার পক্ষে গেরিলা হওয়া সম্ভব না।”

প্রায়ই দেখা যায় তিনি চিঠি লিখছেন। মাঝে মাঝে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে হয়তো কোন একটা মাওবাদী বিপ্লবের বই পড়ছেন, তখনও দেখা যায় বই এর পৃষ্ঠার ভেতরে গোঁজা কাগজে তিনি কিছু লিখছেন। দণ্ডকারণ্যতে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০টির মত চিঠি আদান প্রদান হয় মাওবাদীদের মধ্যে; হাতে হাতে আদান প্রদান হয় বলে এটি যোগাযোগের সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম বলে বিবেচিত। এর মধ্যে অল্প কয়েকটা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় আর তখন এ ঘটনাকে ‘রোমাঞ্চকর আবিষ্কার’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

চিঠিগুলোর শুরুতে থাকে ‘প্রিয় কমরেড’ আর শেষে থাকে “তোমার কমরেড”। মাঝপথে কখনো চিঠিগুলো খোলা হয় না এবং পড়ে ফেলার সাথে সাথেই চিঠিগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়। চিঠিগুলো গেরিলা জীবনের গল্প বহন করে যে গল্পগুলো এই অরণ্যের মাঝে চিরদিনের মত চাপা পড়ে যায়। কেউ যদি চিঠিগুলো উদ্ধার করে লিপিবদ্ধ করতে পারত তাহলে এই ভয়ংকর নিয়মতান্ত্রিক পার্টির গুপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটা নকশা পেয়ে যেত।

বস্তারের গ্রামবাসীরা শিকারের জন্য ভর-মার নামে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। পুলিশ প্রায়ই এইসব বন্দুক বহনকারী স্থানীয় গ্রামবাসীদের আটক করে যদিও এই বিদঘুটে অস্ত্রটি মাওবাদীদের অস্ত্র ভান্ডারে নেই।

বস্তারের গ্রামবাসীরা শিকারের জন্য ভর-মার নামে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। পুলিশ প্রায়ই এইসব বন্দুক বহনকারী স্থানীয় গ্রামবাসীদের আটক করে যদিও এই বিদঘুটে অস্ত্রটি মাওবাদীদের অস্ত্র ভান্ডারে নেই।

এই প্রতিবেদক মাওবাদীদের সাথে বসবাসকালীন তাদেরকে মোট চারটি চিঠি লিখেছিল।

তার মধ্যে একটি ছিল ওদের শীর্ষ নেতা গণপতিকে লেখা; তার একটা সাক্ষাৎকার নেবার জন্য। চিঠির উত্তর এসেছিল অর্জুনের কাছ থেকে, অর্জুন তার ঘনিষ্ঠ সহচর। এবার সাক্ষাৎ করা সম্ভব হবে না জানিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন তবে আশা রাখেন যত দ্রুত সম্ভব দেখা করার। তিনি লিখেছেন, “Itna din rukne ke baad bhi aapka kaam safal nahi hua (এত দিন অপেক্ষা করার পরেও আপনার কাজটা অসমাপ্ত রয়ে গেল- এ জন্য আমরা দুঃখিত) ।” কয়েক মাস পর অর্জুন আত্মসমর্পণ করে। পুলিশের কাছে যাওয়া ও গোপনে অরণ্য ছেড়ে যাবার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন সেটা ভেবে আমাকে চিঠিতে ঐ নিশ্চয়তাটা দেবার সময়ই হয়তো আত্মসমর্পণ করার বিষয়টা তার মাথার ভেতর ছিল।

চিঠির পাশাপাশি বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগের আর একটা মাত্র মাধ্যম ওদের আছে আর তা হল রেডিও। প্রতিটি স্কোয়াডে একটা করে রেডিও থাকে, তাতে সারাদিন বিবিসি আর হিন্দিতে অল ইন্ডিয়া রেডিও বাজতে থাকে। ২০১৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি পাহাড়ের উপরে আশ্রয় নেয়া ক্যাম্পে নীরবতা নেমে এল কারণ রেডিওতে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, অন্ধ্র প্রদেশে ২২ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছে। পরদিন রাজনন্দগাঁওয়ে এক দম্পতি আত্মসমর্পণ করে। ক্যাম্পের একজন নারী লোকটিকে চিনত, লোকটির নাম ভগত। ভগতের সাথে সে একটি এ্যামবুশে অংশ নিয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক মাওবাদী এমন একটা সময় স্মরণ করতে পারে যখন গাছের ডাল থেকে ঝুলন্ত রেডিওতে তার কোন না কোন কমরেড বা কোন দম্পতির এনকাউন্টারে মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করা হয়। একজন বললেন, “মনে হত সে যেন এই কালো বাক্সটার ভেতরেই মারা যাচ্ছে। আমার ইচ্ছে হত বাক্সটা ভেঙ্গে তাকে বের করে নিয়ে আসি।”

(চলবে)



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.