সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার (৮ম পর্ব)

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) দেয়া সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতির সাক্ষাৎকারটি ধারাবাহিক ভাবে বাংলায় প্রকাশ করছে লাল সংবাদ

c

comrades-ka7g-621x414livemint

(অষ্টম পর্ব)

গত দশকের নতুন, অনন্য ও অভূতপূর্ব অর্জনের উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিপ্লব নিশ্চিতভাবেই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নতুনতর, বৃহত্তর ও গৌরবতর বিজয় লাভের পথে এগিয়ে যাবে “

ঐক্যবদ্ধ পার্টির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সিপিআই(মাওবাদী)’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড গণপতি মাওবাদী তথ্য বুলেটিনকে (MIB) সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন-

মাওবাদী তথ্য বুলেটিনঃ পার্টি যাচাই করে দেখেছে যে বিশ্ব পরিস্থিতির অবজেকটিভ বাস্তবতা বিপ্লবের অনুকূলে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে International Communist Movement (ICM) আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবস্থান কী? আভাকিয়ানিজম ও প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোট কর্তৃক নেপাল বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কী ধরনের প্রভাব ICM এর উপর পড়তে পারে বলে আপনি মনে করেন?

গণপতিঃ বিপ্লবের অগ্রগতির পক্ষে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি চমৎকার। আগেই উল্লেখ করেছি, মহা মন্দার (Great Depression) পর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভয়াবহতম সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। যার ফলে প্রচুর পরিমাণে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। একদিকে আছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ও অন্যদিকে শ্রমজীবী শ্রেণীর উপর শোষণ ও নিপীড়িত জনগণের দেশসমূহে নয়া ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। রাষ্ট্র দখলের যুদ্ধ স্তিমিত হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; ইরাক, আফগানিস্তান ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আটকে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্রাজ্যবাদ ও তার গৃহপালিত দোসরদের বিরোধী বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বাধীনতাকামী বাহিনী শক্তিশালী হচ্ছে। শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী,কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী, মুসলিম ও অন্যান্য নির্যাতিত সম্প্রদায়,নারী,শিক্ষার্থী,তরুণ ও আরো অনেক নিপীড়িত শ্রেণী ও গোষ্ঠী পথে নেমে আসছে।

চাকুরী থেকে ছাঁটাই,বেকারত্ব ও আংশিক বেকা্রত্ব,প্রকৃত মজুরী কর্তন,সামাজিক নিরাপত্তা খরচ প্রত্যাহার এবং সরকারের অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশে শ্রমিকদের বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধর্মঘট সংঘটিত হয়েছে যা দেশগুলোকে নাড়া দিয়েছে। ধনী ও গরীবের ব্যবধান যত বাড়ছে ও শ্রেণী দ্বন্দ্ব যত তীব্রতর হচ্ছে, পুঁজিবাদী দেশগুলোর জনগণ তত বেশি সংগ্রামে যোগদান করছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ, মুসলিম, অভিবাসী ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বিক্ষোভ করছে। পশ্চাদপদ দেশগুলোতেও শ্রমজীবী জনগণের সম্পদের অসমতা,দারিদ্র্য, অভাব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন গণ অভ্যুত্থানের জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যা ও রক্তের বন্যার মধ্য দিয়েও ইরাকি, আফগান,কুর্দি ও অন্যান্য জনগণের সশস্ত্র জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি ঘটছে।

স্কটিশ, ক্যাটালনিয় ও ইউরোপের অন্যান্য জাতীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত আছে। ব্রাজিলের মত গণ বিরোধী নয়া উদারবাদী নীতিমালা গ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের সরকারের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আমেরিকায় জনগণ বৃহদাকারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।তবে বর্তমান বিশ্বের অনুকূল অবজেকটিভ পরিস্থিতি থেকে ICM এর সাবজেকটিভ শক্তিগুলো গুরুতরভাবে পিছিয়ে আছে। অবজেকটিভ পরিস্থিতির সম্ভাবনা ও বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য একে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাওবাদী বাহিনীর সাবজেকটিভ ক্ষমতার মধ্যে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে আমরা জানি যে, প্রধানত প্রতিটি দেশের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী বিপ্লব সংঘটনের মাধ্যমে এই সাবজেকটিভ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায়।

সংশোধনবাদী ও সংস্কারবাদীরা জনগণের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ হওয়ায় মাওবাদী শক্তির সাথে তাদের পুনরায় একত্রিত হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। অনেক দেশে মাওবাদী পার্টি ও সংগঠন শক্তি অর্জন করছে এবং নতুন কিছু পার্টি গঠিত হবার প্রক্রিয়া চলছে। মাওবাদী পার্টি, সংগঠন ও বাহিনীর ভেতরে ঐক্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছু বিতর্কের মধ্য দিয়ে ফিলিপিন ও ভারতের দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ চলমান রয়েছে। অন্যান্য বেশ কিছু দেশেও মাওবাদী পার্টিরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের গণযুদ্ধের সমর্থনে আন্তর্জাতিক মাওবাদী শক্তিগুলোর সংহতি কার্যক্রম, বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন গ্রিন হান্ট ও ওপলান বায়ানিহানের (ফিলিপিনের বিপ্লবী বিরোধী অপারেশন)বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত, রাজবন্দীদের অধিকার নিশ্চিতকরণের সংগ্রাম ইত্যাদি চলমান রয়েছে। সুতরাং, ICM ও মাওবাদী শক্তিগুলোর গণ সংগ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারাটা সম্ভব এবং এই পথ ধরে ভবিষ্যতে একটি বিপ্লবী জোয়ারের সূচনা ঘটবে।

প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের সংশোধনবাদ ও নেপালি জনগণের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই ICM কে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকেরা গৌরবময় গণযুদ্ধকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে এবং নিপীড়িত নেপালি জনগণের উপর কঠোর দমন পীড়ন অব্যাহত রাখতে শত্রুকে সাহায্য করেছে। শুধু নেপালি জনগণের জন্যই নয়, পুরো ICM এর জন্য এটি একটি উলট পালট ঘটিয়েছে। অবশ্য, প্রচণ্ড-ভট্টরায় জোটের বিরুদ্ধে প্রকৃত মাওবাদী শক্তির তিক্ত লড়াই, সাম্রাজ্যবাদী ও তার দালালদের কাছে তাদের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ এবং সর্বোপরি, এই বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে নেপালি জনগণের নিজেদের সংগ্রাম এই জোটের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে উন্মোচন করেছে এবং মার্কসবাদ- লেনিনবাদ- মাওবাদকে সমৃদ্ধ করার নামে এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রকে উন্মোচন করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ, গৃহপালিত সামন্তবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বেনিয়া ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সব থেকে বিশ্বাসী পা চাটা কুকুরে পরিণত হয়েছে এই আধুনিক সংশোধনবাদীরা। তাদের শ্রেণী সহযোগীদেরকে নেপালি জনসাধারণ ও ICM সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখান করেছে এবং এইসব বিশ্বাসঘাতকদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জনগণ নিশ্চিতভাবেই বিপ্লবের পথে অগ্রসর হবে। একইভাবে, আভাকিয়ানিজমের তথাকথিত নয়া সিনথেসিসও কিছু মাওবাদী পার্টিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ ছদ্মবেশী সংশোধনবাদ ও লিকুইডেশনিজম (liquidationism) ছাড়া আভাকিয়ানিজম আর কিছুই নয়। ICM এর উপর ক্ষণস্থায়ীভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও এটি অবশ্যই পরাজিত হবে। আভাকিয়ানিজম ও সব ধরনের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের ভেতরে কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিশ্ব প্রলেতারিয়েতের অংশ হিসেবে  আমাদের পার্টি সংগ্রাম করে যাবে।

(চলবে)

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.