নকশালবাড়ীর মহান কমরেড চারু মজুমদারের উদ্ধৃতি-

11998802_1039573956062135_6243312848213816076_n

। বিপ্লবী কে? বিপ্লবী হচ্ছে সে, যে সমস্যা দেখে অন্যের কাছে ছুটে যায় না, নিজেই সমস্যার সমাধান করে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে। ১৯৬৩-৬৪

। আমরা কাজ করতে গিয়ে ভুল করি এবং তা থেকে শিক্ষা নিই, কিন্তু ভূলের ভয়ে কখনোই কাজকে ভয় করি না। ১৯৬৩-৬৪

। যে স্বপ্ন দেখে না এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারে না। ১৯৬৩-৬৪

। আমাদের কাজই হলো মানুষকে নিয়ে, যন্ত্র নিয়ে নয়। তাই সেই মানুষকে নিয়ে থাকবে ভয়, দ্বিধা, স্বার্থপরতা, তবু সেই মানুষই লড়াই করবে এবং এই সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁকে জয় করে হয়ে উঠবে নতুন মানুষ, যে মানুষ হবে নিঃস্বার্থপর, আত্মদানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। বিপ্লবীরাও হচ্ছেন মানুষ, তাঁরা যন্ত্র নন, তাই তাঁরা মানুষের দুঃখ দেখে কাঁদেন, আর কাঁদেন বলেই তাঁরা পারেন মানুষের দুষমনকে শেষ করতে। বিপ্লবীদের মধ্যেও থাকে দ্বিধা, ভয়, দ্বন্দ্ব, ভয় এবং স্বার্থপরতা। কিন্তু লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁরা এগুলো কাটিয়ে ওঠেন; যারা পারে না তারা হয় বসে যায়, না হয় প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরে যোগদান করে। এই সমস্ত কথা মনে রেখেই আমাদের কাজে হাত দিতে হবে। হচ্ছে না বলে হতাশ হলে চলবে না। মানুষ ছোট ছোট লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেই কেবলমাত্র বৃহত্তর লড়াইয়ের দিকে পা বাড়াতে পারে। তাই লেগে থাকার অর্থই বিজয়। ১৯৬৩-৬৪

। এই দুনিয়ায় দুই জাতের মানুষ আছে। এক জাত বাধা দেখলে ছুটে আসে অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য; এরা জীর্ন, এরা পুরাতন, এরা মৃত। অন্য আর এক জাতের মানুষ আছেন যারা বাধা দেখলে অন্যের কাছে সাহায্যের জন্য ছুটে যান না, সাহস ভরে রুখে দাঁড়ান তার মোকাবিলার জন্য। এরা জীবন্ত, এরা প্রকৃত। ১৯৬৫

। কোন কথার মৃত্যু হয় না। আজ আমরা যা বলছি হয়তো মানুষ আজই তা গ্রহণ করছে না; তাই বলে আমাদের সে প্রচার ব্যর্থ হচ্ছে না, কথাগুলো মানুষের মধ্যে থেকে যাচ্ছে। ১৯৬৫

। অন্ধকার দেখে ভয় পেয়ো না, বিচ্ছিন্নতা দেখে সাহস হারিয়ো না, কান পেতে শোনো মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মহান নেতা চেয়ারম্যানের অভয় বাণী- ‘সত্য প্রায়শই অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যে নিহিত থাকে।‘ বুঝতে চেষ্টা কর চেয়ারম্যানের মহান উপলব্ধি- ‘জনগণ বিপ্লব চান।‘ তোমাদের কোন প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে না। পাহাড়ের গায়ে বরফের টুকরোটাকে সরাতে গেলে অনেক ব্যর্থ আঘাতের পরই সে হঠাৎ এক আঘাতে সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে; কঠিন ও কঠোর প্রচেষ্টা ছাড়া কোন কাজ সফল হয় না। ১৯৬৭

। কোন কোন সময় আমাদের মনে হবে যে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, জনগণ আমাদের কথায় কান দিচ্ছে না; তা দেখে ভয় পেলে ভুল হবে; বিপ্লবের বিকাশের নিয়মই হল তাই। অন্ধকারের মধ্যে যিনি আলোর নিশানা দেখাতে পারেন তিনিই হলেন প্রকৃত বিপ্লবী; আর এখানেই হলো পার্টির সচেতন ভূমিকা। ১৯৬৭

। বিপ্লবী সংগঠন গড়ার প্রধান ভিত্তি কী? কমরেড স্ট্যালিন বলেছেন, বিপ্লবী কর্মী। বিপ্লবী কর্মী কাকে বলে? বিপ্লবী কর্মী হচ্ছে সে, যে নিজের উদ্যোগে ঘটনার বিশ্লেষণ করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী কর্মপন্থা গ্রহণ করতে পারে। ২৮ জানুয়ারি, ১৯৬৫

১০। আত্মোন্নতির একমাত্র মার্কসবাদী পথ যা লেনিন এবং চেয়ারম্যান মাও শিখিয়েছেন সেটা হলো শ্রেণীসংগ্রামের পথ। একমাত্র শ্রেণীসংগ্রামের আগুনে পুড়েই কমিউনিস্ট খাটি সোনা হতে পারে। শ্রেনীসংগ্রামই হচ্ছে কমিউনিস্টদের সত্যকার স্কুল এবং শ্রেণীসংগ্রামের অভিজ্ঞতাকেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুং চিন্তাধারার আলোকে যাচাই করতে হবে এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাই পার্টি শিক্ষার মূল কথা হল মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল শিক্ষাকে শ্রেণীসংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এবং সে অভিজ্ঞতা থেকে আবার সাধারণ নীতিতে আসা এবং সেই নীতিকে আবার জনসাধারণের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। একেই বলে জনসাধারণের কাছে শিখে আবার তা নিয়ে জনগণের মধ্যে নিয়া যাওয়া(FROM THE PEOPLE, TO THE PEOPLE)। পার্টি শিক্ষার মূল কথা হলো এই। এপ্রিল, ১৯৬৭

১১। মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা আদর্শগত আলোচনা করে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে, তা হলো তাদের নিজের দেশের বাস্তব অবস্থায় সেই আদর্শের প্রয়োগ কিভাবে হবে তার জন্যে। সাধারণভাবে কোন আদর্শগত আলোচনারই কোন বিপ্লবী তাৎপর্য নেই কারণ সত্যের যাচাই হবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ মারফত। ২৬ অক্টোবর, ১৯৬৭

১২। কমিউনিস্টের সমস্ত কার্যকলাপ হবে একটি লক্ষ্য সাধন এবং তা হলো জনসাধারণের কল্যাণ করা। কমিউনিস্ট বিপ্লবী, কারণ বিপ্লব ছাড়া জনসাধারণের সেবা করা যায় না। যেহেতু জনতার কল্যাণ করার জন্য বিপ্লব দরকার, তাই বিপ্লবের প্রয়োজনে সে আন্তর্জাতিকতাবাদী। এই আন্তর্জাতিকতা নিঃস্বার্থ এবং কমিউনিস্ট জানে তার কাজ সহজ নয়, কাজেই তাকে দাঁত কামড়ে একটা কাজে লেগে থাকতে হয়। এই বার বার চেষ্টা করার দায়িত্ব কমিউনিস্টের আছে। …… ‘জনগণের সেবা কর’ লেখাটায় চেয়ারম্যান জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। এই লেখাটা অধ্যয়ন করলে যে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে আসে এবং যেটা মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তা হলো, এই সংগ্রামে আমার কী হবে? আমি কী চাই? আমি কি এই মুহূর্তে জনতার স্বার্থে মরতে রাজি আছি? জনতার স্বার্থে মরাটাই একটা মানুষের পক্ষে সবচেয়ে মহৎ দায়িত্ব, সে মৃত্যু বিপ্লবের যে কোন কাজেই হোক না কেন। চেয়ারম্যান বলেছেন, সংগ্রাম করলে মৃত্যু আছে, কাজেই মৃত্যুকে ভয় করলে চলবে না।
….’ডাঃ নর্মান বেথুন স্মরণে’ লেখায় আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে দেশ পদানত, আর যে দেশ পদানত করেছে, তার শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে কোন বিরোধ নেই এবং পদানত দেশের মুক্তি ছাড়া উন্নত দেশের মুক্তি নেই। একথা ডাঃ বেথুন বুঝেছিলেন বলেই সমুদ্র পার হয়ে তিনি এসেছিলেন চীনের মুক্ত অঞ্চলে। কী প্রত্যাশা ছিল তার নিজের সম্বন্ধে? একজন বড় সার্জন কী না করতে পারতেন ধনতান্ত্রিক দুনিয়ায়। সব ছেড়ে ছুড়ে তিনি এলেন কেন? এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ তাঁর এসেছিল এই রাজনৈতিক চেতনা থেকে। কাজেই রাজনৈতিক চেতনার তাৎপর্য হচ্ছে এইখানে। দ্বিতীয়তঃ এই লেখায় চেয়ারম্যান দেখিয়েছেন, কমিউনিস্ট কী ধরনের কাজ করে। স্বভাবতই সবচেয়ে কঠিন কাজ, সবচেয়ে নিঃস্বার্থভাবে। শুধু তাই নয়, তথাকথিত ‘ট্যাকনিক্যাল’ কাজ, যাকে মধ্যবিত্তরা অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে, সেই রকম ‘ট্যাকনিক্যাল’ কাজ করতে গিয়ে ডাঃ নর্মান বেথুনের মত সার্জন জীবন দিলেন। কাজেই নর্মান বেথুন থেকে শিক্ষা কোন কাজ ছোট নয়- জনতার কল্যাণে সব রকম কাজ বড় সমান মূল্যবান। এই লেখায়, চেয়ারম্যান কমিউনিস্টের মুল্যায়ন করেছেন। তাঁর লেখায় তিনি বলেছেন, ভাল কমিউনিস্ট সে-ই যে সবচেয়ে কঠিন কাজের দায়িত্ব নেয় এবং পূর্ণ করে। যে কমিউনিস্টরা মুখে বড় বড় কথা বলে এবং কাজের সময় সবচেয়ে সহজ দায়িত্ব নেয় তারা ভাল কমিউনিস্ট নয়।

‘যে বোকা বুড়ো লোকটা পাহাড় সরিয়েছিল’- এই লেখায় চেয়ারম্যান মধ্যবিত্ত চালাকি ও বুদ্ধিমত্তার পরিহাস করেছেন। ও বুদ্ধিমত্তার কোন দাম নেই। বরঞ্চ একটা ‘মূর্খ’ কৃষকের যুগ যুগ সঞ্চিত অভিজ্ঞতা সঠিক পথ বাতলায়। বার বার একটা কাজ করা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবির কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং সে- কাজ সে ঘৃণা করে। একজন কৃষক তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতায় শিখেছে, বার বার একটা কাজ করতে হয় দৃঢ়তার সাথে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়া যায় না। কিন্তু এভাবে কাজ করলেই একদিন সফল হওয়া যায়। ৭ জানুয়ারী, ১৯৬৮

১৩। শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারাটাই কমিউনিস্ট হবার একমাত্র মাপকাঠি নয়। কে প্রকৃত কমিউনিস্ট? যিনি জনগনের জন্য আত্মত্যাগ করতে পারেন এবং এই আত্মত্যাগ কোন বিনিময়ের প্রত্যাশা করে নয়। দুটো পথ- হয় আত্মত্যাগ, নয় আত্মস্বার্থ। মাঝামাঝি কোন রাস্তা নেই। চেয়ারম্যান মাওয়ের ‘জনগণের সেবা কর’- স্লোগানের তাৎপর্য এখানেই। জনগণের সেবা করা ছাড়া জনগণকে ভালবাসা যায় না। জনগণকে সেবা করা যায় একমাত্র আত্মত্যাগ করেই। প্রকৃত কমিউনিস্ট হতে গেলে এই আত্মত্যাগ আয়ত্ব করতে হবে। জনগণকে সেবা করার মানে জনগণের স্বার্থে বিপ্লবের স্বার্থে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম(unpaid labour) দেওয়া। এই বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়ার মধ্য দিয়েই জনগণের সাথে মিশে যাওয়া ঘটবে। কেবলমাত্র এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জনগণকে ভালবাসা যায়, জনগণকে সেবা করা যায়। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিপ্লবীর রুপান্তর(transformation) সাধিত হয়। তাই বিপ্লব মানে শুধু বৈষয়িক লাভ নয়। বিপ্লব মানে এই রুপান্তর- উপলব্ধির, আদর্শের, চিন্তাধারার রুপান্তর। বিপ্লব মানে চেতনার আমূল রুপান্তর। কী সেই চেতনা? জনগণকে সেবা করার চেতনা, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হওয়ার চেতনা, জনগণকে ভালবাসার চেতনা। বিপ্লব মানেই এই রুপান্তর- কি সমাজের, কি ব্যক্তির। ১২ মার্চ, ১৯৬৯

১৪। সংশোধনবাদের সংগে বিপ্লবের প্রধান ভেদটা হচ্ছে এখানে যে, সংশোধনবাদীরা সংগ্রাম করার পূর্ব শর্ত হিসাবে জয়লাভের গ্যারান্টি দাবি করে থাকে, আর বিপ্লবীরা লড়াই করতে সাহসী হয়, বিজয় অর্জনে সাহসী হয়। বিপ্লবীরা পরাজয়কে ভয় পায় না। চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন, ‘লড়ো, ব্যর্থ হলে আবার লড়ো, আবার ব্যর্থ হলে আবার লড়ো- যতক্ষণ না জয়লাভ করতে পারো’। এই হচ্ছে জনগণের যুক্তি ও তাঁরা কোনো সময়ই এই যুক্তির বিরোধিতা করবেন না। এটি হচ্ছে আরেকটি মার্কসবাদী নিয়ম’। অক্টোবর, ১৯৭০

১৫। মধ্যবিত্ত ক্যাডারদের বিপদ এইখানেই। তারা দ্রুত জাতীয়- আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত(National International perspective) হারিয়ে ফেলে এবং তাদের সামনে স্থানীয় এমনকি পারিবারিক সমস্যাটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। এইখানেই পেতিবুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা। শ্রমিক বা দরিদ্র কৃষকের সংগ্রামের কথা না ভাবলে চলে না। কাজেই তারা বিপ্লবে অবিচল(Consistent Revolutionary) থাকতে পারে। চেয়ারম্যান যখন বলেন- দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হও, কোনো আত্মত্যাগে ভীত হয়ো না এবং সমস্ত বাধা অতিক্রম করে বিজয় অর্জনে সাহসী হও- এর তাৎপর্য অনেক গভীর। ত্যাগ(Sacrifice) ব্যাপারটা কোনো নির্দিষ্ট(Particular)ব্যাপার নয়। সেটা দৈনিন্দন জীবনের সমস্যা। সেই জন্যই চেয়ারম্যান বলেছেন গ্রামে গেলেই মধ্যবিত্ত ক্যাডার বিকাশলাভ(develop) করবে, এমন কোনো মন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। গ্রামে গিয়ে তোমাকে জনগণের সাথে একাত্ম হতে হবে(integrated with masses) এবং জনগণের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন(friendly) হতে হবে এবং দ্বিতীয়ত প্রতিনিয়ত সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা নিজেকে পরিবর্তিত(remould)করতে হবে। তবেই তুমি বিকাশলাভ করতে পার। ১ এপ্রিল, ১৯৬৭

১৬। জনগণ যখন কোন অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে এগিয়ে যেতে উদ্যোগ নিচ্ছেন তখন পার্টির কমরেডদের উচিৎ কত কার্যকরীভাবে(effectively) তাঁরা এই সংগ্রাম করতে পারেন, তার পদ্ধতি বলে দেওয়া। কিন্তু আমরা করবো বলে জনগণকে নিবৃত্ত করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে আমরা বিরাট কিছু করি নি, করেছেন জনগণ এই জনগণই সব কিছু করতে পারেন। এটা যদি মনে রাখা না যায় তবে তাতে জনগণের ওপর আস্থার ভাব থাকে না। ফলে ঔদ্ধত্যর(arrogance) জন্ম হয়। এই ঔদ্ধত্যর জন্ম হয় এখান থেকেই এবং তার ফলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়। বিনয়ী হওয়া একজন কমিউনিস্টের প্রধান গুন। যিনি বিনয়ী নন, তিনি উদ্ধত(arrogant)। কাজেই তিনি কমিউনিস্ট নন। চেয়ারম্যান মাও বারবার বলেছেন কমিউনিস্টদের বিনয়ী হতে। বিনয়ী হওয়া পারস্পরিক(reciprocal) নয়।

১৭। চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘একটা ভাল কাজ করা কারো পক্ষেই কঠিন নয়, কঠিন হচ্ছে সারা জীবন ধরে ভাল কাজ করা, কখনো কোন খারাপ কাজ না করা , সর্বদা ব্যাপক জনসাধারণ, যুবক ও বিপ্লবের জন্য হিতকর হওয়া, কয়েক দশক ধরে একটানা কঠোর সংগ্রাম করা- এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।‘ কমরেড সরোজ দত্ত ছিলেন এই রকমই একজন কমরেড যার সারাটা জীবন বিপ্লবের কাজে ব্যয়িত হয়েছে, তাঁর ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় করত না এমন কোন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি নেই। তাই পুলিশবাহিনী বিচারের প্রহসন পর্যন্ত করার সাহস পেল না, সেই রাত্রেই তাঁকে হত্যা করলো। …কমরেড সরোজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতই তিনি বীরের মৃত্যু গ্রহণ করেছেন। তাঁর বিপ্লবী নিষ্ঠা এক আদর্শ হিসেবে তরুণদের গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিক ও দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকের সাথে একাত্ম হয়ে এই হত্যাকান্ডের বদলা নিতে হবে।

১৬ আগষ্ট, ১৯৭১

১৮। কমরেড, রক্ত ঝরা পথই তো একমাত্র বিপ্লবের পথ। মানুষের মুক্তির জন্য মূল্য দেব না এ তো হতে পারে না। আমাদের উপর প্রত্যেকটি আঘাতই বেদনাদায়ক এবং বেদনা থেকেই জন্ম নেয় মহত্তর ত্যাগের দৃঢ়তা এবং শত্রুর প্রতি তীব্রতম ঘৃণা- এ দুটো জিনিস যখন চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সংগে যুক্ত হয় তখনই সৃষ্টি হয় সেই নতুন মানুষ- যে মানুষের জন্মের দিকে তাকিয়ে আছে সারা ভারতের অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষ, দেশের কোটি কোটি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক, এই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক যেদিন জন্ম দেবে সেই নতুন মানুষকে তাদের নিজেদের মধ্যে, সেদিন সমস্ত চোখের জল মুছে সারা ভারতবর্ষের মানুষ হেসে উঠবে, সে কী প্রবল প্রাণবন্যা বয়ে যাবে সারা ভারতবর্ষে, উজ্জ্বল তারার মতো জ্বলে উঠবে আমাদের দেশ- সারা পৃথিবীকে করবে আলোকিত। সেই আমাদের স্বপ্নের ভারতবর্ষ বাস্তব রুপ পাবে কত মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে। এই প্রত্যেকটি মৃত্যু যে পাহাড়ের মত ভারী, কারণ তাঁরা যে আমাদের চাইতে অনেক বড় মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছিল, তাই তাদের মৃত্যু লক্ষ লক্ষ জীবন সৃষ্টি করবে। তাই তো এ পথের ধুলো চোখের জলেই ভেজাতে হয়, রক্ত দিয়েই দৃঢ় করতে হয়।
আমাদের কি কোন ভুল হয়েছিল? ভুল হবে না- একথা কি কেউ বলতে পারে? কিন্তু তা নিয়ে অনুশোচনার দিন তো আজ নয়- আজ দিন আগুনের মত জ্বলে ওঠার, রক্তের ঋণ রক্তের দামে শোধ করার। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের দেশের দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক রক্ত ও জীবন দিয়ে গড়ে তুলেছেন আমাদের দেশকে; আমাদের দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, সম্পদ, ঐশ্বর্য্য, ঐতিহ্য সব কিছুই গড়ে উঠেছে তাদের দানে- সে ঋণের বোঝা আমাদের কাঁধে। সে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমাদের…। ৬ জুলাই, ১৯৭০

১৯। লেনিনকে না মেনে যারা মার্কসবাদী হতে চেয়েছিল তারা ইতিহাসের আবর্জনাস্তুপে আশ্রয় নিয়েছে। তেমনি আজও মার্কসবাদ- লেনিনবাদের সর্বোচ্চ রূপ মাও সেতুঙের চিন্তাধারা- এই আন্তর্জাতিক মার্কসবাদী কর্তৃত্বের যারা বিরোধিতা করছে, তাদের আশ্রয় নিতে হবে সাম্রাজ্যবাদের কোলে। ২৬ অক্টোবর, ১৯৬৭

২০। বিপ্লব করতে হলে বিপ্লবী কর্মীকে ত্যাগ স্বীকার করতে শিখতে হবে, ত্যাগ করতে হবে সম্পত্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য, ত্যাগ করতে হবে পুরোনো অভ্যাস এবং নামের আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ করতে হবে মৃত্যুভয় এবং সহজ পথে চলার চিন্তা; তবেই আমরা বিপ্লবীদের শ্রমসাধ্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে পারবো; তবেই আমরা জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবো মহত্তর ত্যাগে, যার আঘাতে সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ এবং ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ধ্বংস হবে এবং বিপ্লব সফল হবে। ১৩ মার্চ, ১৯৬৯ 

২১। বিপ্লবী যুদ্ধ করার মালমশলা আমাদের তৈরি করতে হবে। এ মালমশলা কি? এ মালমশলা ডিনামাইট নয়, বিস্ফোরক পদার্থ নয়, নয় আগ্নেয় অস্ত্র। বিপ্লবী যুদ্ধের মালমশলা হচ্ছে মানুষ। এই মানুষ বিপ্লবী তত্ত্বে অর্থাৎ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হলে, সে হয় এক আত্মিক এটম বোমা- যার শক্তি হাজার হাজার এটম বোমের চেয়েও বেশি। ২২ জানুয়ারি, ১৯৭০

২২। ভারতের বিপ্লবী ঐতিহ্যের উপর বিশ্বাস রাখো, তোমার দেশের ইতিহাস চিরকাল বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস। জনগণের উপর বিশ্বাস রাখো, অত্যাচার শোষণের বিরুদ্ধে চিরকাল ব্যাপক জনগণ সংগ্রাম করে এসেছে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখো, তুমি এই বিপ্লবী জনগনেরই একজন। চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার উপর বিশ্বাস রাখো- এই চিন্তাধারাই আজ পুরোনো পৃথিবী গুড়িয়ে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মার্কসবাদী- লেনিনবাদী)’র উপর বিশ্বাস রাখো, একমাত্র এই পার্টিই চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রয়োগ করে এমন পথ অনুসরণ করছে যে পথ হাজার হাজার শহীদের রক্তে চিহ্নিত, তাই সে পার্টি কখনো ভুল পথে যেতে পারে না। সুতরাং বিশ্বাস রাখো ভবিষ্যতের ওপর। মার্চ, ১৯৭০

২৩। বিপ্লবী পার্টির বা আমার তা তো নয়। বিপ্লবটা হচ্ছে দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের। তাঁরাই এ সংগ্রামের নেতা, তাই তাঁরাই সবচেয়ে বেশি মুল্য দেয় এই বিপ্লবের স্বার্থে। তাঁরা আমার কথায় জীবন দিচ্ছে না। জীবন দিচ্ছে তাঁদের নিজের জন্য, বিপ্লবের স্বার্থে। কোন জীবনদানই ব্যর্থ হয় না। ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০

২৪। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশৃঙ্খল জীবন তাঁকে বিশৃঙ্খল সমালোচনার পথে টেনে নিয়ে যায়। অর্থাৎ সাংগঠনিক চৌহদ্দির ভেতরে তারা সমালোচনা করতে চায় না। এই বিচ্যুতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে সমালোচনা সম্বন্ধে মার্কসবাদি দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আমাদের সতর্ক হতে হবে।

মার্কসবাদী সমালোচনার বৈশিষ্ট্য হলোঃ
১। পার্টি সংগঠনের মধ্যে অর্থাৎ পার্টি মিটিংয়ে সমালোচনা করতে হবে।
২। সমালোচনার লক্ষ্য হবে গঠনমূলক অর্থাৎ সমালোচনার লক্ষ্য নীতিগতভাবে, সংগঠনগত ভাবে পার্টিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে পার্টির মধ্যে যেন নীতিহীনভাবে কোন সমালোচনা না হয়’।

২৫। …নির্বিচারে হত্যার সামনে কিছু নেতা আছেন যাঁরা ভয় পান, যাঁরা আড়াল খোঁজেন । তাঁদের সম্পর্কে চেয়ারম্যান মাও বলেছেন- ‘তারা ভীরু এবং বিপ্লবী নেতৃত্বের অযোগ্য’। আর একদল আছেন যাঁরা নির্ভয়ে মৃত্যুর মোকাবিলা করেন, প্রত্যেকটি হত্যার বদলা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এঁরাই বিপ্লবী, এরাই জনতাকে পথ দেখাতে সক্ষম।

২৬। সারা ভারতবর্ষে প্রত্যেকটি রাজ্যে আজ কৃষক বিক্ষুব্ধ, তাঁদের সামনে কমিউনিস্টদের পথ দেখাতে হবে। সে পথ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি আর বন্দুক সংগ্রহের অভিযান। মুক্তির এই একমাত্র পথ আমাদের দৃঢ়ভাবে দেখাতে হবে। চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমস্ত রকম বুর্জোয়া মতাদর্শের স্তাবকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেই বিপ্লবের জ্বলন্ত প্রভাব ভারতবর্ষে এসে পৌছেছে। সেই বিপ্লবের আহ্বান- ‘দৃঢ়চিত্তে সমস্ত রকম ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হও, পথের বাধাকে একটা একটা করে দূর কর। জয় আমাদের হবেই’। সাম্রাজ্যবাদ যত ভয়ংকরভাবেই আসুক না কেন, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির দিন ঘনিয়ে এসেছে, মার্কসবাদ- লেনিনবাদ- মাও সেতুং এর চিন্তাধারার উজ্জ্বল সুর্যালোক সব অন্ধকারকে ধুয়ে মুছে নিঃশেষ করে দেবে। এপ্রিল, ১৯৬৭

২৭। বিপ্লব কখনও সফল হতে পারে না বিপ্লবী পার্টি ছাড়া। যে পার্টি দৃঢ়ভাবে চেয়ারম্যান মাও সেতুং চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কৃষক ও মধ্যবিত্ত যুবকদের দ্বারা গঠিত, যে পার্টির অভ্যন্তরে পুরো গনতান্ত্রিক অধিকার আছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার এবং যে পার্টির সভ্যরা স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে শৃংখলা মেনে নিয়েছে, যে পার্টি শুধু উপরের হুকুম মেনেই চলে না, স্বাধীনভাবে প্রত্যেকটি নির্দেশকে যাচাই করে এবং ভুল নির্দেশকে অমান্য করতেও দ্বিধা করে না বিপ্লবের স্বার্থে, যে পার্টির প্রত্যেকটি সভ্য নিজের ইচ্ছায় কাজ বেছে নেন এবং ছোট কাজ থেকে বড় কাজ সব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দেন; যে পার্টির সভ্যরা নিজেদের জীবনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শকে প্রয়োগ করেন, নিজেরা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন, আরও আত্মত্যাগ আরও কর্মোদ্যম বাড়াতে, যে পার্টির সভ্যরা কোনো অবস্থাতেই হতাশ হন না, কোনো কঠিন পরিস্থিতি দেখেই ভয় পান না, দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান তার সমাধানে- এরকম একটা পার্টিই পারে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও মতের মানুষের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তুলতে। এই রকম বিপ্লবী পার্টিই পারে ভারতবর্ষের বিপ্লবকে সফল করে তুলতে। ২৬ অক্টোবর, ১৯৬৭

২৮। ……শুধু বিদ্রোহের পতাকা ওড়ালেই মাওবাদী পার্টি গড়ে ওঠে না। সেই বিদ্রোহী কমরেডদের চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে এবং সেই প্রয়োগের মারফত শ্রমিক ও কৃষক ক্যাডার তৈরি করতে হবে। তবেই আমরা বলব একটা সঠিক মাওবাদী পার্টি গড়ার পথে এগোচ্ছি। পুরাতন রাজনৈতিক কর্মীরা অবশ্যই এই পার্টিতে থাকবেন, কিন্তু মূলত এই পার্টি গড়ে উঠবে শ্রমিক কৃষক ও মেহনতি মধ্যবিত্তশ্রেণীর যুবকদের দ্বারা, যাঁরা শুধু মুখে চেয়ারম্যানের চিন্তাধারাকে মানবেন না, জীবনে তার প্রয়োগ করবেন, ব্যাপক জনতার মধ্যে প্রচার ও প্রসার করবেন এবং গ্রামাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের ঘাঁটি বানাবেন। সেই নতুন পার্টি শুধু বিপ্লবী পার্টিই হবে না; তারা হবে জনতার সশস্ত্র বাহিনী এবং জনতার রাষ্ট্রশক্তি। এই পার্টির প্রত্যেকটি সভ্যকে সংগ্রাম করতে হবে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে। ১৬ মে, ১৯৬৮

২৯। বিপ্লবী পার্টি গড়ার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সংগ্রাম গড়ে তোলা। এ কাজে হাত না দেওয়া পর্যন্ত বিপ্লব শুধু মুখে স্বীকার করা হল। সুতরাং চেয়ারম্যানের ভাষায় তাঁরা হলেন কথায় বিপ্লবী(revolutionary in words)। আমাদের বিপ্লবী পার্টি গড়ে উঠবে কর্মক্ষেত্রে বিপ্লবী(revolutionary in deeds)-এর দ্বারা। এভাবে না দেখলে পার্টি হবে একটি কচকচির আড্ডাখানা(debating society)। ১৬ মে, ১৯৬৮

৩০। কমিউনিস্টদের দায়িত্ব শ্রেণীসংগ্রাম গড়ে তোলা- জাতীয় সংগ্রাম নয়। শ্রেণীসংগ্রামে বিভেদ দূর করার জন্য কমিউনিস্টদের ঘোষনা করতে হবে- প্রত্যেকটি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, এমন কি বিচ্ছিন্ন হবার অধিকার রয়েছে। এই আওয়াজ খন্ড জাতিগুলিকে একটা শোষন থেকে আর একটা শোষণের খপ্পরে পড়ছি না – এই বিশ্বাস দেবে এবং তখনই কেবল তারা শ্রেণীসংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমরা যদি জাতীয় আন্দোলনের নেতা হবার চেষ্টা করি তাহলে আমরা সে নেতা হতে পারব না; আমরা বিভিন্ন জাতিসত্তার পেটি- বুর্জোয়ার লেজুড়ে পরিণত হব। এই সংগ্রামের পর শ্রেণীসংগ্রামের নেতা হিসাবে আমরা যতই এগিয়ে যাব ততই বিভিন্ন জাতিসত্তার সংগ্রামের চরিত্র পরিবর্তিত হতে থাকবে; এবং বিজয়ের পূর্ব মূহুর্তে প্রত্যেকটি জাতিসত্তার আন্দোলন শ্রেণীসংগ্রামে রুপান্তরিত হবে। ২০ মে, ১৯৬৮

৩১। বিপ্লবের স্বার্থে আমরা একত্রিত হয়েছি। কাজেই সমালোচনা আমাদের ভয় করলে চলবে না এবং আত্মসমালোচনার পরাঙ্মুখ হলে আমরা আমাদের গুণগত পরিবর্তন সাধন করতে পারব না, বিপ্লবী কমিউনিস্ট হিসাবে আমাদের যে দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালন করতেও অসমর্থ হব। এই কর্মধারায় অভ্যস্ত হলে যে নতুন বিপ্লবী পার্টি জন্ম নেবে সেই পার্টি বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের উপর নিশ্চয়ই নির্ভরশীল থাকবে না। শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে অবিরাম কৃষিবিপ্লবের রাজনীতি- চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। তার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর যে অগ্রণী অংশ চেয়ারম্যানের চিন্তাধারা ও তাঁর কর্মধারায় অভ্যস্ত হবে তাকে সক্রিয়ভাবে কৃষিবিপ্লব সংগঠিত করবার জন্য গ্রামাঞ্চলে পাঠাতে হবে এবং এভাবেই কৃষিবিপ্লবের উপর শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব কার্যকরী রুপ নেবে। ১৯৬৮

৩২। পার্টির ভিতরে লড়াই অনিবার্য,একথা অস্বীকার করা ভাববাদী বিচ্যুতি। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন ‘পার্টির মধ্যে সর্বক্ষণ বিভিন্ন ধরণের চিন্তাধারার মধ্যে বিরোধিতা ও সংগ্রাম চলে; সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে এবং নতুন ও পুরাতনের যে দ্বন্দ্বগুলি চলে পার্টির মধ্যে তার প্রতিফলন হয়। পার্টির মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে এবং সেগুলিকে সমাধান করার জন্য কোনো মতাদর্শগত সংগ্রাম না থাকে, তা হলে পার্টির জীবন শেষ হয়ে যাবে’। অতীতে আমরা সংশোধনবাদী ভুল করেছি; তাই পার্টির ভেতর ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে হবে। বর্তমান যুগে সংশোধনবাদ প্রতিবিপ্লবী মতাদর্শ। এই জন্য আন্তঃপার্টিসংগ্রাম বিপ্লবী মতাদর্শ ও প্রতিবিপ্লবী মতাদর্শের সংগ্রাম চলাতে হবে। ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্য অর্থাৎ প্রতিবিপ্লবী সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং তাকে পরাজিত করতে হবে। কেবলমাত্র এইভাবেই ঐক্য সম্ভব , কিন্তু সে ঐক্যও স্থায়ী নয়। নতুন দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, সংশোধনবাদ নতুন নতুন রুপে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করবে। এই জন্যই নতুন স্তরের সংগ্রাম চালাতে হবে। ২০ মার্চ, ১৯৬৯

৩৩। ভাববাদের প্রভাববশেই জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে আমরা চাইছি এমন একটি পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালাতে, যা সুবিধাবাদ ও সংশোধনবাদ থেকে মুক্ত। এ হল সম্পুর্ণ ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যার সংগে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কোন সম্পর্ক নেই। অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়েই- যেমন বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে তেমনি ভেতরের বিরুদ্ধ ঝোঁকের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য মধ্য দিয়েই পার্টি শক্তি সঞ্চয় করবে, জনতার সেবা করার জন্য বিপ্লবের অগ্রণী বাহিনীর কাজ করবে, নিজেকে রূপান্তরিত করবে, রূপান্তরিত করবে সমস্ত সমাজকে। ২০ মার্চ, ১৯৬৯

৩৪। ইউনিয়নের নেতা কমিউনিস্ট হলেই ইউ্নিয়নের সভ্যরা কমিউনিস্ট হয় না, বিপ্লবী রাজনীতি অর্থাৎ কৃষিবিপ্লবী রাজনীতির দ্বারা যদি শ্রমিক শ্রেণীকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়, তা হলে স্বাধীনতার পার্টি ইউনিটগুলির বিপ্লবী রাজনীতি প্রচারের দায়িত্ব অনেক বেশি এসে পড়ে, কারণ শ্রমিক শ্রেণী তার অর্থনীতির দাবীর আন্দোলনের মারফতে কৃষি বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা কোনো দিনই বুঝবে না। কৃষি বিপ্লবের রাজনীতি তাকে বোঝাতে হবে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের বাইরে থেকে। এর জন্য চাই রাজনীতির শিক্ষায় শিক্ষিত, চেয়ারম্যানের চিন্তাধারায় শিক্ষিত বিপ্লবী শ্রমিক ক্যাডার এবং এই ক্যাডার তৈরি করা যায় একমাত্র গোপন পার্টি সংগঠনের মাধ্যমে। ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক শ্রেণীর শিক্ষা ক্ষেত্র হয় তখনই যখন দেশে বিপ্লবী পরিস্থিতি নাই, ধনিক শ্রেণীর শক্তি অনেক বেশি বলে মনে হয় এবং শ্রমিক শ্রেণী নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল মনে করে। সেই সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শ্রমিকের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং মালিকশ্রে ণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে সে সংগ্রামী কৌশল শেখে এবং সংগ্রাম সম্পর্কে তার বিশ্বাস বাড়ে।
…বিপ্লবী পরিস্থিতির যুগে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগঠন হচ্ছে পার্টি সংগঠন। বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো দেশে, যেখানে মূল কেন্দ্র হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে, সেখানে পার্টির দায়িত্ব আরও বেশি এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। কারণ এই পার্টি সংগঠন ছাড়া তার নেতৃত্বের ভূমিকা সে পালন করতে পারে না। তাই ভারতবর্ষের বিপ্লবী পরিস্থিতি মানলে একথাও মানতে হবে, ভারতবর্ষে আজকের কাজ গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা, গণসংগঠন নয়। এই গোপন পার্টি সংগঠনই শ্রেণী সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবে। মে, ১৯৬৯

৩৫। চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন যে, জ্ঞানের উৎস- উৎপাদনের সংগ্রাম ও শ্রেণীসংগ্রাম এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। প্রথম দুটি উৎসই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের নেই, বরং আছে শ্রমিক ও কৃষক জনতারই। …তাই ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি তৈরির রাজনীতি, শ্রমিক এবং দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকেরাই বোঝালে সবচেয়ে ভাল বোঝেন। কারণ এই সমাজব্যবস্থার উৎপীড়ন ও শোষণ তাদের উপরই সবচেয়ে বেশি। বিপ্লব তাদেরই স্বার্থ বহন করে। ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯

৩৬। ‘বুর্জোয়া মতাদর্শের প্রভাব আমরা আরও দেখি মানুষের চেয়ে অস্ত্রের উপর আমাদের বেশি নির্ভরশীলতায়। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের শিক্ষা। কমরেড লিন পিয়াওয়ের শিক্ষাঃ ‘অস্ত্রের চেয়ে মানুষ বড়’। অত্যাচারিত উৎপীড়িত কৃষক খালি হাতেই এবং হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়েই শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামে এবং সংগ্রামের প্রয়োজনে, বিপ্লবের তাগিদে, সে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় শাসকশ্রেণীর হাত থেকে। এইভাবেই গড়ে ওঠে জনতার সশস্ত্র বাহিনী। …উন্নত অস্ত্র দিলেই গেরিলা যুদ্ধ শুরু করা যায় না। সেই অস্ত্র ধারণ করার মত মানুষ তৈরি করতে হয়। যতদিন সেই মানুষ তৈরি না হুচ্ছে, ততদিন সে অস্ত্র অর্থহীন। সে মানুষ তৈরি হয় একমাত্র বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের মারফতে, শ্রেণী শত্রুদের খতম করার মারফতে। এ কাজ যে গেরিলা ইউনিট করেনি, সেই ইউনিট বন্দুক নিয়েও কিছু করতে পারে না। ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯

৩৭।‘…চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সংগে সশস্ত্র বাহিনীর যোগাযোগ এক দুর্দমনীয় শক্তির আধার, যা দিয়ে যে কোনো শক্তির মোকাবিলা করা যায়। তাই পার্টি সভ্যদের প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক প্রচারকে উন্নত করার প্রচেষ্টায় রত থাকতে হবে এবং এই কাজ আমরা করতে চাইব তখনই- যখন আমরা দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের চিন্তা ভাবনাগুলো বুঝতে শিখব এবং গণ লাইন প্রচারের ভেতর দিয়ে তাদের সাথে একাত্ম হতে পারব। ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯

৩৮। পৃথিবীর মানুষের পবিত্রতম দায়িত্ব সফল করে তোলার একটা মহৎ অংশগ্রহণ করতে পারি আমরা ভারতবর্ষের বিপ্লবীরা, যদি আমরা শিখি চেয়ারম্যানের সে মহান আহ্বান।, ‘প্রতিটি দিন প্রতিটি মূহুর্তকে শক্ত হাতে কষে ধর’। আমরা জানি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, ভারতবর্ষকে মুক্ত করার সংগ্রামে ভারতবর্ষের মানুষ ত্যাগ স্বীকারে কোনদিন পিছপা হয় নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ সংগ্রাম করেছেন, জীবন দিয়েছেন কিন্তু সফল হতে পারেননি। ভারতবর্ষ কাপুরুষের দেশ নয়। আমাদের দেশের মানুষ মহৎ আদর্শে কোনো দিন জীবন দিতে ভয় পায় না। পৃথিবীর মহত্তম পবিত্রতম দায়িত্বের কথা ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেবে লক্ষ লক্ষ শহীদদের জন্মদাতা ভারতবর্ষের কৃষকশ্রেণী, অনিবার্যভাবে ইতিহাসের মঞ্চে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাবে, প্রমাণ করবে তাঁরা ইতিহাসের নিয়ন্তা। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রেণীশত্রুদের ধ্বংস করে ধ্বংস করবে এই অত্যাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে, ভারতবর্ষের মাটিতেই। কবর রচনা করবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজদের।

২ অক্টোবর, ১৯৬৯

৩৯। কমিউনিস্ট পার্টি(মার্কসবাদী- লেনিনবাদী)-র সভ্য ও দরদীরা আপনারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিয়েছেন ভারতবর্ষকে মুক্ত ও স্বাধীন করার। আপনারা দায়িত্ব নিয়েছেন শ্রমিকশ্রেণীকে উদ্বুদ্ধ করার। দায়িত্ব নিয়েছেন কৃষিবিপ্লবকে সফল করার। দায়িত্ব নিয়েছেন সশস্ত্র সংগ্রামের আগুন সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেবার। কৃষকের গেরিলা যুদ্ধকে সংগঠিত করে বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলার, গ্রামাঞ্চলে মুক্তাঞ্চলকে সুদৃঢ় করে বিপ্লবকে সফল করার। দায়িত্ব নিয়েছেন ভারতবর্ষকে মুক্ত স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার। দায়িত্ব নিয়েছেন সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে শোষণমুক্ত ভারতবর্ষ গড়ে তোলার। বিজয় অর্জন করার, মৃত্যুকে জয় করার, দুর্বার সাহস আপনাদের আছে। কারণ আপনারা হলেন লক্ষ লক্ষ শহীদের উত্তরসাধক। আজ আপনাদের সংগ্রাম এক হয়ে গেছে হাজার হাজার বছরের মানুষের স্বপ্ন ও সাধনার সাথে। আপনাদের সংগ্রাম শুধু ভারতবর্ষের জাতীয় সংগ্রাম, নয়, মনুষ্যজাতির বিশ্বব্যাপী অগ্রগতির আপনারা হলেন অন্যতম অগ্রবাহিনী। আন্তর্জাতিক দায়িত্ব জাতীয় দায়িত্বের সাথে এমনভাবে মিল হওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বোধ হয় নি। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বিশ্বের বিপ্লবী সংগ্রাম আজ এক মহামিলনের ক্ষেত্রে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা তারই অংশীদার, তারই সহযোদ্ধা। সুতরাং নষ্ট করার মত একটি মূহুর্তও আমাদের হাতে নেই। আপনারা সমস্ত শক্তি নিয়ে এগিয়ে যান। জয় আমাদের হবেই। মুক্ত পৃথিবীতে মুক্ত ভারতবর্ষ আজ দিগন্তে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সেই শুভদিনকে স্বাগত জানাতে আপনারা সমস্ত শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলুন। ২ অক্টোবর, ১৯৬৯

৪০। আমাদের দেশের ব্যাপক ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক লিখতে পড়তেও জানেন না। অথচ আজ কৃষকের বিপ্লবী যুদ্ধের বিকাশ ঘটাতে হলে এবং সংগ্রামে দৃঢ়তা ও অবিচলতা আনতে হলে প্রয়োজন ‘চেয়ারম্যানের’ উদ্ধৃতি কৃষকদের মাঝে প্রচার ও প্রসার করা, তাঁর ‘তিনটি লেখা’- কে বারবার পড়াশোনা ও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করানো এবং সংগ্রামীদের ‘শৃঙ্খলার তিন বিধি’ এবং ‘যে আটটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে’ এগুলি দৈনন্দিন তাঁদের পড়ানো। আজকের দিনে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে এই কাজের ভার নিতে হবে। তা ছাড়া মনে রাখতে হবে, এই কয়টি লেখা আজ যে শুধু কৃষক জনতার সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্যই প্রয়োজন তাই নয়, শ্রমিক- কৃষক- মধ্যবিত্ত, যারাই বিপ্লবী চিন্তায় চিন্তিত তাদের এই লেখা কয়টি বারবার অধ্যয়ন করতে হবে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তবেই সংগ্রামী মানুষের রাজনৈতিক চেতনার মান উন্নত হবে। …শুধু কৃষক জনতা নয়, অন্য সমস্ত শ্রেণীর বিপ্লবী জনতার মধ্যে এই লেখা কয়টির মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার আগ্রহ সৃষ্টি করার দায়িত্ব বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের রয়েছে। এই কাজ করার মধ্য দিয়েই তাঁরা চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সৃষ্টিশীল প্রয়োগ করতে পারবেন এবং এইভাবে ভাল কমিউনিস্ট তৈরি হবে। আরেকটি দায়িত্বও বুদ্ধিজীবীদের পালন করতে হবে। সে দায়িত্ব হচ্ছে, পৃথিবীর দেশে দেশে যে বিপ্লবী যুদ্ধ চলছে তাঁর অভিজ্ঞতা কৃষক জনতার মধ্যে প্রচার করা; মহান চীন বিপ্লবের শিক্ষাকে কৃষক জনসাধারণের মধ্যে প্রচার ও প্রসার করা। এই কাজগুলি করার মধ্য দিয়েই বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের সাথে একাত্ম হতে পারবেন। তবেই তাঁরা ভাল বিপ্লবী হতে পারবেন। ৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯

৪১। আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতা কমিউনিস্ট আন্দোলনে বারবার সংগ্রাম করেছেন, অসীম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন দিয়েছেন। পুন্নাপ্রা- ভয়ালার বীর শহীদরা, তেলেঙ্গানার বীর সংগ্রামীরা, ভারতের প্রত্যেকটি প্রদেশের শ্রমিক ও কৃষক সংগ্রামীরা বহু জীবন দান করে যে ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে যেতে হবে আমাদের, আমরা তারই উত্তরসাধক। যে কমিউনিস্ট পার্টির নাম করে কায়ুরের বীরেরা ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, সেই কমিউনিস্ট পার্টিরই প্রতিনিধি আমরা, সেই কমিউনিস্ট পার্টিই আজকের ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মার্কসবাদী- লেনিনবাদী)। সেই মহান ঐতিহ্যকে বহন করার জন্যই আজ আমাদের প্রয়োজন সেই মহান অভিজ্ঞতার সারসংকলন করা এবং ভুল চিন্তাগুলির বিরুদ্ধে তীব্রতম শ্রেণী ঘৃণার সৃষ্টি করা। ৪ ডিসেম্বর,১৯৬৯

৪২। ভারতবর্ষের কমরেডরা সমস্ত দুর্বলতা কাটিয়ে ফেলুন, ছড়িয়ে দিন আপনাদের সংগ্রাম প্রতিটি গ্রামে গ্রামে, ভুলে যান আত্মরক্ষার কথা। এটা আত্মত্যাগের যুগ। এটা বিশ্বের মুক্তির যুগ; দেশে দেশে শোষিত নির্যাতিত মানুষ অত্যাচার আর শোষণের হাত থেকে পাবেন মুক্তি। সেই পবিত্র দায়িত্ব নিয়ে সমস্ত আত্মরক্ষার কথা ভুলে আঘাত করুন, ধ্বংস করুন শত্রুকে। কোটি কোটি মানুষের বিপুল অভ্যুত্থান আপনার দুর্বল হাতকে শক্তিশালী করে তুলবে। দুর্বার গতিতে আপনি এগিয়ে যাবেন ভারতবর্ষের মুক্তির পথে, বিশ্বের মুক্তির পথে। আমাদের পার্টিকংগ্রেস ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে শ্রেণীসংগ্রামকে ছড়িয়ে দেবার যে কর্তব্য নিয়েছে তাকে কার্যকরী করবার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে এগিয়ে চলুন। চেয়ারম্যানের বাণী আপনার মন্ত্র হউক; ‘দৃঢ় হও, আত্মবলিদানে ভীত হয়ো না, সমস্ত বাধা- বিঘ্ন অতিক্রম করে বিজয় অর্জন কর।  ২১ মে, ১৯৭০

৪৩। আমাদের পার্টিকে যেটা ব্যাপকভাবে চালু করতে হবে সেটা হল সমালোচনার পদ্ধতি। আত্মসমালোচনা সাধারণ কর্মী ও জনসাধারণের উদ্যোগকে কমিয়ে দেয়। আত্মসমালোচনা করেও বিটি রণদিভের মতো লোক নেতা হয়ে বসতে পারে। সমালোচনার পদ্ধতির মধ্যে সমালোচকদের রাজনৈতিক মান এবং বিপ্লবী সতর্কতা বাড়ে বলে পার্টির বিপ্লবী চরিত্র অক্ষুন্ন রাখতে গভীরভাবে সাহায্য করে। আমাদের দুটি বিষয় সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। আত্মনির্ভরতা বাড়ায় আত্মতুষ্টির মনোভাব আর আত্মবিশ্বাস একজনকে উদ্ধত করে তোলে; সুতরাং এই দুটি বিচ্যুতির বিরুদ্ধে পাহারাদারের কাজ করার জন্য আমাদের সমালোচনার আহ্বান করতে হবে। এই সমালোচনা আবার বিভেদ বাড়ানোর কাজে সাহায্য করতে পারে। আমাদের নেতৃত্ব ও ক্যাডাররা যদি শান্তভাবে তা গ্রহণ করেন এবং সমালোচিত হওয়ার জন্য মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত থাকেন তবে সমালোচনার পদ্ধতি বিভেদপন্থার দিকে এগোবে না। মনে রাখতে হবে সমালোচনা সবসময় সুষ্ঠু, সুন্দর ও মার্জিত নাও হতে পারে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্যাডারদের নাম না করে তাঁদের লাইনের সমালোচনা একেবারে এলাকার স্তরে ও ব্যাপক বিপ্লবী জনগণের স্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। এটা সব সময় মনে রাখতে হবে সমালোচনা না হওয়ার চেয়ে তিক্ত সমালোচনা অনেক ভাল। অক্টোবর, ১৯৭০

৪৪। গোপন পার্টিতে সব সময়ই উচ্চতর কমিটির সাথে পার্টির সাধারণ সভ্য ও ইউনিটের বিচ্ছিন্নতা ঘটে। এর ফলে উচ্চতর কমিটিতে আমলাতান্ত্রিক মনোভাব দেখা দেয়। হুকুম , নির্দেশ, ম্যানডেট ইত্যাদির দ্বারা পার্টি সংগঠন চালানোর একটা ঝোক আসে। এগুলো সবই পুরোনো পার্টি থেকে নিয়ে আসা পাপ। আমরা কোনো কাজ নির্দেশ দিয়ে করি না। আমাদের সব কাজ হবে নিম্নতর ইউনিটের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে এবং কাজের তৎপর্য বুঝিয়ে। …এই পথেই পার্টি তার বিপ্লবী ক্ষমতা বাড়াতে পারে ও পার্টি- ঐক্য দৃঢ় হয়। …নিম্নতর ইউনিটগুলিকে উচ্চতর সমালোচনা করায় সাহায্য করতে হবে এবং প্রতিস্তরে নিম্নতর ইউনিটের মতামত গ্রহণ করতে হবে। পার্টির মধ্যে দুই লাইনের সংগ্রাম আছে এবং সর্বদাই থাকবে। সেই সংগ্রাম নীতিসম্মতভাবে চালাতে হবে। এইভাবেই পার্টির কেন্দ্রিকতা শক্তিশালী হবে।

৪ অক্টোবর, ১৯৭১ 

৪৫। একটা মানুষের দুটি দিক আছে, একটা ইতিবাচক দিক আছে, একটা নেতিবাচক দিক আছে, ……ইতিবাচক দিকটা যার বেশি থাকে, তাঁকে আমরা ভালো লোক বলবো। আর নেতিবাচক দিক যার বেশী স্বভাবতঃই আমরা তাঁকে খারাপ দিক লোক বলবো। ……এই দুটো দিক আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে। এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক নিয়ম। …৬০%-৪০% যদি হয় তবে ৬০% কেই নেব। ব্যক্তিগত দেখাশোনা(individual care)- প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে ধরে তার ইতিবাচক দিক বিকাশ করার চেষ্টা করবো। ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে পার্টি গঠনের কথা বলা যে হয় তার উদ্দেশ্য হল এই, তার জীবন্ত ধারণা(living idea)- কে ধরতে হবে।…সংগ্রাম- সমালোচনা- রূপান্তর। সংগ্রাম যেমন করবো সমালোচনাও করবো ও রূপান্তর করবো। এবং এটা রূপান্তর করানো যায়। ৫ এপ্রিল, ১৯৭২

৪৬। সবসময় মনে রেখো চেয়ারম্যানের শিক্ষা: ভুল রাজনৈতিক লাইন ও ভুল মিলিটারি লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই একমাত্র সঠিক লাইন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অর্থাৎ এই দুই লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই ক্যাডাররা কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক তা বুঝতে শিখবে। দ্বান্দ্বিক নিয়মেই এক সবসময় দুইয়ে বিভক্ত হবে এবং দ্বন্দ্ব স্থায়ী থাকবে। তাই আমাদের ঐক্য, সংগ্রাম ও উন্নত পর্যায়ের ঐক্য এই পদ্ধতি নিয়েই চলতে হবে। যত উচু থেকেই ভুল লাইন আসুক না কেন তার বিরোধিতা করতে ইতস্তত করো না। তবে সংগ্রামের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাপকতর ঐক্য, এ কথাটিও ভুলো না। আজকের ঐক্য কাল ভেঙ্গে যাবে এটা ঐতিহাসিক নিয়ম। তাই নতুন শক্তির সমাবেশ ও তার সাথে ঐক্য আমাদের সব সময় লক্ষ্য হবে। ………নতুন ও পুরাতনের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে নতুনকে সমর্থন করতে ইতস্তত করো না। অবশ্য নতুনকে তার চিন্তা জগতকে পরিবর্তন করতে হবে।এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ব করতে হবে। এবং চিন্তাজগতের বিপ্লবীকরণের কাজে নতুনরা সফল হতে পারে। ১০ জুলাই, ১৯৭১

৪৭। পার্টির মধ্যে দুই লাইনের সংগ্রাম আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। দুই লাইন যখন আমরা বলি তখন একটা সঠিক এবং একটা বেঠিক। আমাদের দেশে বেঠিক লাইন মানে সংশোধনবাদ যা আজকের যুগে একটি প্রতিক্রিয়াশীল মতবাদ। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার্টি কর্মী এবং সাধারন মানুষ কোনটা ঠিক এবং কোনটা বেঠিক তা বুঝতে শিখবেন। সুতরাং এই সংগ্রাম নীতিসম্মত উপায়ে পরিচালনা করার উপরই পার্টির শক্তি এবং আঘাত করার ক্ষমতা বাড়বে। আজকের দুনিয়া বোঝার জন্য এবং কোনটা সঠিক লাইন তা বোঝার জন্যে কমরেডদের মহান চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক প্রকাশিত ‘জনযুদ্ধের জয় দীর্ঘজীবি হোক’ এবং মহান চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ‘নবম কংগ্রেসের রিপোর্ট’ এই দুইটি বিশেষভাবে অনুশীলন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই দুইটি লেখাতেই আজকে যে প্রশ্নগুলো উঠছে তার জবাব আছে। এবং এই দুইটি লেখা অনুশীলন করলেই কোনটা সঠিক ও কোনটা বেঠিক তা বোঝা যাবে। তাই আমি কমরেডদের কাছে বিশেষভাবে আবেদন জানাচ্ছি যে, এই দুইটি লেখা জীবন্তভাবে পড়া এবং কাজে লাগানোর সচেতন প্রচেষ্টা তাঁরা চালাবেন। ৪ আগষ্ট, ১৯৭১

৪৮কাদের সাথে আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো
১. যারা চেয়ারম্যান মাওকে বিশ্ববিপ্লবের নেতা হিসেবে মানেন এবং তাঁর চিন্তাধারাকে বর্তমান যুগের সর্বোচ্চ মার্কসবাদ- লেনিনবাদ হিসাবে স্বীকার করেন।
২. যারা বিশ্বাস করেন ভারতবর্ষের সর্বত্রই বৈপ্লবিক অবস্থা বিদ্যমান।
৩. যারা বিশ্বাস করেন যে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এই বিপ্লবের বিকাশ ও অগ্রগতি সম্ভব। ১৯৬৫

@ লেখাটি PDF ফাইল আকারে ডাউনলোড করতে নীচে ক্লিক করুন

কমরেড চারু মজুমদারের উদ্ধৃতি

Advertisements

2 Comments on “নকশালবাড়ীর মহান কমরেড চারু মজুমদারের উদ্ধৃতি-”


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.