সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (১ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছেলাল সংবাদ‘।

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার  বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে

c

comrades-kA7G-621x414@LiveMint

(প্রথম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

 

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন- 

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে MIB এর পক্ষ থেকে আপনাকে ও আমাদের সকল কমরেডদের জানাচ্ছি বিপ্লবী শুভেচ্ছা।

গণপতিঃ ধন্যবাদ। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে MIB এর সকল কমরেডদের প্রতি বিপ্লবী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

মাওবাদী তথ্য বুলেটিন: গত দশ বছরে পার্টির কী কী উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (Communist Party of India) গঠিত হবার পর থেকে আমাদের দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময় পার করেছে। এর মধ্যে গত দশকটি অনন্য সাধারণ, কারণ এ দশকে নকশালবাড়ির পর থেকে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালিত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু অভিনব ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী গত দশক। এই দশকের তাৎপর্য্যপূর্ণ ঘটনাগুলো হল-

-ভারতে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য একটি একক গাইডিং সেন্টারের সূচনা করা। পার্টি, আর্মি ও যুক্তফ্রন্ট(United Front) বিপ্লবের এই তিনটি ম্যাজিক অস্ত্র আগের থেকে আরো বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠছে; রাজনৈতিক ও সামরিক লাইন, যুক্তফ্রন্টের নীতিমালা ও অন্যান্য নীতিমালাকে ঐক্যবদ্ধ পার্টির দলিলপত্র হিসেবে সমৃদ্ধকরণ।

-কংগ্রেসের দলিলপত্র, নীতিমালার কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সার-সংক্ষেপ, আর্টিকেল ইত্যাদির সমন্বয় সাধন করা; মিলিটারি লাইনের আরো উন্নয়ন সাধন, গেরিলা যুদ্ধকৌশলের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে জনগণের বিশাল অংশগ্রহণ ঘটেছে যা এই লড়াইতে সত্যিকারের গণযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে যার ফলে শত্রুর নৃশংসতম বিপ্লব বিরোধী দমন অভিযান পরাভূত হয়েছে। জল, জঙ্গল, ভূমি, সম্মান ও অধিকার বিষয়গুলোতে জনগণের বড় অংশ বিশেষ করে কৃষকদের অংশগ্রহণে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিপ্লবী গণ কমিটি (Revolutionary People’’s Committees- RPCs) আকারে কৌশলগত যুক্ত ফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধি ও সুপরিকল্পিত যুক্তফ্রন্ট গঠনে নতুন ও অধিকতর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। শাসক শ্রেণীর গণ বিরোধী, দেশ বিক্রিকারী উন্নয়ন মডেলের বিপরীতে বিপ্লবী গণ কমিটি (RPCs) কর্তৃক উন্নয়নের বিকল্প মডেল স্বীকৃতি পেয়েছে যেটি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।

বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগিতায় গোটা দেশব্যাপী ফ্যাসিবাদী ভারতীয় সরকার পরিচালিত নজিরবিহীন বর্বর দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিপ্লব টিকে আছে এবং ভারত তথা গোটা বিশ্বের মানুষের মাঝে বিপ্লবের আশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে ও গণযুদ্ধের স্বপক্ষে লড়াইরত বিপ্লবী গণমানুষের জন্য ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অর্জিত হয়েছে।

সিপিআই (মাওবাদী) ও সিপিআই (এম-এল) নকশালবাড়ির একটি একক পার্টিতে একীভূত হবার ঘটনা আমাদের দেশে প্রকৃত বিপ্লবীদের মাঝে ঐক্যবদ্ধকরণের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। ভারতের গণযুদ্ধ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে যাকে ঘিরে মাওবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সমর্থন আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। মহান নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের ফলে সূচিত এবং আমাদের পার্টির মহান প্রতিষ্ঠাতা নেতা কমরেড চারু মজুমদার ও কানহাই চট্টোপাধ্যায় প্রণীত নতুন মতাদর্শ, নতুন রাজনীতি, নতুন লাইন, নতুন পার্টি, নতুন আর্মি ও নতুন গণ ফ্রন্টের উপর ভিত্তি করে গত দশকের এই নতুন ও তাৎপর্য্যপূর্ণ উন্নয়নগুলো সাধিত হয়েছে।

এক দিকে শত্রুর নিরন্তর বর্বরোচিত দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে পাল্টা লড়াই চালিয়ে ও অন্যদিকে আন্দোলনের বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে পার্টির ভেতরে গজিয়ে উঠা ডান ও ‘বাম’ সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত সংগ্রাম চালিয়ে গত দশকের সকল উন্নয়নগুলো অর্জিত হয়েছে। ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য কমিউনিস্ট ও সাধারণ মানুষ উভয়ের গৌরবময় আত্মদান। তাদের আত্মদান ছাড়া গত দশকের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কোনটাই অর্জিত হত না। এই আত্মদানগুলোর মধ্য দিয়ে পার্টি একটি বিকল্প ধারার চিন্তা ও সংস্কৃতিকে সামনে তুলে এনেছে যেটি সর্বোচ্চ মানবীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এ ধারা, শাসক শ্রেণী কর্তৃক জনসাধারণের মাঝে ধীরে ধীরে নষ্ট, অধঃপতিত ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ও সংস্কৃতির ধারা প্রবেশ করানোর যে প্রক্রিয়া, তার বিরোধী। এভাবে, এই আত্মদানগুলো সমাজের নির্যাতিত শ্রেণীকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য লড়াই করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

(চলবে)