একক পরাশক্তি মার্কিনের মোকাবেলায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার তৎপরতা

syria-the-good-old-cold-war-game

আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক কার্যক্রম মোকাবেলা করে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া নিজেকে রক্ষা করে এবং হারানো স্বর্গ ফিরে পেতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক তথা সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। বৈশ্বিক মন্দা, পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা, তেলের দাম অর্ধেকেরও বেশি পড়ে যাওয়ায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে পড়ে ২০১৫ সালে মন্দা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। রুবলের দাম পড়তে পড়তে ১ ডলার ৮০ রুবলে গিয়ে পৌঁছায়। রুবলের দরপতন এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে ২০১৪ সালে মোট ৬ বার সুদের হার বৃদ্ধি করলে এক পর্যায়ে তা ১৭%-এ দাঁড়ায়। এভাবে রাশিয়া বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার ঠেকাতে চেষ্টা করলেও পাশ্চাত্যের চক্রান্তে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুঁজি প্রত্যাহার হয়। তেলের দাম বিগত সেপ্টেম্বর’১৪-এ ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার থেকে কমতে কমতে ৫০ ডলারেরও নিচে নেমে গেলে রাশিয়ার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কারণ রাশিয়ার অর্থনীতিতে রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগ আসে তেল-গ্যাস তথা জ্বালানি খাত থেকে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২৪.১৩৫ বিলিয়ন (১২ হাজার ৪১৩ কোটি ৫০ লক্ষ) ডলার কমে দাঁড়ায় ৩৮৬.৪৬ বিলিয়ন (৩৮ হাজার ৬৪৬ কোটি) ডলার। ২০১৪ সালে ১০ম অবস্থান পিছিয়ে পড়া রাশিয়ার জিডিপি ১.৮৫৭৫ (১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৭৫০ কোটি) ডলার; জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ০.৬%; বেকারত্বের হার ৫.৯%। ২০১৫ সালে ১ম কোয়াটারে (কোয়াটার ভিত্তিতে) জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল -০.৭% যা (বার্ষিক ভিত্তিতে) দাঁড়ায় -১.৯%। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বাজেটে সামরিক খাত ছাড়া অন্যান্য খাতে ১০% ব্যয় হ্রাস করা হয়। সঙ্কট থেকে উত্তরণে রাশিয়া পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এ পরিকল্পনা কার্যকরী করার মধ্যদিয়ে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত রুবলের মূল্য ১৩% বৃদ্ধি পেয়ে ১ ডলার ৫০ রুবলে পৌঁছায়। ইউরোপের ভূমিকার কারণে রাশিয়ার তার সাউথ স্ট্রিম পরিকল্পনা বাতিল ঘোষণা করে নতুন রুটের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে তুরস্ককে বেছে নিয়ে তার সাথে পাইপ লাইন স্থাপন ও গ্যাস চুক্তি সম্পাদন করে। এটাকে ‘তার্কিস স্ট্রিম’ বলা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাশিয়া গ্রিসের সাথে গ্যাস পাইপ লাইন ও গ্যাস চুক্তি সম্পাদন করে। রাশিয়া বিকল্প বাজার হিসেবে চীন তথা পূর্ব এশিয়া মুখি জ্বালানি পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ জোরদার করে। তেলসহ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির জন্য রাশিয়া ওপেকভুক্ত ও ওপেক বহির্ভূত দেশসমুহকে নিয়ে বৈঠক করে। এ প্রেক্ষিতে ওপেক/সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলার সাথে বৈঠক করে। রাশিয়া তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কৌশল গ্রহণ করে বর্তমানে রোসাটম ১ ডজন দেশে ২৯টি পারমাণবিক রিএক্টর স্থাপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, জর্ডান, ইরান, হাঙ্গেরি, মিশর, আর্জেন্টিনা, তুরস্ক ইত্যাদি। রাশিয়ার আয়ের আরেকটি উৎস হচ্ছে অস্ত্র বিক্রি থেকে আয়। ২০১৪ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় অস্ত্র রফতানিকারী দেশ হিসাবে রফতানি করে ১৩.২ বিলিয়ন ( ১ হাজার ৩২০ কোটি) ডলার। মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকা- মোকাবেলায় রাশিয়া পুঁজিবাদী চীনের সাথে সমন্বিত হয়ে মেরুকরণ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সিস-সিসটো, এসসিও-র‌্যাটস, রিক-ব্রিকস, সিকা, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন প্রক্রিয়া জোরদার করে চলেছে। ব্রিকস ও ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংক (NDB), চীনের নেতৃত্বে এআইআইবি ব্যাংক আন্তর্জাতিকভাবে শক্তির পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রক্রিয়া জোরদার করে। এর মধ্যদিয়ে দ্বিমেরু ব্যবস্থা গড়ে উঠার ইঙ্গিত লক্ষণীয়। মিশর, তিউনেশিয়া, ভিয়েতনাম ইউরেশীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ) স্বাক্ষরে সম্মত হয়। ইসরাইল ইউরেশীয় ইউনিয়নের সাথে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ (FTA)-এর সম্পৃক্ত হওয়ার আলোচনা চলছে। ৮ এপ্রিল রাশিয়ার প্রধনমন্ত্রী মেদভেদেভ ব্যাংককে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রাউথ চানো চা’র সাথে বৈঠকে থাইল্যান্ডকে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে প্রস্তাব দেন।

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ট্রং ট্যান স্যাং ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধের ৭০তম বিজয় বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে রাশিয়া সফর করে। তিনি পুতিনের সাথে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। তারা উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে দু’দেশের সামগ্রিক রণনীতিগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার কথা বলেন। এ মাসের শেষে তারা ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন ও ভিয়েতনামের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য এলাকা চুক্তি স্বাক্ষরে ঘোষণা দেন। ২০২০ সালের মধ্যে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন (১ হাজার কোটি) ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যাপারে তারা একমত হয়।

রাশিয়ার নতুন সামরিক মতবাদ:
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বে ইউরোপকে সমন্বিত করে ন্যাটোর সামরিক রণনীতি মোকাবেলায় রাশিয়া নতুন সামরিক মতবাদ সামনে আনে। এই মতবাদে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর বৃহত্তম হুমকি হিসেবে ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করা হয়। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রুশ সেনা মোতায়ন করা, সমগ্র সমাজের বর্ধিত সামরিকীকরণ, ব্রিকস দেশসমূহ ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের সাথে সামরিক সহযোগিতাকে সামনে আনা হয়। নতুন প্রতিরক্ষা মতবাদে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে সামরিক হুমকির চরিত্রের পরিবর্তনের কথা বলা হয়। যা ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং উত্তর আফ্রিকা, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের ঘটনাবলীতে পরিলক্ষিত হয়। রিপোর্টে জাতিসংঘের গুরুত্ব এবং ওএসসি’র সাথে রাশিয়ার সহযোগিতা করার ইচ্ছার কথা বলা হয়। পারমাণবিক বা প্রচলিত অস্ত্রেই হোক রাশিয়া আক্রান্ত হয়ে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়লে রাশিয়ার প্রি-এম্পটিভ পারমাণবিক আঘাত হানার অধিকার বজায় রাখার কথা বলা হয়। চীন, বেলারুশ, কাজাখস্তানসহ রাশিয়ার মিত্রদের উপর সামরিক আক্রমণ হলে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের অধিকার বজায় রাখে। রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের উপর আলোকপাত করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামরিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারে পরিস্থিতি তুলে ধরে রাশিয়ার মূল সামরিক হুমকিগুলো বর্ণনা করা হয়। রিপোর্টে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির প্রস্তাব করা হয়। ক্রিমিয়ার রণনীতিগত গুরুত্বের কারণে স্থলবাহিনী ও কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরকে আরও উন্নত ও আধুনিকীকরণ করা এবং আর্কটিকে রাশিয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রদত্ত সামরিক সংস্কার কর্মসূচি কার্যকরী করা এবং সামরিক অস্ত্র সজ্জিতকরণ বিষয়ে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের জন্য নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। রাশিয়ার নাগরিকদের সামরিক দেশপ্রেমিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণ এবং প্রত্যেক নাগরিককে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা। সামরিক সংঘাত প্রশমন ও প্রতিরোধের প্রধান কর্তব্য হিসেবে দলিলে ব্রিকস, মধ্যএশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে বর্ধিত সামরিক সহযোগিতা করার কথা বলা হয়। রাশিয়ার সাথে দক্ষিণ ওসেটিয়া ও আবখাজিয়ার সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলা হয়। সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে এতদঞ্চলে অনেক নৃ-গোষ্ঠী ও জাতীয় সংঘাত রয়েছে যাকে যে কোন সময় প্ররোচিত করে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি সংঘর্ষের বিপদ সৃষ্টি করা যেতে পারে বলে বলা হয়। সিসটোর সদস্য ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোকে শক্তিশালী এবং ওএসসিই (OSCE) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO)’র সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এ সময়ে ইউক্রেন কোন পক্ষের সামরিক জোটে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টে বাতিল করে ভবিষ্যতে ন্যাটাভুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করায় রাশিয়ার উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। ইউক্রেনকে আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রেরণ করে চলেছে। ১৬ মে ইউক্রেন পার্লামেন্ট বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করার মোরাটোরিয়াম ঘোষণা করায় রাশিয়া তা প্রত্যাখান করে।
১৬-১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উপরে ৪র্থ মস্কো কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৭৯টি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক প্রতিনিধি দল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কয়েকজন প্রধান উপস্থিত থাকেন। এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই সইগু এবং রাশিয়ার সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ বিশ্ব নিরাপত্তার প্রধান প্রধান হুমকি এবং তা মোকাবেলায় সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন। এই সম্মেলনে গতবারের মত এবারেও ন্যাটো ও ইউরোপের দেশগুলো অংশগ্রহণ করে না।

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে ব্যাপক অস্ত্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে রাশিয়া ২০১৫ সালে মহাকাশ সেনাবাহিনী গঠনের ঘোষণা দেয়। বর্তমানে একটি মাত্র মহাকাশ স্টেশন আইএসএস-এ যাতায়াতে মার্কিন স্যাটেল যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে সামনে থাকে রাশিয়ার সুয়্যাজ রকেট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর করে চললে রাশিয়া পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কালিনিনগ্রাদে ইস্কান্দার মিসাইল স্থাপন করা ছাড়াও আইসিবিএম বিধ্বংসী মিসাইল উদ্ভাবন করে। তাছাড়া মহাকাশে উপগ্রহ অস্ত্র বানানোর কথা শোনা যায়। রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর ব্যাপক সামরিক মহড়ার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, ভূমধ্যসাগরে পাল্টা মহড়া করা ছাড়াও যুক্তরাষ্টের নিকটবর্তী এলাকায় রণনীতিগত দূরপাল্লার বোমারু বিমান উড়ানো, মেক্সিকো উপসাগরে রাশিয়ার স্টিলথ্ সাবমেরিনের চলাচল লক্ষণীয়। রাশিয়া ল্যাটিন আমেরিকায় ভেনিজুয়েলাসহ সিলাকের কয়েকটি দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া সংগঠিত করে। কিউবায় রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজ ভেড়া, রুশ ঘাঁটি নবায়ন করা; ইরানকে অত্যাধুনিক এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদানের ঘোষণা; চীনের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে যৌথ মহড়ার ধারাবাহিকতায় ভূমধ্যসাগরে যৌথ নৌমহড়া; চীনকে অত্যাধুনিক এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ মিসাইল প্রদানের ঘোষণা; অত্যাধুনিক আর্মাটা ট্যাংক, আইসিবিএম প্রদর্শন; ভিয়েতনাম ‘কামরান বে’ সামরিক ঘাঁটি রাশিয়াকে ব্যবহার করতে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

কাস্পিয়ান থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত ১,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ ২০১৫ সালে মার্চ মাসে শুরু হয়ে ২০১৮ সালে সমাপ্ত হবে বলে বলা হচ্ছে। এটা হচ্ছে ইউরোপের তুলে ধরা সউদার্ণ করিডোর রুটের অংশ। এই পাইপ লাইন প্রকল্পে আজারবাইজান ৫৮%, তুরস্ক ৩০%-এর অংশীদার। বর্তমানে ইরান এর শেয়ার কিনতে চাইলে তুরস্ক সম্মত হয়। এই পাইপ লাইনের নির্মাণ ব্যয় ১০ থেকে ১১ বিলয়ন (১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ কোটি) ডলার।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কাজাখস্তান, রাশিয়া ও বেলারুশ সফরে এবং ৯ মে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ৭০তম বার্ষিকীতে যোগদান উপলক্ষ্যে ৭ মে কাজাখস্তানের উদ্যেশ্যে দেশত্যাগ করেন। সফরের শুরুতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নূর সুলতান নাজারবায়েভের সাথে ৮ মে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। তারা উভয় দেশের সহযোগিতার নীলনক্সা প্রণয়ন করেন। এ প্রেক্ষিতে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্টের বাণিজ্য ও অবকাঠামো যৌথ নির্মাণ বিষয়ে আলোচনা করেন।

৯ মে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন মস্কোর রেড স্কোয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় দিবস (V-Day)’র ৭০তম বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ব্যাপক সামরিক সম্ভার সজ্জিত কুচকাওয়াচ পরিদর্শন করেন। এই কুচকাওয়াজে ১৫০টির বেশি জঙ্গি বিমান, ২ হাজার সামরিক যান, ১৬,৫০০ সেনা অংশগ্রহণ করে। এতে চীনের কন্টিজেন্ট, ৭৫ সদস্যের ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১টি কন্টিজেন্ট অংশগ্রহণ করে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের রুশ সীমান্তে ব্যাপক সামরিক মহড়া ও তৎপরতার প্রেক্ষিতে এবং তাদের এই অনুষ্ঠান বর্জনের প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্টের রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই অনুষ্ঠানে ভারত, ভিয়েতনাম, মিশর, ভেনিজুয়েলা, কিউবা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়েসহ মোট ২৭টি দেশের রাষ্ট ও সরকার প্রধান অংশগ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রকৃত ইতিহাস চেপে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা কমরেড ষ্টালিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং লাল ফৌজের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করছে। আবার পুতিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াও বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ মহান নেতা কমরেড স্টালিনের নেতৃত্ব এবং সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক নির্ধারক ভূমিকাকে নৎস্যাত করছে।

অনুষ্ঠান শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকালে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠককালে তারা রুশ-চীন সম্পর্কের অগ্রাধিকার ও গতি নির্ধারণ করেন। এ সময় উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে ৩০টিরও অধিক দলিল স্বাক্ষরিত হয়। তারা সিল্ক রুট পরিকল্পনার সাথে রাশিয়ার নেতৃত্বে ইউরেশীয় ইকনোমিক ইউনিয়ন তথা ইউরেশিয়াব্যাপী বাণিজ্য ও অবকাঠামো নেটওয়ার্ক সমন্বিত করা নিয়ে আলোচনা করেন। পূর্বাঞ্চলীয় রুট ছাড়াও পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটে গ্যাস সরবরাহে রাশিয়া চীনের সাথে চুক্তি করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য উভয় দেশের মধ্যে ইতিপূর্বে ৪০০ বিলিয়ন (৪০ হাজার কোটি) ডলারের গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আর্থিক, বিমান পর্যবেক্ষণ ডাটা বিনিময়, দ্বৈত কর পরিহার, উৎপাদন সামর্থ, হাইস্পিড রেল ইত্যাদি নিয়ে দলিল স্বাক্ষরিত হয়।

এরপর শি জিনপিন দু’দিনব্যাপী বেলারুশ সফরকালে ১১ মে প্রেসিডেন্ট আলেক্সজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সাথে শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। উভয় নেতা সিল্ক রোড এবং বেলারুশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন নিয়ে আলোচনা করেন। ২০১৪ সালে উভয়পক্ষের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলার। বেলারুশে চীনা বিনিয়োগ ৪০০ মিলিয়ন (৪০ কোটি) ডলার। বেলারুশকে দেওয়া চীনা ঋণের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার।

৮ থেকে ১০ জুলাই রাশিয়ার উফায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ৭ম এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ১৫ম শীর্ষ সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ উত্তেজনাময় বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যকে মোকাবেলায় রুশ-চীন পরিকল্পনা, রণনীতি-রণকৌশল নির্ধারণ এবং এ সংস্থার পূর্ণ সভ্যপদ সম্প্রসারণ করে ভারত, পাকিস্তানকে নেওয়ার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক মন্দাজনিত পরিস্থিতিতে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যকে মোকাবেলায় রাশিয়া-চীনের বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা এই শীর্ষ সম্মেলনসমূহের মধ্যদিয়ে আরও অগ্রসর করা হয়।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৮, রোববার।। ২২ নভেম্বর ২০১৫।।

Advertisements

One Comment on “একক পরাশক্তি মার্কিনের মোকাবেলায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার তৎপরতা”

  1. arghua Chowdhury says:

    Mentioned stalin & red force but didn’t mention Poland & katin genocide.except these,a good analysis.

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.