সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৩য় পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবারবুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(তৃতীয় পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি ও PLGA এর একত্রীকরণের পর PLGA এর উন্নয়ন ও গেরিলা যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গতি হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গণপতিঃ আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক। এই কারণে গত দশকে কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এবং এখানে গতি হ্রাস পাওয়ার যে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেটিও সঠিক যেহেতু ২০১১ সাল থেকে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটি পরিস্থিতির একটি সার সংক্ষেপ করে এবং যাচাই করে দেখা যায় যে আমাদের আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে। গত দশ বছরে অগ্রগতির পথটা বন্ধুর ছিল এবং আমাদের বিভিন্ন গেরিলা জোন পরবর্তীতে দুবল হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে ঠিক তেমনি কেবল বিভিন্ন গেরিলা জোনগুলোই নয় বরং সারা দেশের বিপ্লবী আন্দোলন অমসৃণ পথ অতিক্রম করছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি আইন। নিঃসন্দেহে, আমাদের মানসিক শক্তি গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটায়, এবিষয়ে কোন মতবিরোধ থাকার কথা নয়।

অবশ্য, ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন গেরিলা জোনে গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতি ঘটেছে। একইভাবে, গেরিলা যুদ্ধের উত্থান পতনের ক্ষেত্রেও এই অবস্থাগুলো একটি ভিত্তি গঠন করে। এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে আমাদের চলবে না। ২০১১ সাল থেকে বেশ কিছু রাজ্যের/গেরিলা জোনের মিলিটারি ফ্রন্টে গণ সংগ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে ও আন্দোলন প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। এই সময়কালে বিপ্লবী গণ কমিটিগুলোকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পার্টিকে সংহত করার মাধ্যমে কিছু গেরিলা জোনে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটেছিল। তারপরেও আমরা মন্দার মুখোমুখি হয়েছি। পার্টি এই মন্দার কারণগুলো চিহ্নিত করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমগ্র পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে এবং এটিকে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিৎ।

অপারেশন গ্রিন হান্টের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে এবং মোদি নেতৃত্বাধীন NDA সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন গ্রিন হান্টের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ সব কিছুই প্রচণ্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে এবং পাল্টা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে করতে হয়েছিল। জল, জঙ্গল, ভূমি, ইজ্জত ও অধিকারের জন্য সংগ্রামরত মানুষের সমর্থনে ও অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে সমাজের যে সকল গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তীব্রভাবে সোচ্চার হয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকে পার্টি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানায়। জনগণের লড়াকু শক্তিকে টেকসই করতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৯ সালের মধ্যভাগ থেকে এই বিপ্লব বিরোধী যুদ্ধের পাল্টা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিপ্লবী বাহিনী ও বিপ্লব বিরোধী বাহিনীর শক্তির ফারাকটা ছিল বিশাল। শত্রুর প্লাটুন পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কোম্পানি পর্যায়ে গেরিলা বাহিনীকে মোতায়েন করা হত। ব্যাটেলিয়ন পর্যায়ে গেরিলা বাহিনী শত্রুর কোম্পানি পর্যায়ের বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করতে শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে, শত্রুরা প্রতিটি গেরিলা জোনে হাজার হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বাহিনী মোতায়েন করল। সুতরাং, বিপক্ষ বাহিনীর সাথে শক্তির ফারাকের দরুণ আমাদের গেরিলা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হল। আমাদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যই যে কেবল শত্রুরা এত বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করল তা নয়, বরং একই সাথে এই দশকে ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় এবং প্রায় সব গেরিলা জোনেই যে গুরুত্বপূর্ণ গণ আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলোকে দমন করার জন্যেও এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এভাবে, এই অধঃপতিত ব্যবস্থার একটি বিকল্প হিসেবে মাওবাদী আন্দোলন প্রকাশিত হল। আমাদের গতিতে যে মন্দা দেখা দিয়েছে তাকে কেবল শত্রুর দমন নিধনের ফলাফল হিসেবে দেখলে হবে না পাশাপাশি একে আমাদের নিজেদের দুর্বলতার বিপর্যয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমরা আমাদের ভুলগুলো ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং পার্টি, PLGA ও গণ সংগঠনগুলোর বলশেভিকীকরণের কাজ হাতে নিয়েছি।

একই সাথে, এই পরিস্থিতির পিছনে যে বাহ্যিক শর্তগুলো কাজ করেছে সেগুলোও আমাদেরকে দেখতে হবে। আগের ধাপে শত্রুর আক্রমণের পাল্টা মোকাবেলা হিসেবে আমরা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছিলাম যেগুলো কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় শত্রুরা এই কৌশলগুলোর পাল্টা কিছু কৌশল গ্রহণ করে। ফলে নতুন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সুতরাং, আমাদেরকে আবারো কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেগুলো গেরিলা যুদ্ধে শত্রুর সর্বোচ্চ বাহিনীকে মোকাবেলা করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধ গড়ে তোলা ও অগ্রগতি ঘটানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল আমাদের গণভিত্তিকে মজবুত করা। আন্দোলনের উত্থান ও পতনের যে প্রক্রিয়া সেটি নতুন নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি বোঝার ক্ষেত্রে এবং পার্টি, PLGA ও জনগণকে এর জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পার্টির দিক থেকে কিছু গুরুতর ভুল হয়েছে। নতুন চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে পার্টির ত্রুটির কারণে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে একটি শক্তিশালী শত্রুর সাথে লড়াইয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও অবস্থার অবনতি ঘটেই থাকে।

এই কারণে মাও বলেছিলেন জয়-পরাজয়-জয়-পরাজয় ও সবশেষে জয় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ এগিয়ে যাবে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ সবসময় একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও আংশিক সাফল্য ও কিছু বড় ধরনের সাফল্য ও অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও আংশিক ক্ষতি, পরাজয় ও কিছু বড় ধরনের ক্ষতি ও পশ্চাদপসরণ থাকে। এটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের একটি নিয়ম যে এটি আঁকাবাঁকা ভাবে চলে। কাজেই গেরিলা যুদ্ধের গতি হ্রাস হবার ঘটনাকে আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ করার অর্থ এটাই দাঁড়ায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলন যে বন্ধুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেটিকে মাথায় রেখে আমাদের কাজের স্থানগুলোর বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন অনুযায়ী আমাদেরকে হয় আত্মরক্ষার কৌশল অথবা আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী যুদ্ধের সামগ্রিক পরিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে একে বিবেচনা করতে হবে।

শুধু বিভিন্ন অংশেই নয়, একটি গেরিলা জোনের ভিতরেও সেই নির্দিষ্ট গেরিলা জোনটির বিশেষত্ব অনুযায়ী আমাদেরকে আক্রমণাত্মক কিংবা আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কিছু এলাকায় যদি অবস্থা একটু ভালও হয়, তাহলেও সামগ্রিকভাবে যে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা আমাদের করতে হচ্ছে তাকে কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। এবং আমরা সকলে জানি যে আত্মরক্ষার মধ্যে সবসময় আক্রমণ নিহিত থাকে এবং আক্রমণাত্মক না হয়ে কোন আত্মরক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যে কৌশলই গ্রহণ করি না কেন, সকল পর্যায়ের নেতৃত্বকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের পার্টিতে যে দুইটি বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে তা হল-

১। শত্রুর আপাত শক্তিমত্তা ও তীব্রতার প্রতি দৃষ্টি আরোপ করা এবং তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত না করা; নিজেদের শক্তিমত্তা, সুবিধা ও বিপ্লবী যুদ্ধে জনগণের প্রভাবশালী ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আরোপ না করা; শত্রুর বৃহৎ কৌশলকে না বুঝে কেবল শত্রুর ক্ষুদ্র কৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। এর ফলে কমরেডগণ আত্মরক্ষার নামে কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলে অক্রিয় হয়ে পড়বে এবং শেষে লড়াকু শক্তি হারিয়ে ফেলবে। এটি হল ডান বিচ্যুতি।

২। গেরিলা যুদ্ধে লড়াইয়ের দিকগুলোতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাকে না বোঝা এবং আত্মরক্ষা তথা নেতৃত্বকে রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা, জনগণের অক্রিয়তাকে বিবেচনায় না রেখে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করা। তারা শত্রুকে ক্ষুদ্র কৌশলগত দিক থেকে দেখে না, তারা শত্রুকে কেবল বৃহৎ কৌশল দ্বারা যাচাই করে। এটি একটি বাম বিচ্যুতি।

কাজেই, আমাদের গেরিলা যুদ্ধের গতি বৃদ্ধি করতে হলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে সেগুলো জানার পাশাপাশি বিপ্লবী যুদ্ধে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো জানতে হবে এবং শত্রুর ও নিজেদের শক্তিমত্তার ও দুর্বলতার জায়গাগুলো জানতে হবে। এটি একটি অন্যতম প্রধান বিষয় যেটি আমরা বলশেভিকীকরণের মধ্য দিয়ে অর্জন করার চেষ্টা করছি। জয়লাভ করতে হলে গণভিত্তি বৃদ্ধি করা, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা চালানো, গেরিলা যুদ্ধ ও গণযুদ্ধের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় ভূমিকা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরী। কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিটি ও সকল পরিচালনা কমিটি বর্তমানে এই বিষয়টিকে বুঝে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে।

(চলবে)  

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.