এ কোনও প্রতিবাদের গল্প নয়

saibabaprof

শ্রদ্ধেয়

ড. জি এন সাইবাবা
নাগপুর সেন্ট্রাল জেল, নাগপুর
মহারাষ্ট্র৷‌

জানি না কোনওদিন এ চিঠি আপনার হাতে পৌঁছবে কিনা৷‌ না পৌঁছনোটাই স্বাভাবিক৷‌ তবু কেন লিখছি পৌঁছনোর অনিশ্চয়তা নিয়েও? লিখছি কোনও আবেগ বা আপনার প্রতি আমার সঙ্গোপন শ্রদ্ধা যতটা না আপনাকে জানাতে, তার চেয়ে অনেক বেশি আপনার কথা আমার এই বাংলার মানুষকে জানাতে৷‌ তাই এত প্রকাশ্য চিঠি, এক ভিন্নস্বরের মানুষ হওয়ার জন্য আপনার দুর্দশার সব অন্তরাল যথাসম্ভব ভাঙতে৷‌

আপনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রামলাল আনন্দ কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক৷‌ গত বছরের গ্রীষ্মে সারা দেশ যখন তাপপ্রবাহের পাশাপাশি লোকসভা নির্বাচনের উত্তেজনায় ফুটছে, তারই মধ্যে মে মাসের ৯ তারিখ সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বাড়ির ফেরার পথে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু লোক আপনাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়৷‌ অধ্যাপক সাইবাবা, ছোটবেলায় পোলিও হওয়ার পর থেকে আপনার কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ অসাড়৷‌ আপনি প্রতিবন্ধী৷‌ হুইলচেয়ার ছাড়া আপনার শরীরের কোনও গতি নেই, আপনার কোনও চলাচল নেই৷‌

নির্দিষ্ট সময়ের পরেও আপনি বাড়ি না ফেরায় এবং আপনার মোবাইল ফোনে কোনও সাড়া না পেয়ে আপনার সহধর্মিণী বসন্ত স্হানীয় থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন৷‌ তারপর জানা যায়, যারা আপনাকে অপহরণ করেছিল তারা আসলে মহারাষ্ট্র পুলিসের লোক এবং ওই অপহরণকে তারা গ্রেপ্তার আখ্যা দিয়েছিল৷‌ হায় আখ্যান! ওরা জানত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আপনার আবাস থেকে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলে ছাত্র, শিক্ষক, সমাজকর্মীদের এক প্রবল পরাক্রান্ত প্রতিরোধের মুখে ওদের পড়তে হবে, আপনি এতই নিবেদিতপ্রাণ অধ্যাপক, আপনি এমনই অকুতোভয় জনপ্রিয় মানুষ৷‌ তাই আখ্যান৷‌ ওরা গোপনে অপহরণ করে দেখাল যে ওরা আসলে এক দারুণ সক্রিয় রাষ্ট্রদ্রোহী সন্ত্রাসবাদীকে গ্রেপ্তার করার দক্ষতায় পৌঁছেছে৷‌ ওহ! রাষ্ট্রক্ষমতা, ওহ! রাজনৈতিক ক্ষমতা৷‌

কিন্তু ঘটনার এই আকস্মিকতার মধ্যেও ধারাবাহিক হল এই যে, ওই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ও দিল্লি শহরে আপনার পরিচিতরা সবাই জানত, আপনি গ্রেপ্তার হবেনই, একদিন না একদিন৷‌ কেন জানত, আপনি তো কোনওদিন ভাল কাজ ছাড়া খারাপ কাজ করেননি? বরং গত কয়েক বছর ধরে আপনার যে ডক্টরেট ডিগ্রির গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন তার বিষয় ছিল, ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের বিষয়গত রাজনীতি৷‌ এমন দারুণ আধুনিক বিষয়ের এক গবেষকের গ্রেপ্তার হওয়াও তবে কী করে পরিচিতদের কাছে প্রত্যাশিত? কী আপনার ক্রমাগত অপরাধ, ড. সাইবাবা? কী সেই অপরাধের সত্য আর মিথ্যা?

এখানেই কাহিনীর শুরু৷‌ ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম অপারেশন গ্রিন হান্ট অভিযান শুরু করেন৷‌ প্রধানত মধ্যভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার জঙ্গলমহল থেকে আদিবাসী অরণ্যবাসীদের উচ্ছেদ করে ওই অঞ্চলকে মাওবাদী-মুক্ত পরিচ্ছন্ন অঞ্চল বানাতেই আধাসামরিক বাহিনীকে তলব করা হয়৷‌ আসলে তা ছিল অরণ্যের প্রকৃত বাসিন্দাদের উৎখাত করার অভিযান, যাতে বহুজাতিক খনি ও পরিকাঠামো তৈরির কোম্পানিগুলির তৎপরতার পথ অবাধ হয়ে যায়৷‌ অরণ্য আর প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদে ভরা ওই ভূগোলকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আদিবাসী অরণ্যবাসীদের উৎখাত করা অসাংবিধানিক জেনেও ইউ পি এ সরকার তার তোয়াক্কা করেনি৷‌ সেই চরম নৈরাজ্য আর বেআইনকে আইনসিদ্ধ করতেই নতুন জমি অধিগ্রহণ বিল পাস করাতে তৎপর নরেন্দ্র মোদির সরকার৷‌ ড. সাইবাবা, আমাদের বাংলা ভাষায় একটি মহতী উপন্যাসের নাম ‘অরণ্যের অধিকার’৷‌ সেই অধিকার কেড়ে নিতে হাজার হাজার আধাসামরিক জওয়ান ঢুকে পড়ল জঙ্গলে৷‌ গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিল, খুন আর ধর্ষণ করল হাজারে হাজারে৷‌ আদিবাসীরা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গেল আরও গহন অরণ্যে৷‌ বেঁচে থাকল খোলা আকাশের নিচে৷‌ প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে গড়ে উঠল যে সংগঠন, তাদের তৎপরতাকে দেশের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ বিপদ বললেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং৷‌ তাঁর কথামতোই, ইতিহাস তো তাঁকে মনে রাখবেই, যে ইতিহাস আর কিছুর না হোক মধ্যভারতের অরণ্যবাসের, অরণ্যবাসীর৷‌

পৃথিবীর সব ভূগোলের, সব সময়ের ইতিহাসেই, বর্তমানেও অবশ্যই, কিছু সুবিধাভোগী, কিছু দালাল, কিছু দুষ্কৃতী, কিছু বিশ্বাসঘাতক হাজির থাকে৷‌ ক্ষমতার অবারিত প্রশ্রয় পেয়ে যায় তারা, কীভাবে যে! কেউ উন্নয়নকে বলে সন্ত্রাস, কেউ সন্ত্রাসকেই বলে উন্নয়ন৷‌ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এই অপারেশন গ্রিন হান্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হল দেশে৷‌ বিভিন্ন শহরে সভা, সমিতি, মিছিল হল৷‌ সেই সব জমায়েতের অনেকগুলোরই প্রকাশ্য উদ্যোক্তা ছিলেন আপনি, অধ্যাপক সাইবাবা৷‌ তার সামনে পড়ে সরকার জানাল, অপারেশন গ্রিন হান্ট নামে কোনও অভিযানই নেই, সবটাই সংবাদমাধ্যমের বানানো গল্প৷‌ অনামে সেই অভিযান কিন্তু আরও তীব্রতর চলতে থাকল৷‌ সত্যিই তো, গোলাপের মতোই, নামে কী এসে যায়, উৎপীড়ন, নির্যাতন, উৎখাত, সন্ত্রাস বা হত্যার, ধর্ষণের?

ওই অনাম্নী অভিযানের যারাই প্রতিবাদ করল তাদেরকেই ‘মাওবাদী’ আখ্যা দিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হল৷‌ কত হাজার হাজার দলিত, আদিবাসীকে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে, কে হিসেব বা খোঁজ রাখে তার? তারা কেউ আইনি সাহায্য পায় না, কোন অপরাধে জেলে আছে, তাও জানে না, কোনও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও করে না৷‌ আপনি খোঁজ রাখতেন অধ্যাপক সাইবাবা৷‌ আপনার মতো সহমর্মীদের বিরুদ্ধে এবার মাঠে নামল সরকার৷‌ সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিল আপনার মতো সহমর্মীদের সম্বন্ধে৷‌ বলল, এরা অরণ্যের মাওবাদীদের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক৷‌ এ হলফনামা ২০১৩ সালের৷‌

ওই হলফনামার পরই সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে আপনার বাড়িতে তল্লাশি চালাল পঞ্চাশ জন পুলিসের একটি দল৷‌ কোনও এক চুরির মাল খোঁজার অজুহাতে৷‌ সে নির্দেশ দিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের আহেরির এক ম্যাজিস্ট্রেট৷‌ চুরির মাল তো সেই পুলিস-দল পেলই না, উল্টে আপনার নিজস্ব ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, পেনড্রাইভ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেল তারা৷‌ দু’সপ্তাহ পর তদন্তকারী অফিসার সুহাস বাওয়াচে আপনাকে ফোন করে আপনার হার্ডডিস্কের পাসওয়ার্ড জানতে চাইলে আপনি তা দিয়ে দিলেন৷‌ পরের জানুয়ারিতে পুলিস আপনার বাড়িতে এসে কয়েক ঘণ্টা ধরে আপনাকে জেরা করে৷‌ আর মে মাসের ৯ তারিখে আপনাকে অপহরণ, যা আসলে গ্রেপ্তার৷‌

সেই রাতেই ওরা আপনাকে নাগপুর উড়িয়ে নিয়ে যায়৷‌ ফের গাড়িতে নিয়ে যায় আহেরিতে৷‌ ফের ফিরিয়ে আনে নাগপুরে৷‌ এই সড়কযাত্রায় আপনার নিরাপত্তায় ছিল এক বিশাল পুলিসবাহিনী ও বুলেটপ্রুফ কনভয়৷‌ তারপর থেকে আপনার ঠিকানা নাগপুর সেন্ট্রাল জেল৷‌ দেশের আরও ত্রিশ লক্ষ কারাবাসীর একজন৷‌ ওরা আপনার হুইলচেয়ার ভেঙে দিয়ে সেই ভাঙা হুইলচেয়ারে সঙ্গে আপনার মৃত শরীরকে বসিয়ে নিজেদের ছবি কাগজে ছাপিয়ে দেবে, যেন শচীনের হাতে বিশ্বকাপ৷‌ আপনি নব্বই শতাংশ প্রতিবন্ধী, আপনার শরীরের যত্ন, নিয়মিত ওষুধ, খাবার, ফিজিওথেরাপির ওরা তোয়াক্কা করে না৷‌ আপনার সলিটরি সেলে কেউ আপনাকে দেখার বা সাহায্য করার নেই৷‌ বাথরুমে যেতেও না৷‌ আপনাকে বিশেষ সম্মান দিয়ে ওরা আসলে আপনার ওপর যেমন খুশি অত্যাচার ও আপনাকে যখন খুশি হত্যার অধিকার অর্জন করেছে৷‌

ওরা আপনাকে জামিন দেবে না৷‌ দু’বার বাতিল করেছে আবেদন, আরও করবে৷‌ দেশের সংবিধান মেনে এভাবে কি একজন প্রতিবন্ধীকে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে বন্দী করে রাখা যায়? আমি জানি না৷‌ আপনার শরীর কেবলই খারাপ হচ্ছে৷‌ ডাক্তাররা আপনার শরীর তথা হৃদযন্ত্রের ক্রমাগত দেখভালের কথা বলছেন৷‌ তবু আপনি চিকিৎসাধীন এক কারাবাসী৷‌ আপনার জীবন অথবা মৃত্যুতে ওদের কিছুই যে যায় আসে না৷‌

২০০২ সালে নারোদা পাটিয়া হত্যাকাণ্ডে দিবালোকে ৯৭ জনকে খুন করার ঘটনার আসামি বাবু বজরঙ্গীর জামিন হয়, গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের মন্ত্রী মায়া কোদনানিকে আটাশ বছরের কারাবাসের দণ্ড দিয়েও, ওই একই মামলায়, গুজরাট হাইকোর্ট জামিন মঞ্জুর করে৷‌ সবই শরীরের কারণে৷‌ সোহরাবুদ্দিন শেখ, আরও দুজনকে হত্যা মামলায় প্রত্যক্ষ অভিযুক্ত অমিত শাহের জামিন হয়, যিনি এখন বি জে পি-র সর্বভারতীয় সভাপতি, কিন্তু আপনার হয় না৷‌ আপনাদের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক আপনার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে গিয়েছিলেন আপনারই মুক্তির ব্যাপারে৷‌ কয়েক মিনিটের জন্য৷‌ এক নিরাপত্তারক্ষী হাতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র আপনাদের দুজনের মাথার দিকে সারাক্ষণ তাক করেছিল, পাছে প্রতিবন্ধী আপনি ওই অধ্যাপকের সঙ্গে পালানোর কর্মসূচি বাস্তবায়িত করেন৷‌

অধ্যাপক সাইবাবা, ব্যক্তিপ্রতাপ, সঙঘপ্রতাপ, সংগঠনপ্রতাপ, অর্থপ্রতাপ জীবনভর, জীবিকাভর প্রতিদিন প্রতিরাত দেখেছি অনেক, দেখছি, দেখব নিশ্চয়ই আমৃত্যু৷‌ আপনি দেখছেন ও সহ্য করছেন রাষ্ট্রপ্রতাপ, কতদিন, তা রাষ্ট্রও জানে না৷‌ এমন সহনের দৈনন্দিন আমার কল্পনা-আশঙ্কার অতীত না ভবিষ্যৎ, তা আমিও যে জানি না৷‌ আপনাকে ব্যক্তিগত প্রণাম৷‌

( লেখকঃ অনিশ্চয় চক্রবর্তী  ০৭/০২/২০১৫ )

revolt_02-07-15-300x169

সূত্রঃ http://aajkaal.in/uncategorized/%E0%A6%8F-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%A8%E0%A7%9F/



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.