বিশ্বব্যাপী শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে

turkey-anti-mining-protest-juoly-8-2015

সাম্রাজ্যবাদীরা মন্দা থেকে বের হওয়ার জন্য একদিকে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের অর্থে উদ্ধার ও উদ্দীপক কর্মসূচি, কৃচ্ছতা সাধনের কর্মসূচির নামে সঙ্কটের বোঝা আরও বেশি বেশি করে জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মজুরি, বেতন, পেনশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণ খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়ে ছাঁটাই, বেকারত্ব, করের বোঝা বৃদ্ধি করে শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট, আরও দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করছে। শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব সুতীব্র হওয়া এবং একচেটিয়া পুঁজির তীব্রতর আক্রমণ মোকাবেলায় আমেরিকা, ইউরোপসহ পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোসহ বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক, যুবক, জনতা বিভিন্ন রূপে আন্দোলন, বিক্ষোভ-সমাবেশ, ধর্মঘট-সাধারণ ধর্মঘট তীব্রতর করে চলেছে। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

২৩ মে বিশ্বের বৃহত্তম বীজ কোম্পানি মনসান্তোর বিরুদ্ধে ৪৮টি দেশের ৪৫২টি শহরে প্রচন্ড বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মনসান্তো হচ্ছে জিএম ফুড, হাইব্রিড বীজ, পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের বৃহত্তম উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণকারী যুক্তরাষ্ট্রের একটি একচেটিয়া কোম্পানি। এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কৃষিভিত্তিক বায়োটেক কোম্পানির জনগণ ও প্রকৃতি বিধ্বংসী ও দুষণকারী ক্ষতিকর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয় দেশে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক, জনগণ।

যুক্তরাষ্ট্রে তেল শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের পর বৃহত্তম ধর্মঘট ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত করে। ৯টি শোধনাগারের শ্রমিকরা ছাঁটাই ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ২ মার্চ থেকে সফল ধর্মঘট চালিয়ে যায়। ইস্পাত শ্রমিকরা মজুরি নিয়ে নতুন চুক্তির দাবিতে ধর্মঘট সংগঠিত করে। ম্যাগডোনালসহ ফাস্ট ফুডের কর্মচারীরা ঘণ্টায় ১৫ ডলারের দাবিতে ১৫ এপ্রিল সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী ধর্মঘট করে। হাজার হাজার শ্রমিক এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা, একচেটিয়া পুঁজির শোষণ-লুন্ঠন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি, বর্ণবৈষম্যবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে গোটা আমেরিকাব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয়ে চলেছে। ফার্গুসন শহরে মাইকেল ব্রাউন পুলিশের গুলিতে এবং মেরিল্যান্ড স্টেটের বাল্টিমোর শহরে ফ্রেডি গ্রে পুলিশের কাস্টিডিউতে নিহত হলে পুলিশ কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। বিক্ষোভ ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এত তীব্র আকার ধারণ করে যে তা দমনে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী দমন পীড়ন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরও প্রচন্ড বিক্ষোভের লক্ষণসমূহ সামনে আসায় তা দমনের জন্য পুলিশ, প্রশাসন, ন্যাশনাল গার্ড বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমাবেশ, র‌্যালি, বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। কোথাও কোথাও বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে হতাহত ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। একই দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিন জু অ্যাবের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় লস এঞ্জেলসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

৮ মার্চ ব্রাজিলে সরকারের দুর্নীতি ও গণবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রাজধানী ব্রাসিরিয়ায় ১০ লক্ষ লোকের বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। তাছাড়া ৭ এপ্রিল পুলিশের গুলিতে এক বালক নিহত হলে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। মার্চ মাসে ইসরাইলে লে-অফের প্রতিবাদে ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করে। ইসরাইলের ডাক, বিমান বন্দর, বিদ্যুৎ, পানি শ্রমিকরা এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। ফ্রান্সের ফেরি শ্রমিকরা ধর্মঘট করলে বন্দর অচল হয়ে যায়। আফ্রিকায় নাইজেরিয়ার আবুজা স্টিল মিলের ৪ জন শ্রমিককে চাকুরীচ্যুত করলে শ্রমিকরা ধর্মঘট সংগঠিত করে। নাইজেরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা বকেয়া বেতনের দাবিতে ধর্মঘট পালন করে। আরব আমিরাতের দুবাই-এ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত অভিবাসী শ্রমিকরা দুবাইভিত্তিক এমার প্রপার্টিস-এর শ্রমিকরা অধিকতর মজুরির দাবিতে ধর্মঘট সংঘটিত করে। জার্মানিতে ২টা বিমান বন্দরের গ্রাউন্ড ক্রু’রা ৬ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করে। ১ এপ্রিল পূর্ব ইউরোপের ৬টি দেশ এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া, ল্যাটভিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রের উপর দিয়ে ১২০টি সামরিক যান নিয়ে ন্যাটো বাহিনী জার্মানির অভিমুখে মার্চ করার সময় কোন কোন জায়গায় জনগণ ‘ফিরে যাও’, ‘ট্যাংক নয়, শান্তি’ ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ৫ এপ্রিল জার্মানিতে ন্যাটোর যুদ্ধোন্মোদনার বিরুদ্ধে রাজধানী বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরে ৮০টির বেশি র‌্যালী ও সমাবেশ সংঘটিত হয়। ২২ এপ্রিল ইউক্রেনের কয়লা শ্রমিকরা রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ১ ও ২ মে আয়ারল্যান্ডের বাস শ্রমিকরা বাস সার্ভিস ব্যাক্তি মালিকানাকরণের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট করে এবং আরও ৫ দিনের ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। গ্রিস, স্পেনসহ ইউরোপের দেশে দেশে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, সমাবেশ, ধর্মঘট সংঘটিত হয়। বিনা বেতনে শিক্ষার দাবিতে ২৯ মে চিলিতে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ সংঘঠিত হয়।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৫।।সংখ্যা-০৯, রোববার।। ২০ ডিসেম্বর ২০১৫।।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.