অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৬ষ্ঠ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

ষষ্ঠ পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখেএবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেনমাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যানআশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশীবিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

মাওবাদীদের ঘাঁটি এলাকা

মাওবাদীদের ঘাঁটি এলাকা

ইতোমধ্যে, পাকিস্তান বেশ ভালই রান তাড়া করছে আর মান্দভীর অস্বস্তি বাড়ছে। রাত হয়ে গেছে, রাতের খাওয়া শেষ কিন্তু রেডিওতে এখনো অনেকে কান পেতে আছে। তারপর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেল। ভুবনেশ্বর কুমার ৪৯তম ওভারে ২টি উইকেট নিলেন এবং ৫০তম ওভারের প্রথম বলে আর অশ্বিন পাকিস্তানের নবম উইকেটটি নিলেন। মান্দভী বললেন, “বলেছিলাম না, বিপ্লবের জন্য ভারতকে জিততেই হবে”। এরপর শহীদ আফ্রিদি পরপর কয়েকটি ছক্কা পেটালেন। পাকিস্তান ১ উইকেটে জিতে গেল। মান্দভী তেরপলের উপর চুপচাপ শুয়ে পড়লেন। জয়লালের মুখে স্নেহময় হাসি, চোখে ঝিলিক; তার বয়স ২২ কিন্তু তাকে আরো অল্প বয়স্ক দেখাচ্ছে। ওর বাম কাঁধের ইনসাস রাইফেলটা ওর ৫ ফিট ৩ ইঞ্চি শরীরটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে আর ডান কাঁধে ঝুলছে পিঠ ব্যাগ। একটা পেন গান আর একটা ধারালো ছুরি ধরে একটা হাত দিয়ে কোমরের থলিটাকে সে ক্রমাগত উপরের দিকে টানতে থাকে; তার সরু কোমর বেয়ে থলিটা শুধু নিচের দিকে নেমে যায়। সে পার্টিতে আছে সাত বছর হল এর মধ্যে কোন বন্দুকযুদ্ধে অংশ নেয়নি সে, নেয়ার ইচ্ছেও তার নেই। সে বলল, “নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করা আমার কাজ”। একটি স্থানীয় সংগঠন স্কোয়াডের প্রধান হিসেবে ১,০০০ বর্গ কিলোনিটারের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ১০টা গ্রামে জয়লাল পার্টির কার্যক্রম দেখাশোনা করে থাকে। সে প্রতিদিন গ্রামবাসীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে এবং তাদেরকে সতর্ক করে দেয় যে যদি বস্তারে সরকার ও শিল্প কারখানা ঢুকে তাহলে তারা তাদের ভূমি কেড়ে নেবে। সে অশিক্ষিত গোন্ডি আদিবাসীদেরকে ‘বিশ্বাসঘাতক পলাশীর যুদ্ধ’ ও ‘১৯৪৭ সালের ভুয়া স্বাধীনতা’ সম্পর্কে বলে। জয়লাল মাওবাদীদের এমন একটা দিকের প্রতিনিধিত্ব করে যে দিকটি সম্পর্কে মানুষ খুব কমই জানে। সাধারণত সবার কল্পনায় থাকে যে গেরিলারা শুধু হামলা চালায় আর হত্যা করে। কিন্তু সিপিআই (মাওবাদী) এর বিশালাকৃতির রাজনৈতিক শাখা দৃশ্যের পেছনে থেকে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে এবং গ্রামবাসীদের মাঝে মাওবাদীদের প্রতি সমর্থনকে ধরে রেখেছে।

আদিবাসী গ্রামীণ পরিবারে মাওবাদীরা

আদিবাসী গ্রামীণ পরিবারে মাওবাদীরা

স্থানীয় পর্যায়ে এই কাজগুলোর মাধ্যমে ক্যাডাররা বিশ্বাস করে যে তারা গ্রামগুলো দিয়ে পর্যায়ক্রমে শহরগুলোকে ঘেরাও করতে পারবে। রাজনৈতিক শাখার খুব কম সংখ্যক ক্যাডারদের পুলিশের খাতায় নাম আছে- তারা ছদ্মবেশে কাজ করা আর্মি। জয়লাল বলল, “আমরা একটা রাজনৈতিক দল যেখানে নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে”। রাজনৈতিক শাখা গ্রামগুলোতে জনতার আদালতগুলোকে (নির্বাচিত গ্রামবাসীদের নিয়ে গঠিত হয় জনতার আদালত) দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে এবং সরকারের কার্যক্রম গুলোকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। বস্তারের অনেক গ্রামে পঞ্চায়েতের পরিবর্তে জনতার আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বস্তারে ১০,০০০ এর বেশী মাওবাদী সমর্থিত পঞ্চায়েত নির্বাচিত হয় বাধাহীনভাবে। প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি রূপির প্রকল্প দেখাশোনা করবে এই পঞ্চায়েতগুলো। এই অর্থের অতি সামান্য অংশ হলেই তা মাওবাদীদের খোরাকের জন্য যথেষ্ট। এ্যামবুশে অংশগ্রহণ না করলেও রাজনৈতিক শাখার সদস্যরা অস্ত্র বহন করে এবং গ্রামগুলোতে মৌলিক পর্যায়ের দুইটি বাহিনী গঠন করে থাকে- একটি জন মিলিশিয়া ও অপরটি গ্রাম রক্ষক দল। মিলিশিয়ারা মূলতঃ মাওবাদীদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করে। গ্রাম রক্ষক দলের সদস্যরা হালকা অস্ত্র বহন করে এবং সশস্ত্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে। মাওবাদীদের প্লাটুন ক্যাডারদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই দলগুলো থেকে নেয়া হয়। ওদের প্রতি আদিবাদীদের সমর্থনের একটা প্রধান কারণ হল গ্রামবাসীদের কাছে তেমন কোন বিকল্প পথ নেই। গ্রামবাসীরা বলে, “আমরা যখনই বাইরে যাই, পুলিশ আমাদেরকে থামিয়ে হয়রানি করে, বলে আমরা গুপ্তচর”। ফলশ্রুতিতে, আদিবাসীদেরকে মাওবাদীদের সাথে আবদ্ধ থাকতে হয়; মাওবাদীরা ওদের অধিকার সম্পর্কে কথা বলে, ইতিহাস ও মতাদর্শ নিয়ে কথা বলে। একবার, জয়লাল একটা বিতর্কিত জন আদালতে (Peoples Court) সভাপতিত্ব করেছিল। ২০১৩ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত কোঙ্গের গ্রামের অধিবাসী কাওয়াসি চন্দ্রাকে তার স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানদের সামনে পিটিয়ে হত্যা করে প্রায় ২০০ জন গ্রামবাসী। জয়লাল বলল, গ্রামবাসীরা এই শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাঝেমাঝে এই ধরনের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

(চলবে)

Advertisements

One Comment on “অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (৬ষ্ঠ পর্ব)”

  1. Tarit Chowdhuri says:

    The news of decision of the Kangaroo Court ( Peoples Court) to pass Capital Punishment for a villager convicted with spying can not be agreed with. The Horrific order in this case was to kill the person simply beating before his Family Members is an incident of inhuman characteristic which does not follow any justification and this type of punishment for any persons who was a member of the same community always invite revenge within the same community . so what a revolutionary party can teach about humanity? For, a communist must be humanist at first.

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.