অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৪র্থ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

চতুর্থ  পর্ব :

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

২৮শে ফেব্রুয়ারি সবার মানসিক অবস্থা বদলে গেল কারণ সেই একই রেডিওতে দান্তেওয়াদায় পাঁচজন পুলিশ নিহত হবার সংবাদ শোনানো হচ্ছে। কেউ একজন বলল,  “এত পুলিশ মরছে তারপরেও এরা থামছে না (Itne maare jate hain ye policewale, phir bhi nahi maante)”   

forest6২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মাওবাদী, সাধারণ নাগরিক ও পুলিশের গুপ্তচর সহ মোট ১৩৫ জন নিহত হয়েছে; এবছর ৫০ জন নিহত হয়েছে

রজনু মান্দভী এ প্রশ্নে দার্শনিকধর্মী। বললেন, “এটা একটা দীর্ঘ লড়াই। নিজেদের ক্যাডারদের মৃত্যুতে আমাদের হতাশ হলে চলবে না কিংবা পুলিশের লোকদের মৃত্যুতে আমাদের উল্লসিত হলে চলবে না। খুশিও না, দুঃখও না, আমাদেরকে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে হবে (Na hansi, na dukh, medium rehna hai)”।

একদিন সাহারা কোম্পানির প্রধান সুব্রত রায় এর গ্রেফতারে ওরা আনন্দ প্রকাশ করল। দণ্ডকারণ্যতে মাওবাদীদের দুটো মাত্র ব্যাটেলিয়ন আর তার প্রধান রামধের; নিরাপত্তা বাহিনীর উপর বেশ কয়েকটি বড় ধরনের হামলা পরিচালনা করেছেন তিনি। রামধের বললেন, “এই ধরনের পুঁজিবাদীরা যদি তাদের অন্যায় কাজের শাস্তি পায় তাহলে আমাদের বিপ্লবের কী প্রয়োজন?”

মাওবাদীদের বিপ্লব এমন একটা বাস্তবতা যেটা আত্মস্থ করার ইচ্ছা খুব কম লোকেরই আছে। মধ্য ভারতের অরণ্যে বসবাসরত হাজার হাজার সশস্ত্র নারী ও পুরুষ এই বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্বে রয়েছে যে সংগ্রামের শীঘ্রই ৫০তম বর্ষপূর্তি হতে যাচ্ছে। কিছু শিক্ষিত ক্যাডার দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে থাকে। ২০১০ সালে এনকাউন্টারে নিহত হবার আগে পর্যন্ত সিপিআই (মাওবাদী) এর প্রাক্তন মুখপাত্র আজাদ তার কমরেড ও স্ত্রী পদ্মার সাথে দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে বসবাস করতেন অনেক বছর ধরে। স্বামীর মৃত্যুর পর পদ্মা এখন হায়দ্রাবাদের একটা বাড়িতে বসবাস করেন; বাড়ির মালিকের ছেলে ঝাড়খণ্ডের কারাগারে আছেন আর তার পুত্রবধূ সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পদ্মা বললেন, “ও (আজাদ) ছিল ওর ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের একজন কিন্তু আমরা গেরিলা জীবন বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমরা একটা সম অধিকারের সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলাম।”

প্রায় প্রত্যেক ক্যাডার উপলব্ধি করে যে সে ‘ক্রান্তি’র (বিপ্লব) আগেই মারা যাবে। ওদের সাথে কথা বলে ‘বিপ্লবের’ লক্ষ্যটাকে অনেক বেশী দূরের, অনেক বেশী অস্পষ্ট বলে মনে হয়। একটা বড় অংশের কাছে এটা কেবলই ওদের ‘জল, জঙ্গল ও জমি’ রক্ষা করার যুদ্ধ।

কাঙ্কার জেলার নরেশ সিপিআই (মাওবাদী) এর রাওঘাট এরিয়া কমিটির সদস্য। রাওঘাট এলাকাতে সংরক্ষিত লোহার খনি আছে যে কারণে বড় বড় কোম্পানিগুলো এই এলাকার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

নরেশ বলেন, অন্য কোন এলাকা হলে সরকার স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে আলাপ আলোচনায় বসত কিন্তু এখানে সরকার বিএসএফ ব্যাটেলিয়ন মোতায়েন করেছে। নরেশের প্রশ্ন, “আপনি আমার ভূমি চান। আমি যখন তা দিতে অস্বীকার করলাম তখন আপনি আমার বাড়ির বাইরে ১০,০০০ সেনা পাঠালেন। কী করব আমি?”

(চলবে)   

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s