আমেরিকানদের ৭ম শীর্ষ সম্মেলনের তাৎপর্য ও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব

expanding america

১০-১১ এপ্রিল পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে আমেরিকানদের ৭ম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে কিউবার উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি ও বিরোধিতার কারণে এতদিন কিউবা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা তাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এ প্রেক্ষিতে কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান মার্কিন বিরোধিতার ফলে যুক্তরাষ্ট্র এতদঞ্চলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত এই সংস্থার ৬ষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে ‘আমেরিকার জনগণের বলিভারিয়ান বিকল্প’(ALBA) দেশগুলো কিউবাকে অংশগ্রহণ করতে না দিলে শীর্ষ সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দেয়। এখানে উল্লেখ্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণকারী সাইমন বলিভার দক্ষিণ আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই-এ নেতৃত্ব প্রদান করেন। তার নাম অনুসারে বলিভারিয়ান শব্দটি সামনে আসে। ভেনিজুয়েলার সাবেক নেতা হুগো শ্যাভেজ ও কিউবার ফিদেল ক্যাষ্ট্রোর নেতৃত্বে ২০০৪ সালে ১৪ ডিসেম্বর ভেনিজুয়েলা-কিউবার চুক্তির মধ্যে দিয়ে মার্কিন নেতৃত্বে আমেরিকানদের জন্য মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল(FTAA)-এর বিকল্প হিসেবে এই সংস্থা গঠিত হয়। বর্তমানে এই সংস্থার সদস্য হচ্ছে ১১টি দেশ। এই সংস্থায় মার্কিন বিরোধিতা করে প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে অগ্রসর করে চলে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে বাদ দিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর গোষ্ঠী সিলাক (CELAC) গঠিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ল্যাটিন আমেরিকায় তার অবস্থান, শক্তি বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কৌশল পরিবর্তন করে কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৫৯ সালে মার্কিনের দালাল বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে ফিদেল ক্যাষ্ট্রো ও চে গুয়েভরার নেতৃত্বে কিউবার ক্ষমতা দখল করে। ১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ১৯৬২ সালে কিউবায় রাশিয়ান মিসাইল স্থাপনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধের বিপদ দেখা দিলে সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটে। কিউবার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি ও কিউবার সরকারকে উৎখাত করার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী কার্যক্রম সফল না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে। এ প্রেক্ষাপটে সকল সদস্য তথা ৩৫টি দেশের উপস্থিতিতে এবারের সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও রাউল ক্যাষ্ট্রোর করমর্দনের বিষয়টা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এদিকে ভেনিজুয়েলার উপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি উল্লেখ করলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এ প্রেক্ষিতে ভেনিজুয়েলা বড় আকারে ১০ দিনের সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত করে। সঙ্কট প্রশমনে শীর্ষ সম্মেলনে আগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

চীনা প্রধানমন্ত্রীর ল্যাটিন আমেরিকার ৪টি দেশ সফর:
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান তার ল্যাটিন আমেরিকা সফরের প্রাক্কালে আয়ারল্যান্ড থেকে ১৮ মে ব্রাজিল পৌঁছান। ১৮ থেকে ২৬ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া, পেরু ও চিলি সফর করেন। ল্যাটিন আমেরিকা সফরের শুরুতে ব্রাজিল সফরকালে লি কেকিয়ান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রসৈফের সাথে শীর্ষবৈঠক করেন। চীনের সাথে ব্রাজিলের ২৭ বিলিয়ন (২ হাজার ৭০০ কোটি) ডলার মূল্যের ৩টি চুক্তি ও যৌথ একসান প্লান স্বাক্ষরিত হয়। চীনের সাথে ব্রাজিলের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৮.৯৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৮৯৪ কোটি) ডলার। আগামী ৬ বছরে চীন ব্রাজিলে ৫৩ বিলিয়ন (৫ হাজার ৩০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগ করবে। ব্রাজিল থেকে চীন ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের প্যাসেঞ্জার বিমান ক্রয় করবে।

২১ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান কলম্বিয়া সফর করে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়াল স্যান্তোসের সাথে শীর্ষবৈঠকে মিলিত হন। চীনের সাথে কলম্বিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫.৬৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৫৬৪ কোটি) ডলার। ২২ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়ান পেরু সফর করেন। তিনি পেরুর প্রেসিডেন্ট ওলান্টা হুমালার সাথে শীর্ষ বৈঠক করেন। ২৩ মে উভয় দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার উপর প্রথম রণনীতিগত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। চীনের সাথে পেরুর বাণিজ্যের পরিমাণ ১৪.৩২ বিলিয়ন (১ হাজার ৪৩২ কোটি) ডলার। পেরুতে চীনের বিনিয়োগ হচ্ছে ১৪.২৪ বিলিয়ন (১ হাজার ৪২৪ কোটি) ডলার।

২৪ মে চীনের প্রধানমন্ত্রী চিলি সফর করেন। ২৫ মে চিলির প্রেসিডেন্ট মিসেলি ব্যাসিলেটের সাথে চীনের প্রথানমন্ত্রী লি কেকিয়ানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুদেশের ৩.৬ বিলিয়ন (৩৬০ কোটি) ডলার কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে শান্তিয়াগো দক্ষিণ আমেরিকায় চীনা মুদ্রা রেন মিনবি’র লেনদেনের ১ম স্থানে পরিণত হয়। চীন চিলিকে ৮.১ বিলিয়ন (৮১০ কোটি) ডলার অনুদান মঞ্জুর করে যা যোগ্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের চিলিতে বিনিয়োগ করার জন্য দেওয়া হবে। চিলির সাথে চীনের বাণিজ্য ৩৪.১ বিলিয়ন (৩ হাজার ১০০ কোটি) ডলার। চিলির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হচ্ছে চীন। চিলির বাণিজ্যের ২৪% হয় চীনের সাথে।

ল্যাটিন আমেরিকার সাথে চীনের বাণিজ্যের ৫৭% হয় এই ৪টি দেশের সাথে। ব্রাজিল থেকে শুরু করে পেরু পর্যন্ত তথা আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সংযুক্ত করার জন্য ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেল লাইন স্থাপন করবে চীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য চীন নিকারাগুয়ায় আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ৪০ বিলিয়ন (৪ হাজার কোটি) ডলার ব্যায়ে পানামা খালের বিকল্প খাল নির্মাণ কর্মসূচি গুরুত্ব বহন করে। ২০১৬ সালে অ্যাপেক শীর্ষ সম্মেলন পেরুতে অনুষ্ঠিত হবে। এই শীর্ষ সম্মেলন সফল করতে চীন ভূমিকা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। জানুয়ারি মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিন আগামী দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় ২৫০ বিলিয়ন (২৫ হাজার কোটি) ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে শেষে ল্যাটিন আমেরিকায় চীনা বিনিয়োগ প্রায় ৯৯ বিলিয়ন (৯ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার। ২০১৪ সালের শেষ সময়ে চীন ল্যাটিন আমেরিকার সাথে প্রকৃতিক গ্যাস, পাইপ লাইন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, হাইওয়ে, বন্দর, আবাসন, টেলি যোগাযোগ ও রেলওয়ে খাতে ১১০ বিলিয়ন (১০ হাজার ১০০ কোটি) ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে।

নয়া ঔপনিবেশিক-আধা সামন্তবাদী ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশের উপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার প্রাধান্য হারায় এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন তাদের প্রভাব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। মার্কিন বিরোধিতাকে সামনে রেখে ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভা মোরালেস-এর নেতৃত্বে আমেরিকা ও কানাডাকে বাদ দিয়ে সিলাক সংস্থা গড়ে তোলা হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কৌশল পরিবর্তন করে কিউবার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনস্থাপন করে পানামায় আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করে তার অবস্থান ও প্রভাব বৃদ্ধিতে তৎপর থাকে। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক সম্পর্ক অগ্রসর করে তাদের বাজার ও প্রভাববলয় সম্প্রসারিত করে চলেছে।

সূত্র:  সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৯, রোববার।। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫।।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s