সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৪র্থ পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

সাক্ষাৎকারটি প্রতি শনিবার ও বুধবার ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে –

c

 

comrades-ka7g-621x414livemint

(চতুর্থ পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টির অধিকাংশ কার্যক্রম আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধ; এটি নিয়ে পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষীরাও চিন্তিত। কেউ কেউ বলছেন যে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল এই ধরনের এলাকার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, গোটা ভারতের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ বিষয়ে আপনার উত্তর কী? সারা দেশে আপনারা কীভাবে গণযুদ্ধকে ছড়িয়ে দেবেন?

গণপতিঃ ভারত একটি বৃহৎ আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী রাষ্ট্র যার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন বন্ধুর পথে এগুচ্ছে। এই বন্ধুর অবস্থার ফলে দেশ জুড়ে যুগপৎ সশস্ত্র বিপ্লবের লাইন বাতিল হয়ে যায়। আমাদেরকে অবশ্যই গ্রামাঞ্চলের পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোতে নিজেদের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ যেখানে সামাজিক অসংগতিগুলো অনেক বেশী তীব্র, তুলনামূলকভাবে সেই সব অধিকতর পশ্চাৎপদ এলাকায় বিপ্লবী যুদ্ধকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সুতরাং, বিপ্লবী আন্দোলন কেবল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথ ধরেই অগ্রসর হতে পারে। উপরন্তু শাসক শ্রেণীর কাছে রয়েছে একটি শক্তিশালী দমনমূলক যন্ত্র আর তা হল একটি ক্ষমতাশালী কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র ও এর সাথে একটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত আধুনিক আর্মি।

কাজেই শত্রুর শাসনের দুর্বলতম সংযোগ রয়েছে যে সকল স্থানে সেখানে আমাদেরকে বিপ্লবী যুদ্ধ চালনা করতে হবে; উদাহরণস্বরূপ গ্রামাঞ্চলে। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং চীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ইত্যাদি দেশের ইতিহাস আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনের যথার্থতাকে প্রমাণ করে সন্দেহাতীতভাবে। এদেশে মুক্ত এলাকা ও লাল বাহিনী গঠন করা সম্ভব নয় এবং দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এসব বিষয় নিয়ে যে তর্কবিতর্ক চালু আছে তা নতুন নয়। শাসক শ্রেণী ও বুদ্ধিজীবীরা, সংশোধনবাদী সংসদীয় ‘বাম’রা এবং ছদ্ম ML পার্টি; এরা সকলেই দীর্ঘদিন ধরে এ জাতীয় তর্ক বিতর্ক চালিয়ে আসছে। বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি যারা গণযুদ্ধে জড়িত, তাদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশ্যে তারা এ ধরনের কথা বলে। উপরন্তু, যে সকল বাম দল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের পথকে প্রত্যাখান করেছে তারা তাদের দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে সমাজকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে কিছুই করতে সমর্থ হয়নি।

মূলতঃ, তারা সবসময় এ ধরনের রূপান্তরের বিপক্ষে থেকে সংসদীয় ডোবায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের বিপক্ষে এই ভ্রান্ত বক্তব্যের একটি ভিন্ন ধরনের দাবী হল দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ কেবল আদিবাসী এলাকাতেই প্রযোজ্য, দেশের বাকি এলাকাগুলোতে প্রযোজ্য নয়। এই বক্তব্যটিও অন্তঃসার শূন্য। শত্রুদের এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভারতীয় বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথক করে দেখতে হবে। বিপ্লবের শুভাকাঙ্ক্ষীরা আন্দোলনের অধিকাংশ কার্যক্রমের আদিবাসী এলাকায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত। এটা সত্যি যে মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিশাল অরণ্য এলাকায় যে এলাকাগুলো আদিবাসী জনগণের বাসভূমি, সেখানে আজ আমাদের আন্দোলন তুলনামূলকভাবে বেশী শক্তিশালী। দণ্ডকারণ্য ও বিহার-ঝাড়খণ্ড জোনকে কেন্দ্রে রেখে গত এক দশকে আন্দোলন অগ্রসর হয়েছে। সমতলের বিভিন্ন এলাকায় কীভাবে আন্দোলনের উন্নয়ন ঘটানো যায় সে বিষয়ে পরিস্কার দৃষ্টিকোণ রয়েছে এবং ‘Strategy and Tactics of Indian Revolution’ নামে আমাদের যে দলিলটি রয়েছে তাতে কৌশলগত নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।

শহরে কাজের জন্য আমাদের একটি নীতিমালাও রয়েছে। তারপরেও গ্রামীণ সমতলে ও শহরাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যাডারদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি। এই দুটি এলাকার (গ্রাম ও শহর) বৃহৎ কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে এবং সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনগুলোকে বিশ্লেষণ করার জন্য সামাজিক তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফলশ্রুতিতে, আমরা অনেক নেতৃত্বকে হারিয়েছি যারা শত্রুর সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল এবং এই এলাকাগুলোতে আন্দোলনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। দেশের বিশাল সমতল কৃষি এলাকায় আমাদের ক্ষীণ উপস্থিতির পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল আমরা কৃষকদেরকে বিশেষত কৃষি শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষকদেরকে গেরিলা যুদ্ধে বিশদভাবে সংগঠিত করতে পারিনি। একইসাথে, অরণ্য ঘেরা আদিবাসী এলাকার নব্য উদ্ভাবিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সহ কৃষক শ্রেণীর বাইরে অন্যান্য শ্রেণীকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমাদের ত্রুটি ছিল; আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ার এটিও একটি কারণ।

আমাদেরকে অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না যে এধরনের এলাকায় কাজ করার ফলে বিপ্লবী আন্দোলন প্রভূত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দুই পার্টির একত্রীকরণের পর গত দশক থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা আমাদেরকে যথাযথ শিক্ষার একটি চিত্র তৈরি করতে ও আমরা যেখানে বাধার সম্মুখে আছি সেখানে আন্দোলনকে পুনরায় গঠন করতে, যেখানে আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছি সেখানে শক্তির যোগান দিতে ও আমরা যে এলাকায় নেই সেখানে আন্দোলনকে সম্প্রসারণ করতেও সাহায্য করবে। কলিঙ্গনগর, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, নারায়ণপাটনায় গণমানুষের বিদ্রোহ ও তেলেঙ্গানায় পৃথক রাজ্য আন্দোলন ইত্যাদি থেকে আমাদেরকে অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে; এইসব আন্দোলন গ্রাম ও শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও দেশীয় দালালদের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শোষণ ও নিপীড়নের দাসত্বের নীচে থাকা জনগণের একটা বড় অংশ বিশাল গ্রামাঞ্চল ও আদিবাসী এলাকার বাইরে অবস্থিত শহরাঞ্চলে বসবাস করে।

লড়াই ছাড়া সমস্যা সমাধানের আর কোন বিকল্প তাদের নেই। চলমান গণযুদ্ধ তাদের উপর প্রভাব রাখছে। সুতরাং, এই এলাকাগুলোর অবস্থা বিপ্লবী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল। বাস্তব অবস্থা ও বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের জনগণের চাহিদার কথা মনে রেখে আমাদেরকে সৃষ্টিশীলভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক-মিলিটারি লাইনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থেকে, সুবিশাল অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টিশীলতার সাথে কাজ করে, অতীতের ভুলগুলোকে সংশোধন করে, পরিবর্তিত অবস্থা ও শত্রুর কৌশলের সাথে সংগতিপূর্ণ সঠিক কৌশল কাজে লাগিয়ে এই এলাকাগুলোতে জনগণকে সংগঠিত করে শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা চমৎকার সব অবজেকটিভ কন্ডিশনগুলোর সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হব এবং গেরিলা যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। এভাবে, গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে।

(চলবে)

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.