“আমি অন্তত আন্না হতে চাই না”- অরুন্ধতী রায়

arundhati_roy_20140310

(দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারের বঙ্গানুবাদ।)

টিভি-তে যেটা দেখছি সেটা বিপ্লব হলে, সাম্প্রতিক কালের এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং নির্বোধ বিপ্লব। জনলোকপাল বিল নিয়ে আপনার মনে যে প্রশ্নেরই উদয় হোক না কেন, সম্ভাব্য উত্তর যা আপনি পেতে চলেছেন তা এরকম: ক) বন্দে মাতরম, খ) ভারত মাতার জয়, গ) ভারত হল আন্না, আন্নাই ভারত, ঘ) জয় হিন্দ। সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে, আপনি বলতে পারেন মাওবাদীদের সঙ্গে জনলোকপালবাদীদের একটি সাদৃশ্য কিন্তু আছে –দুপক্ষেরই উদ্দেশ্য ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলা। একপক্ষ একেবারে গোড়া থেকে গরিব, তস্য গরিবদের (যাঁদের অধিকাংশই আদিবাসী) নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলছে। অন্য দিকে, সদ্য সাধুর আখ্যা পাওয়া আন্না হাজারের নেতৃত্বে চলছে অহিংস গান্ধীবাদী আন্দোলন, অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই শহুরে এবং নিশ্চিত ভাবে যাঁদের জীবনযাত্রার মান আদিবাসীদের থেকে উন্নত (এ ক্ষেত্রে সরকার নিজেই নিজেকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনে অক্সিজেন যোগাচ্ছে)। ২০১১-র এপ্রিলে আন্নার আমরণ অনশন শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই, বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে, সরকার, তথাকথিত ‘নাগরিক সমাজের’ নামাঙ্কিত ব্র্যান্ড ‘টিম আন্না’-কে দুর্নীতি রোধক আইন প্রণয়নের জন্য যুগ্ম কমিটির অংশ হতে আমন্ত্রণ জানায়। কয়েক মাস পরেই সরকার অবশ্য নিজেই এই সংক্রান্ত বিল পেশ করে সংসদে, অজস্র ফাঁক-ফোঁকর থাকা এই বিলটিকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও জায়গাই ছিল না। তারপরে ১৬ অগাস্ট ২০১১ সকালে, আন্নার দ্বিতীয় আমরণ অনশন শুরু করার আগেই তাঁকে জেলে ভরে দেওয়া হল। জনলোকপাল বিলের জন্য এই লড়াই মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারের দিকে মোড় নিল। গণতন্ত্রের নিজের জন্যেই শুরু হল সংগ্রাম। ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শুরুর কয়েক এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্নাকে ছেড়ে দেওয়া হল। যদিও নাটকীয় ভাবে তিনি জেল থেকে বেরোতে অস্বীকার করলেন। তিহার জেলের ভিতরে মাননীয় অতিথি হয়ে শুরু করে দিলেন অনশন—তাঁকে জনগণের সামনে অনশনের অনুমতি দিতে হবে। তারপরের তিন ধরে, তিহার জেলের বাইরে টিভি-ভ্যান ও জনতার ভিড় লেগে রইল। টিম আন্নার সদস্যরা ঘনঘন উচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন তিহার জেলের ভিতরে ও বাইরে যাতায়াত করতে লাগলেন, জেলে এ অনশনরত আন্নার বক্তব্যের ভিডিও টিভি-র সমস্ত চ্যানেলগুলিতে দেখান হতে থাকল। (আর কোনও মানুষের জন্যে এই বিলাসিতার ব্যবস্থা করা হত? ) এরমধ্যে দিল্লি পুরসভার ২৫০ জন কর্মী, ১৫টি ট্রাক, ৬টা বুল-ডোজার রামলীলা ময়দানকে সপ্তাহান্তের চিত্তাকর্ষক মনোরঞ্জনের মঞ্চ করে তুলতে দিনরাত কাজ করে গেছে। এইবারে, অসংখ্য দর্শক ও উঁচু ক্রেনের ওপর চাপানো ক্যামেরার সামনে, ভারতের সবচেয়ে দামী ডাক্তারবাবুদের উপস্থিতিতে আন্নার তৃতীয় দফার আমরণ অনশন শুরু হল। “কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর, অখণ্ড ভারত”—টি.ভি.র সঞ্চালকরা আমাদের জানালেন। তাঁর উপায়টা গান্ধীবাদি হলেও দাবিদাওয়া সম্পর্কে সে কথা বলা যাচ্ছে না। গান্ধীর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের তত্ত্বের বদলে জনলোকপাল বিলটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত, দুর্নীতি-বিরোধী একটি আইন, যেখানে সাবধানে নির্বাচিত একটি প্যানেল হাজার হাজার কর্মীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃহৎ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর খবরদারি করবে- পুলিশ থেকে প্রধানমন্ত্রী-বিচার ব্যবস্থা-সাংসদ থেকে শুরু করে একেবারে নিচু স্তরের সরকারি কর্মী কেউ বাদ যাবেন না। লোকপালের নিজস্ব তদন্ত করার অধিকার, কড়া নজরদারি রাখার অধিকার, এমনকী বিচার করার ক্ষমতাও থাকবে। শুধু নিজেদের জেলখানা থাকবে না। একটি স্বাধীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে–বর্তমানের দুর্নীতি গ্রস্ত ব্যবস্থার পাল্টা হিসেবে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার একটি ব্যবস্থাকে শোধরানোর জন্যে আরেকটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ব্যবস্থা। এটা কার্যকর হবে কী হবে না, সেটা নির্ভর করছে আমরা দুর্নীতিকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তার ওপর। দুর্নীতি বলতে কেবলমাত্র বেআইনি কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক অনিয়ম আর ঘুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব? নাকি ক্রমাগত বাড়তে থাকা আর্থিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য যেখানে ক্ষমতা মাত্র কিছু লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন একটি ব্যবস্থার ফল? এমন একটি শহরের কথা কল্পনা করুন, যেখানে শুধুমাত্র শপিং মল আছে, রাস্তায় হকারি করা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। একটি হকার স্থানীয় থানার পুলিশ এবং মিউনিসিপালিটির অফিসারটিকে অল্প ঘুষ দিয়ে আইন ভেঙ্গে হকারি করার ব্যবস্থা করল যাঁর গ্রাহক কিনা এমন মানুষ যাঁরা শপিং মলের দামে জিনিস কিনতে পারবেন না। ভবিষ্যতে কি লোকপালের প্রতিনিধিরা তাঁকেও জরিমানা করবেন? তাহলে সাধারণ মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তার সমাধানের জন্যে কাঠামোগত অসাম্যকে ধরতে হবে, নাকি আরেকটা কুক্ষিগত ক্ষমতার নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে, যেখানে মানুষকে না চাইলেও ভরসা রাখতেই হবে? এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এক্ষুনি নজর দেওয়া জরুরি , সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রীন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগঢ়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কারেন নি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোন মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতা কে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) এরমধ্যে পুরও চিত্রনাট্য, উগ্র জাতীয়বাদ, এবং বিপুল উৎসাহ নিয়ে জাতীয় পতাকা তুলে ধরে আন্নার বিপ্লবের সমস্তটাই সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বিশ্বকাপ জয়ের মিছিল এবং পরমাণু বোমা পরীক্ষার সাফল্যের উচ্ছ্বাসের থেকে ধার করা। এমনভাবে তুলে ধরা হল, যেন অনশন সমর্থন না করলে প্রকৃত ভারতীয় হওয়া যায় না। ২৪ ঘণ্টার খবরের চ্যানেলগুলির এমন ভাব, দেশে যেন আর খবর নেই। ‘আন্নার অনশন’ কোন ভাবেই মণিপুরের আইরম শর্মিলা চানুর এ এফ এস এ আইন কে তুলে নেওয়ার জন্যে ১০ বছর ধরে চলতে থাকা অনশন কে প্রতিনিধিত্ব করছে না, যে আইনের বলে সেনাবাহিনী শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে হত্যা করতে পারে। কুদানকুলামে পরমাণু চুল্লির বিরুদ্ধে চলতে থাকা হাজার দশের লোকের রিলে অনশনের কথাও তো কই বলছে না ‘আন্নার অনশন’। ‘প্রতিবাদকারী’ দের বলতে তো একবারও উঠে আসছে না সেই মণিপুরিদের কথা যারা আইরমের অনশন কে সমর্থন করছেন। জগৎসিংহপুর, কলিঙ্গগিরি, নিয়মগিরি, বস্তার, বা জয়তাপুরে খনি মাফিয়া আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত মানুষগুলোর কথাও তো কই বোঝানো হচ্ছে না ‘প্রতিবাদকারী’ বলে। ‘জনগন’ বলতে ভূপাল গ্যাস বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা নর্মদা উপত্যকায় বাঁধ-প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া লোকগুলোর কথা বোঝানো হচ্ছে না। বা নয়ডা ,পুনে কিংবা হরিয়ানা বা দেশের অন্য কোথাও যেখানে কৃষকরা জমি-অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তাদের কথাও বলা হচ্ছে না। ‘জনগন’ বা ‘প্রতিবাদকারী’ বলতে শুধু মাত্র ৭৪ বছর বয়সী ভদ্রলোকের অনশন দেখতে আসা জনতার কথাই বোঝানো হচ্ছে, আমরন অনশন ক’রে ভদ্রলোকের দাবী তাঁর প্রস্তাবিত জন-লোকপাল বিল কেই গ্রহণ করতে হবে। ‘জনগন’ মানে রামলীলা ময়দানে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার লোক, টি ভির দৌলতে যা লাখো লাখো লোকের অবস্থান মনে হচ্ছে, ঠিক যেমন খ্রীষ্ট রুটি আর মাছের সঙ্খ্যা বহুগুন বাড়িয়ে ক্ষুধার্তর মুখে খাওয়ার তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হল, “কোটি কণ্ঠ সোচ্চারিত-ভারত বলতে আন্না’। নব্য উদিত এই সাধুটি কে? অদ্ভুত ভাবে যে বিষয়গুলির ওপর এখনই নজর দেওয়া জরুরি, সেগুলি সম্পর্কে তিনি নীরব। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কৃষকের আত্মহত্যা বা সুদূরের ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নিয়ে একটি কথাও নেই তাঁর মুখে। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, লালগড়, পস্কো নিয়ে মুখে রা কাড়েননি। মধ্য ভারতের বনাঞ্চলে ভারত সরকারের সেনা নামানো নিয়ে তাঁর কোনো মতামত আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যদিও তিনি রাজ ঠাকরের উগ্র আঞ্চলিকতাকে সমর্থন করেন। নরেন্দ্র মোদীর “গুজরাট উন্নয়ন মডেল’ কে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, ২০০২ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে। ( যদিও জনগনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় আন্না পরে এই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন, কিন্তু সম্ভবত তাঁর মন থেকে সায় ছিল না) সাংবাদিক রা যা করে থাকে, এখনো পর্যন্ত তাই করেছে। আর এস এসের সাথে আন্নার পুরন সম্পর্কের গল্প এখন আমাদের কাছে আছে। আন্নার গ্রাম রালেগান সিদ্ধি তে যে বিগত ২৫ বছর ধরে গ্রম পঞ্চায়েত বা সমবায় সমিতির নির্বাচন হয় না, সে খবরও আমাদের মুকুল শর্মা জানিয়েছন। হরিজনদের সম্পর্কে আন্নার মনোভাবও আমাদের অজান নয়ঃ “ মহাত্মা গান্ধী চাইতেন প্রত্যেকটি গ্রামে একজন সুনার, একজন চামার, একজন কুমহার ইত্যাদি থাকবে। তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজ করে গেলে, গ্রাম স্বয়ং-সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। রালেগান সিদ্ধি তে আমরা এটাই অনুশীলন করছি”। টিম আন্নার অন্যান্য সদস্যরা যে সংরক্ষণ বিরোধী ‘ ইয়ুথ ফর ইকুয়ালিটি’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেটা কি আশ্চর্যজনক ঠেকছে? আন্দোলনটির রাশ ছিল কোকা-কোলা এবং ল্যেমান ব্রাদার্স মতো সংস্থার এর পয়সায় চলা কতিপয় এন জি ও র হাতে। আনন্দ কেজরিওয়াল এবং মনীশ সিসোদিয়া, আন্নার প্রধান পরমর্শদাতারা, কবীর নামে একটি সংগঠন চালান, বিগত তিন বছরে যেখানে ৪০০,০০০ ডলার টাকা এসেছে ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে। আন্নার দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের প্রধান দাতারা হচ্ছে কিছু ভারতীয় ব্যাবসায়ী সংস্থা যারা নয় এলুমিনিয়াম কারখানা নয় বন্দর বানানো নয় এস ই জেড এর সাথে যুক্ত, এবং কিছু রাজনৈতিকের সাথে এদের নিবিড় সম্পর্কে আছে যারা কয়েক হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য চালায়। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির দায়ে তদন্তও চলছে। এরা হঠাৎ এত উদ্দীপ্ত কেন? মনে রাখুন জনলোকপাল বিলের দাবিতে আন্দোলনটা যখন শুরু হল, তখন উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া একের পর এক তথ্যে এবং পরপর দুর্নীতির দায়ে জেরবার কিছু প্রবীন সাংবাদিক, মন্ত্রী এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা, কংগ্রেস এবং বিজেপি দুদলেরি। জনগনের কোটি কোটি টাকা কিছু লোকের ট্যাঁক মোটা করে দিয়েছে। বহু বছর পর এই প্রথম সাংবাদিক-লবিস্ট রা বিড়ম্বনায় এবং কর্পোরেট ভারতের তাবড় কিছু অধিনায়কদের গন্তব্য স্থল জেল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের একেবারে আদর্শ সময়। তাই কি? যখন সরকার নিজের দায়িত্ব থেকে হাত ধুয়ে ফেলছে, সরকারের সমস্ত কাজের ভার কর্পোরেট সংস্থা এবং এনজিও গুলির হাতে চলে যাচ্ছে ( পানীয় জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিকম ব্যবস্থা, খনন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ), যখন কর্পোরেট মিডিয়ার ভয়ঙ্কর ক্ষমতা এবং প্রভাব মানুষের চিন্তার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন কর্পোরেটগুলি, মিডিয়া, এন জি ও গুলি যে প্রস্তাবিত লোকপাল বিলের আওতায় থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। আশ্চর্যজনক ভাবে, এদের একটিও প্রস্তাবিত বিলটির আওতায় নেই। সরকার এবং দুষ্ট রাজনৈতিকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চেঁচামেচি করা, কায়দা করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। সরকার কে অসুর সাব্যস্ত করে , নিজদের জন্যে আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছে—সংস্কারের দ্বিতীয় পর্যায়– আরও বেসরকারিকরন, সরকারী পরিকাঠামো এবং ভারতের সম্পদের ওপর আরও দখল কায়েম করা। কর্পোরেট দুর্নীতি কে লবিং ফির নাম করে আইনসিদ্ধ করে দেওয়ার দিন আর বেশী দেরি নেই। সমস্যাটা বড় হয়ে উঠছে, কারণ ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এই সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন করছে কিছু দুর্নিতিগ্রস্থ নেতা এবং কিছু কোটিপতি, যারা সাধারণ মানুষের সমস্যা গুলো থেকে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত অর্থে একটাও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নেই। তাই শুধুমাত্র পতাকা নাড়ানো দেখে আবেগতাড়িত হয়ে লাভ নেই।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.