ভারতঃ পুলিসি অভিযানের প্রতিবাদে বাসে আগুন দিল মাওবাদীরা

bus1

রায়পুর: নকশাল বিরোধী পুলিসি অভিযানের প্রতিবাদে ছত্তিশগড়ে যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দিল মাওবাদীরা৷ তবে হতাহতের কোনও খবর নেই৷ সোমবার রাতে মাওবাদী উপদ্রুত সুকমা জেলায় তাহাকওয়াড়া গ্রামে ৩০ নম্বর জাতীয় সড়কে ঘটনাটি ঘটে৷

সোমবার রাতে বস্তার থেকে হায়দরাবাদে যাচ্ছিল বাসটি৷ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় বাসটি থামায় সশস্ত্র মাওবাদীর দল৷ বাসটিকে ঘিরে ফেলে প্রায় ৫০ জন সশস্ত্র মাওবাদীর দল৷ যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে বলে তারা৷ এর পর ফাঁকা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ গত বছর এপ্রিল মাসে এই এলাকাতেই অতর্কিত হানায় ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মীকে খতম করছিল মাওবাদীরা৷

অনুবাদ সূত্রঃ

http://timesofindia.indiatimes.com/india/Maoist-commander-gunned-down-in-Chhattisgarh-rebels-torch-passenger-bus/articleshow/49909794.cms

Advertisements

শহীদ মাওবাদী কমরেড কিষানজী’র একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার

প্রাককথন

কমরেড কিষানজী

সন্দেহাতীতভাবে ভারত সরকারের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের তালিকায় তার অবস্থান দুই নম্বরে (এই তালিকার ১ নম্বর নাম কমরেড গণপতি), তিনি সিপিআই (মাওবাদী)’এর পলিট ব্যুরোর সদস্য ও সামরিক শাখার প্রধান কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও, ওরফে ‘প্রহলাদ’, ওরফে ‘বিমল’, ওরফে ‘রামজী’, ওরফে ‘কিষানজী’ (৫৭)। তাঁর বেড়ে উঠা অন্ধ্রপ্রদেশে গান্ধী ও রবি ঠাকুরের বই পড়ে। কিন্তু বিশ্বের মুক্তির ইতিহাস অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পর এক পর্যায়ে তিনি বিপ্লবাকাঙ্খায় অরণ্যে আত্মগোপন করেন। তাঁর জন্ম ১৯৫৪সালে অন্ধ্রপ্রদেশের করিমনগর জেলার পেদপল্লী গ্রামে (উঃ তেলেঙ্গনা)। ১৯৮০ সালে কান্দাপালি সিথামাইয়াহ নামের এক স্কুল শিক্ষকের নেতৃত্বে “পিপলস্ ওয়ার গ্রুপ” (পিডব্লিউজি) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অন্যতম সহযোগী ছিলেন কিষানজী। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ‘পিডব্লিউজি’ এবং ‘মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়া’ একীভুত হয়ে গঠিত হয় ‘সিপিআই (মাওবাদী)’। ১৯৮২ সালে সার্চ অপারেশন চলার সময়ে পুলিশ তাঁর পেদপল্লী গ্রামের বাড়ীটি ভেঙ্গে দেয়। তিনি আত্মগোপনে চলে যান, এরপরে আর মায়ের সাথে দেখা করতে আসেননি; তবে তেলেগু পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তাঁর মা’কে লিখতেন। কিষানজী’র স্ত্রী সুজাতাও মাওবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত। তিনি দান্তেওয়াড়া এলাকার মাওবাদী কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করেন। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়’এর নক্সাল এলাকায় ২০ বছর জড়িত থাকার পর তাকে পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়া হয়। লালগড় পুলিশ ক্যাম্প থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কিষানজী’র একটি গুপ্ত আশ্রয়স্থল থাকা সত্ত্বেও তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী (র’, সিআরপিএফ, বিএসএফ, পুলিশ, সেনাবাহিনী) তাঁকে খুঁজে না পাওয়ার মূলে ছিল জনগণের সাথে তাঁর একাত্মতা। তিনি প্রতিদিন ১৫টি সংবাদপত্র পড়তেন, সেই সাথে তার পার্টির প্রকাশনাগুলোর সাথে যুক্ত থাকতেন। তিনি ছিলের সিপিআই (মাওবাদী) পার্টির সামরিক শাখার প্রধান। মুখের ছবি তুলতে না দিলেও তিনি সাংবাদিকদের সাথে মন খুলেই কথা বলতেন। ৩৭ বছর যাবৎ একই মতাদর্শে অটুট থেকে নিপীড়িতদের মুক্তির সংগ্রামে আমৃত্যু লড়ে যান এই বিপ্লবী।

২৪ নভেম্বর ২০১১ ছিল এক শোকের দিন, সেদিন ‘ভুয়া সংঘর্ষ’ (ফেক এনকাউন্টার) দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক সিআরপিএফ দ্বারা হত্যা করা হয় কমরেড কিষানজী’কে। বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারের শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া চলছিল মাওবাদীদের সাথে। ২৩ তারিখে কিষানজী এমনই এক গোপন সভায় হাজির হলে তাকে ধোঁকা দিয়ে আটক করা হয় এবং অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করার পর ২৪ নভেম্বর ২০১১ তারিখ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে এক ভুয়া এনকাউন্টারের নাটক সাজানো হয়।

ধিক্কার জানাই ভারত রাষ্ট্রকে বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য…

শহীদ কমরেড কিষানজী’র প্রতি রইলো আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। কিষানজী শুধু কোন একক ব্যক্তি নন; তিনি এমনই এক সত্তা, যা বিদ্যমান সকল মুক্তিকামী মানুষের মাঝে। তাই কিষানজী’দের মৃত্যু নাই, তারা চিরঞ্জীব। তিনি বেঁচে থাকবেন, গণমানুষের মুক্তির নেশায়, লড়াই–সংগ্রামে।

লাল সালাম, কমরেড…..

——————————————–

(২০০৯ সালের নভেম্বরে “তেহেলকা ডট কম”এ প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে কমরেড মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও ওরফে ‘কিষানজী’ কথা বলেন সশস্ত্র সংগ্রাম, শান্তি আলোচনা, দলের অর্থায়নের উৎস, ভারতের প্রথাগত গণতন্ত্র ও জনগণতন্ত্রের পার্থক্য এবং সিপিআই (মাওবাদী)’এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তুষা মিত্তাল।)

মধ্যরাত্রিতে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির উদ্ধৃতাংশ:

প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনি কিভাবে সিপিআই (মাওবাদী) দলে যোগ দিলেন?

সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছেন কমরেড কিষানজী

কমরেড কিষানজী: আমি অন্ধ্র প্রদেশের করিম–নগরে জন্মগ্রহণ করি। ১৯৭৩ সালে গণিতে স্নাতক ডিগ্রীর পর আমাকে আইনের মাধ্যমে অভিযুক্ত দেখিয়ে হায়দ্রাবাদে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’(Telangana Sangarsh Samiti)’এর সাথে আমার সংযুক্তি থেকে; এখানে উল্লেখ্য যে, ‘তেলেঙ্গানা সংঘর্ষ সমিতি’ পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্যের দাবী জানাচ্ছিল সেসময়ে। ১৯৭৫ সালের জরুরী অবস্থার মধ্যেই আমি অন্ধ্র প্রদেশে ‘রেডিক্যাল স্টুডেন্টস মুভমেন্ট’ (Radical Students Union (RSU))’এর কাজ শুরু করি। এরপরে আমি বিপ্লবের উদ্দেশ্যে আত্মগোপনে চলে যায়। সেসময়ে বেশ কিছু বিষয়ে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম; এর মাঝে কিছু বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ, যেমন: লেখক ভারাভারা রাও (যিনি বিপ্লবী লেখক সংঘ, Revolutionary Writers Association’এর প্রতিষ্ঠাতা), তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক আবহ এবং একটি প্রগতিশীল পরিবেশ, যে পরিবেশে আমার বেড়ে উঠা।

আমার বাবা ছিলেন একজন গণতন্ত্রী এবং মহান মুক্তিযোদ্ধা [*তিনি ১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন]। তিনি রাজ্য কংগ্রেস পার্টির সহসভাপতিও ছিলেন। আমরা বর্ণে ব্রাহ্মণ হলেও আমাদের পরিবার বর্ণ বিশ্বাস করতো না। যখন আমি সিপিআই (মার্কসবাদী–লেনিনবাদী) দলে যোগদান করি,আমার বাবা কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন। তখন তিনি একথা বলেন যে, ‘এক ছাদের নিচে দুই ধারার রাজনীতি বেঁচে থাকতে পারে না।’ তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামে নয়। ১৯৭৭ সালে জরুরী অবস্থা শেষ হবার পর আমি সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেই। ৬০ হাজারেরও বেশী কৃষক এই আন্দোলনে যোগ দেন, এই কৃষক আন্দোলন পরবর্তীতে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: গৃহমন্ত্রী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) সিপিআই (মাওবাদী)’এর সাথে বন অধিকার, জমি অধিগ্রহণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল SEZs(Special Economic Zones)’এর মতো বিষয়গুলোতে কথা বলতে আগ্রহী। আপনারা তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন কেন? তিনি শুধুমাত্র আপনাদের সহিংসতা স্থগিত রাখার কথাই বলেছেন।

কমরেড কিষানজী: সরকার তার বাহিনী প্রত্যাহার করলে আমরা আলাপের জন্য প্রস্তুত। সহিংসতা আমাদের কর্মসূচীর অংশ নয়। আমাদের এই সহিংসতা কেবলই আত্মরক্ষার জন্য। সরকারী বাহিনী আমাদের লোকদের প্রতিদিন আক্রমণ করছে। বাস্তারে গত মাসে কোবরা বাহিনী ১৮জন নিরপরাধ আদিবাসী এবং ১২জন মাওবাদীকে হত্যা করেছে। ছত্তিশগড়ে উন্নয়ন খাতে যারা আমাদের সহায়তা করতো, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এগুলো বন্ধ করুন; সহিংসতাও বন্ধ হয়ে যাবে। সম্প্রতি, ছত্তিশগড়ে পুলিশের ডিজিপি একটা সন্ত্রাসী সংগঠন ‘সালওয়া জুডুম’এর ৬,০০০ বিশেষ পুলিশ সদস্যদের নিজেদের গৌরব বলে তকমা লাগিয়েছেন। অথচ,তারা বছর বছর ধরে আদিবাসীদের ধর্ষণ, হত্যা, লুটের সাথে জড়িত। ‘সালওয়া জুডুম’এর অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। সরকার নিজের মনগড়া কথা বলে যেতে পারে, তবে আমরা তা বিশ্বাস করিনা। তারা কিভাবে এই কর্মপন্থার পরিবর্তন ঘটাবে, যখন তাদের অধিকারে কিছুই নাই? সবই তো যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বব্যাংকের এখতিয়ারে!

প্রশ্ন: কোন পরিস্থিতিতে আপনারা সহিংসতা কমাবেন?

কমরেড কিষানজী: প্রধানমন্ত্রীকে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সেই সাথে এই সব অঞ্চলে মোতায়েন করা সৈন্যদের প্রত্যাহার করতে হবে। এই সেনাবাহিনী নতুন কিছু না, আমরা গত ২০বছর যাবৎ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছি। সকল বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সেনা প্রত্যাহারের জন্য যা সময় লাগে নিন, কিন্তু এসেময়ে যেন আমাদের উপর পুলিশী হামলা না হয়, তা নিশ্চিত করুন। যদি সরকার তাতে রাজী থাকে, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে কোন সহিংসতা হবে না। আমরা পূর্বের ন্যায় গ্রামাঞ্চলে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

প্রশ্ন: এতে সম্মত হওয়ার পূর্বে আপনারা কি রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, এক মাসের জন্য আপনারা আক্রমণ করবেন না?

কমরেড কিষানজী: আমরা এবিষয়টা নিয়ে চিন্তা করবো। এবিষয়ে আমাকে দলের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু এমন কী নিশ্চয়তা আছে যে, তাদের তরফ থেকে এই এক মাসে কোন সহিংসতা হবে না? তাই সরকারের তরফেই এই ঘোষণা আসতে হবে এবং প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এটা জনগণের জন্য শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী হবে না। অন্ধ্র প্রদেশের দিকে তাকান। তারা আলোচনা শুরু করলো,আবার সেই আলোচনা ভেঙ্গেও দিল। আমাদের একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অন্ধ্রের রাজ্য সচিবের সাথে দেখা করতে গেলেন; পরবর্তীতে, সরকারের সাথে আলাপ করার দুঃসাহসের অভিযোগে (!) পুলিশ উনাকে গুলি করে হত্যা করে।

প্রশ্ন: যদি সত্যিই আপনারা গণমানুষের কর্মসূচী নিয়ে কাজ করেন, তাহলে সাথে অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তা কী?আপনার লক্ষ্য কি ‘আদিবাসী কল্যাণ’, নাকি ‘রাজনৈতিক শক্তি’?

কমরেড কিষানজী: রাজনৈতিক শক্তি। আদিবাসী কল্যাণকে আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া আমরা কিছুই অর্জন করতে পারব না। একটি সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কেউ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। আদিবাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকার ফলেই তারা শোষিত এবং এই শোষণ তাদেরকে সবচেয়ে অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়াদের চরমে পৌঁছে দিয়েছে। নিজের সম্পদের উপরেও তাদের কোন অধিকার নেই। তাসত্ত্বেও, আমাদের মতাদর্শ অস্ত্রের উপর স্থিত না। আমরা অস্ত্রকে দ্বিতীয় অবস্থানে স্থান দেই। অন্ধ্রে আমরা একারণেই এক বড় ক্ষতির সম্মুখীন হই।

প্রশ্ন: সরকার বলছে আগে সহিংসতা থামান, আপনারা বলছেন আগে সেনা প্রত্যাহার করুন। এই বুদ্ধিবৃত্তিশূণ্য চক্রে আদিবাসী সমাজ, আপনারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে দাবি করেন, তারা সর্বাধিক কষ্টকর অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে।

কমরেড কিষানজী: আচ্ছা, তাহলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আনা হোক। অন্ধ্র প্রদেশ হোক, পশ্চিমবঙ্গ বা মহারাষ্ট্র, আমরা কখনোই সহিংসতা শুরু করিনি। প্রথম আক্রমণ সবসময় সরকার পক্ষ থেকেই আসে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম [ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি (মার্কসবাদী)]’এর সন্ত্রাসীরা তাদের দলের সাথে যুক্ত নয় এমন কাউকেই গ্রামে প্রবেশ করতে দেয় না (*তৎকালীন সময়ে সিপিএম ছিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল)। পুলিশ ১৯৯৮ সাল থেকে লালগড় এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে আছে। এমতাবস্থায়, আলুর মূল্যবৃদ্ধি অথবা বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য কিভাবে আমরা চাপ দিতে পারি? এজন্য এমন কোন মঞ্চ আমাদের নাই। যখন পশ্চিমবঙ্গে সর্বনিম্ন মজুরি দেওয়ার কথা প্রতিদিন ৮৫ টাকা, অথচ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে ২২ টাকা করে; আমরা দাবী জানালাম ২৫ টাকা করার। মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল যখন পাণ্ডবদের দাবী অনুযায়ী কৌরভরা পাঁচটি গ্রাম তাদের দিতে অস্বীকার করে, তখন। রাষ্ট্রও আমাদের ৩ টাকা মজুরী বৃদ্ধিকে অগ্রাহ্য করলো। এখানে আমরা পাণ্ডব, আর তারা কৌরভ।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন সহিংসতা আপনাদের কর্মসূচী নয়, কিন্তু আপনারা গত চার বছরে প্রায় ৯০০ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই এসেছে গরীব আদিবাসী পরিবার থেকে। এমনকি যদি সেটি অপরপক্ষের সহিংসতার কাউন্টারও হয়ে থাকে, এর মধ্য দিয়ে গণ–মানুষের পক্ষের এই লক্ষ্যে কিভাবে এগুনো সম্ভব?

কমরেড কিষানজী: আমাদের যুদ্ধ পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আমরা পুলিশের সাথে হতাহতের সংখ্যা কমাতে চাই। বাংলায়, অনেক পুলিশ পরিবার আসলে আমাদের সাথে সহমর্মী। সেখানে গত ২৮ বছরে ক্ষমতাসীন সিপিএম প্রায় ৫১ হাজার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হ্যাঁ, আমরা গত সাত মাসে ৫২ জন সিপিএম সদস্যকে হত্যা করেছি। আর তা কিন্তু সিপিএম ও পুলিশের পশুর ন্যায় বর্বর আচরণের ফলেই করতে হয়েছে।

প্রশ্ন: সিপিআই (মাওবাদী) কিভাবে গঠিত হলো? আপনাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কী কী অভিযোগ রয়েছে?

কমরেড কিষানজী: সেখানে কোন চাঁদাবাজী হয়নি। আমরা কর্পোরেট এবং বড় বুর্জোয়াদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করেছি, এটি কর্পোরেট সেক্টর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে তহবিল সংগ্রহে অর্থায়ন ভিন্ন অন্য কিছু নয়। আমাদের একটি ষাণ্মাসিক নিরীক্ষা হয়। একটা পয়সাও নষ্ট হয় না। গ্রামবাসীরাও স্বেচ্ছায় প্রতি বছর তাদের দুই দিনের আয় পার্টি তহবিলে অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকেন। গাদচিরলি’তে দুই দিনের বাঁশ কাটা থেকে আমরা ২৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। বাস্তারে টেন্ডু পাতা সংগ্রহ থেকে আমরা প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করি। এছাড়াও, কৃষকেরা ১০০০ কুইন্টাল ধান অনুদান হিসেবে দিয়ে থাকে।

প্রশ্ন: যদি কৃষক এই অনুদান দিতে রাজি না হয়?

কমরেড কিষানজী: এমনটা কখনোই হবে না।

প্রশ্ন: এর কারণ কি ভয়?

কমরেড কিষানজী: কখনোই না। তারা আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমরা যে উন্নয়ন কর্মকান্ডের উদ্যোগ নিয়েছি, তার জন্য একটা পয়সাও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে দাবী করিনি।

প্রশ্ন: মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় আপনারা কী কী উন্নয়ন করেছেন? ছত্তিসগড় এবং ঝাড়খন্ডের আদিবাসীদের জীবন–ধারা কিভাবে উন্নত হয়েছে?

কমরেড কিষানজী: আমরা মানুষকে রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, তাদেরকে ধনীদের জীবন–যাত্রা ও তারা (আদিবাসীরা) কী কী সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সে সম্পর্কে অবগত করেছি। এসব এলাকায় ১টাকায় ১০০০ টেন্ডু পাতা বিক্রি হতো। আমরা মহারাষ্ট্রের ৩টি জেলা, অন্ধ্র প্রদেশের ৫টি জেলা এবং সমগ্র বাস্তার এলাকায় এই দাম বাড়িয়ে প্রতি টেন্ডু পাতার দাম ৫০ পয়সা করেছি। প্রতি বান্ডেল বাঁশ ৫০ পয়সায় বিক্রি হতো। এখন যার দাম ৫৫ টাকা। আমদের এই অর্জন এসেছে রাষ্ট্রের নির্মম প্রতিরোধ ও নিষ্ঠুর চেহারাটার সাক্ষাৎ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র গাদচিরলি’তেই তারা আমাদের ৬০ জনকে হত্যা করে, আর আমরা মারি ৫ জনকে।

এছাড়াও সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি প্রায় প্রতিদিনই ১২০০টি গ্রামে স্বাস্থ্য সহায়তা দিয়ে থাকে। বাস্তারে আমাদের বেশকিছু সৈনিক রয়েছেন, যারা দক্ষ ডাক্তার, তারা এপ্রোন পরেন এবং জঙ্গলে ধাত্রীর কাজ করে থাকেন। শুধুমাত্র বাস্তারেই আমাদের এমন ৫০টি ভ্রাম্যমান স্বাস্থ্য দল এবং ১০০টি ভ্রাম্যমান হাসপাতাল আছে। গ্রামবাসীরা নির্দিষ্ট অসুস্থতার জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের যান; যেমন: জ্বরের জন্য যাবে ইসা’র কাছে, আবার ডাইরিয়ার জন্য যাবে রামু’র কাছে, ইত্যাদি। এই অঞ্চলে মানুষ এতো বেশী অসুস্থ হয় যে কখনো কখনো লাশ উঠানোর মানুষেরও স্বল্পতা দেখা দেয়। আমরা মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ডাক্তারদের কাছে ঔষধ সরবরাহ করে থাকি। সরকার জানে না যে, এই ঔষধ কিন্তু সরকারী হাসপাতাল থেকেই আসে।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র যদি নক্সাল অধ্যুষিত এলাকায় সিভিল প্রশাসন পাঠায়, আপনারা কি তার অনুমতি দিবেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা স্বাগত জানাব। আমরা চাই শিক্ষক ও ডাক্তারেরা এখানে আসুক। লালগড়ের জনগণ যুগ–যুগ ধরে সেখানে একটি হাসপাতালের দাবী জানাচ্ছে। কিন্তু সরকার কিছুই করেনি। যখন জনগণ নিজেদের চেষ্টায় একটা হাসপাতাল গড়ে তুললো, সরকার এটিকে সেনা–ছাউনিতে রূপান্তর করলো।

প্রশ্ন: আপনাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কি? তিনটি সুস্পষ্ট লক্ষ্যের কথা বলুন।

কমরেড কিষানজী: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং তারপর সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের ঋণের কোন প্রয়োজন নাই। যুগ–যুগ ধরে আমরা বিদেশী ঋণের টাকা শোধ করে আসছি, আর যেহেতু এখানে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ক্রমবর্দ্ধমান তাই অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এটা কখনোই পরিশোধিত হবে না। আর এটাই চায় বিশ্বব্যাংক। আমাদের এমন এক অর্থনীতি প্রয়োজন, যা দুইটি বিষয়ের উপর কাজ করবে– কৃষি এবং শিল্প। প্রথমত,আদিবাসীরা জমি চায়। জমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র তাদের শোষণ করেই যাবে। শ্রমের ভিত্তিতে শতকরা হারে জনগণকে শস্য বরাদ্দ দিতে হবে। আমরা শিল্পের বিরোধী নই; শিল্প ছাড়া উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিল্পটি ভারতের জন্য সহায়ক, নাকি আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংকের সহায়ক। বড় বাঁধ, বড় শিল্পের বদলে আমরা ছোট শিল্প, বিশেষত যা কৃষির উপর নির্ভরশীল,এমন শিল্পকে উন্নীত করার পক্ষপাতী। তৃতীয় লক্ষ্য হলো, টাটা থেকে আম্বানী পর্যন্ত সকল বড় কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করা, সকল স্মারক চুক্তি (MOU) বাতিল করা, তাদের সকল সম্পদকে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা ও এর মালিকদের জেলে প্রেরণ করা। অবশ্যই, নিম্ন থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকবেন।

প্রশ্ন: কিন্তু বিশ্বে কমিউনিস্ট সরকারগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা যে ব্যবস্থাকে উৎখাত করেছিল শোষণের অভিযোগে, ক্ষমতায় এসে তারা নিজেরাও সেরকমই হয়ে যায়। মাওবাদী শাসন ব্যবস্থারই এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব যেখানে বল প্রয়োগ হয়েছে এবং মত পার্থক্য সহ্য করা হয়নি। কিভাবে তা মানুষের স্বার্থে হতে পারে?

গণমানুষের নেতা কমরেড কিষানজী

কমরেড কিষানজী: এই সব পুঁজিবাদীদের দ্বারা ছড়ানো গল্প। গ্রামের মানুষেরা বিনা চিকিৎসায় মরছে, অথচ ডাক্তারেরা সব শহরে থাকতে চায়। আমাদের সব প্রকৌশলীরা জাপানের মতো উন্নত দেশে, অথবা আইটি নিয়ে কাজে আগ্রহী। তারা জনগণের সম্পদ ব্যবহার করেই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তারা আমাদের দেশের জন্য কী করেছেন? রাষ্ট্র আপনাকে ডাক্তার হওয়ার জন্য জোর দিতে পারে না। কিন্তু যদি আপনি তা হয়ে যান,তাহলে আপনাকে জোর দেওয়া উচিৎ (রাষ্ট্র কর্তৃক)নিজের দক্ষতা অনুযায়ী দুই বছর গ্রামে সেবা দেওয়ার জন্য। রাষ্ট্র কতটা শোষক, তা নির্ভর করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় কারা আসীন তার উপর।

আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চাই। যদি সেখানে কোন গণতন্ত্র না থাকে, তাহলে গ্রামবাসীদের বলুন আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য আরেকটি বিপ্লবের সূচনা করতে। একটি প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ইতিমধ্যে বাস্তারে আমাদের একটি বিকল্প জনগণতান্ত্রিক সরকার আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচিত করি, যা বিপ্লবী জনগণের কমিটি নামে পরিচিত। জনগণ হাত উঁচিয়ে ভোট দেন। সেখানে একজন চেয়ারম্যান, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কল্যাণ, কৃষি, আইন–শৃঙ্খলা, জনসংযোগ ইত্যাদি বিভাগ রয়েছে। এই ব্যবস্থা বর্তমানে ভারতের প্রায় ৪০টি জেলায় বিদ্যমান। ‘মাওবাদীরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না’ বলে যে একটা ধারণা আছে, তা সম্পূর্ণরূপে ভুল।

বর্তমানে ভারতে যা বর্তমান, তা হলো আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র। এটি প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। তা মমতা হোক, সিপিএম হোক, আর কংগ্রেস পার্টি, সবগুলোই স্বৈরতান্ত্রিক। আমরা তাদের আসল চেহারাটা সবার সামনে উন্মোচনের জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ১৪ জন আদিবাসী নারীকে মুক্তির জন্য আলোচনা করেছি; বিশ্ববাসী দেখুক, তাদের এই জেলে কাদের আটকে রাখা হয়।

প্রশ্ন: আপনি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে ইতিমধ্যে বিদ্যমান গণতন্ত্রকে পরিহার করছেন কেন? নেপালে তো মাওবাদীরা নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে।

কমরেড কিষানজী: নতুন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য পুরোনোটিকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে। নেপালে মাওবাদীরা সমঝোতা করেছে (*এরই ফল স্বরূপ বর্তমানে নেপালে মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বে আসীন দুই দালাল, প্রচণ্ড আর ভট্টরাই)। ১৮০ জন এমপি (সংসদ সদস্য) গুরুতর অপরাধের আসামী, ৩ শতাধিক এমপি কোটিপতি। এর নামই কি নির্বাচন? আপনি কি জানেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই উত্তর প্রদেশে একটি ঘাঁটিতে অনুশীলন শুরু করেছে? তারা স্বদম্ভে বলছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোন স্থানে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এই স্পর্ধা কে অনুমোদন দেয়? আমি তো নয়। আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। আমিই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

প্রশ্ন: ভারতকে আপনি কেমন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান? একটি আদর্শ ব্যবস্থা বাছাই করুন।

কমরেড কিষানজী: আমাদের প্রথম আদর্শ ব্যবস্থা হলো প্যারিস, যা ভেঙ্গে গেছে। এরপর রাশিয়া ধ্বসে পড়লো, আর তখনই জ্বলে উঠলো গণচীন। কিন্তু মাও পরবর্তী সময়ে সেটিরও পতন হয়। এখন বিশ্বের কোনোখানেই জনগণের হাতে সত্যিকারের ক্ষমতা নাই। সর্বত্রই শ্রমিকেরা এজন্য সংগ্রাম করছে। তাই কোন আদর্শ ব্যবস্থা বিদ্যমান নাই।

প্রশ্ন: যখন কমিউনিজম অন্যত্র ফলপ্রসু হয়নি, তখন ভারতে তা কিভাবে কাজ করবে? চীনে বর্তমানে মাও’এর তত্ত্বকে ভ্রান্তিমূলক আখ্যা দেওয়া হয়। নেপালে ইতিমধ্যে মাওবাদীদের বিদেশী বিনিয়োগ খোঁজছেন।

কমরেড কিষানজী: নেপালে মাওবাদীরা যা করছেন, তা ভুল। এই পথ অনুসরণ করার মানে হলো আরেকটি বুদ্ধদেব বাবু [“মার্কসিস্ট” পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী] তৈরী করা। আমরা তাদের নিকট আবেদন জানিয়েছি পুরোনো পন্থায় ফিরে আসার জন্য। যেখানেই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজম শিকড় গজিয়ে উঠে,সেখানেই সাম্রাজ্যবাদ তা স্বমূলে উপড়ে ফেলতে চায়। অবশ্যই, লেনিন, মাও, প্রচণ্ড – সবারই কিছু দুর্বলতা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ের পর লেনিন এবং স্তালিন আমলাতন্ত্রের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করেন। তারা জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করেন। তাদের ভুল থেকে আমাদের শিখতে হবে। পুঁজিবাদও কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েছে। আপনি কিভাবে বলবেন যে পুঁজিবাদই সফল হয়েছে? সমাজতন্ত্রই মুক্তির শুধুমাত্র পথ।

প্রশ্ন: কিন্তু ক্ষমতায় গেলে আপনারাও কী নেপালের মাওবাদীদের মতো বা সিপিএম’এর মতো বিভ্রান্ত হতে পারেন না?

কমরেড কিষানজী: যদি আমরা পরিবর্তিত হই, তাহলে জনগণ আমাদের বিরুদ্ধেই আরেক বিপ্লবের(ক্রান্তিকারী আন্দোলন)সূচনা করবে। শাসক যেই হোক না কেন, যদি সে শোষকে পরিণত হয় তাহলে জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য উঠে দাঁড়াবেই। তাদের ‘একজন কিষানজী’, ‘একজন প্রচণ্ড’ বা ‘একজন স্তালিন’এর উপর অন্ধ বিশ্বাস থাকা উচিৎ নয়। যদি কোনো নেতা বা পার্টি তাদের নিজস্ব মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে তাদের উপরে আস্থার সমাপ্তি ঘটিয়ে আবারো বিদ্রোহ করতে হবে। জনগণের এই পরম্পরা জিইয়ে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি কি কখনও কোন ব্যক্তিগত দ্বিধার সম্মুখীন হয়েছেন? সহিংসতাই কি একমাত্র পথ রাষ্ট্রের উপর চাপ বৃদ্ধি করার?

কমরেড কিষানজী: আমার বিশ্বাস আমরা সঠিক কাজটিই করার চেষ্টা করছি। আমরা একটা ন্যায়ের যুদ্ধ করে যাচ্ছি। হ্যাঁ, পথ চলতে ভুল হতেই পারে। কিন্তু তা রাষ্ট্রের মতো নয়, আমরা ভুল করলে তা স্বীকার করতেও জানি। ফ্রান্সিস ইন্ডুয়ার’কে হত্যা করাটা ছিল একটি ভুল, আমরা এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। লালগড়ে আমরা একটা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। সেখানে আমরা সম্প্রতি শুধুই উন্নয়নের জন্য সরকারকে (লিখিতভাবে) দাবী জানিয়েছি এবং সরকারকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। আমরা ৩০০টি গভীর নলকূপ এবং ৫০টি অস্থায়ী হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়াও আমরা ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআই,এমনকি সিপিএম’এর মতো বাম দলগুলোর সাথেও আলোচনা করেছি। আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীদের সাথেও যোগাযোগ করেছি। মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আমি নিজে কথা বলেছি।

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রীর অফিস এগুলো ময়লার ঝুড়িতে ফেলেছে।

কমরেড কিষানজী: আমি মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। আমি তাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করতে বলেছি এবং বলেছি যে, আমরা আমাদের উন্নয়ন চাহিদা চিঠির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। তিনি জানালেন যে, তিনি তার দল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চিদাম্বরম দ্বারা চাপে আছেন।

প্রশ্ন: পুলিশ কেন আপনাকে ধরতে সক্ষম হচ্ছে না?

কমরেড কিষানজী: আটটি রাজ্যে দিন নেই, রাত নেই, আমাকে ধরার জন্য অভিযান চলতেই থাকে। তাদের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আমার অবস্থান ২ নম্বরে। পুলিশ যেন আমার কাছে পৌছাতে না পারে, সেজন্য বাংলার ১৬০০ গ্রামের মানুষ রাতে পাহাড়া দেয়। আমি এখন যেখানে আছি, সেখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে একটা ক্যাম্পে ৫০০ পুলিশ রয়েছে। বাংলার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। পুলিশ আমাকে ধরার আগে তাদের মারতে হবে।

প্রশ্ন: স্বরাষ্ট্র সচিব সম্প্রতি আপনাদের অস্ত্র দেওয়ার জন্য চীনকে উদ্দিষ্ট করেছেন। এটা কি সত্য?

কমরেড কিষানজী: তিনি আমাদের মতাদর্শ সম্পর্কে একদমই কিছু জানেন না। যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রু সম্পর্কে জানতে হয়। আমাদের অবস্থান চীন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিপরীত। আমি ভেবেছিলাম চিদাম্বরম এবং পিল্লাই আমার প্রতিযোগী, কিন্তু আমার শত্রু এতো নিন্ম–মানের হবে তা কখনোই বুঝতে পারিনি। তারা কেবল হাওয়াতেই তরবারী ঘোরাবেন। বিজয় আমাদেরই হবে।

প্রশ্ন: লষ্কর–ই–তৈয়বা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? আপনি কি তাদের যুদ্ধ সমর্থন করেন?

কমরেড কিষানজী: আমরা তাদের কিছু দাবী সমর্থন করি, কিন্তু তাদের পদ্ধতি ভুল এবং জনবিরুদ্ধ। তাদেরকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাদ দিতে হবে, কারণ তা কোন লক্ষ্যের দিকে সহায়ক নয়। শুধুমাত্র জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিজয় অর্জন করা সম্ভব।।

অনুবাদ: শাহেরীন আরাফাত

সূত্রঃ http://mongoldhoni.net/a-tribute-to-comrade-kishanji/


কোলকাতার নকশালপন্থী সংগঠন RADICAL -এর বক্তব্য

11230738_724701604330594_7423805322591780187_o

R A D I C A L

কিছু কথা , কিছু ভাবনা , কিছু প্রশ্ন

()

গুলি না । পাথর ছুঁড়ত ওরা একদিন । প্রাক-ইতিহাসের সেই ঊষাকালে । গুহাচিত্রের দিনগুলোয় । জাদুবিদ্যা জায়গা করে নিয়েছিল । লোক সংস্কৃতিতে । তার বুনোট-বুনোনের মধ্যে মিশে থাকত । মানুষের বাঁচার লড়াই । আর উদ্ভট কল্পনা । ওতপ্রোতভাবে । তারপরে । যুগান্তরের মোড়ের মাথায় । বুনোট খুলে বেড়িয়ে এলো । জাদুবিদ্যার দুই সন্তান । আলাদা পথের পথিক হল । জন্ম নিল । একদিকে বিজ্ঞান । ভেল্কি থেকে ভেষজ । অ্যালকেমি থেকে কেমিস্ট্রি । অন্যদিকে ধর্ম । প্রকৃতি পূজো । ঈশ্বর পূজো । পর পর । বাংলার রাজনীতির ইতিহাস । অনেকটা সেরকমই । কংগ্রেস বিরোধী রাজনীতি বলতে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি । তার মধ্যে মিলেমিশে ছিল সংগ্রাম আর শোধনবাদ । আমে-দুধে মতো । এক সময়ে তারা আলাদা হল । জন্ম হল রাজনীতির দু-দুটো নতুন উপাদান । অকংগ্রেসী সরকার আর বিপ্লবী রাজনীতি । দুটোই ছিল সেদিন । নতুন আর কাঁচা । শেষ পর্যন্ত তাই টেঁকসই হতে সময় নিল দুটোই । ‘ওভার কারেকশন’ আর ‘আন্ডার কারেকশন’-এর মধ্যে দিয়ে । যুক্তফ্রন্ট থেকে বামফ্রন্ট । বামফ্রন্ট সরকারের তেত্রিশ বছর আর জোয়ারের পারে ভাটির টান । ক্ষুদে পাতি গণ্ডির ভেতরে গ্রুপ সম্রাটদের অন্তহীন মুষ্টিযুদ্ধ পেরিয়ে বাংলার বুকে বিপ্লবী সংগ্রামের নতুন উজ্জীবন । এ ছিল পরের ধাপের ইতিহাস । আর একটা মোড়ের মাথায় আমরা আজ । অকংগ্রেসী সরকার আর অকংগ্রেসী রাজনীতির মেটামরফোসিস । হাত কংগ্রেসের জায়গায় ঘাস কংগ্রেস । আর বামের জায়গায় রাম । আর কারাগারকে সাক্ষী রেখে । উদ্যোগ আর নিরুদ্যোগের দোলাচলে । সম্ভাবনা আর সংকটের রসায়নে । অকংগ্রেসী সরকার । তার রাজনীতি । তার বিবর্তন । তার ভবিষ্যতের রূপরেখা । তার সঞ্চারপথ । এটারও চর্চা দরকার । গভীর ভাবেই । কিন্তু আজকের চর্চার জন্য আমরা বেছে নেবো বিপ্লবী রাজনীতি । তার উজ্জীবন । তার সংকট । এ নিয়ে কিছু কথা । মোটা দাগে । গোদা ভাবেই । কিছু ভাবনা । কিছু প্রশ্ন ।

()

বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন জায়গা করে নিল বাংলার বাইরে । আর বাংলায় শুরু হল পাতি গোষ্ঠীগুলোর ভূতের নাচ । দশকের পর দশক । ঐক্যের আলোচনা আর ভাঙন । চুলে পাক ধরল কুশীলবদের । আসলে বিপ্লবী আন্দোলন চলতির সঙ্গে ফিট করে নেবার কর্মসূচী । সেটাই ছিল রোজনামচা । আর বারোমাস্যা । ৭০-এর সেট ব্যাকের ভূত ঘাড়ে চেপে বসেছিল একেবারে আসন গেঁড়ে । সবই ভারসাম্যের সূত্রে বাঁধা আন্দোলন । ভারসাম্যের দুষ্টচক্রের ভুলভুলাইয়ায় ফেঁসে যাওয়া আন্দোলন । থোড়-মানে-খাঁড়া । প্রভাবের খুব ছোট ছোট বলয়কে ধরে রাখার জন্যে । ব্যস ।

ভূতের বোঝা ঘাড়ে , তিন কিল দিলে ছাড়ে ।

দরকার ছিল ভারসাম্যের বৃত্ত উপচে পড়া আন্দোলনের কিল । যাকে বলা যায় আন্দোলনের অভিঘাত । ভারসাম্যের সীমানা না পেরিয়েই সবাই চাইছিল ঐক্য । চাইছিল সংগঠনকে বড় করতে । আর সংগঠন ছোট হচ্ছিল দিনকে দিন ।

যতো ভাবি করি করি হওয়া তো হয় না । এই ছিল সংকট ।

()

বিপ্লবী আন্দোলন কি ? বিপ্লবী আন্দোলন মানে জনতার উত্থান । জল-জঙ্গল-জমি-জনপদের জন্য জনতার জাগরণ । যে উত্থান ভারসাম্যকে খান খান করে দেয় । যে উত্থান ধনী মানি বালির সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয় । যে উত্থান সমস্ত সীমারেখাকে মুছে দেয় । যে উত্থান জনতাকেই নায়কের আসনে বসায় । চীনের ৪ঠা মে-র আন্দোলন । হুনান কৃষক আন্দোলন । ইংরেজ আমলের কৃষক বিদ্রোহগুলো । তেলেঙ্গানা , তেভাগা , গোর্খাল্যান্ড জাগরণ । হালের নন্দীগ্রাম , লালগড় । সবাই ছিল জাগরণের মহাকাব্য । জনতার উত্থান । তার চমক । তার অভিঘাত । তার প্রেক্ষিত । তার প্রতিক্রিয়া । মাটির বুকে ফাটল ধরিয়ে তার অনুরণন ।

এদের মধ্যে তফাৎ বিস্তর । আদর্শের ফারাক দেদার । এদের নেতৃত্বও এক না । এদের পরিণতিও আলাগ । তবু তারা ভারসাম্যের গণ্ডি ছাপিয়ে জাদা , জনগণের উত্থান । বিপ্লবী আন্দোলন মানে ভারসাম্যের গণ্ডি ছাপিয়ে যাওয়া আন্দোলন । মুখ্য ধারার গড়পড়তা আন্দোলন না । তার জাত আলাদা । তার পরিচয় করাতে হয় না । সে নিজেই তার পরিচয়কে সোচ্চার করে । রুশ পথ । চীনা পথ । অভ্যুত্থান । দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ । যাই হোক , বিপ্লবী আন্দোলনের সাধারণ দিশাই হল গড়পড়তা আন্দোলন না । গতানুগতিক চলতি পথের পথিক হয়ে না । লক্ষণরেখা ছাড়িয়ে যাওয়া । এ দিশাকেই স্তালিন বলেছিলেন , রুশিয়ার বিপ্লবী গতিবেগ । মাও বলেছিলেন , দশের বিরুদ্ধে এক । আগ্রাসী এ মানসিকতাকে মানুষের মধ্যে জাগানো , এটাই অবস্থান বিপ্লবীর । যে অবস্থান অনূদিত হয় জাগরণের ভাষায় । উত্থানের ভাষায় । আন্দোলনের ভাষায় । বিপ্লবী আন্দোলনের নতুন উজ্জীবন বঙ্গদেশে আমরা দেখতে পেলাম নতুন শতাব্দীতে । আড়েবহরে তা গোপীবল্লভপুরের চেয়ে অনেক বড় । তার অভিঘাত অনেক গভীর । ভারসাম্যের আর উজ্জীবন তাদের মুখে থাপ্পড় মারল ।

()

আসল কথা চলতি রোজনামচার জীবন থেকে বিপ্লবী আন্দোলনের বাস্তবতার ফারাক বড় বেশি । এতটাই বেশি যে তাকে স্বপ্ন মনে হয় । মনে হয় দূরেরই জিনিস । রোজকার জীবনের থেকে তার ফারাক দেখা দেয় বড় করে । মনে হয় কোন আকস্মিক ঘটনা । মনে হয় কোন অলৌকিক বলে । মনে হয় কোন ব্যতিক্রমের মতো । যার আবির্ভাব হয় বিশেষ ঘটনাচক্রে বহু যুগের পরে পরে । রোজনামচায় আটকে থাকে যে চোখ , সে চোখে তাই মনে হয় । আর পা যদি থাকে রোজনামচার মাটিতে কিন্তু ভবিষ্যতের দিগন্তে যদি থাকে দৃষ্টি , আজকের মাটিতে যার পা কালকের আকাশে যার চোখ , তার কাছে স্বপ্ন আর বাস্তবের ফারাক না , ধরে পড়ে শুধু মিল । বাস্তব থেকে শুরু করে স্বপ্নে পৌঁছোবার সেতু তার কাছে ধরা দেয় ।

মতাদর্শ যদি হয় ভারসাম্যকে ছাপিয়ে যাবার মতাদর্শ । রাজনীতি যদি হয় জনতার উত্থানের রাজনীতি । সংগঠনের তবে কাজ হবে গন্তব্যের সে ঠিকানা , সে ঠিকানায় যাবার পথ । সে পথকে ছোট ছোট বহু অংশে ভেঙে নেওয়া । এক পা এক পা করে সে পথে চলার সংস্কৃতি চালু করা । ভারসাম্যকে ছাপিয়ে যাওয়া শুরু করা । এরকমই অনেক ছোট ছোট লাফ দিতে দিতে , জনতাকে রপ্ত হবার সময় করে দিতে দিতে , একদিন বাঁধ ভেঙে , বড় মাপে , মানুষ গড়ে ইতিহাস । তাকিয়ে দেখে তার নিজের সৃষ্টিকে , ড্যাব ড্যাব করা চোখে , কান এঁটো করা হাসিতে , সৃষ্টিসুখের উল্লাসে । তাই তেরো বছর ধরে ছোট ছোট মাপে ভারসাম্যকে ছাপিয়ে যেতে যেতে একদিন রাঢ়ের মানুষ নামলো বড় মাপে । এর চমক আর আন্দোলনের পেছনে পড়ে ১৩টা বছরের লম্বা ইতিহাস । ১৩ বছর পরে খাসজঙ্গলে হুলসাইয়ের মেলা । আসলে কি গ্রাম কি শহর , বিপ্লবী আন্দোলনের রাজনীতি মানে । কারণ বিপ্লবী রাজনীতিকে সোচ্চার করা যায় শুধু আন্দোলনের ভাষাতেই । এ পথেই তাকে তুলে ধরা যায় লক্ষ জনের মনে । জাগানো যায় তার আবেদন । পাঠানো যায় তার বার্তা । একেকটা আন্দোলন , ভারসাম্য ছাপিয়ে যাবার আন্দোলন হয়ে ওঠে একেকটা মাইলস্টোন । জনতার চলার পথে , জনজীবনের চলতা ধারায় , এক আন্দোলন থেকে আরেক আন্দোলনে উত্তরণের সোপান বেয়ে এগিয়ে চলে জনতার ইতিহাস । জনতার সংগ্রামের ইতিহাস । এটাই হল গণ লাইন । আর এখানে এসেই সময় থমকে দাঁড়ায় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ।

()

সত্যিই কি ? আন্দোলনই কি শেষ কথা বলে ?? আন্দোলনই কি সবকিছু ??? আন্দোলনই কি আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ ???? Think in Itself –এর মতো কিছু ????? আন্দোলন মানে কি ? আন্দোলন মানে শ্রেণীসংগ্রাম । এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক সেই বার্তা । শিক্ষকদের ঐতিহাসিক সেই ঘোষণা । শুধু শ্রেণীসংগ্রামকে স্বীকার করলেই সে মার্কসবাদী না । সর্বহারা একনায়কত্বকে যে স্বীকার করে , সেই মার্কসবাদী ।

সর্বহারার একনায়কত্ব কি ? সর্বহারা একনায়কত্বের ধারণা মানে বিকল্পের ধারণা । আর বিকল্প মানে রাজনীতি । মানুষকে দেবার মতো একটা বলিষ্ঠ রাজনীতি । শ্রেণী লাইন । বিকল্পের ধারণা মানে কি ? প্রত্যেক সংগঠনেরই থাকে তার তার মতো করে বিকল্পের ধারণা । থাকে তার তার নিজস্ব রাজনীতি । যে রাজনীতিতে সে মানুষকে প্রভাবিত করতে চায় । যে বিকল্পের স্বপ্ন সে মানুষকে দেখাতে চায় ।

মোদ্দা দুটো বিকল্পই হতে পারে । সংসদীয় বিকল্প আর বিপ্লবী বিকল্প । কিন্তু প্রত্যেকটা সংসদীয় দলেরও থাকে সংসদীয় রাজনীতিতে তার তার নিজস্ব ধরণ । সংসদীয় রাজনীতি মানেই , মুখ আর মুখোশের তফাৎ । নবান্নের আর ব্রিগেডে আলাদা রূপ । নবান্নের রূপটা সবারই প্রায় এক । কিন্তু ব্রিগেডের রূপটা আলাদা আলাদা । কারও মেহনতি মানুষের রূপ । কারও মা মাটি মানুষের রূপ । কারও বা গেরুয়া ত্রিশূলে , নোটের মালায় সাধু সাধ্বীর ভিড়ে এক জগাখিচুড়ি রূপ । গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির দুই রণকৌশলে লেনিন বলেছিলেন : বিপ্লব নিশ্চয়ই আমাদের সবাইকেই শিক্ষা দেবে । কিন্তু প্রশ্ন হল , আমরা বিপ্লবকে কিছু শিক্ষা দিতে পারবো কিনা । বিপ্লবকে আমরা আমাদের রাজনীতি দিয়ে প্রভাবিত করতে পারবো কিনা । বিপ্লবের ওপরে আমাদের ছাপ আমরা ফেলতে পারবো কিনা । তাই গণ উত্থান আর রাজনীতি , গণ লাইন আর শ্রেণী লাইন একই মুদ্রার দু’পিঠ । অচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত । তবু তারা আলাদা । দুটো মেরু ।

গণ উত্থানের চলার পথে দেখা দেয় আরও দুটো মেরু । বিকল্পের দু’দুটো ধারণা । যুগপৎ সংসদীয় বিকল্প আর বিপ্লবী বিকল্পের ধারণা । তারা যদিও একেবারে আলাদা , তবু তারা দেখা দেয় একই সাথে । পরস্পরের মহলে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয় । পরস্পরের কাছে নিজেদের সোচ্চার করে । পরস্পরকে ব্যবহার করে নেবার সুযোগ খোঁজে । গণ লাইন আর শ্রেণী লাইন , জাগরণ আর বিকল্প , সঙ্গে থেকেও যারা আলাদা । আর সংসদীয় আর বিপ্লবী বিকল্পের রাজনীতি , আলাদা হয়েও যারা দেখা দেয় একসঙ্গে । এই সবকিছু মিলিয়ে আন্দোলনের সামনে তৈরি হয় জটিল এক পরিস্থিতি । জটিল যখন যুগ । জনতা যেখানে জাগার । তাই যেকোনো বিপ্লবী জাগরণের সামনেই , সংসদীয় বিকল্প সামনে আসে সমান তালে । আর তখনই দরকার হয় শ্রেণী লাইন । রাজনীতি । বিপ্লবী বিকল্প । রাজনৈতিক মেরুকরণ । বিভাজন রেখা ।

()

সংসদীয় বিকল্প মানে স্রোতে গা ভাসানো বিকল্প । সংসদীয় বিকল্প গণ উত্থানের সম্ভাবনাকে বাধা দেয় । জনতাকে বেঁধে রাখে ভারসাম্যের গণ্ডিতে । সংসদীয় বিকল্প গণ উত্থানকে আবার ফিরিয়েও আনে ভারসাম্যের গণ্ডিতে । যেমন ঝাড়খণ্ড আর গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে । সংসদীয় বিকল্পে একটা জোরের জায়গা আছে । স্বতঃস্ফূর্ততার জোর । চলতির জোর । চলমানতার জোর । ঐতিহ্যের জোর । জায়গা জুড়ে বসে থাকার জোর । অভ্যাসের জোর । যেটা আছে যেটা চলছে , যেটাকেই লোক দেখতে অভ্যস্ত । চোখ পচে গেছে যেটাকে দেখে দেখে । তাই সংসদীয় বিকল্প বারেবারে উদয় হয় । নতুন করে উদয় হয় । স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উদয় হয় । ষাটের দশকে সিপিআই-এর স্লোগান ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে ফ্রন্ট । সিপিএম-এর স্লোগান ছিল , কংগ্রেসী কুশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম । কংগ্রেসের সঙ্গে ফ্রন্ট , মানে শ্রেণী সমঝোতার রাজনীতি । কংগ্রেসের সঙ্গে সংগ্রাম , মানে শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি । কারণ সেদিন কংগ্রেস মানেই সরকার । সরকার মানেই কংগ্রেস । কংগ্রেসী কুশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম , কিন্তু বিকল্প কি ? অকংগ্রেসী সরকার ? নাকি বিপ্লবী আন্দোলন ? এ প্রশ্নে সেদিন মেরুকরণ তৈরি হয়নি । তাই ৬৬তে দক্ষিণবঙ্গে খাদ্য আন্দোলনের জাগরণ । ৬৭তে কংগ্রেসী শাসনের বিরুদ্ধে জাগরণ । তাতে আন্দোলন ছিল , বিপ্লবী বিকল্প ছিল না । গণ লাইন ছিল , শ্রেণী লাইন ছিল না । তাই তার পরিণতি হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট সরকার ।

তবুও মেরুকরণকে আটকানো যায়নি । যখন যুক্তফ্রন্ট সরকার আর বিপ্লবী বিকল্পের রাজনীতি মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো দুই শ্রেণী রাজনীতির প্রতীক হয়ে । কংগ্রেসী কুশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দু’দুটো রূপ হয়ে । দুই শ্রেণী লাইন হয়ে । একই সঙ্গে । পাশাপাশি । যুগপৎ যুক্তফ্রন্ট সরকার আর নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলন হয়ে । কংগ্রেসী কুশাসনের দুটো বিকল্প হয়ে । সংসদীয় বিকল্প আর বিপ্লবী হয়ে । এটাই ইতিহাস । নয় খুব প্রাচীন ইতিহাস ।

()

সেকালেও যা , একালেও তাই । সামাজিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে , হার্মাদ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে , দেখা গেল আন্দোলনের দুটো রূপ । দুটো বিকল্প ।

মা-মাটি-মানুষের সরকার আর জঙ্গলমহল আন্দোলন । গত বিধানসভা নির্বাচনে দুটো বিকল্প ছিল পাশাপাশি ।

মা-মাটি-মানুষের পক্ষে ভোট আর ভোট বয়কট । দুই পরিণতি ছিল । দুই রাজনীতির পরিণতি । দুই বিকল্পের রাজনীতির পরিণতি । হার্মাদ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দুটো ফ্রন্ট । একেবারে আলাদা । বিভাজিত । কিন্তু গত বিধানসভা নির্বাচনে ছবিটা গেল পাল্টে । জঙ্গলমহল আন্দোলনে আমরা একটা অন্য বিভাজন দেখতে পেলাম । তৃণমূলীকে ভোট না বিপ্লবীকে ভোট । বিভাজনটাও স্পষ্ট ছিল না বিধানসভা ভোটের আগে । তৃণমূলের মিটিং-এ লোক এনে লোক ভরাতে দেখলাম আমরা । সে অগণিত লোক কাদের ? তারা আর যাই হোক তৃণমূলের লোক ছিল না । বিধানসভা ভোটে তৃনমূলে ভোট না বিপ্লবীকে ভোট । এ বিভাজনও স্পষ্ট ছিল না । বিভাজনটা ছিল শুধু জঙ্গলমহল আন্দোলনের মধ্যে । আসলে তারাই বিভাজিত হয়ে গেছিল । তৃনমূলকে ভোট না বিপ্লবীকে ভোট , এ প্রশ্নে । বাকি সব জায়গায় তৃণমূলকে ভোট , একটা জায়গায় বিপ্লবীকে ভোট , এটাও হয়নি । সত্যি সত্যি আন্দোলন বিভাজিত হয়ে গেছিল এ প্রশ্নে । বিভাজনের এ ভগ্নদশা কেন ? ভোট না সংগ্রামে বিভাজন ছিল বিধানসভা ভোটে । কাকে ভোট , এ বিভাজন ছিল । ভোট রঙ্গমঞ্চে না , আন্দোলনেরই সারির মধ্যে । কেন এ হতদ্দশা । লোকসভা ভোটে বিপ্লবকে শিক্ষা দেবার অধিকার ধরে রাখতে পেরেছিল যারা , বিধানসভা ভোটে তারা হারিয়েছিল সে অধিকার । পরিস্থিতিকে চালাতে পারেনি তারা । পরিস্থিতি তখন তাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলেছিল । শুধু পরিস্থিতির তাড়া খেয়ে চলাই না । তাই থেকেও আরও দূরে সরে যেতে হয়েছিল । গাছে চড়ে নিজের হাতে গাছের ডাল কাটতে হচ্ছিলো তখন তাদের ।

বিপক্ষকে নিজের হাতেই শক্তি জোগাতে হচ্ছিলো , যাতে অচিরেই শত্রু তাদেরকে ছিন্নমূল করতে পারে । এ ছিল নিজের পায়ে কুড়ুল মারা । এ ছিল বিপ্লবকে শিক্ষা দেবার অধিকার ছেড়ে দেওয়া । বিপ্লবকে শিক্ষা দেবার অধিকার তুলে দেওয়া শত্রুর হাতে । বিপ্লবের সামনে সংসদীয় বিকল্পকে তুলে ধরার সুযোগ করে দেওয়া । বিপ্লবকে সংসদীয় বিকল্প দিয়ে প্রতারিত করার দরজা খুলে দেওয়া । গণজাগরণের সামনে সংসদীয় খোয়াবের বেনোজল ঢোকার ফ্লাডগেট হাট করে দেওয়া । গণ লাইন আর শ্রেণী লাইনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো । বিপ্লবী উত্থান আর সংসদীয় বিকল্পের মেলবন্ধন ঘটানো । অপ্রাকৃতিক বিচ্ছেদ আর অপ্রাকৃতিক মেলবন্ধন । প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে । যেমন তেমন করে ।  খামখেয়ালে । শিবঠাকুরের আপন দেশের নিয়মে । তুঘলকি কর্মকাণ্ডে । দর্শনে একে বলে এক্লেক্টিসিজম (Eclecticism ) । মতাদর্শের ভাষায় একে বলে নতিস্বীকার । আত্মসমর্পণ । রাজনীতিতে একে বলে রাজনৈতিক উদ্যোগ হারিয়ে ফেলা ।

()

কেন এমন হয় ? বারবার ?? জাগরণ আর উত্থান কেন পরিণতি পায় অপ্রাকৃতিক বিচ্ছেদে , আর অপ্রাকৃতিক মেলবন্ধনে ? কেন জাগরণ আর উত্থান বেদখল হয়ে যায় ? সাময়িকভাবে ? কেন নিজের হাতে শক্তি জুগিয়ে দিতে হয় বিপক্ষের রাজনীতিকে ? কেন সরে যেতে হয় ? শ্রেণী লাইন থেকে ? কেন নিজের হাতে কুড়ুল মারতে হয় ? নিজেরই পায়ে ? সেখানে আর একটা মেরুকরণ আছে । সংগ্রাম আর প্রতিযোগিতার মেরুকরণ । শাসনের সাথে সংগ্রাম আর বিকল্পের জন্য প্রতিযোগিতা । শাসনের সাথে সংগ্রাম কোন লক্ষ্যে ? জনগণকে শাসন করার জন্যে ? না জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে ? এই হল দুই বিকল্প । শ্রেণী সংগ্রামের দুই বিকল্প । দুই বিকল্পের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা । শাসনবিরোধী সংগ্রামকে দখলের জন্যে প্রতিযোগিতা । গণজাগরণ আর গণ উত্থানকে দখলের জন্যে প্রতিযোগিতা । বিপ্লবকে শিক্ষা দেবার প্রতিযোগিতা । বিপ্লবের উপরে রাজনৈতিক ছাপ ফেলার প্রতিযোগিতা । প্রতিযোগিতার এই দৌড় । দমের এই লড়াই । লড়াই ছেড়ে দিতে হয় কেন ? কেন অন্যের রাজনীতিকে শক্তি জুগিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয় ? কেন অন্যের হাতে মৃত্যুবাণ তুলে দিতে বাধ্য হতে হয় ? কেন নিজের পায়ে কুড়ুল মারতে বাধ্য হতে হয় ? কেন বারেবারে পড়তে হয় ভুলের ভুলভুলাইয়ায় ? দেখে শেখা আর ঠেকে শেখা কাজ করে না কেন ? কেন তিন জায়গায় গু লাগে আহাম্মকের ? গভীর কারণ আছে তার । যখন পরিস্থিতির ঘেরার মধ্যে পড়ে যেতে হয় , প্রত্যেকটা কাজের ফল যখন হয় উল্টো , তখনই পালের হাওয়া কেড়ে নেয় অন্যে । পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতিকূলতা যখন ঘিরে ফেলতে থাকে ক্রমশ । যখন মাথা কাজ করে না । যখন উদ্যোগ হাট থেকে বেড়িয়ে যায় । যখন চলতে হয় পরিস্থিতির ঠোক্কর খেয়ে । পরিস্থিতির হাতে খেলতে হয় যখন । পরিস্থিতির তাড়া খেয়ে চলতে গিয়ে যখন নিজের হাতেই রচনা হয়ে যায় নিজের ফাঁস । চরম সে উদ্যোগহীন অবস্থায় নিজেদেরই কর্মকাণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজেদের । নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিস্থিতির । তখনই নিজের পায়ে কুড়ুল মারে মানুষ । মারতে বাধ্য হয় ।

ব্যক্তি মানুষের ক্ষেত্রে যা সত্যি , বিপ্লবী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তা সত্যি । লোকসভা নির্বাচনের সময়ে উদ্যোগ ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের হাতে । বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে হাত থেকে পিছলে গেছিল সে উদ্যোগ ।

()

বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে যে অবস্থা ছিল , ভোটের পরে তা চলল পরিণতির পথে । হাত থেকে উদ্যোগ বেড়িয়ে যাওয়া । নিজের হাতে অন্যের হাত শক্ত করা , নিজের পায়ে কুড়ুল মারা । এবার সবটাই চলল পেকে ওঠার দিকে । রিভিউ কমিটি ছিল একটা সরকারী ভুলভুলাইয়া । অধিকার আন্দোলনের সামনে একটা ভুলভুলাইয়া । বিপ্লবী আন্দোলনের সামনেও রাখা একটা ভুলভুলাইয়া । ফলে অধিকার আন্দোলনের সামনে দুটো সম্ভাবনা দেখা দিল । সরকারী ভুলভুলাইয়ায় সবাইকে নিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া । অধিকার আন্দোলনকে সরকারী বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় আটকে ফেলা অথবা সরকারী বিভ্রান্তির জালকে উদ্ঘাটিত করা । পরিস্থিতি থেকে নির্ঝঞ্ঝাটে সরে যাবার সুযোগ যাতে কেউ না পায় , অধিকার আন্দোলনকে জোরদার করাটা তখন নির্ভর করছিল । নির্ভর করছিল সরকারী বিভ্রান্তির জালটাকে টেনে ছিঁড়তে পারার ওপরেই । কিন্তু সেসময়ে আর একটা মধ্যপন্থী ঝোঁক দেখা গেল । অধিকার আন্দোলনে সবাইকে একসাথে নিয়ে চলার ঝোঁক । সরকারী বেসরকারী সবাইকেই । যখন সরকারী আর বেসরকারী এসে দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি । দুটো চলেছে দু’দিকে । তখন সবাইকেই একসাথে নিয়ে চলার নিদান । এটা আসলে ছিল । গাছেরও খাবো তলারও কুড়োবো মার্কা স্বপ্ন দেখা । এটা ছিল সরকারী বেসরকারী দুই জায়গাতেই ডিম রাখার কৌশল । কিন্তু পুরোপুরি ভুল আর আত্মঘাতি কৌশল । আজকে এ ব্যাপারে বিভ্রান্তির আর অবকাশ নেই । রিভিউ কমিটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে । মৃত্যু হয়েছে দু জায়গায় ডিম রাখার কৌশলের । কিন্তু সেই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে শক্তিশালী অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলার এক স্বপ্নের । কিন্তু রিভিউ কমিটি তার অল্প দিনের জীবনে “কাজ” করে গেছে । বিপ্লবী আন্দোলনের সারি থেকে সরকারী পক্ষে জব্বর ডিগবাজি আর তিক্রমবাজী দেখতে পাওয়া গেছে দেদার । এর পরের ধাপটা আরও চতুর । সরকারের সঙ্গে আলোচনার টোপ । আর সে টোপ ফেলা হল অধিকার আন্দোলনের সরকারী গোষ্ঠীতে আলো করে থাকা লোকজনকে সামনে রেখে । দলত্যাগ আর দলত্যাগীর ওপরে ভরসা । সরকারী দূত হয়ে জায়গা বদলেছে যে , তাকেই বেছে নেওয়া সরকারের কাছে বার্তা পাঠাতে । যাকে আসলে সরকার নিজেই বেছে নিয়েছে , আন্দোলনের কাছে বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যে । সরকার কি বার্তা পৌঁছাতে চেয়েছিল ? বিভ্রান্তির বার্তা । পশ্চিমে এগোনোর সময়ে পূবের দিকে পা ফেলার বার্তা । এ পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছিল , পূবের দিকে চলতে রাজি হবার বার্তা । সরকার যা চাইছিল , সেই বার্তা গেল সরকারের কাছে । সরকারের হাতে খেলা হল । যখন সরকার নিজে চাইছিল অন্য পথে । একেই বলে – যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই / যাহা পাই তাহা চাই না ।

(১০)

ব্যাপারটা দাঁড়ালো এরকম , পাড়া গ্রামে দুটো শিয়াল মিলে যেভাবে ছাগল ধরে । একটা শিয়াল ছাগলের দড়ির একটা মাথা কামড়ে ধরে ছুটতে থাকে । আর একটা শিয়াল ছাগলের পায়ে কামড়ে থাকে । কামড় খেয়ে ছাগল ছুটতে থাকে , যেদিকে দড়ির টান সেদিকেই , গ্রাম আর লোকালয় থেকে দূরের দিকে । ছাগল বাঁচার জন্য ছোটে মরণের দিকে । বাঁচার জন্যে ছুটছে বলে ভেবে , ছোটে মরণের দিকে ।

উদ্যোগ হাত থেকে বেড়িয়ে গেলে এরকমই হয় । উদ্যোগ হারিয়ে ফেলা অবস্থা । তাই গ্রাম্য প্রবচনে বলে – গরু হারালে ওমনি হয় । কিন্তু কেনই বা হারায় গরু ? হারিয়ে যায় উদ্যোগের চাবিকাঠি ? কয়েক বছর আগে এ অবস্থা ছিল না । পালের হাওয়া সেদিন কেড়ে নিয়েছিল জনতা । মানুষ ঘর ছেড়ে পথকে করেছিল ঘর ।

লালগড়ের লাল মাটি

জ্যেগে ওঠে বহু বিটি

খাসজঙ্গলে হুলসাইএর মেলা ।

সেদিন জনতা যেদিকেই হাত বাড়াচ্ছিল , ধুলোমুঠো সোনামুঠো হচ্ছিলো । তবে কি করে হারালো গরু ? চলতি হাওয়ার পন্থী হয়ে । চলতি হাওয়ার পন্থী মানে হাওয়ার সঙ্গে চলা । ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে চলা । ঘটনাপ্রবাহের আগে চলা না । ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে চললে কি হয় ? স্বতঃস্ফূর্ততার লেজুরবৃত্তি করা হয় । আন্দোলন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে । তার উত্তরণ হয় না । আন্দোলন যতদিন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে , আড়ে-বহরে বাড়তে থাকে , ততদিন তা বোঝাও যায় না । কিন্তু আড়ে বহরে । পুষ্টিতে গভীরতায় বাড়ে না ।

আন্দোলন আসলে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে । আন্দোলন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে , শত্রু শক্তি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না । তাদের থিংক ট্যাঙ্ক কাজ করতে থাকে । তাদের টাকার বান্ডিল কাজ করতে থাকে । তাদের পরিকাঠামো কাজ করতে থাকে ।

গ্রাম স্তরে তৈরি হয় শত্রু শক্তির গোপন পরিকাঠামো । বারেবারে সে পরিকাঠামোকে শেষ করতে গিয়ে , গ্রামীণ পরিবারগুলোর আরও কিছু অংশ আন্দোলনের বাইরে চলে যায় । আন্দোলনের পক্ষে গ্রামীণ যুক্তফ্রন্ট আরও দুর্বল হয় । আর এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে অবিরাম । কারণ বিরোধীশক্তি নাছোড়বান্দা । তারা কাজ করে শ্রেণী লাইনেই । উত্তরণহীন আন্দোলন । ভেতরে ভেতরে ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা গ্রামীণ যুক্তফ্রন্ট । প্রথমে চোখের আড়ালে , পরে চোখে আঙুল দিয়ে ।

উদ্যোগ হাতছাড়া হতে থাকে ক্রমশ । এটাও হতে থাকে প্রথমে অদৃশ্যে ।

পরে চোখের সামনেই । তখন বড় আকারে হার্মাদ আক্রমণের মোকাবিলায় মা-মাটি-মানুষকে ভোট দেবার ডাক দিতে হয় । তখন গ্রামীণ জনতাই বলে , যাকে ভোট দিতে বলা হয় , তাকে কাজ করার সময়ও দিতে হয় । দেওয়া উচিৎ । এভাবেই এগোতে থাকে সময় , ইতিহাস , ঘটনার ক্রম ।

রাজনৈতিক উদ্যোগ হাতছাড়া হয় । আসে উদ্যোগহীন অবস্থা । উদ্যোগ যতো হাতছাড়া হয় , ততই এগোতে হয় সংসদীয় বিকল্পের দিকে । ভাবতে হয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের কথা । ছাগল ততই ছুটতে থাকে । লোকালয় থেকে দূরে । মৃত্যুর দিকে ।

(১১)

আন্দোলন শুরু হয়েছিল পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে , রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে । কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় শুধু রাষ্ট্রীয় দল থাকে না । থাকে বিরোধী দলও । রাষ্ট্র যদি নিপীড়ন দিয়ে উদ্যোগ হরণ করে , তাহলে বিরোধী দোল সংসদীয় বিকল্পের স্বপ্নকে সামনে রেখে উদ্যোগ হরণ করে । ছিনতাই করে আন্দোলনকে ।

কিন্তু এখানে তা হয়নি । পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ দাবী তুলেছিল । সিবিআই তদন্ত বা বিচার বিভাগীয় তদন্ত অথবা ওঠবস আর নাকে খত দেবার । উদ্যোগ পুরোপুরি নিজের হাতে ছিল আন্দোলনের । ছিনতাই করার কোন সুযোগ ছিল না । তৈরি হল তৃণমূল স্তরে মানুষের ক্ষমতা । ওপরের স্তরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা । তৈরি হল এক দ্বৈত ক্ষমতা কিছুদিনের জন্যে ।

গ্রামীণ উন্নয়নের কিছু কর্মসূচী নেওয়া হল । পানীয় জল আর রাস্তা । পুলিশ বয়কট । হার্মাদ প্রতিরোধ । গ্রামের বিকাশ । এই ছিল আন্দোলনের সামনে কর্মসূচী । মোটমাট জনতার উদ্যোগের ফলন্ত রূপ দেখা গেল । কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে হাত পড়েনি । আর গ্রামীণ অর্থনীতিতে হাত না পড়লে গ্রামীণ ওলটপালট হয় না । গ্রামীণ রাস্তাঘাটে হাত পড়েছিল । গ্রামের নাভিদেশ তখনও অনাঘ্রাত । সারের ডিলাররা তখনও সারের কালবাজারী করছিল ।

চাষির জমির খিদে তখনও অভুক্ত । গ্রামের অর্থনীতিও অভুক্ত । গ্রামের অর্থনীতিতে হাত পড়লে কি আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন কমে যায় ? একেবারেই না । কিছু লোক সরে যেত নিশ্চয়ই । কিন্তু তখনই নিচুতলার মানুষ লক্ষগুণ সক্রিয় হয়ে এগোত । প্রভাব বাড়ত আন্দোলনের । শুধু আড়ে বহরে না , শুধু গায়ে গতরে না , গভীরত্বেও ।

আন্দোলনকে নিশ্চলতার হাত থেকে বাঁচাতে হলে , রাজনৈতিক উদ্যোগকে ধরে রাখতে হলে , আন্দোলনের প্রভাবকে গভীরতর করা ছাড়া গতি নেই । এখনও পর্যন্ত জানা মার্কসবাদী , লেনিনবাদী , মাওবাদী সাহিত্যে , সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লবী কৃষক আন্দোলনে , ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে জমি আন্দোলন ।

যাই হোক , যে কোন ভাবেই হোক , হাত দিতে হয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে । ভাঙতে হয় ভারসাম্য এক্ষেত্রেও । সারের কালোবাজারি বন্ধ করতে হয় । অর্থনীতির ক্ষেত্রেও চলতি ভারসাম্য ভাঙতে হয় । কিন্তু শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্য ভাঙা যায় না । করতে হত রাজনীতিকরণ । রাজনীতির সংগঠনের জাল তৈরি করতে হত ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে ।

আর সবটাই করতে হত সময়মত । কারণ , সময় চলিয়া যায় / নদীর স্রোতের প্রায় । রাজনীতি আর যুদ্ধে সময় একটা খুব বড় ফ্যাক্টর ।

সময়ের কাজ সময়মত করা । উদ্যোগ হাতে ধরে রাখার একটা গ্যারান্টি । সময়মত কাজ বাছাই করে স্থির করা । উদ্যোগ ধরে রাখার এটাই গ্যারান্টি ।

নতুন নতুন কাজ স্থির করা । নতুন নতুন কাজে জনতাকে সমাবেশ করা । রাজনৈতিক উদ্যোগ ধরে রাখার গ্যারান্টি । আন্দোলনের পক্ষে গ্রামীণ যুক্তফ্রন্টকে ব্যপক আর গভীর করে তোলার গ্যারান্টি । আর রাজনৈতিক উদ্যোগ দরকার হয় রাজনীতিকরণের জন্যে । রাজনীতিকরণ মানে বিকল্পকে সামনে আনা । সংসদীয় বিকল্পের মোহ ভাঙা । শ্রেণী লাইনকে সামনে আনা ।

(১২)

শেষ কথা 

আশির দশক থেকে বাঁধা বাংলা-ভূতের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে । বোঝা নামলো নয়া শতাব্দীতে । বাংলার মরা গাঙে বিপ্লবী আন্দোলনের বান ডাকল । জনতা জাগল । মাথা তুলল । উঠলো জনজোয়ার । জনতার কর্মকাণ্ড – গণ লাইন , একটা মোড়ের মাথায় এসে পড়ল পিছলে ।

আন্দোলনে রাজনৈতিক উত্তরণের শূন্যতা সৃষ্টি হল । সময়ের দৌড়ের খেলায় পড়তে হল পিছিয়ে । হাতছাড়া হল উদ্যোগ । সংসদীয় বিকল্প মাথাচাড়া দিল । বিপ্লবী আন্দোলনে দেখা দিল সংকট । সংকট সঙ্গিন রূপ নিল চোরাবালির আবর্তে । বিপ্লব শিক্ষা দিল । সে শিক্ষা আত্মস্থ করে আবার জন্ম হবে বিপ্লবের । বিপ্লবকে শিক্ষা দিতে উঠে দাঁড়াবে বিপ্লবী । সময়কে হার মানিয়ে উত্তরণের পথে কেড়ে নেবে পালের হাওয়া ।

হার মানা আর হার না মানার মধ্যে দোলাচল মানুষই আবার গড়বে ইতিহাস ।

শহীদের রক্ত হবে আমাদের প্রেরণা ।

“ হাজারো কাজের কুমারী দিগন্ত সামনে । থর থর প্রত্যাশায় উদ্বেল অধীর । পৃথিবী বিশাল গতির ছন্দে মুখর । সময়ের স্তরে তৃপ্তিবিহীন দাবীর ঘোষণা লেখা ।

চার সমুদ্র কখন হয়েছে উত্তাল । মেঘের পাহাড় স্রোতসির ঢেউয়ে ক্রোধের ফণা পাঁচ মহাদেশ কিসের আবেগে উদ্বেল ঝড়ো বাতাসের পাঁজরে ফুঁসছে কি বিস্ফোরণ কীট পতঙ্গ নিপাত যাক – দুর্দমনীয় শক্তিতে মরা অগ্নুৎপাত ।”

মাও সে তুং

radical.alternative@gmail.com