কলকাতাঃ হুকুমচাঁদ জুটমিলে FACT FINDING TEAM এর একটি অভিজ্ঞতা ।। জুবি সাহা

201508131618215622_Situation-of-Hukumchand-jute-mill-is-not-normal-still-now_SECVPF
কাল(৬ই ডিসেম্বর) আমরা র‍্যাডিকাল এর উদ্যোগেনভেম্বর বিপ্লব শতবর্ষ প্রস্তুতি কমিটি’র পক্ষ থেকে ৫ জন ছাত্রছাত্রী হুকুমচাঁদ জুটমিলে যাই। আমরা ছিলাম সৌম্যদীপ (রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ),বাবু (সেতু প্রকাশনীর সাথে যুক্ত), সুব্রত ও গুপী(চাঁদপাড়া, ‘হককথা’ পত্রিকার সাথে যুক্ত) আর আমি জুবি(যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়)
আমরা গিয়েছিলাম একটা fact-finding team হিসেবে। এই জুটমিলে কতজন কাজ করেন, তাদের মধ্যে কতজন পার্মানেন্ট আর কতজন ঠিকা শ্রমিক, এখানকার শ্রমিকদের মধ্যে নারী-পুরুষ শ্রমিক কতজন, তাদের বেতন আদৌ সমান কি না, কারখানার ভেতরে কাজের পরিবেশ কতটা স্বাস্থ্যকর, মিল বন্ধ হওয়ার পর যে আন্দোলন চলছে তাকে ওনারা কিভাবে দেখছেন, মালিকপক্ষ কি বলছে, সরকারের কি মনোভাব, এই আন্দোলনের সাথে আশেপাশে যে আরও অনেক জুটমিল আছে সেখানকার শ্রমিকদের কিরকম সম্পর্ক- এ জাতীয় নানান বিষয় আমরা শ্রমিক বন্ধুদের কাছ থেকে জানব, এমনটাই ভাবনা নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম। প্রয়োজনে যদি সম্ভব হয় মালিক বা যেকোনো union এর নেতাদের থেকেও তাদের মনোভাব আমরা জানব।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল একেবারে নতুন ধাঁচের। হালিশহরে নেমে অটো চেপে দুপুর ১২ টা নাগাদ হুকুমচাঁদের গেটে পৌছতেই দেখলাম যে সেখানে প্রায় ৩০-৪০ জন পুলিশ পুরো গেটটিকে ঘিরে রেখেছে। আমরা যেতেই একজন মহিলা পুলিশ আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “আপনারা এখানে কি করছেন?” আমরা পাল্টা জিজ্ঞেস করাতে উনি বললেন, ওনাদের কাছে বিশেষ খবর আছে, তাই এখানে দাঁড়ানো চলবে না। আমরা জানতে চাই এখানে কি ১৪৪ ধারা আছে? উত্তর আসে ‘না’, কিন্তু এখানে দাঁড়ানো চলবে ‘না’। ওখানে তখন তেমন মানুষজন ছিল না। তাই খুব বেশী বাকবিতন্ডায় না জড়িয়ে আমরা পাশেই শ্রমিক মহল্লার দিকে চলে যাই। এরপর রাস্তায় স্থানীয় কিছু ছেলেদের সাথে যেই আমরা কথা বলতে যাই, দেখি আমাদের ঠিক পেছনে (প্রায় ঘাড়ের ওপর) একটা বড় গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ১৪-১৫ জন পুলিশ, র্যা ফ সমেত। এদের মধ্যে ৪ জন ক্যামেরা দিয়ে আমাদের ভিডিও করছে। আমরা জিজ্ঞেস করি, এটা কি করছেন? কিন্তু ওদের মুখে কুলুপ আঁটা। যে ছেলেরা আমাদের সাথে কথা বলছিল তারা ভয়ে চুপ করে যায়। এরপর হাঁটতে হাঁটতে আমরা এক বাড়িতে ঢুকি। ঐ পরিবারটি হুকুমচাঁদের সাথেই যুক্ত। ওনারা আমাদের সাথে কথা বলতে রাজি হন। কিন্তু নিমেষে দেখি, বাড়ির দরজায় পুলিশ ক্যামেরা আর লাঠি হাতে ঘিরে ধরেছে। আমাদের এবং ঐ পরিবারের পুরো ভিডিও হচ্ছে। এবার আমরা ওদের পরিস্কারভাবে বলি এটা কি করছেন আপনারা? কেন করছেন? আপনাদের মধ্যে কে কথা বলবেন? কিন্তু আগের মতই নিরুত্তর। শুধুমাত্র আমদের সমস্ত চলাফেরা রেকর্ড হতে থাকে। আমরা বুঝতে পারি, এভাবে যে কাজে আমরা এসেছি, সেটা আজ আর করা সম্ভব নয়। কারণ এভাবে কেউ ভয়ে মুখই খুলতে চাইবে না। সিদ্ধান্ত নেই, আমরা এই মুহূর্তেই বাইরের বন্ধুদের, APDR, MEDIA সহ সমস্ত জায়গায় জানাবো এটা। একটা চায়ের দোকানে বসে ফোন করতে শুরু করি। সেটাও অবশ্য ক্যামেরাবন্দী অবস্থাতেই!
ইতিমধ্যে প্রথমে আমরা যে ছেলেদের সাথে কথা বলেছিলাম, তাদেরই মধ্যে একজন আমাদের কাছে এসে বলে, তোমাদের ওরা তুলবে। তোমরা চায়ের পয়সা দিও না। আমরা দেবো। আমরা বুঝতে পেরেছি, তোমরা ক্রান্তিকারী। এই অল্প সময়ে এটা আমাদের কাছে সত্যিই বড় পাওনা এবং উনি এটা আশেপাশের সবাইকে বলতে থাকেন। উনিও ক্যামেরার আওতাতেই ছিলেন!
পুলিশ চেয়েছিলো এলাকায় একটা মারাত্মক আতঙ্ক তৈরি করে কথাবার্তার সমস্ত পথ বন্ধ করতে আর এই খবরটা যাতে বাইরে না ছড়ায়, সেই ব্যবস্থা করতে। কিন্তু যখন দেখে তা হচ্ছে না, ওখানকার মানুষেরাও জানছেন আর এদিকে বাইরেও এটা সবাই জানছে, তখন ওরা সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের তোলার, নিমেষে বড় বড় ৩টে গাড়ি ঢোকে, সঙ্গে প্রচুর force এবং বড়বাবু। গাড়ি থেকে পুরো DABANG এর কায়দায় বড়বাবু নেমে বললেন,“১ মিনিটের মধ্যে এখান থেকে বেড়িয়ে যা!” আমরা যখন বলি ‘কেন?’, উত্তর আসে ‘তোল সবকটাকে।’ শুরু হয় ঘুষি, লাথি, মার। তোলে গাড়িতে। থানায় নেমেই আমদের সবার ফোন, ব্যাগ কেড়ে নেয়। তারপর চলতে থাকে দফায় দফায় জেরা, ছবি তোলা আর Address বলা। প্রত্যেককে প্রায় ৩-৪বার করে জেরা করেছে ACP, STF, SPECIAL BRANCH এর অফিসার। জেরার সময় আমার ফোনের মেসেজ পুলিশ নিজের ফোনে আমকে দেখাচ্ছে। বুঝলাম ফোনের সবকিছু ওদের আওতায়। এরপর শুরু হয় প্রত্যেকের বাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি। সৌম্যদীপের পাড়ায় তো পুলিশ ওকে ISIS এর চর বলে রটিয়ে দিয়েছে। কারণ ওর মুখে হাল্কা দাড়ি আর ও হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বলে। ইতিমধ্যে বাইরে আমাদের অনেক বন্ধু অপেক্ষা করছিলো। তাদের এবং আমাদের প্রতিনিয়ত চাপের মুখে আমরা রাত ৮.৩০টায় মুক্তি পাই।
এই শ্রেণীবৈষম্যে ভরা সমাজের যে প্রান্তে আমরা থাকি তার উল্টো দিকের চেহারাটাকে আমরা জানতে গিয়েছিলাম, মেলাতে চেয়েছিলাম এই দুই প্রান্তকে। শ্রমিক-কৃষক-ছাত্রের যে ঐক্যের কথা আমরা মুখে বলি, তাকে বাস্তবায়িত করতে। আর এই ঐক্যকে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা ভয় পায়, তা খুব ভালোভাবে আরও একবার টের পেলাম। তাই সেই ঐক্য গঠনের ন্যূন থেকে ন্যূনতম সম্ভাবনাকে সে গোড়াতেই মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু পারবে কি? আমাদের চ্যালেঞ্জ এখন একটাই হওয়া উচিত যে সে ঐক্য আমরা গড়বোই। গণতন্ত্রের যে রিসার্ভ ফরেস্টে আমরা থাকি সেখান থেকে বেরিয়ে সেই সমস্ত জায়গায় আমরা যাবো যেখানে গণতন্ত্রের ‘গ’ নেই। ইতিমধ্যে অনেকেই হুকুমচাঁদে গেছেন, তাদের সবার কাছে আবেদন রইল চলুন আবার আমরা সবাইমিলে একসাথে আগামী ১৩ তারিখ হুকুমচাঁদে যাই। আর রাষ্ট্রের চোখরাঙ্গানির মুখে থুতু ছিটিয়ে বলে আসি
শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুব ঐক্য জিন্দাবাদ।’


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.