বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় — রাকেশ কামাল

ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল
ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল( রাকেশ কামাল )

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়

— রাকেশ কামাল

[ নোট: ডিসেম্বর ২০০৪-এ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) (লাল পতাকা)’র মুখপত্র ৩নং সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যায় পার্টি সম্পাদক কমরেড রাকেশ কামাল(ডাঃ মিজানুর রহমান টুটুল) এ নিবন্ধটি লেখেন। এটা দুঃখজনক যে তিনি গ্রেফতার হন এবং ২৭ জুলাই,’০৮-এ শত্রু তাঁকে হত্যা করে। এই নিবন্ধে রা.কা. বাংলাদেশের মাওবাদী আন্দোলনকে পর্যালোচনা ও সারসংকলনের বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মধ্যকার ঐক্যের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। এবং কিছু সমস্যাবলী নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। লেখাটি বড়। তাই তার লাইন ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কিত অংশ বিশেষ এখানে সংকলিত করছি। – লাল সংবাদ।]

…  …  ….      ……  ….   ….    ….     …..       …..      . . ……     …..    …..      … …           ….         …..

প্রগতিশীল পক্ষের অবস্থাঃ

আগেই উল্লেখ করেছি প্রগতিশীলদের মধ্যে আছেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা, ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা; আর শ্রমিক-কৃষকসহ সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণী ও পেশার ব্যাপক মেহনতি জনগণ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ঐক্যবদ্ধ নন, সংগঠিত নন, সশস্ত্রও নন। তারই জন্য প্রতিক্রিয়াশীলরা এভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যেতে পারছে।

মূলত কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ঐক্যবদ্ধ নন বলেই, সমগ্র বিপ্লবী শক্তি খন্ড-বিখন্ড ও টুকরো-টুকরো হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবী বলতে আমরা মূলত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী দলগুলোর নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত কর্মী বাহিনীকেই বুঝাচ্ছি। সেই সঙ্গে সংসদীয় নির্বাচনের সুবিধাবাদী পথে এবং প্রকাশ্য সংশোধনবাদী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনের পথে ধাবিত কমিউনিস্ট দাবিদার দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত এখনো কিছু বিপ্লবী আকাংখা লালনকারী কর্মীদেরও (যাঁদের ভবিষ্যতে প্রকৃত কমিউনিস্ট কাতারে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে) বুঝাচ্ছি।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী দলগুলো ক্রমেই টুকরো-টুকরো হয়ে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে চলেছে। এর প্রধান কারণ হল রাজনৈতিক-মতাদর্শিক-সাংগঠনিক ক্ষেত্রে প্রধান প্রধান কিছু প্রশ্নে গুরুতর মতপার্থক্য। আর সহায়ক কারণ হল নেতৃত্বের সামন্তসুলভ ও পাতি বুর্জোয়াসুলভ সংকীর্ণতা।

কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এখনো এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করে, কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্ম-সমালোচনামূলক সারসংকলন হাজির করেননি; তার আলোকে নয়া-গণতান্ত্রিক সমগ্র পর্যায় জুড়ে ক্রিয়াশীল পূর্ণাঙ্গ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী রণনীতি-রণকৌশলও হাজির করেননি; উক্ত রণনীতি-রণকৌশল ব্যবহার করে সশস্ত্র সংগ্রাম ও পরিপূরক

গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেননি এবং তার ভিত্তিতে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেননি। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা এখনো এইসব গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যকর্ম সম্পদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ ক্ষমতা দেখাতে পারেননি। এই করণেই তাঁরা দেশের অন্যান্য দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, একই পার্টিতে কর্মরত কমিউনিস্ট কর্মিরাও রাজনৈতিক-মতাদর্শিকভাবে ঐক্যবদ্ধ নন। আমাদের পার্টিতেও এই অবস্থা বিদ্যমান। এর কারণ, মাওবাদের বুলি কপচালেও আমরা এখনো মাওবাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে পার্টির ভ্রান্ত কর্মরীতি ও অধ্যয়নরীতি সংশোধন করার প্রক্রিয়াকে পার্টিতে ভালোভাবে প্রয়োগ করিনি।

এর সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে পার্টিগুলোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রামের এলাকাগুলোর গুরুতর বিপর্যয়। মূলত রণকৌশলগত বিচ্যুতি এবং অংশত সামরিক রণনৈতিক বিচ্যুতি এই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অবশ্য এর পিছনে একাধিক মতাদর্শিক বিচ্যুতিও কাজ করেছে। বিপর্যয় সত্ত্বেও পার্টিগুলোর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো টিকে রয়েছে। উক্ত বাহিনীর সদস্যগণ প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনী-ত্রয়ের (জেএমবি-পুলিশ-র‌্যাবের) আক্রমণাত্মক অভিযানকে প্রতিরক্ষাত্মক রণনীতির অধীনেই পাল্টা আঘাত করার প্রস্তুতিও চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মানবিকতা বিবর্জিত বর্বর হামলা দিয়ে প্রগতিশীল শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু ঘটনা তাদের আশানুরূপ ঘটেনি। প্রগতিশীল শক্তি বরং উজ্জীবিত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সচেতন অংশের পাশাপাশি মধ্যবর্তী অংশের মানুষও এই প্রতিক্রিয়াশীল বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মানসিকভাবে উজ্জীবিত হচ্ছেন। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের নেতৃত্ব ছাড়াই তাঁরা বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকমিউনিস্ট দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক শক্তির নেতৃত্বে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধও হচ্ছেন।

প্রতিক্রিয়াশীলদের অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়াবহতা বরং কোনো কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতার মধ্যেই আত্মরক্ষার সুবিধাবাদী নীতির জন্ম দিয়েছে, যার ফলস্বরূপ খুবই প্রকটভাবে তাঁদের মধ্যে পলায়নবাদ ও নিষ্ক্রীয়তার লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। এটা তাদের উপর নির্ভরশীল কর্মিদের একটা অংশকে বেশ খানিকটা হতাশ করেছে। কিন্তু টিকে থাকা বাহিনীর পাল্টা আঘাত (যত ছোট আকারেই হোক) জনগণের একটা বিরাট অংশের মধ্যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ নিজস্ব উদ্যোগে এগিয়ে এসে সাম্রাজ্যবাদী-সামন্তবাদী চক্রান্তের মুখোশ খুলে দেওয়ার বিপ্লবী নৈতিক কর্তব্য পালন করছেন অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে।

সুতরং আপাত দৃষ্টিতে পরিস্থিতিকে মারাত্মক বলে মনে হলেও সুদুরপ্রসারী দৃষ্টিতে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। আগুনঝরা বিপ্লবী কর্মতৎপরতার জন্ম দেওয়ার জন্য পরিস্থিতি চমৎকার বিপ্লবী উপাদানে ক্রমে ভরপুর হয়ে উঠছে।

বর্তমানে দেশীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য ভেঙ্গেচুরে টুকরো-টুকরো হয়ে গেলেও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী ধারার বিভিন্ন পার্টির অভ্যন্তরে ধীরে হলেও অন্য একটা ধারার অলক্ষ্য প্রস্তুতি চলছে। এই পার্টিগুলোর অভ্যন্তরে বারবার সশস্ত্র সংগ্রামের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানের একটা প্রক্রিয়া বেশ কিছুদিন যাবৎ শুরু হয়েছে। নিজেদের সীমাবদ্ধ গন্ডিতেই সেই আত্মানুসন্ধান শুরু হলেও অচিরেই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রশস্ত অঙ্গনের সঙ্গে সেই ধারার সাম্প্রতিক যোগাযোগ সেই আত্ম-অনুসন্ধানকে আরো বেগবান করে তুলেছে।

পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভারতের মাওবাদীদের উদ্যোগের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মাওবাদীদের সংযোগে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘কমপোসা’ দক্ষিণ-এশিয়ার মাওবাদী বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সাধারণ প্লাটফর্ম হিসেবে সক্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশের ৪টি মাওবাদী সংগঠন তার সদস্য হয়েছে। এছাড়াও এই সূত্র ধরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। নেপালের ও ভারতের অভিজ্ঞতা, বিশেষত মাওবাদী বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী, ধৈর্য্যশীল, কষ্টকর প্রক্রিয়া আমাদের দেশের এই নতুন ধরাকে নিঃসন্দেহে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে সাম্প্রতিক অতিতের সশস্ত্র সংগ্রামের সফল সূচনা ও বিকাশগুলোও হিসেবের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। মানুষের মন থেকে সহজেই এসব সাফল্যের স্মৃতি মুছে যায় না। অতীতের গর্ভে জন্ম নেওয়া সাফল্যগুলো বর্তমানে স্তিমিত হয়ে গেলেও তার রেশ রয়ে গেছে। রয়ে গেছে উদাহরণগুলোও। সশস্ত্র সংগ্রামের সফল উদাহরণগুলো জনসাধারণকে আংশিকভাবে হলেও মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীলরা ফ্যাসিবাদী কায়দায় সশস্ত্র সংগ্রামকে আংশিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়ে জনগণের মুক্তির পথটাকে জনগণের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আড়াল করার শত চেষ্টা সত্ত্বেও, নিজেদের মুক্তির পথের চেহারা জনগণ ঠিকই মনে রেখেছেন। তাই তাঁরা এখন ঐ আড়াল করার প্রক্রিয়াশীল প্রচেষ্টাকেই প্রতিহত করতে চাইছেন।

কিন্তু সকলে মিলিতভাবে কাঁধ না-লাগালে যে এটা পুরোপুরি প্রতিহত করা যাবে না, সেই কথাটা আমরা এত দিন জনগণকে না-বললেও এখন আমাদের তা বলতে হবে এবং এরপর থেকে বলেই যেতে হবে। সমগ্র জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিপ্লব দমনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার কাজে হাত লাগাতে উদ্বুদ্ধ করার এখনই সময়। আজ সূচনা করলে, কাল সাফল্য আসবে। আর কাল সূচনা করলে, পরশু সাফল্য আসবে। তাই আজই শুরু করা দরকার। তবে কোনো কারণে দেরি হয়ে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই, সাফল্য আসবেই তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

করণীয় কর্তব্যসমুহঃ

         উপরি-উক্ত সামগ্রিক পরিস্থিতিই আমাদের করণীয় কর্তব্যগুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সেই করণীয়গুলোর মধ্যে কতিপয় হচ্ছে সাধারণ করণীয় আর কতিপয় হচ্ছে বিশেষ করণীয়।

সাধারণ করণীয়গুলো হলঃ

প্রথমত, শ্রেণী-লাইন, শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণীর উপর নির্ভরশীলতাকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে, চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ও বিকাশের উপর ভিত্তি করে বর্তমান অবস্থার উপযোগী বিভিন্ন গণসংগঠন ও গণআন্দোলন গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, নির্ধারিত রণকৌশল অনুযায়ী এতদিন ধরে অবহেলিত সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিপ্লবী শক্তিসমূহকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। চতুর্থত, পার্টি বহির্ভূত সমস্ত বিপ্লবী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

বিশেষ করণীয়গুলো হলঃ

এক, এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা ভিত্তিতে সমগ্র অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করা। দুই, উক্ত সারসংকলনের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার বিপ্লবের রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়ন করা। তিন, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সমগ্র পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা। চার, কেডার-স্কুল চালু করার ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত নেতা-কর্মী গড়ে তোলা। পাঁচ, সম্ভব হলে পেশাদার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদেরও কোনো সামাজিক পেশার আড়াল গ্রহণ করা। ছয়, পার্টিতে আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেবার ব্যবস্থা করা। সাত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আত্মস্থ করে দেশীয় বিপ্লবী কর্মকান্ডে কাজে লাগানো এবং আন্তর্জাতিক আভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করা।

সাধারণ করণীয় কর্তব্যগুলো সম্পর্কেঃ

প্রথম কর্তব্যঃ শ্রেণী-লাইন, শ্রেণী-দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণীর উপর নির্ভরশীলতাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, চলমান সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা।

আমরা যেসব এলাকায় পার্টিতে ও বাহিনীতে শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষকের প্রাধান্য সৃষ্টি করিনি, সেসব এলাকাতে বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খেয়েছি। কারণ পার্টিতে বিদ্যমান অসর্বহারা শ্রেণীর প্রাধান্যের ফলে আমরা শ্রমিক ও দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষক শ্রেণীর উপর নির্ভর না-করে, অন্যান্য সুবিধাভোগী বা আধা-সুবিধাভোগী শ্রেণীর উপর নির্ভর করেছি। ফলে দমননীতির সময় মূল শ্রেণী আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করতে এগিয়ে আসেনি, যার দরুন বিপর্যয় এসেছে। তাই শ্রেণী-লাইনকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে ও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেই এই মুহূর্তে আমাদের প্রাথমিক করণীয় (সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ও তাকে উন্নত পর্যায়ে বিকশিত করা) সম্পন্ন করতে হবে।

লড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমরা প্রথম থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি রাখিনি। দু-একজন কমরেড রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর আঘাত হানার কথা বললেও সেই অনুযায়ী উপযুক্ত রাজনৈতিক-সাংগঠনিক-সামরিক কোনো প্রস্তুতিই গ্রহণ করিনি। এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর আঘাত হানার আগে এই ধরনের প্রস্তুতি যে প্রয়োজন, সেটাই চিন্তা করিনি। ফলে আমাদের সৃষ্ট সশস্ত্র সংগ্রাম শুধু শ্রেণীশত্র“ খতমের আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে। তার ভিতর থেকে বের হতে পারেনি। তাই বর্তমানে আমাদের প্রধান মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে রাষ্ট্রিয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার যোগ্যতা অর্জন করা ও তা কার্যকরী করার দিকে।

অতীতে আমরা একপেশেমির প্রভাবে, সামরিক রণনৈতিক ও রণকৌশলগত পরিকল্পনাও করিনি। এই পরিকল্পনা থাকলে আমরা বিপর্যস্ত না হয়ে শত্র“র বর্তমান দমননীতিকে আরো বহুগুণ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারতাম। উপযুক্ত মুহূর্তে পিছিয়ে গিয়ে, কর্মী বাহিনীকে রক্ষা করে আরো কার্যকরভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারতাম। এর জন্য এখন থেকে আমাদের সামরিক রণনৈতিক ও রণকৌশলগত পরিকল্পনা করে কাজে হাত দিতে হবে এবং সচেতন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পিছিয়ে যাওয়ার জায়গা ও সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তুলতে হবে, গেরিলা বাহিনীর সামরিক শক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, গণ-মিলিশিয়া গড়ে তুলতে হবে ইত্যদি কাজগুলো যথাযথ গুরুত্ব সহকারে করতে হবে।

সেই সঙ্গে খতমযোগ্য শ্রেণীশত্র“ নির্ধারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। নিতান্তই যে শ্রেণীশত্র“ খতম না করলেই নয়, কেবলমাত্র তাকেই খতম করতে হবে। মনে রাখতে হবে অধিক খতম নয়, সফল খতমই আমাদেরকে এগিয়ে দেবে।

দ্বিতীয় কর্তব্যঃ সশস্ত্র সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ও বিকাশের উপর ভিত্তি করে বর্তমান অবস্থার উপযোগী বিভিন্ন গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা। বর্তমান সরকারি দমননীতি ও সশস্ত্র সংগ্রামের সাময়িক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের উচিত হবে সাধারণ গণতান্ত্রিক সংগঠন ও আড়াল সংগঠন গড়ে তোলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া।

তৃতীয় কর্তব্যঃ নির্ধারিত রণকৌশল অনুযায়ী এতদিন ধরে অবহেলিত সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিপ্লবী শক্তিসমূহকে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

রণকৌশল হলঃ আন্দোলনের জোয়ার-ভাটা, বিপ্লবের উত্থান-পতনের অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের পরিসরে সর্বহারা শ্রেণী যে লাইনে নিজেদের পরিচালিত করবে তা স্থির করা; এবং পুরনো ধরনের (রূপের) সংগ্রাম ও সংগঠনের বদলে নতুন ধরনের সংগ্রাম ও সংগঠন মারফত, পুরনো ধরনের শ্লোগানেরবদলে নতুন ধরনের শ্লোগানের মারফত এবং এই সমস্ত বিভিন্ন রূপের সমন্বয় সাধনের মারফত সেই লাইন অনুসরণ করা।

সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামের ও সংগঠনের ধরন, তার রদবদল ও সমন্বয়সাধন নিয়েই রণকৌশলের কাজ কারবার। বিপ্লবের কোনো নির্দৃষ্ট স্তরে, বিপ্লবের জোয়ার-ভাটা ও উত্থান-পতনের উপর নির্ভর করে রণকৌশল অনেকবার পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে রণনীতির চাহিদা অনুসারে এবং সকল দেশের শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংগ্রামের সবচেয়ে উপযুক্ত রূপ ও পদ্ধতিসমূহ স্থির করাই রণকৌশলের কর্তব্য।

সংগ্রামের রূপ বলতে যুদ্ধের রূপ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ উভয়কেই বুঝায়। প্রাথমিকভাবে এটা এই দুই প্রকার।

যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি ও যুদ্ধের রূপ সবসময় একরকম থাকে না, বিকাশের অবস্থা অনুসারে, প্রাথমিকভাবে উৎপাদনের বিকাশ অনুসারে সেগুলো বদলে যায়। চেঙ্গিস খানের সময়কার যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কার যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ছিল; বিংশ শতাব্দির যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি ঊনবিংশ শতাব্দির যুদ্ধবিগ্রহের পদ্ধতি থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য।

রাজনৈতিক পরিমন্ডলের সংগ্রামের রূপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যুদ্ধের রূপসমূহের চেয়ে রাজনৈতিক পরিমন্ডলের সংগ্রামসমূহ আরো অধিক বৈচিত্রপূর্ণ। অর্থনৈতিক জীবন, সামাজিক সম্পর্কসমূহ ইত্যাদি অনুসারে, সেগুলো পরিবর্তিত হয়।

আমরা এতোদিন ধরে যুদ্ধের রূপের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র শ্রেণীশত্র“ খতমের রূপকেই অনুশীলন করে এসেছি, প্রয়োজনে অন্যান্য রূপের অনুশীলনকে গুরুত্ব দেইনি। যুদ্ধের বর্তমান স্তরের মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন অনুযায়ী সংগ্রামের বিভিন্ন রূপের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপযোগী যুদ্ধের রূপকে কাজে লাগানোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। একই কথা রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে আমরা এতদিন ধরে সংগ্রাম ও সংগঠনের গোপন রূপকেই অনুশীলন করে এসেছি। কিন্তু ব্যাপক জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল করতে হলে রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যান্য রূপগুলো অর্থাৎ আধা-গোপন ও প্রকাশ্য রূপগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে এর মধ্য থেকে সুনির্দিষ্ট অবস্থার উপযোগী রূপকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

সংগ্রামের উক্ত রূপগুলোকে কাজে লাগাতে হলে সেগুলোর উপযোগী সংগঠন গড়ে তোলা এবং সেই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সংগ্রামের উক্ত রূপগুলোতে জনগণকে সামিল করে সংগ্রামের সূচনা করলে সেই সংগ্রামের ভিতর দিয়ে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা গড়ে উঠবে। তার ভিতর দিয়ে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগণ তাদের পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন এবং ক্রমে সশস্ত্র সংগ্রামের সাঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হবেন।

চতুর্থ কর্তব্যঃ পার্টি বর্হিভূত সমস্ত বিপ্লবী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

উপরি-উক্ত তিনটি কর্তব্য সম্পাদন করতে পারলে এই কর্তব্য সম্পাদনের মূল কাজটা সম্পন্ন হয়ে যাবে। সমস্ত বিপ্লবী শক্তির ঐক্য কমিউনিস্ট  বিপ্লবীদের মধ্যকার ঐক্য ছাড়া অর্জিত হওয়া সম্ভব হবে না। কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে, অন্যান্য বিপ্লবী শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটা সহজ হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করা প্রসঙ্গে আমরা অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

বিশেষ করণীয়গুলো সম্পর্কে কিছু কথাঃ

এক, এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং তার ভিত্তিতে অতীত সংগ্রামের সার-সংকলন করা।

আমরা ইতিমধ্যে এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ইতিহাসের উপাদান-উপকরণ সংগ্রহের কাজে হাত দিয়েছি, কিন্তু কাজটা এখনো শেষ হয়নি। কাজটা শেষ হলে তার ভিত্তিতে প্রথমে আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করব তারপর অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করব। তবে এইসব কাজকর্মের ভিতর দিয়ে আমাদের সামনে যে চিত্রটা ফুটে উঠেছে তাতে আমাদের মতে অতীত সংগ্রামের সরসংকলন হলঃ এ-দেশের কউিনিস্ট আন্দোলন মূলত দুটো ভুল ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটা ধারাঃ ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রামকে পরিত্যাগ করে, সংশোধনবাদী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে গিয়ে কমিউনিস্ট বৈশিষ্ট্যই হরিয়ে ফেলেছে এবং সংসদীয় সংশোধনবাদ চর্চার ভিতর দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের লেজুড় বা দোসরে পরিণত হয়েছে। আরেকটা ধারাঃ এমনকি বিপ্লবী গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনও পরিত্যাগ করে বাম-সংকীর্ণতাবাদী সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হয়ে, বারবার একই ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে গিয়ে পড়েছে এবং আবারো পরিপূরক গণ-সংগঠন-গণ-আন্দোলনবিহীন সশস্ত্র সংগ্রামই সংগঠিত করেছে। বাম-সংকীর্ণতা চর্চা করলেও এই ধারার মধ্যেই সঠিক ধারার কমিউনিস্ট বিপ্লবদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। কোনো একক পার্টির নেতৃত্বে পুরোপুরি সঠিক বিপ্লবী ধারা এখনো ভালোভাবে চর্চা হতে শুরু করেনি। সঠিক বিপ্লবী ধারার মূল কাজ হবে-শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে মূলত শ্রমিক-কৃষকের সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের সশস্ত্র সংগ্রাম ও তার পরিপুরক হিসেবে উপযুক্ত প্রচারমূলক ও শিক্ষামূলক কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে সমগ্র বিপ্লবী জনগণকে প্রকাশ্য ও গোপন বিভিন্ন ধরনের গণ-সংগঠনে সংগঠিত করে বিপ্লবী গণ-আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়া।

দুই, অতীত সংগ্রামের সারসংকলনের ভিত্তিতে রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়ন করা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের মূলনীতির আলোকে অতীত সংগ্রামের সারসংকলন করতে গেলেই আমরা দেখতে পচ্ছি একগুচ্ছ রণনীতিগত ও রণকৌশলগত ভুল আমরা করেছি। এর ভিত্তিতে রণনীতি-রণকৌশল প্রণয়নের কাজও আমরা হাত দিয়েছি। অচিরেই আমরা কাজটা শেষ করব। সেখানেই এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তিন, শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করা ও চালিয়ে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সমগ্র পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সংগ্রহশালায় মাওসেতুঙের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর মধ্যে শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের নীতি-পদ্ধতি হচ্ছে অন্যতম। তার আলোকে আমাদেরকে প্রথমে এ-দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রিয়াশীল প্রধান প্রধান ভুল ও অ-কমিউনিস্ট চিন্তাধারাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। তার পর কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে, প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদি প্রস্তুত করে, পার্টির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী (কমপক্ষে ২-৫ বছর মেয়াদী) শুদ্ধিকরণ আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। এর মাধ্যমেই পার্টির কর্মরীতি ও অধ্যয়ন রীতির সংস্কার সাধন করে, সমগ্র পার্টি কর্মীদের একই চিন্তা-পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করার ভিতর দিয়ে মতদাদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

এভাবে নিয়মিত রাজনৈতিক ধূলো-ময়লা ঝাড়– দেওয়ার অভ্যাস গড়ে না তোলার ফলে প্রতিদিনই আমাদের পার্টির ঘর-দোরে ভুল রাজনীতি ও মতাদর্শের যেসব ধূলো-ময়লা আর আবর্জনা জড়া হয়েছে তার ফলে চলাফেরা করাই সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। যদিও মাঝে-মধ্যে দায়সারা গোছের একটু-আধটু ঝাড়– দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু তাতে ঘরের ময়লা ঘরেই থেকে গেছে, শুধু চলাচলের পথ থেকে একটু পাশে সরে গেছে মাত্র।

এ ক্ষেত্রে যেসব প্রধান প্রধান ভুল চিন্তাধারার বিরোধিতা করতে হবে সেগুলো হচ্ছেঃ

প্রথমত, আত্মমুখীবাদ। সমস্ত প্রকার ভুল চিন্তাধারার উৎসই হচ্ছে আত্মমুখীবাদ। আত্মমুখীবাদই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে, বিভিন্ন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে, বিভিন্ন প্রকার ভুল চিন্তাধারার জন্ম দেয়। আত্মমুখীবাদ হলো ঃ বাস্তব ঘটনা ও বস্তুকে বস্তুগত বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবমুখীভাবে না-দেখে বাস্তব বিবর্জিত আত্মমুখী আকাঙ্খার নিরিখে দেখা বা অবাস্তবভাবে দেখা।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীবাদ দেখা দেয় সুবিধাবাদ হিসেবে। এই সুবিধাবাদ দুই দিক থেকেই দেখা দিতে পারে। দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ও বামপন্থী সুবিধাবাদ। যদিও সুবিধাবাদ বলতে মূলত দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদই বুঝায়। দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আত্মত্যাগের ঝুঁকি পরিহার করার সুবিধাবাদী আকাঙ্খায় সশস্ত্র সংগ্রামকেই পরিহার করা। আর বামপন্থি সুবিধাবাদ বলতে হঠকারিতাবাদ বা বাম-সংকীর্ণতাবাদকে বুঝানো হয়। এর বৈশিষ্ট্যৗ হলো, অল্পস্যংখক লোকের সশস্ত্র তৎপরতার ভিতর দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে তাড়াতাড়ি কাজ হাসিল করার সুবিধাবাদী আকাঙ্খায় ব্যাপক জনগণকে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল করার দীর্ঘমেয়াদী ও ধৈর্যশীল প্রচারমূলক রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিহার করা।

সমগ্র সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনে বাম-সংকীর্ণতা বা বাম-হঠকারিতাই প্রধান ভুল চিন্তাধারা হিসেবে বারবার এসেছে এবং সংগ্রামের ফসলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। কিন্তু বিপর্যয়ের সময় ঐ বাম-হঠকারীদের একটা অংশই আবার শত্র“র শক্তিকে আত্মমুখীভাবে অতিরঞ্জিত করে দেখে, কোনো পাল্টা আক্রমণই নয় বরং সর্ম্পূণ নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষার চরম দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদে নিমজ্জিত হয়েছে। সমগ্র ইতিহাস জুড়ে এভাবে বামপন্থী সুবিধাবাদীরা চাপে পড়ে নিজেদের দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদে পাল্টে নিয়েছে।

সশস্ত্র সংগ্রাম বিকাশ লাভ করতে থাকার সময় বাম-সংকীর্ণতাই প্রধান বিপদ হয়ে দেখা দেয়। আর বিপর্যয় চলাকালীন প্রধান বিপদ হয়ে দেখা দেয় দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ। যেহেতু সংগ্রামের বিকাশ ও বিপর্যয়ের বহুসংখ্যক আবর্তনের ভিতর দিয়েই আমাদের যেতে হবে, তাই এই দুই ভিন্ন প্রকৃতির ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রামের নীতি ও কৌশল আমাদের আয়ত্ব করতে হবে।

অন্যান্য ক্ষেত্রের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিম্নরূপঃ

সামরিক ক্ষেত্রেঃ শত্র“র শক্তিকে অতিরঞ্জিত করে দেখার আত্মমুখীবাদী বিচ্যুতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের জন্ম দেয়, সেটাই সামরিক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় প্রতিরক্ষার ভ্রান্ত পলায়নবাদী রণকৌশলের জন্ম দেয। আবার শত্র“র শক্তিকে প্রয়োজনের চেয়ে ছোট করে দেখার আত্মমুখী বিচ্যুতি রাজনীতির ক্ষেত্রে যে বাম-সংকীর্ণতার জন্ম দেয়, সেটা সামরিক ক্ষেত্রে বাম-হঠকারী আত্মঘাতি রণকৌশলের জন্ম দেয়।

আমাদের প্রয়োজন রণনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে শত্র“কে তুচ্ছ করে দেখা, তার প্রকৃত শক্তিহীনতা ও দুর্বলতাগুলোকে উপলব্ধি করা। কেবলমাত্র তা হলেই আমরা তার ভয়ে অহেতুক ভীত না হয়ে তাকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে পাল্টা আঘাত হানার রননীতিগ্রহণ করতে পারব। আর রণকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের প্রয়োজন শত্র“কে শক্তিশালী হিসেবে দেখা, শত্র“র সবলতাগুলোকে এবং তার শক্তি-সামর্থ্যকে উপলব্ধি করা। কেবলমাত্র তাহলেই আমরা আত্মঘাতী আক্রমণের ভিতর দিয়ে অহেতুক শক্তি ক্ষয় না করে কৌশলী আঘাতের ভিতর দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে লাভের পরিমাণ বাড়াতে পারব।

সাংগঠনিক ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীবাদ প্রকাশ পায় সংকীর্ণতাবাদ হিসেবে। যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ প্রথমত, গণলাইন পরিত্যাগ করা। যার ফলে পার্টি ক্রমে ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সশস্ত্র সংগ্রামের পরিপূরক বিপ্লবী গণসংগঠন-গণআন্দোলনও পরিত্যাগ করে। দ্বিতীয়ত, নীতিহীন অভ্যন্তরীণ বিরোধের জন্ম দেওয়া। কতিপয় নেতার ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার আত্মমুখী আকাঙ্খা পার্টিতে নীতিহীন বিরোধের জন্ম দেয়, যার ফলে বাড়তে থাকে অভ্যন্তরীণ অনৈক্য। এই অনৈক্য যথাযথভাবে মীমাংসিত না হলে তা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রূপ নেয়, যা আত্মঘাতী সংঘর্ষের দিকেও গড়ায়। তৃতীয়ত, বিদ্যমান সংগঠনকে শূণ্য গোয়ালে পরিণত করা। সংগঠক নেতা নিজে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই বাস্তব প্রয়োগে না গিয়ে, বাস্তব বিবর্জিত পন্থায় কর্মীদের নিজের মতো করে গড়তে চান। ফলে কর্মীরা পার্টি ছেড়ে চলে যান আর শেল্টারগুলো ব্যক্তিগত শেল্টারে পরিণত হয় আর নয়তো নষ্ট হয়ে যায়। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে আত্মমুখীবাদ নেতৃত্বের দিক  থেকে হুকুমবাদ আকারে প্রকাশিত হয়। এই হুকুমবাদ আবার কর্মীদের মধ্যে অন্ধক্রিয়াবাদের জন্ম দেয়। যার পরিণতি হচ্ছে শূণ্য গোয়াল।

রাজনৈতিক রণকৌশলের ক্ষেত্রেঃ পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে সংগ্রাম ও সংগঠনের বিভিন্ন রূপগুলো ও তার প্রয়োজনীয় রূপান্তর উপেক্ষিত হয়।

ঘটনা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেঃ আত্মমুখীতার প্রকাশ হয় একদেশদর্শিতা বা খোলস-সর্বস্তা হিসেবে, যা ঘটনাকে কেবল এক দিক থেকে এবং উপর-উপর বা হালকাভাবে দেখে, সার্বিকভাবে বা গভীরভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়। এই একদেশদর্শিতা বা খোলস-সর্বস্বতা আমাদেরকে অতীত সংগ্রামগুলোর যথাযথ সারসংকলন থেকে বিরত রেখে দেয়। ফলে বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

চার, ক্যাডার-স্কুল চালু করার ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত নেতা-কর্মী গড়ে তোলা।

কার্যকর ধৈর্যের সঙ্গে তাড়াহুড়োবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এবং প্রয়োজনীয় বিপ্লবী সতর্কতা অবলম্বন করে, পার্টিতে ক্যাডার-স্কুল চালু করা, সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে তাকে চালিয়ে যাওয়া এবং এর মাধ্যমে সামগ্রিক রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত একগুচ্ছ সুযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এ-সম্পর্কে শিক্ষা নীতি ও ক্যাডার-স্কুল নামক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

পাঁচ, পেশাদার বিপ্লবীদেরও কোনো সামাজিক পেশার আড়াল গ্রহণ করা।

আমাদের পার্টির পেশাদার বিপ্লবীদের বিপ্লব করা ছাড়া কোনো সামাজিক পেশা না থাকায়, তাঁদের অধিকাংশই শত্র“ কর্তৃক দ্রুতই চিহ্নিত হয়ে গেছেন এবং এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে পার্টি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেরই যদি আগে থেকেই কোনো-না-কোনো সামাজিক পেশা থাকত, তা হলে তাঁরা এলাকার মধ্যেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারতেন এবং সাংগঠনিক ও সামরিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারতেন। তাই আমরা বলছি, সম্ভব হলে পেশাদার বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদেরও রাজনৈতিক পেশাকে আড়াল করার জন্য কোনো-না কোনো সামাজিক পেশা বেছে নিতে হবে।

ছয়, পার্টিতে আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেবার ব্যবস্থা করা।

আংশিক সময়ের কর্মীদের সদস্যপদ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় পার্টি-কর্মীদের সংখ্যা খুবই সীমিত হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা থাকলে, আজ পেশাদার বিপ্লবীদের চেয়ে কমপক্ষে চারগুণ বেশি আংশিক সময়ের কর্মী পার্টিতে থাকত। যাঁরা তাঁদের সিকিভাগ সময়ও পার্টিকে দিলে, পার্টিতে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ পেশাদার বিপ্লবী কর্মীশক্তি থাকত। সেই সঙ্গে পার্টি পেত সমাজের প্রায় সমস্ত পেশার মানুষের সঙ্গে এক আত্মিক যোগাযোগ, যা পার্টির গণভিত্তি বাড়িয়ে দিত প ্রায় দশগুণ। তাই আমরা বলছি আংশিক সময়ের কর্মীদেরও পার্টি-কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সাত, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভিতর দিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভিতর দিয়ে ভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণ থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আত্মস্থ করে দেশীয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর কর্তব্য সম্পাদন করা এবং নিজেদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।

পার্টিকে উপরি-উক্ত সমস্ত করণীয় সম্পাদনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয়।

সূত্রঃ  

রাকেশ কামাল(ডাঃ টুটু) রচনাসংগ্রহ

(দলিল সংকলন)

শ্রাবণ প্রকাশনী

Advertisements

2 Comments on “বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় — রাকেশ কামাল”

  1. Mostofa Arif says:

    It will take time.

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s