অরণ্যের দিনরাত্রি – ছত্তিসগড়ে মাওবাদীদের সাথে ২৩ দিনের ধারাবাহিক গল্প (শেষ পর্ব)

একটি বিপ্লবের অরণ্যের জীবনের গল্প

(লাল সংবাদ প্রতিবেদনটি বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে)

শেষ পর্ব:

( এক দুর্লভ সুযোগ। মাওবাদীদের ক্যাম্পে বাস করে, তাদের সাথে একত্রে খাবার ভাগ করে খেয়ে, ল্যাপটপে সিনেমা দেখে এবং মাওকে নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদক আশুতোষ ভরদ্বাজ ছত্তিসগড়ে ২৩ দিন কাটিয়ে এলেন মাওবাদীদের সাথে। গত বছরের (২০১৪) ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিসগড়ের অবুঝমাদ অরণ্যে প্রবেশের দুর্লভ অনুমতি পেয়ে যান আশুতোষ ভরদ্বাজ। অবুঝমাদ মাওবাদীদের একটি মুক্তাঞ্চল। এখানে মাওবাদীদের নেটওয়ার্ক মানবদেহের ধমনীর থেকেও বেশী বিস্তৃত। এটি বিপ্লবের অরণ্যে জীবনের গল্প)

naxal-45

পুলিশরা আদিবাসীদেরকে অত্যাচার করে বলে মাওবাদীরা অভিযোগ করে; পুলিশ এবং মাওবাদীদের মধ্যে তফাৎ কী জানতে চাইলে জয়লাল সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলঃ “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এটা খারাপ”। তারপরই বলল, “এবিষয়ে হয়তো সিনিয়র নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন”।

বরাবর তর্কপ্রবণ হলেও তাদের মতাদর্শের ভিতরে যে ফাঁক আছে সেটা গেরিলারা অস্বীকার করে না। ওরা যখন বলে, “সব ধরনের সম্পত্তিই খারাপ, কাজের বিনিময়ে অর্থ মানুষকে খারাপ বানিয়ে ফেলে”, তখন আমি ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি বেতন পাই। আমি যদি আরো বেশি কাজ করি তাহলে বাড়তি অর্থ পাই। আপনাদের কি মনে হয় আমি খারাপ লোক? মাও যা বলেছেন তার সবকিছুই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে কেন?” ওরা বলল, “ঠিক আছে, কিন্তু এ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে”।

চোখের সামনে যখন বিপ্লবের দেখা মিলছে না, এ অবস্থায় ওরা মৃত্যু ভয়কে কীভাবে জয় করে? নিজেদের ভূমি রক্ষা করা এবং ‘ইতিহাসে নাম লেখানোর’  আকাংক্ষাই তাদের মৃত্যুভয়কে জয় করতে সাহায্য করে।

নরেশ বলল, “গ্রামের কেউ যখন মারা যায়, তাকে শুধু স্থানীয় গ্রামবাসীরাই মনে রাখে। আমি যদি মারা যাই, পার্টি আমাকে নিয়ে পুস্তিকা লিখবে”।

ab2

মজার ব্যাপার হল সবার মৃত্যু সমান নয়। কয়েক বছর আগে বন্দুকযুদ্ধে কমরেড মঙ্গল নিহত হয়। মাওবাদীরা তার স্মরণে বালি বেরা গ্রামের বাইরে একটা স্মৃতিফলক নির্মাণ করে কিন্তু গ্রামবাসীরা ফলক থেকে তার নাম মুছে ফেলেছে।

মঙ্গলের বোন সিমরি কাছেই থাকেন; বললেন, “মঙ্গল যে এখানে থাকত পুলিশ সেটা জেনে যেতে পারে এই ভয়ে ওরা নামটা মুছে ফেলেছে”।

কোন এক দুর্বল মুহূর্তে ওরা প্রকাশ করল যে ওদের ভাগ্য মঙ্গলের থেকে কিছু আলাদা হবে না। পার্টির পুস্তিকাই যথেষ্ট না আর গ্রামবাসীরা ধীরে ধীরে শহরে চলে যাবে কিন্তু ওদের ফেরার কোন উপায় নেই। ওরা স্বীকার করে যে ওদের জীবদ্দশায় বিপ্লব সম্ভব না কিন্তু এই সংগ্রাম ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখতে পায় না ওরা। একজন বলল, ” এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। আমি মারা যাব কিন্তু বিপ্লব ঘটবে”।

বাইরের পৃথিবী ওদের মতাদর্শ থেকে একেবারেই ভিন্ন ধারার মনে হয়। পার্টির সাথে এক দশক ধরে যে সব ক্যাডাররা আছে তারা ‘দীর্ঘকালীন লড়াইয়ের তাৎপর্য ও নয়া সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বায়নের বিপদ’ সম্পর্কে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ চালাতে পারে; তারা এক রাতে বসে চিন্তা করছিল নয়া সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কোথায়। ভাত আর পেঁপে দিয়ে রাতের খাবার সেরে আগুনের ধারে বসে এক মহিলা জানতে চাইলেন, “আমেরিকা কোথায়”?

যখন বলা হল ওরা এই গ্রহের যেখানে বসে আছে আমেরিকা ঠিক তার বিপরীতে, তখন মহিলাটি এবং তার সাথে অন্যান্যরাও ভীষণ অবাক হল।

গোন্ডি আদিবাসীদের একটা বড় অংশ পার্টিতে যোগদানের পর কখনো অরণ্য এলাকার বাইরে পা রাখেনি; ওরা কখনো বিদ্যুৎ দেখেনি, ফোনের সিগনাল কিংবা গাড়ি দেখেনি।

একজন ক্যাডার জানতে চাইল, “শহরে শুনেছি ফ্যান বলে একটা জিনিস আছে। এটা কিভাবে চলে”?

আরেকজন বিশ্বাসই করতে চায় না যে শহরে লোকেরা গ্যাসের চুলায় রান্না করে, লাকড়ির দরকার হয় না।

অন্য আরেকজন জানতে চায়, “Raipur kitna bada hai? Kitne ghar hain wahan? Gaadiyan? (রায়পুর কত বড়? কতগুলো ঘরবাড়ি ওখানে? কতগুলো গাড়ি?)”

ওরা জানে যে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই ওদের মৃত্যু হবে। অল্প বয়স্ক একজন বলল, “এখান থেকে বের হবার সাথে সাথেই আমাকে মেরে ফেলবে। বিপ্লবের পরেই শুধু আমরা বের হতে পারব”।

এক সন্ধ্যায়, একটা ছেলে ক্যাম্পে যোগ দিল, বয়স ১৫ বছরের বেশি হবে না।

সে নারায়ণপুর হোস্টেলে থেকে ক্লাস এইটে পড়ত; দিওয়ালি কাটাতে নিজ গ্রাম অবুঝমাদে এসেছে।

ওর বাবা ফসল কাটার জন্য ওকে থাকতে বলেছে, এরপর বড়দিনের ছুটি, তারপর আরো কয়েক মাস থেকে যেতে বলেছে। মাওবাদীরা ওর গ্রামে গিয়ে ওকে দলে ভেড়ানোর জন্য নিয়ে আসল।

এই এলাকার সবচেয়ে শিক্ষিত এই ছেলেটা; বাড়ি ফেরার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছে কিন্তু ফিরতে পারছে না। ওকে বিপ্লবী রাজনীতি, মতাদর্শ ও কিছু কিছু যুদ্ধের অনুশীলনও শেখানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে না যে সে আর কখনো তার পড়াশোনায় ফিরতে পারবে। আর যদি ফিরেও তাহলেও গেরিলা জীবনের দিনগুলো ওর অনুভূতিপ্রবণ মনকে সারা জীবন তাড়া করে ফিরবে।

ab

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বস্তারের আদিবাসীর যা তার মৌলিক ডিএনএ কেই বদলে দিয়েছে। অরণ্যবাসী মুক্ত স্বাধীন আদিবাসী আজ সবকিছু নিয়েই সন্দিহান। পুলিশ, সাংবাদিক ও মাওবাদী- সবার জন্যই তথ্য সংগ্রহের প্রথম উৎস সে। এদের সবার মাঝখানে পড়ে তার জীবন একটা ছুরির ডগায় ঝুলছে। আর তাই সে শিখে নিয়েছে কী করে উভয় ক্যাম্পেই ছলচাতুরি করে চলতে হয়। পুলিশ ও মাওবাদী উভয়েই এটা জানে কিন্তু এটা মানতে তাদের দ্বিধা রয়েছে যে তাদের অধিকাংশ এ্যামবুশই এই আদিবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার উপর নির্ভরশীল; হতে পারে এই আদিবাসী একজন পঞ্চায়েত প্রধান কিংবা কোন স্কুল শিক্ষক।

মাওবাদীরা আদিবাসীদেরকে বনরক্ষী ও পাটওয়ারীদের (ভূমি রাজস্ব আদায়কারী) জুলুম থেকে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে জানিয়েছে, ইতিহাস ও মতাদর্শের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। অরণ্যের ভিন্ন এক মহাবিশ্বে বিচরণকারী ব্যক্তিটির জীবনে ক্লাসিক্যাল মার্কসবাদী চেতনার প্রবেশ ঘটায় নিজের ভেতরে হঠাৎ ‘বিপ্লবের ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ অনুভব করল সে। নিজের পরিবার, ঈশ্বর ও ঘোটুল (গণ বাসস্থান) ত্যাগ করে ‘ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেতে’ সে যুক্ত হয়ে গেল এই সংগ্রামে।

শিল্প কারখানা ও সালওয়া জুডুম এর ফলে আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ বিষয়ে দিস্তা দিস্তা লেখা হয়েছে কিন্তু মাওবাদীদের সাথে যোগদানের পর বস্তারের কী পরিমাণ আদিবাসীদের নির্মূল করা হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। মোটে দুইটা পাহাড় পরেই একজন ক্যাডারের পরিবার বাস করে কিন্তু সে দুই বছরে একবার মাত্র তাদের কাছে যেতে পারে খুব গোপনে।

আমি মাওবাদীদের জিজ্ঞাসা করলাম ছেলেটা চাইছে না তারপরেও কেন ওকে ওরা সাথে নিতে চাইছে। ওরা বলল, ও আমাদের সাথে থাকতে চায়। ছেলেটা বলল ভিন্ন কথা। সে যে এখানে আছে একথা যদি প্রকাশ হয় তাহলে তার স্কুলে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে; এটা ভেবে সে উদ্বিগ্ন। পুলিশ ওকে হয়রানি করবে। ওকে হয়তো গুপ্তচর হতে বাধ্য করা হবে আর সে বিশ্বাসঘাতকতার পথে পা বাড়াতে বাধ্য হবে। বস্তারের পুলিশ ব্যারাক আর গ্রামগুলোতে এই ধরনের গুপ্তচরের অভাব নেই। বিশ্বাসঘাতকতা এখন আদিবাসীদের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। প্রতিটি স্থানে, একজন আদিবাসীর মৃত্যু হয় আর একজন গুপ্তচরের জন্ম হয়। রূপান্তর ঘটতে এখনো অনেক বাকি।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশ– ৩ মে, ২০১৫

সূত্রঃ

http://indianexpress.com/article/india/india-others/days-and-nights-in-the-forest-23-days-with-the-maoists-in-chhattisgharh/



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.