ভারতঃ শক্তি বাড়াচ্ছে মাওবাদীসহ গোর্খারা, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের উদ্বেগ

42be6ed808e9acffb9510d161f262355_XL

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে মাওবাদীদের বিবৃতিতে চিন্তায় পড়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। মাওবাদীদের পক্ষ থেকে দেয়া ওই বিবৃতিতে নভেম্বর বিপ্লবের স্মরণে বর্ধমানে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছে। সশস্ত্র গণমিলিশিয়া গঠনেরও ডাক দেয়া হয়েছে। এর অর্থ সাধারণ মানুষকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া।

লালগড় আন্দোলনের সময় সিধো-কানহু গণ মিলিশিয়াকেই মাওবাদীরা দেশের মধ্যে তাদের মডেল হিসাবে তুলে ধরেছিল। এই বিবৃতি হাতে পেয়ে গোয়েন্দাদের সন্দেহ, তাহলে কি মিলিশিয়া গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে মাওবাদীরা?

ওই বিবৃতিতে সাধারণ মানুষের কাছে কৃষির বিকাশ ঘটানো ও সমবায় আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ভূস্বামী-সরকার ও শাসকের জমি বাজেয়াপ্ত করে তা জমিহারাদের মধ্যে বন্টনের দাবিও তুলেছে মাওবাদীরা

বিবৃতিতে সরকারকে ট্যাক্স-সেস-লেভি দেয়া বন্ধ করার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে গণমিলিশিয়া গঠনের আহ্বানকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন গোয়েন্দারা।

এসবের পাশাপাশি আসামের চিরাংয়ে একটি গাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি  অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং প্রচুর পরিমাণ কার্তুজ উদ্ধারের পর গোয়েন্দাদের চিন্তা আরো বেড়ে গেছে।

আসাম পুলিশের দাবি, ইউনাইটেড গোর্খা পিপলস অর্গানাইজেশন নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের জন্য আনা হচ্ছিল অস্ত্র এবং কার্তুজগুলো। নাগাল্যান্ড থেকে আসাম হয়ে দার্জিলিং আসছিল গাড়িটি।

উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলিবারুদের মধ্যে রয়েছে, ১টি এম ১৬ রাইফেল, ২টি বেরেটা পিস্তল, ৩টি পয়েন্ট ৩২ পিস্তল, নাইন এমএম পিস্তলের ৩০০ রাউন্ড কার্তুজ, একে রাইফেলের ১৯৮ রাউন্ড কার্তুজ।

আসামের ঢালিগাঁও থানার ছাপাগুড়ি অঞ্চলে গাড়িটিকে আটক করে আসাম পুলিশ, সিআরপিএফ ও এসএসবি। গাড়িটি দার্জিলিংয়ের  রেজিস্ট্রেশন করানো।

গ্রেফতার হয়েছে দার্জিলিংয়ের বাসিন্দা উমেশ কামি ও বাকসার  বাসিন্দা গণেশ ছেত্রী। আসাম পুলিশ বলছে, নাগাল্যান্ড থেকে অস্ত্র পাচার করা হচ্ছিল দার্জিলিংয়ে ইউনাইটেড গোর্খা পিপলস অর্গানাইজেশনের প্রশিক্ষিত জঙ্গিদের কাছে। এই সব মিলিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে।

সূত্রঃ http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/item/67568-%E0%A6%B6%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%B8%E0%A6%B9-%E0%A6%97%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%96%E0%A6%BE-%E0%A6%9C%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE,-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6-%E0%A6%93-%E0%A6%97%E0%A7%8B%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%97


‘নেপালকে ভাঙার চেষ্টা করছে ভারত’

প্রচণ্ড

প্রচণ্ড

নেপালের উপ প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ মাইনালি অভিযোগ করেছেন, ভারত তার দেশকে ভাঙার চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, তেরাই অঞ্চলকে নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের সঙ্গে একীভূত করতে চাইছে নয়াদিল্লি। রাজধানী কাঠমান্ডুতে আজ (শনিবার) এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।

চন্দ্র প্রকাশ দাবি করেন,  ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাদেশি জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি ভারতের এ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভারতের এ ধরনের তৎপরতা দু দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অনুকূল হবে না।

এদিকে, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা ইউসিপিএন (মাওবাদী) চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছেন, অঘোষিত অবরোধ দিয়ে ভারত যে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে তা মোকাবেলা করবে নেপালের জনগণ। তিনিও এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন।

প্রচন্ড নামে পরিচিত নেপালের সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমঝোতার মধ্য দিয়ে ভারত-নেপাল সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় দেশটির মানুষ। কিন্তু ভারত যদি আধিপত্য বিস্তার করতে চায় তবে নেপালের মানুষ সে নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, নিজেদের সংবিধান গ্রহণ করে নেপালের মানুষ কোনো অপরাধ করে নি।

সূত্রঃ http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/2010-04-21-08-29-54/item/78983-%E2%80%98%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E2%80%99


‘চীন, পাকিস্তান এবং নক্সালপন্থিরা ভারতের জন্য প্রধান হুমকি’

26_04_59_35_Maoist_guerrillas

ভারতের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অরূপ রাহা চীন, পাকিস্তান এবং নক্সালপন্থি নামে পরিচিত মাওবাদী গেরিলা গোষ্ঠীকে ভারতের জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

রাজধানী দিল্লিতে ১২তম সুব্রত মুখার্জি সেমিনারের উদ্বোধনী ভাষণে এ কথা বলেছেন তিনি। উপমহাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নয়াদিল্লির জন্য মারাত্মক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে জানান তিনি। অরূপ রাহা বলেন, কৌশলগত লক্ষ্যকে সামনে রেখে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাড়ছে। আর এটি ভারতের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

ভারতের বিমান বাহিনী প্রধান বলেন, সব প্রতিবেশীর সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে চীন। এ ছাড়া, টিএআর নামে পরিচিত স্বায়ত্ত্বশাসিত তিব্বত অঞ্চলের অবকাঠানোর উন্নয়ন করছে বেইজিং। সেইসঙ্গে, দাওচেং ইয়াদিং-এ তৈরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত বিমানবন্দর, কিংহাই প্রদেশের শিনিয়াং-এ তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে উচ্চতায় অবস্থিত রেললাইন। এই রেললাইন তিব্বত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে বেইজিং।

পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর এবং ইসলামাবাদ নিয়ন্ত্রণ আজাদ কাশ্মিরের মধ্য দিয়ে চীনের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের কথাও উল্লেখ করেন এয়ার চিফ মার্শাল অরূপ রাহা। তিব্বত থেকে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন তিনি। ভারতের বিমান বাহিনী প্রধান  চীনের এসব পদক্ষেপকে কৌশলগত তৎপরতা হিসেবে তুলে ধরে দাবি করেন, ভারতকে কোণঠাসা করাই এসবের উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, ভারত মহাসাগরে নিজ উপস্থিতির প্রমাণ দেয়ার লক্ষ্যে জলদস্যু নিয়ন্ত্রণের নামে সাবমেরিন পাঠাচ্ছে চীন।

ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, বাইরের চ্যালেঞ্জের চেয়ে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ আলাদা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক অতীতে নক্সালবাদ ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একক এবং বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া মাওবাদী গেরিলাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় বিমান বাহিনীর ভূমিকাও তুলে ধরেন এয়ার চিফ মার্শাল অরূপ রাহা। তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো মাওবাদীদের বিরুদ্ধে ১৫,১০০ দফা অভিযান চালিয়েছে।  এ ছাড়া, এসব হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৭৪,০০০ পুলিশ ও ১,৬০০ টন মালামাল বহন করা হয়েছে। পাশাপাশি গত ছয় বছরে ১,০০০ আহত ব্যক্তি এবং বহু নিহত ব্যক্তির দেহাবশেষও বহন করা হয়েছে।

সূত্রঃ http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/2010-04-21-08-29-54/item/79102-%E2%80%98%E0%A6%9A%E0%A7%80%E0%A6%A8,-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B9%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%95%E0%A6%BF%E2%80%99


ভারতঃ মাওবাদী নেতা ভাস্কর মুখোপাধ্যায় গ্রেফতার হয়েছেন

maoists-danger-in-india

মাওবাদী নেতা ভাস্কর মুখোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করল পুলিশ। পুলিশের কাছে খবর ছিল, তিনি কলকাতা থেকে জনশতাব্দী এক্সপ্রেস ধরে বড়াজামদা স্টেশনে নামবেন। সেখান থেকে যাবেন সারণ্ডা। গত কাল জনশতাব্দী এক্সপ্রেস থেকে বড়াজামদা স্টেশনে নামতেই তাঁকে গ্রেফতার করে চাইবাসা পুলিশ। আটক মাওবাদী নেতার কাছে ১০টি ওয়ারলেস যন্ত্র, মাওবাদ সংক্রান্ত নথি মিলেছে। পুলিশের দাবি, সে সব জিনিসপত্র সারণ্ডার মাওবাদী ঘাঁটিতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন তিনি।

সূত্রঃ http://www.anandabazar.com/national/%E0%A6%9D-%E0%A6%A1-%E0%A6%96%E0%A6%A3-%E0%A6%A1-%E0%A6%A7-%E0%A6%A4-%E0%A6%AE-%E0%A6%93%E0%A6%AC-%E0%A6%A6-%E0%A6%A8-%E0%A6%A4-1.264627


ভারতঃ মাওবাদীদের খোঁজে নামানো হচ্ছে ‘সন্তু রোবট’

Bomb_Disposal-1612-300x169

ছত্তিশগড়ের পর এ রাজ্যেও জঙ্গলে মাওবাদীদের খোঁজ দেবে সন্ত রোবট। অনেকটা জে সি বি মেশিনের মতো দেখতে ৪৫ কেজির এই রোবট রিমোট চালিত। ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল, খানাখন্দ পেরিয়ে পৌঁছে যাবে মাওবাদীদের কাছাকাছি। এতে ৫টি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। সেই ছবি ওয়াই ফাইয়ের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে সি আর পি এফ বা গোয়েন্দা অফিসারদের কাছে। বুধবার খড়্গপুরের সালুয়ায় ই এফ আর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংলগ্ন জঙ্গলে এর মহড়া দেওয়া হয়। জঙ্গলপথে ৫/৭ ফুটের চওড়া গর্ত বা ডোবা পড়লে ট্যাঙ্কারের মতো রবারের বেল্টের সাহায্যে তা পেরিয়ে যেতে পারবে। মাওবাদীরা যদি এর গতিবিধি টের পায় তবে তার সঙ্কেত সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গা ঢাকা দেবে, নয়ত পালিয়ে আসবে। যদি শত্রুপক্ষ একে ধরতে আসে বা আক্রমণ করে, তবে এতে লাগানো এ কে ৪৭ স্বয়ংক্রিয় বন্দুক দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটবে মাওবাদীদের দিকে। যে–কোনও পজিশনে এটি গুলি ছুঁড়তে পারবে। সলিড ফাইবার ও মনো–কার্বন মিশ্রণে তৈরি এই রোবট সহজে ভাঙবে না। আগুনে পুড়বে না। জলে ডুবে থাকলেও নষ্ট হবে না।

সূত্রঃ http://aajkaal.in/districts/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%93%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%96%E0%A7%8B%E0%A6%81%E0%A6%9C-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A7%8D/


“আমি অন্তত আন্না হতে চাই না”- অরুন্ধতী রায়

arundhati_roy_20140310

(দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারের বঙ্গানুবাদ।)

টিভি-তে যেটা দেখছি সেটা বিপ্লব হলে, সাম্প্রতিক কালের এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং নির্বোধ বিপ্লব। জনলোকপাল বিল নিয়ে আপনার মনে যে প্রশ্নেরই উদয় হোক না কেন, সম্ভাব্য উত্তর যা আপনি পেতে চলেছেন তা এরকম: ক) বন্দে মাতরম, খ) ভারত মাতার জয়, গ) ভারত হল আন্না, আন্নাই ভারত, ঘ) জয় হিন্দ। সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে, আপনি বলতে পারেন মাওবাদীদের সঙ্গে জনলোকপালবাদীদের একটি সাদৃশ্য কিন্তু আছে –দুপক্ষেরই উদ্দেশ্য ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলা। একপক্ষ একেবারে গোড়া থেকে গরিব, তস্য গরিবদের (যাঁদের অধিকাংশই আদিবাসী) নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলছে। অন্য দিকে, সদ্য সাধুর আখ্যা পাওয়া আন্না হাজারের নেতৃত্বে চলছে অহিংস গান্ধীবাদী আন্দোলন, অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই শহুরে এবং নিশ্চিত ভাবে যাঁদের জীবনযাত্রার মান আদিবাসীদের থেকে উন্নত (এ ক্ষেত্রে সরকার নিজেই নিজেকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনে অক্সিজেন যোগাচ্ছে)। ২০১১-র এপ্রিলে আন্নার আমরণ অনশন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই, বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে, সরকার, তথাকথিত ‘নাগরিক সমাজের’ নামাঙ্কিত ব্র্যান্ড ‘টিম আন্না’-কে দুর্নীতি রোধক আইন প্রণয়নের জন্য যুগ্ম কমিটির অংশ হতে আমন্ত্রণ জানায়। কয়েক মাস পরেই সরকার অবশ্য নিজেই এই সংক্রান্ত বিল পেশ করে সংসদে, অজস্র ফাঁক-ফোঁকর থাকা এই বিলটিকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও জায়গাই ছিল না। তারপরে ১৬ অগাস্ট ২০১১ সকালে, আন্নার দ্বিতীয় আমরণ অনশন শুরু করার আগেই তাঁকে জেলে ভরে দেওয়া হল। জনলোকপাল বিলের জন্য এই লড়াই মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারের দিকে মোড় নিল। গণতন্ত্রের নিজের জন্যেই শুরু হল সংগ্রাম। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শুরুর কয়েক এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্নাকে ছেড়ে দেওয়া হল। যদিও নাটকীয় ভাবে তিনি জেল থেকে বেরোতে অস্বীকার করলেন। তিহার জেলের ভিতরে মাননীয় অতিথি হয়ে শুরু করে দিলেন অনশন—তাঁকে জনগণের সামনে অনশনের অনুমতি দিতে হবে। তারপরের তিন ধরে, তিহার জেলের বাইরে টিভি-ভ্যান ও জনতার ভিড় লেগে রইল। টিম আন্নার সদস্যরা ঘনঘন উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন তিহার জেলের ভিতরে ও বাইরে যাতায়াত করতে লাগলেন, জেলে এ অনশনরত আন্নার বক্তব্যের ভিডিও টিভি-র সমস্ত চ্যানেলগুলিতে দেখান হতে থাকল। (আর কোনও মানুষের জন্যে এই বিলাসিতার ব্যবস্থা করা হত? ) এরমধ্যে দিল্লি পুরসভার ২৫০ জন কর্মী, ১৫টি ট্রাক, ৬টা বুল-ডোজার রামলীলা ময়দানকে সপ্তাহান্তের চিত্তাকর্ষক মনোরঞ্জনের মঞ্চ করে তুলতে দিনরাত কাজ করে গেছে। এইবারে, অসংখ্য দর্শক ও উঁচু ক্রেনের ওপর চাপানো ক্যামেরার সামনে, ভারতের সবচেয়ে দামী ডাক্তারবাবুদের উপস্থিতিতে আন্নার তৃতীয় দফার আমরণ অনশন শুরু হল। “কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর, অখণ্ড ভারত”—টি.ভি.র সঞ্চালকরা আমাদের জানালেন। তাঁর উপায়টা গান্ধীবাদি হলেও দাবিদাওয়া সম্পর্কে সে কথা বলা যাচ্ছে না। গান্ধীর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের তত্ত্বের বদলে জনলোকপাল বিলটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত, দুর্নীতি-বিরোধী একটি আইন, যেখানে সাবধানে নির্বাচিত একটি প্যানেল হাজার হাজার কর্মীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃহৎ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর খবরদারি করবে- পুলিশ থেকে প্রধানমন্ত্রী-বিচার ব্যবস্থা-সাংসদ থেকে শুরু করে একেবারে নিচু স্তরের সরকারি কর্মী কেউ বাদ যাবেন না। লোকপালের নিজস্ব তদন্ত করার অধিকার, কড়া নজরদারি রাখার অধিকার, এমনকী বিচার করার ক্ষমতাও থাকবে। শুধু নিজেদের জেলখানা থাকবে না। একটি স্বাধীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে–বর্তমানের দুর্নীতি গ্রস্ত ব্যবস্থার পাল্টা হিসেবে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার একটি ব্যবস্থাকে শোধরানোর জন্যে আরেকটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ব্যবস্থা। এটা কার্যকর হবে কী হবে না, সেটা নির্ভর করছে আমরা দুর্নীতিকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তার ওপর। দুর্নীতি বলতে কেবলমাত্র বেআইনি কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক অনিয়ম আর ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব? নাকি ক্রমাগত বাড়তে থাকা আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য যেখানে ক্ষমতা মাত্র কিছু লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন একটি ব্যবস্থার ফল? এমন একটি শহরের কথা কল্পনা করুন, যেখানে শুধুমাত্র শপিং মল আছে, রাস্তায় হকারি করা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। একটি হকার স্থানীয় থানার পুলিশ এবং মিউনিসিপালিটির অফিসারটিকে অল্প ঘুষ দিয়ে আইন ভেঙ্গে হকারি করার ব্যবস্থা করল যাঁর গ্রাহক কিনা এমন মানুষ যাঁরা শপিং মলের দামে জিনিস কিনতে পারবেন না। ভবিষ্যতে কি লোকপালের প্রতিনিধিরা তাঁকেও জরিমানা করবেন? তাহলে সাধারণ মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তার সমাধানের জন্যে কাঠামোগত অসাম্যকে ধরতে হবে, নাকি আরেকটা কুক্ষিগত ক্ষমতার নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে, যেখানে মানুষকে না চাইলেও ভরসা রাখতেই হবে? এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এক্ষুনি নজর দেওয়া জরুরি , সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রীন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগঢ়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কারেন নি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোন মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতা কে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এখনই নজর দেওয়া জরুরি, সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কাড়েননি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোনো মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতাকে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) সাংবাদিক রা যা করে থাকে, এখনো পর্যন্ত তাই করেছে। আর এস এসের সাথে আন্নার পুরন সম্পর্কের গল্প এখন আমাদের কাছে আছে। আন্নার গ্রাম রালেগান সিদ্ধি তে যে বিগত ২৫ বছর ধরে গ্রম পঞ্চায়েত বা সমবায় সমিতির নির্বাচন হয় না, সে খবরও আমাদের মুকুল শর্মা জানিয়েছন। হরিজনদের সম্পর্কে আন্নার মনোভাবও আমাদের অজান নয়ঃ “ মহাত্মা গান্ধী চাইতেন প্রত্যেকটি গ্রামে একজন সুনার, একজন চামার, একজন কুমহার ইত্যাদি থাকবে। তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজ করে গেলে, গ্রাম স্বয়ং-সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। রালেগান সিদ্ধি তে আমরা এটাই অনুশীলন করছি”। টিম আন্নার অন্যান্য সদস্যরা যে সংরক্ষণ বিরোধী ‘ ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেটা কি আশ্চর্যজনক ঠেকছে? আন্দোলনটির রাশ ছিল কোকা-কোলা এবং ল্যেমান ব্রাদার্স মতো সংস্থার এর পয়সায় চলা কতিপয় এন জি ও র হাতে। আনন্দ কেজরিওয়াল এবং মনীশ সিসোদিয়া, আন্নার প্রধান পরমর্শদাতারা, কবীর নামে একটি সংগঠন চালান, বিগত তিন বছরে যেখানে ৪০০,০০০ ডলার টাকা এসেছে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে। আন্নার দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের প্রধান দাতারা হচ্ছে কিছু ভারতীয় ব্যাবসায়ী সংস্থা যারা নয় এলুমিনিয়াম কারখানা নয় বন্দর বানানো নয় এস ই জেড এর সাথে যুক্ত, এবং কিছু রাজনৈতিকের সাথে এদের নিবিড় সম্পর্কে আছে যারা কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য চালায়। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির দায়ে তদন্তও চলছে। এরা হঠাৎ এত উদ্দীপ্ত কেন? মনে রাখুন জনলোকপাল বিলের দাবিতে আন্দোলনটা যখন শুরু হল, তখন উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া একের পর এক তথ্যে এবং পরপর দুর্নীতির দায়ে জেরবার কিছু প্রবীন সাংবাদিক, মন্ত্রী এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা, কংগ্রেস এবং বিজেপি দুদলেরি। জনগনের কোটি কোটি টাকা কিছু লোকের ট্যাঁক মোটা করে দিয়েছে। বহু বছর পর এই প্রথম সাংবাদিক-লবিস্ট রা বিড়ম্বনায় এবং কর্পোরেট ভারতের তাবড় কিছু অধিনায়কদের গন্তব্য স্থল জেল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের একেবারে আদর্শ সময়। তাই কি? যখন সরকার নিজের দায়িত্ব থেকে হাত ধুয়ে ফেলছে, সরকারের সমস্ত কাজের ভার কর্পোরেট সংস্থা এবং এনজিও গুলির হাতে চলে যাচ্ছে ( পানীয় জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিকম ব্যবস্থা, খনন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ), যখন কর্পোরেট মিডিয়ার ভয়ঙ্কর ক্ষমতা এবং প্রভাব মানুষের চিন্তার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন কর্পোরেটগুলি, মিডিয়া, এন জি ও গুলি যে প্রস্তাবিত লোকপাল বিলের আওতায় থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। আশ্চর্যজনক ভাবে, এদের একটিও প্রস্তাবিত বিলটির আওতায় নেই। সরকার এবং দুষ্ট রাজনৈতিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চেঁচামেচি করা, কায়দা করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। সরকার কে অসুর সাব্যস্ত করে , নিজদের জন্যে আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছে—সংস্কারের দ্বিতীয় পর্যায়– আরও বেসরকারিকরন, সরকারী পরিকাঠামো এবং ভারতের সম্পদের ওপর আরও দখল কায়েম করা। কর্পোরেট দুর্নীতি কে লবিং ফির নাম করে আইনসিদ্ধ করে দেওয়ার দিন আর বেশী দেরি নেই। সমস্যাটা বড় হয়ে উঠছে, কারণ ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন করছে কিছু দুর্নিতিগ্রস্থ নেতা এবং কিছু কোটিপতি, যারা সাধারণ মানুষের সমস্যা গুলো থেকে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থে একটাও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নেই। তাই শুধুমাত্র পতাকা নাড়ানো দেখে আবেগতাড়িত হয়ে লাভ নেই।


অনন্য বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়ক কমরেড স্তালিন

stalin_5001

আজ ১৮ই ডিসেম্বর, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান কমরেড জে ভি স্তালিনের জন্মদিবস। দুনিয়ার সর্বত্র এই দিনটিতে মেহনতী জনগণ কমরেড স্তালিনের মহান অবদানগুলোকে স্মরণ করে শ্রেণী সংগ্রামকে তীব্র করে তোলবার শপথ নিচ্ছেন। এই অবসরে কমরেড স্তালিনের জীবন ও শিক্ষাকে আরও একবার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ক্রমশ জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যে‍‌তে হবে।

রুশ বিপ্লবের অন্যতম প্রধান রূপকার কমরেড লেনিন বলেছেন : কোন ব্যক্তি, বিষয়, আন্দোলন অথবা কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন পর্যালোচনা করতে হলে তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় অবস্থা, শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থান, শোষকশ্রেণী ও শোষিত শ্রেণীগুলোর পারস্পরিক শক্তির অবস্থা এবং সর্বহারা শ্রেণীর চরম লক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয়ের তৎকালীন আশু কর্মসূচীর বিশ্লেষণ করতে হবে। এই ধরনের বিচারেই সঠিক মার্কসবাদী মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা বেরিয়ে আসে। ইতিবাচক ও নেতিবাচক কতগুলি ঘটনার যোগ ও বিয়োগ ফলের দ্বারা তা হয় না। মার্কসবাদী দৃষ্টিতে একটা সামগ্রিক, সার্বিক ও অখণ্ড চিন্তা বেরিয়ে আসবে, নতুবা খণ্ডিত বা আংশিক বিচার হয়ে যায়।

কমরেড লেনিনের এই শিক্ষার আলোতেই তাঁর সুযোগ্য সহকারী কমরেড স্তালিনের বিপ্লবী জীবনের শিক্ষাগুলোকে আয়ত্ত করতে হবে। এবং শ্রেণী আন্দোলন ও গণ-আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে তার সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

রাশিয়ার বুকে জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বলশেভিক পার্টি গড়ে তোলা, শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করে তোলবার জন্য সংগ্রাম, ট্রটস্কিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আদর্শগত সংগ্রাম, বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখবার সংগ্রাম, কমরেড লেনিনের জীবনাবসানের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখবার সংগ্রাম এবং সর্বোপরি হিংস্র উন্মত্ত ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মানবজাতিকে রক্ষার সংগ্রামে ব্যাপৃত ছিল কমরেড স্তালিনের সমগ্র জীবন। শুধু তাই নয়, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অটুট রাখতে তিনি পুঁজিবাদী ও ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

কমরেড স্তালিনই সর্বপ্রথম কমরেড লেনিনের শিক্ষা ও তত্ত্বগুলোকে সূত্রবদ্ধ করে সৃষ্টি করেন — ‘লেনিনবাদ’। এর সংজ্ঞা নির্ধারিত করে তিনি বলেছিলেন : লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রমিক-বিপ্লবের যু‍‌গের মার্কসবাদ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, লেনিনবাদ হলো সাধারণভাবে শ্রমিক-বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল এবং বিশেষভাবে এ হলো শ্রমিকশ্রেণীর মতবাদ ও রণকৌশল।

লেনিনবাদকে মার্কসবাদের আরও বিকশিত রূপ হিসেবে উল্লেখ করে তার অসামান্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন কমরেড স্তালিন। সর্বহারারা যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, শ্রমিক-বিপ্লব যখন কার্যক্ষেত্রে আশু ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি সেই প্রাক্‌-বিপ্লব যুগে মার্কস আর এঙ্গেলস তাঁদের কার্যকলাপ চালাতেন। আর মার্কস-এঙ্গেলসের উত্তরসূরি কমরেড লেনিন তাঁর কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক বিপ্লবের বিকাশের যুগে — যখন শ্রমিক বিপ্লব একটি দেশে ইতোমধ্যেই জয়যুক্ত হয়েছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে চূর্ণ করে, শ্রমিকশ্রেণীর গণতন্ত্রের, সোভিয়েততন্ত্রের যুগের সূত্রপাত করেছে।

এইভাবে মার্কসবাদ-এর তত্ত্বকে বিকশিত করে তুলে‍‌ছিলেন কমরেড স্তালিন। তিনিই লেনিনবাদের প্রবক্তা। ১৯২৪-এ প্রকাশিত কমরেড স্তালিনের ‘লেনিনবাদের ভিত্তি’ এবং ১৯২৬-এ ‘লেনিনবাদের সমস্যা’ পুস্তক দুটিতে লেনিনবাদের আরও ব্যাপক বিস্তৃত আদর্শগত ব্যাখ্যা রয়েছে।

দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের প্রিয় নেতা, শিক্ষক কমরেড লেনিনের জীবনাবসানের পর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে তীব্র মতাদর্শগত বিরোধ দেখা দেয়। কমরেড লেনিনের ‍‌জীবদ্দশাতেই ১৯২২ সালের ৩রা এপ্রিল পার্টি’র কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে কমরেড লেনিনের প্রস্তাবে কমরেড স্তালিন পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, একই বছরে গঠিত হয়েছিল ‘ইউনাইটেড সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক’ সংক্ষেপে ইউ এস এস আর। কমরেড লেনিন নেই। একদিকে নবগঠিত সোভিয়েতে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকাজকে চালু রাখা, অন্যদিকে পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ট্রট‍‌স্কি-বুখারিন-জিনোভিয়েভ-কামেনেভ-রাডেক চক্রের পার্টি, কমরেড স্তালিন ও সোভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই চলতে থাকা কার্যকলাপ নবগঠিত এই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে চরম বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির এই কার্যকলাপ কমরেড স্তালিনকে এতটুকু বিচলিত করতে পারেনি। এই সঙ্কটের মধ্যেই তিনি লেনিনবাদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে তীব্র আন্তঃপার্টি সংগ্রাম গড়ে তুলে তাঁর সমস্ত বিরোধীদের তত্ত্বগতভাবে ধরাশায়ী করেছিলেন। যার পরিণতিতে পরবর্তীকালে ট্রটস্কি ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা পার্টির কাছে নিজেদের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯২৮-৩২) ছিল সার্বিক অগ্রগতির এক উৎসমুখ। পুঁজিবাদী দুনিয়ার মাতব্বর সংবাদপত্রগুলো কমরেড স্তালিনের এই পরিকল্পনাকে নিয়ে অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিল। অথচ এই পরিকল্পনার প্রথম চার বছরেই কৃষি, শিল্প, শিক্ষাসহ সবকটি মৌলিক ক্ষেত্রেই গড়পড়তা ৯৩ শতাংশ সাফল্য দেখা দিয়েছিল। এককথায় দুরন্ত অগ্রগতি। তখন ঐসব কুৎসা রটনাকারী সংবাদপত্রগুলো তার প্রশংসায় সরব হতে বাধ্য হয়েছিল। এই সময়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো পুঁজিবাদী দুনিয়ার তীব্র সঙ্কট। প্রথম পরিকল্পনার চার বছরে সোভিয়েতে যখন শিল্পোৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে তখন পুঁজিবাদী দেশ যথাক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা কমেছে শতকরা ৫৭ ভাগ, ব্রিটেনে কমেছে শতকরা ১৮ ভাগ, জার্মানিতে কমেছে শতকরা ৪০ ভাগ এবং ফ্রান্সে কমেছে শতকরা ৩০ ভাগ। পুঁজিবাদের এই সর্বব্যাপী সঙ্কটের যুগে কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েতে সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল। প্রথম পরিকল্পনায় রাশিয়ার কৃষি সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হওয়াতে দ্বিতীয় পরিকল্পনায় (১৯৩৩-৩৭) কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল যাতে ১৯৩৫ সালের গোড়াতেই শতকরা ৮৫ ভাগ জমি যৌথ খামারের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং উৎপাদিত পণ্য বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল শতকরা ২৬৯ ভাগ।

১৯৩৬ সালে সোভিয়েতের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সর্বক্ষেত্রেই উন্নতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এই ব্যাপক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংবিধান-এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় ১৯২৪ সালে সোভিয়েত প্রণীত সংবিধানকে নতুন রূপ দেওয়া হয়। কমরেড স্তালিনের সভাপতিত্বে মোট ৩১ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল ১৯৩৬ সালে রচনা করেন সোভিয়েতের নতুন সংবিধান। এই সংবিধানে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের তুলনায় আরও অনেক বেশি গণতান্ত্রিক অধিকার দেওয়া হলো। এই সংবিধানে ঘোষণা করা হয়েছিল গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র অজেয়। মনীষী রোঁমা রোলাঁ এই সংবিধানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন : ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ এতকাল ছিল মানুষের স্বপ্নের বস্তু মাত্র। এই সংবিধান থেকে তারা প্রাণ পেল।’ চীন থেকে সান ইয়াৎ সেনও অভিনন্দিত করেছিলেন এই সংবিধানকে। ইতিহাসে এই সংবিধান স্তালিন সংবিধান নামে পরিচিত হয়ে আছে। ১৯৩৮ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদনক্রমে কমরেড স্তালিন রচনা করেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-র ইতিহাস — সংক্ষিপ্ত পাঠ’। ঐ একই বছরে তিনি লেখেন ‘দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ যা মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক অমূল্য দলিল।

২২শে জুন, ১৯৪১। হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলো। কমরেড স্তালিন ঘোষণা করলেন : . . . কেবল আমাদের দেশকেই মুক্ত করা নয়, ফ্যাসিস্ত প্রভুত্বে নিপীড়িত জনগণকেও আমরা মুক্ত হতে সাহায্য করব। . . . এ যুদ্ধ সমগ্র মানবজাতির মুক্তি ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরিত হবে।

কমরেড স্তালিনের আহ্বানে নাৎসি জল্লাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেনিনগ্রাদে ৩ লক্ষ লালফৌজের পাশে এসে সমবেত হয় সমগ্র লেনিনগ্রাদের জনসাধারণ। প্রবল প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে হয়েছিল হিটলারের ২ লক্ষ সেনা, ৮৪৬টি বিমান এবং ৪০০টি ট্যাঙ্ককে। হিটলারের মস্কো দখলের পরিকল্পনা ‘অপারেশন টাইফুন’ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। লালফৌজের সবচেয়ে গৌরবজনক লড়াই ছিল স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ। এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মার্শাল জুকভ। শুরুতে নাৎসিরা স্তালিনগ্রাদের শতকরা ৭৫ ভাগ অংশই দখল করে ফেলেছিল। স্তালিনগ্রাদের জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধভাবে বীরত্বপূর্ণ লড়াই-এর মধ্য দিয়ে পুরোটাই তাদের হাত থেকে কেড়ে নেয়। লেনিনগ্রাদ, মস্কো, স্তালিনগ্রাদের লড়াইতে লালফৌজের কাছে আত্মসমর্পণ হিটলারের কাছে খুব বড় আঘাত হয়ে উঠেছিল। ১লা মে, ১৯৪৫ কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত লালফৌজ বার্লিনের রাইখ্‌স্ট্যাগে রক্তপতাকা উড়িয়ে মানবজাতির চরমতম শত্রু ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘোষণা করেছিলেন।

ফ্যাসি-বিরোধী যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল প্রথম স্থানে। এই যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন ২ কোটি সোভিয়েত জনগণ। যুদ্ধের সময় শিশুসহ ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে জার্মানিতে দাস শ্রমিক হিসেবে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন সোভিয়েতে ৫৩ লক্ষ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে যুদ্ধের শেষে মাত্র ১০ লক্ষকে জীবিত পাওয়া গিয়েছিল। ফ্যাসিস্তদের আক্রমণে চরম ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল সোভিয়েতের ছোট-বড় মিলিয়ে ১ হাজারেরও বেশি শহরকে, ৭০ হাজার গ্রামকে, ৩২ হাজার শিল্প সংস্থাকে এবং ৯৮ হাজার যৌথ ও রাষ্ট্রীয় খামারকে। যুদ্ধ যখন চলছে, মিত্রশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতকে ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন রুজভেল্ট ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। রুজভেল্টে’র জীবনাবসানের পর ট্রুম্যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েই সেই প্রতিশ্রুতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। অবশ্য কমরেড স্তালিন তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে সমস্ত যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রমাণ করে দিয়েছিল তার সমাজতান্ত্রিক দৃ‌ঢ়তা। শুধু তাই নয়, পূর্ব ইউরোপের সদ্য মুক্ত হওয়া দেশগুলোতে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যেও সোভিয়েত তার সমগ্র শক্তিকে ব্যবহার করেছিল। এইভাবে যুদ্ধে বীভৎসা কাটিয়ে কমরেড স্তালিনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে দুনিয়ার তাবৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল।

অক্টোবর, ১৯৫২-তে সোভিয়েত বলশেভিক পার্টির ঊনবিংশতম কংগ্রেসের ভাষণে কমরেড স্তালিন বলেছিলেন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান ও জাপানী ফ্যাসিস্ত বর্বরতাকে চূর্ণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপ এবং এশিয়ার জনগণকে ফ্যাসিস্ত দাসত্বের বিপদ থেকে মুক্ত করেছে। . . . যে সকল কমিউনিস্ট শ্রমিক-কৃষক ও গণতান্ত্রিক পার্টি আজও বুর্জোয়া শাসনের চাপে শোষিত ও বঞ্চিত, তাদের দিকে আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।

এই পার্টি কংগ্রেস ভবিষ্যতে সোভিয়েতকে যেকোন বিপদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ মোকাবিলার আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তুলেছিল। এটাই ছিল কমরেড স্তালিনের জীবনের শেষ পার্টি কংগ্রেস। ৫ই মার্চ, ১৯৫৩ সোভিয়েত তথা সমগ্র দুনিয়ার শোষিত জনগণের মুক্তিকামী নেতা কমরেড স্তালিন চিরনিদ্রামগ্ন হন।

তবে, জীবনের শেষপর্বে কমরেড স্তালিনের কিছু ভুল হয়েছিল যা একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসেবে সতর্কভাবে তাঁর এড়িয়ে চলা উচিত ছিল। কিন্তু এই মহান বিপ্লবীর সমগ্র জীবনচর্চায় দেখা যায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক তত্ত্ব ও তার বিকাশ তথা শোষণহীন সমাজ গঠনে শোষিত মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে জয়ী করতে কমরেড স্তালিনের নিরলস প্রয়াস তাঁর এই ভুলগুলোর তুলনায় বহুগুণ বড় হয়ে উঠেছে। কমরেড স্তালিনের এইসব ভুলগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।

দুনিয়ায় শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের সংগ্রাম যতদিন ধরে চলবে, নিপীড়িত হৃদয়ের প্রতি স্পন্দনে অনুপ্রেরণার স্ফূলিঙ্গ হয়ে রইবেন কমরেড স্তালিন।

সূত্রঃ http://ganashakti.com/bengali/news_details.php?newsid=17898