‘বিদ্রোহী’ কবি রমাশঙ্কর যাদবের উপর নির্মিত আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয়ী তথ্যচিত্র ‘আমি তোমার কবি’

(রমাশঙ্কর যাদববিদ্রোহী’, যিনি বিদ্রোহী বলেই পরিচিত ছিলেন, গত ৮ই ডিসেম্বর জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মারা যান। তিনি গত ৩ দশক ধরে জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের(JNU) ক্যাম্পাসে একটি গাছের নিচে বাস করছিলেন, এই ৩০টি বছর তিনি হাজার হাজার ছাত্রকে রাত জেগে বিদ্রোহের কবিতা শোনাতেন। তিনি একাধারে কবি ও সংস্কৃতি কর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের একজন নিয়মিত কবি ছিলেন । কবিতা লিখতেন না। কবিতা বলতেন। কবিতা গুলো মূলত বর্ণ ও লিঙ্গ-ভিত্তিক নিপীড়ন এবং অতিক্রান্ত সময়কে কেন্দ্র করে। তার কবিতাগুলির কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। আর ওনার একটা মাত্র কবিতার বই বেরিয়েছিল। সেটাও উনি নিজে লেখেন নি, ওনার কবিতাগুলি শুনে অন্যরা লিপিবদ্ধ করেছিল । তাঁর উপর নির্মিত ‘আমি তোমার কবি‘ ছবিটি মুম্বাই আন্তর্জাতিক তথ্য চিত্র উৎসব ২০১১ এ সেরা তথ্যচিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। এতে কবিতা কি ও কার জন্যে এসব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি তুলে ধরেছেন –লাল সংবাদ)

Advertisements

কলকাতাঃ নকশালপন্থীদের ওয়েব পোস্টার “হুকুমচাঁদ জুট মিল চলো”

12345396_747678588699562_7569600480798878796_n


JNU ক্যাম্পাসের কবি রমাশঙ্কর যাদব ‘বিদ্রোহী’র দুটি কবিতার অনুবাদ

vidrohi-759

(রমাশঙ্কর যাদববিদ্রোহী’, যিনি বিদ্রোহী বলেই পরিচিত ছিলেন, গত ৮ই ডিসেম্বর জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মারা যান। তিনি গত ৩ দশক ধরে জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের(JNU) ক্যাম্পাসে একটি গাছের নিচে বাস করছিলেন, এই ৩০টি বছর তিনি হাজার হাজার ছাত্রকে রাত জেগে বিদ্রোহের কবিতা শোনাতেন। তিনি একাধারে কবি ও সংস্কৃতি কর্মী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের একজন নিয়মিত কবি ছিলেন । কবিতা লিখতেন না। কবিতা বলতেন। কবিতা গুলো মূলত বর্ণ ও লিঙ্গ-ভিত্তিক নিপীড়ন এবং অতিক্রান্ত সময়কে কেন্দ্র করে। তার কবিতাগুলির কিছু ভিডিও পাওয়া যায়। আর ওনার একটা মাত্র কবিতার বই বেরিয়েছিল। সেটাও উনি নিজে লেখেন নি, ওনার কবিতাগুলি শুনে অন্যরা লিপিবদ্ধ করেছিল । নীচে ওনার দুটি প্রিয় কবিতার বাংলা অনুবাদ সাথে রয়েছে ওনার মূল কবিতা বলার ভিডিও –লাল সংবাদ)

vidrohi_120915045848
মহেঞ্জোদরোর শেষ সিঁড়ি থেকে
আমি সাইমন,
ন্যায়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।
প্রকৃতি ও মানুষ আমার হয়ে সাক্ষী দিক!
আমি বলছি,
মহেঞ্জোদরোর দিঘির শেষ সিঁড়ির ধাপ থেকে,
যেখানে এক নারীর পোড়া লাশ পড়ে আছে,
আর দিঘিতে ছড়িয়ে মানুষের ভাঙাচোরা হাড়।
এরকম পোড়া লাশ
পাওয়া যাবে ব্যাবিলনে,
আর ঠিক এরকম ছড়ানো হাড়গোড়
মিলবে মেসোপটেমিয়াতেও।
আমি ভাবছি আর ভেবেই চলেছি,
কেন
সব প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মোহানায়
এক নারীর পোড়া লাশ পড়ে থাকে,
আর ছড়িয়ে থাকে মানুষের হাড়গোড়।
যা আবহমান কাল পড়েই রয়েছে,
সিথিয়ার পাথুরে জমি থেকে বাংলার ময়দান অবধি,
আর সাভানার জঙ্গল থেকে কান্‌হার বন পর্যন্ত।
এক নারী যে মা হতে পারে ,
বহিন হতে পারে ,
বউ হতে পারে ,
মেয়ে হতে পারে,
আমি বলছি
তোমরা সরে যাও আমার সামনে থেকে।
আমার রক্ত ফুটছে,
আর কলজে জ্বলছে ধিকিধিকি,
পুড়ে যাচ্ছে দেহ।
আমার মা কে, আমার বহিন কে, আমার বউ কে
আমার মেয়ে কে মেরে ফেলা হয়েছে আর
আকাশ থেকে আর্তনাদ করছে আমার পূর্বজরা।
আমি এই নারীর পোড়া লাশের ওপর
মাথা ঠুকে ঠুকে মরে যেতাম ,
যদি না আমার একটি মেয়ে থাকত।
মেয়ে আছে,
সে বলে
যে বাবা, তুমি খামোকাই আমাদের
নিয়ে এত ভেবে মরো!
আমরা মেয়েরা তো গাছের শুকনো ডালপালার মত
যারা বড় হলে চুলোর আগুনে কাজে লেগে যাই।
আর এই যে মানুষের ইতস্তত হাড়গোড়
তা রোমান দাসদেরও হতে পারে
বা বাংলার তাঁতিদের
হতে পারে অতি আধুনিক কালের ভিয়েতনামের, প্যালেস্তাইনের বা ইরাকের
শিশুদেরও।
সাম্রাজ্য তো শেষ বিচারে সাম্রাজ্যই
তা সে রোমান সাম্রাজ্য হোক
কি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য
বা অতি আধুনিক কালের আমেরিকার সাম্রাজ্য।
তার একটাই কাজ-
পাহাড়ে মালভূমিতে
নদী তীরে, সাগরের পারে
মাঠে ময়দানে মানুষের হাড়গোড় ছড়িয়ে দেওয়া।
যা কিনা ইতিহাসকে তিনটি বাক্যে
ধরে রাখবে বলে কথা দেয়-
যে আমরা পৃথিবীতে আগুন লাগিয়েছি,
যে আমরা পৃথিবীতে ভরে দিয়েছি ধ্বংসের ফুলকি,
যে আমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছি মানুষের হাড়গোড়।
কিন্তু আমি,
স্পার্টাকাসের বংশধর,
স্পার্টাকাসের শপথ নিয়ে বাঁচি-
যে যাও বলে এসো সবাইকে
যে আমরা সারা দুনিয়ার গোলামদের একত্র করব,
আর এক দিন ঠিক আসবো রোমে।
কিন্তু আমরা কোথাও যাব না
কারণ ঠিক এই সময়ে, যখন আমি
আপনাদের কবিতা শোনাচ্ছি,
তখন লাতিন আমেরিকার মজদুর
মহান সাম্রাজ্যের কবর খুঁড়ছে ,
আর ভারতের মজদুর
তার পোষা ইঁদুরের গর্তে জল ভরছে।
এশিয়া থেকে আফ্রিকা
ছড়িয়ে পড়েছে যে ঘৃণার আগুন,
সে আগুন তো নিভবে না বন্ধু!
কারণ সে আগুন
এক নারীর পুড়ে যাওয়া লাশের আগুন
সে আগুন ইতস্তত ছড়ানো মানুষের হাড়ের আগুন।
ইতিহাসে প্রথম স্ত্রী হত্যা
তার ছেলে করেছিল, তার বাপের কথায়।
জমদগ্নি বলল, ও পরশুরাম!
আমি তোমায় বলছি তুমি তোমার মা কে বধ কর
আর পরশুরাম তাই করল।
এইভাবে ছেলে পিতার হল
আর পিতৃতন্ত্র এল।
তখন পিতা তার পুত্রকে বধ করল।
জাহ্নবী তার স্বামীকে বলল
যে আমি তোমায় বলছি
তুমি আমার জলে আমার সন্তানদের ডুবিয়ে দাও,
আর রাজা শান্তনু নিজের সন্ততিদের
গঙ্গায় ডুবিয়ে দিল।
কিন্তু শান্তনু জাহ্নবীর হল না
কারণ রাজা কারুর হয় না
লক্ষ্মী কারুর হয় না
কিন্তু সবাই রাজার হয়,
গরুও, গঙ্গাও, গীতাও, আর গায়ত্রীও।
আর ঈশ্বরের কথা কি বলি, সে তো রাজার ঘোড়ার
ঘাসই কেটে গেল ,
বড়ই ভালোমানুষ ছিল গো বেচারা ঈশ্বর
রাজার ভারি ন্যাওটা
আফশোষের বিষয় যে সে আর নেই
বহু দিন হল গত হয়েছে।
আর যখন মরল তখন রাজা তাকে দফন ও করল না
দফনের জন্য দু’গজ জমিও দিল না।
কারুর জানা নেই ঈশ্বরকে কোথায় গোড় দেওয়া হল।
যাহোক, ঈশ্বর মরল
এবং তার মরা ইতিহাসের পাতায় উঠল,
এমনটা ইতিহাসকারেরা বলে
ইতিহাসকারেরা এও বলে
যে রাজাও মরল
তার রানীও মরল
আর তার ছেলেও মরল।
রাজা লড়াইতে মরল,
রানী কড়াইতে মরল,
আর ছেলে, লোকে বলে, ‘পড়াই’ তে মরল।
কিন্তু রাজার ধনদৌলত রয়ে গেল
আর বেড়েই চলল।
আর ফের সেই একই কথা
সব সভ্যতার মোহানায় এক নারীর
পোড়া লাশ
আর মানুষের ছড়ানো ছেটানো হাড়গোড়।
এই লাশ পোড়েনি, একে পোড়ানো হয়েছে,
এই হাড়গোড় ছড়ায়নি, ছড়ানো হয়েছে,
এই আগুন লাগেনি, লাগানো হয়েছে,
এই লড়াই বাঁধেনি, বাঁধানো হয়েছে,
কিন্তু কবিতাও লেখা ছিল না, লেখা হয়েছে,
আর যখন কবিতা লেখা হয়
তখন আগুন তো জ্বলবেই।
আমি বলছি তোমরা আমায় এই আগুন থেকে বাঁচাও আমার প্রিয়জনেরা!
আমার পুবের মানুষেরা, আমায় এই আগুন থেকে বাঁচাও!
তোমরা, যাদের সুন্দর ক্ষেতগুলোকে তলোয়ারের ধারে কাটা হয়েছে
যাদের ফসলকে রথের চাকার তলায় পেষা হয়েছে।
আমার পশ্চিমের মানুষেরা, আমায় এই আগুন থেকে বাঁচাও!
যাদের স্ত্রীদের বাজারে বেচা হয়েছে
যাদের শিশুদের চিমনিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমার উত্তরের মানুষেরা, আমায় এই আগুন থেকে বাঁচাও!
যাদের পূর্বজদের পিঠে পাহাড় ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সুদূর দক্ষিণের মানুষেরা, আমায় এই আগুন থেকে বাঁচাও!
দাবাগ্নিতে যাদের বস্তি জ্বালানো হয়েছে,
অতল জলরাশিতে যাদের নৌকোগুলো ডোবানো হয়েছে।
তোমরা সবাই মিলে আমাকে বাঁচাও-
আমি, যার রক্তের চুনসুরকি দিয়ে
তৈরি হয়েছে পিরামিড, মিনার, প্রাচীর…
কারণ আমাকে বাঁচানো মানে সেই নারীকে বাঁচানো
যার লাশ মহেঞ্জোদরোর দিঘির শেষ সিঁড়ির ধাপে
পড়ে আছে।
আমাকে বাঁচানো মানে সেই মানুষদের বাঁচানো
যাদের হাড়গোড় ছড়িয়ে আছে দিঘি জুড়ে।
আমাকে বাঁচানো মানে তোমার পূর্বজদের বাঁচানো,
আমাকে বাঁচানো মানে তোমার সন্তানদের বাঁচানো,
তোমরা আমাকে বাঁচাও!
আমি তোমাদের কবি।
( মূল কবিতাটি ‘বিদ্রোহী’র মুখে শুনতে পারেন এখানে
নূর মিয়াঁর সুর্মা 
আজ কেউ চোখে আঁকবে ভিক্টোরিয়া ছাপ কাজল
আর কেউ সাধ্বী ঋতম্ভরা ছাপ অঞ্জন
কিন্তু আসল গরুর ঘিয়ের সুর্মা
তো বানাত নূর মিয়াঁই
অন্তত আমার দাদী তো তাই মনে করত
নূর মিয়াঁ যখনই আসত
আমার দাদী সুর্মা কিনত ঠিক
এক টান সুর্মা চোখে লাগাতেই
মেঘের মত ভরে আসত চোখ
গঙ্গা যমুনার মত ছাপিয়ে উঠত ঢেউ
বুড়ির চোখ হয়ে যেত সাগরের মত
যার মধ্যে ডুব দিয়ে আমরা ক্ষুদেরা
দেখতে পেতাম পুরোটাই
দাদী অনেক দোয়া করত নূর মিয়াঁ
আর তার সুর্মার জন্য
বলত,
ভাগ্যিস নূর মিয়াঁর সুর্মা ছিল
তাই তো বয়সও করতে পারছে না কাবু
ছুঁচে সুতো পরিয়ে নিচ্ছি আয়াসে
আর আমার মনে হত যে বলি
ওরে বুড়ি দাদী
তুই হলি সুকন্যা
আর তোর নূর মিয়াঁ চ্যবন ঋষি
নূর মিয়াঁর সুর্মা
তোর চোখের চ্যবনপ্রাশ
তোর চোখ তো চোখ নয়, পীরের থান
আর নূর মিয়াঁর সুর্মা যেন হাতে মাখা সিন্নি।
সেই নূর মিয়াঁ একদিন পাকিস্তান চলে গেল
কেন গেলে পাকিস্তান, নূর মিয়াঁ?
লোকে বলে নূর মিয়াঁর আপন কেউ ছিল না
তাহলে কি আমরাও কেউ ছিলাম না নূর মিয়াঁর?
নূর মিয়াঁ কেন গেলে পাকিস্তান?
আমাদের না বলে
আমার দাদীকে না বলে
নূর মিয়াঁ কেন চলে গেলে পাকিস্তান?
এখন না আছে সেই চোখ আর না সেই সুর্মা
যে ঘাট দিয়ে দাদী এসেছিল
সেই ঘাটেই গেল
নদী পেরিয়ে বিয়ে হয়ে এসেছিল আমার দাদী
অমনি নদী পেরিয়েই চলে গেল
যখন ওর ছাই ভাসিয়ে দিচ্ছি নদীর জলে
তখন মনে হল এই নদী তো নদী নয়, আমার দাদীর চোখজোড়া
আর এই ছাই, ছাই নয়
নূর মিয়াঁর সুর্মা
যা পড়ছে আমার দাদীর চোখে
এইভাবে শেষ বারের মত
আমার বুড়ি দাদীর চোখে
পরালাম নূর মিয়াঁর সুর্মা।
( মূল কবিতাটি ‘বিদ্রোহী’র মুখে শুনতে পারেন এখানে
vidrohi-a-poet-2-1024_120915051138
অনুবাদকঃ Kas Turi