অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৫ম পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

পঞ্চম পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

আদিবাসীদের মন জয় করতে না পারলে রাষ্ট্র মাওবাদীদের পরাস্ত করতে পারবে না। এই যুদ্ধ যত বেশী দীর্ঘায়িত হবে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের ভেতরে ব্যবধান তত বেশী বৃদ্ধি পাবে। রাষ্ট্র প্রায়ই মাওবাদীদেরকে দোষারোপ করে যে তারা আদিবাসীদেরকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে কিন্তু তারা এই বাস্তবতাটা দেখতে পায় না যে তাদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে রাষ্ট্র যে মাওবাদীদের থেকে বেশী কার্যকরী এ বিষয়ে আদিবাসীদেরকে তারা আশ্বস্ত করতে পারেনি। অন্ধ্র প্রদেশ থেকে আশির দশকে দণ্ডকারণ্যতে প্রবেশের পর মাওবাদীরা এই অরণ্যকে তাদের ল্যাবরেটরী বানিয়েছে এবং মানবদেহের ধমনীর চাইতেও বেশী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা এখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। সরকার দশক প্রতি আদমশুমারিও চালাতে পারেনি এই এলাকায়। বস্তারের অনেক ভেতরের দিকের বিভিন্ন গ্রামের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। ভোটার তালিকা ভুলে ভরা, স্কুল আর বন বিভাগের রেস্টহাউস গুলো যেগুলোকে সরকার ভোটকেন্দ্র বলে জানে সেগুলো বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।

মাওবাদীদের বিশাল রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের অন্তরালে নীরবে কাজ করছে। তাদের খুব অল্প সংখ্যকেরই পুলিশের খাতায় নাম আছে-ওরা ছদ্মবেশে কাজ করে যাওয়া আর্মি।  "আমাদের পার্টির নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এ্যামবুশ তার মধ্যে একটা মাত্র।"

মাওবাদীদের বিশাল রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের অন্তরালে নীরবে কাজ করছে। তাদের খুব অল্প সংখ্যকেরই পুলিশের খাতায় নাম আছে-ওরা ছদ্মবেশে কাজ করে যাওয়া আর্মি। “আমাদের পার্টির নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এ্যামবুশ তার মধ্যে একটা মাত্র।”

অন্যদিকে মাওবাদীরা মাঝে মাঝেই তাদের গ্রামগুলোর তালিকা হালনাগাদ করে। এলাকার প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি পরিবারের  মুরগী, ছাগল এবং খাদ্য শস্যের তালিকা তাদের নোটবইতে লেখা থাকে। যদি একটা মোরগও খুঁজে পাওয়া না যায় কিংবা গ্রামের কোন ব্যক্তি যদি শহর থেকে না ফেরে কিংবা যদি ফিরতে দেরী করে সেটা মাওবাদীরা জেনে যায়। এক সন্ধ্যায় একটা গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় একজন ক্যাডার জানতে পারল গ্রামের দুইজন নিখোঁজ। ওরা কি পুলিশের গুপ্তচর হতে পারে? ওরা কি গ্রেফতার হয়েছে? মাওবাদীরা গ্রামে থামার সিদ্ধান্ত নিল, উত্তেজনা বাড়তে লাগল। পরদিন সকালে দুইজন ফিরল। খুব সাধারণ কোন কারণেই ফিরতে দেরী হয়েছিল কিন্তু মাওবাদীরা জানে কোন ঝুঁকি নেয়া তাদের উচিৎ হবে না। জিজ্ঞাসাবাদের পর দুইজনকে ছেড়ে দেয়া হল। এখানে অবকাশের সুযোগ নেই বললেই চলে। গ্রামের অধিকাংশই চলমান ছবি বলতে যা বুঝে তা হল পার্টির তৈরী করা কোন এ্যামবুশ বা প্রোপাগান্ডার ভিডিও চিত্র কিংবা কিং কং এর মতো কোন এ্যাকশন চিত্র। এগুলো সৌর চার্জার ও ব্যাটারী চালিত কম্পিউটারে দেখানো হয়। এক রাতে ওরা এই প্রতিবেদকের ল্যাপটপে থিও এঞ্জেলপোলাসের সিনেমা ইউলিসেস গেজ (Ulysses’ Gaze) দেখল আর বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে লেনিনের বিশালাকৃতির সাদা রং এর ভাস্কর্যকে টুকরো টুকরো করে আলাদা করার দৃশ্য দেখে ওরা চমৎকৃত। ওরা সিনেমার ভাষা কিংবা সাবটাইটেল কিছুই বুঝে না। ল্যাপটপটা শীঘ্রই ক্যাম্পের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হল; মাওবাদীরা প্রতি রাতে আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করে কখন এই যন্ত্রটা চালু করা হবে।

মার্চের ২ তারিখ রেডিওতে এশিয়া কাপে ভারত পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচের ধারাবিবরণী প্রচার শুরু হল; মাওবাদীরা মহেন্দ্র সিং ধোনি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। সে দেখতে কেমন, সে কত রোজগার করে? “সে তো খেলোয়াড়, তার গায়ে নিশ্চয়ই অনেক জোর”। ওরা ধোনির কোন ছবি দেখেনি।

ম্যাচ শুরু হতে এখনো বাকি, রজনু মান্দভী তার বিপ্লবকে বাজি ধরলেন ভারতের জয়ের জন্য। বললেন, “ভারত জিতলে বিপ্লব সফল হবে।” স্কোয়াডের মাঝে উত্তেজনা বাড়তে লাগল। নেতা তার ক্যাডারদের পাশের গ্রামে পাঠালেন একটা বল নিয়ে আসার জন্য। আশেপাশে প্রচুর লাকড়ি আছে, একটা ব্যাট সহজেই বানিয়ে ফেলা যাবে। দল গঠন করা হল, ক্যাডারদের মধ্যে একটা ম্যাচ শুরু হবে কাছের একটা ঝরণার ধারে। কিন্তু বল খুঁজে পাওয়া গেল না।

(চলবে)

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.