আন্তর্জাতিক লাইনগত-বিতর্কে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি(সিসি)-র মতাবস্থান

Maoist-Flag

আন্তর্জাতিক নতুন লাইন-বিতর্ক এবং আমাদের কিছু অবস্থান সম্পর্কে

[পূবাসপা’র কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক ব্যুরো (আনব্যু) কর্তৃক প্রকাশিত]

(ফেব্রুয়ারী, তৃতীয় সপ্তাহ, ২০০৯)

[নোটঃ

কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসি-সম্পাদক কমরেড আনোয়ার কবীর এই দলিলটি ডিসেম্বর,’০৮-এ রচনা করেন এবং প্রাথমিক আলোচনার জন্য আনব্যু-তে পেশ করেন। আনব্যু সিদ্ধান্ত নেয় যে, সিসি-সদস্য সহ সমগ্র পার্টিতে এবং মাওবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে একযোগেই দলিলটি আলোচনা-পর্যালোচনা করার জন্য পেশ করা প্রয়োজন। সে অনুযায়ী দলিলটি প্রকাশ করা হয় ফেব্রুয়ারী,’০৯-এ। প্রকাশের পর দলিলটি মাওবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে প্রচার করা হয়। এবং পার্টির অভ্যন্তরে সর্বস্তরে এর ভিত্তিতে অধ্যয়ন, আলোচনা ও বিতর্ক শুরু করা হয়।

দলিলটি বর্তমান আন্তর্জাতিক লাইনগত-বিতর্কের বিষয়াবলীকে বুঝতে যেমন সহায়ক হবে, তেমনি মৌলিক কিছু বিষয়ে পূবাসপা’র কেন্দ্রীয় কমিটির মতাবস্থানকেও পরিস্কার করবে। দলিলটি বাংলাদেশের মাওবাদীদের লাইনগত সংগ্রামের মুখপত্র নয়া বিতর্ক, আগস্ট ২০০৯ এ প্রকাশিত হয়েছিল।

সম্পাদনা বোর্ড/লাল সংবাদ]

১৯৭৬-সালে চেয়ারম্যান মাও-এর মৃত্যুর পর, বিশেষতঃ চীনে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ও আলবেনিয়ার হোক্সাপন্থী অধঃপতনের প্রেক্ষিতে বিশ্বের মাওবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ’৮৪-সালে রিম গঠিত হয়েছিল। আমাদের পার্টি শুরু থেকেই তার সদস্য হয় এবং রিমের অগ্রগতিতে বিভিন্ন ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রিম ’৯৩-সালে একটি বর্ধিত সভায় মালেমা সূত্রায়ণ গ্রহণ করে। মালেমা’র ভিত্তিতে গঠিত ও পরিচালিত রিম বিশ্বের প্রকৃত মাওবাদীদের প্রধানতম কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। রিম মালেমা’র উপলব্ধি ও প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটায়। এ অগ্রগতির পথে সর্বদাই বিভিন্ন মতের দ্বন্দ্ব ছিল, দুই লাইনের সংগ্রাম ছিল, যা একটি প্রাণবন্ত বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠনের বিকাশে চালিকাশক্তির কাজ করে। এবং রিম-কমিটির নেতৃত্বে রিম মূলত/প্রধানত ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলে। কিন্তু বিগত কয়েকবছর ধরে রিম-অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্য একটা গুণগত স্তরে উন্নীত হয়েছে। এর শুরু হয়েছিল ’৯৩-সালে পেরু-পার্টির অভ্যন্তরে দুই লাইনের সংগ্রামের উদ্ভব ও তার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে।  প্রথম দিকে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও সাময়িক-আংশিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে কিছুদিন এগোলেও এ শতাব্দীর শুরু থেকে এ বিষয়ক দ্বন্দ্ব রিম কমিটিসহ রিমের প্রধানতম অংশের সাথে পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্বের দাবীদার এমপিপি’র গুরুতর ভাঙন সৃষ্টি করে।

এ সত্ত্বেও রিম-কমিটি মূলত ঐকবদ্ধভাবে রিম-কে গতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে চলছিল। কিন্তু ২০০৩-সাল থেকে পেরু-প্রশ্নের বাইরে অন্য নতুন প্রশ্নে রিম-কমিটির অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্য ও বিতর্ক গুণগত রূপ নিতে থাকে। কমরেড প্রচন্ডের নেতৃত্বে নেপাল-পার্টি বেশ কিছু নতুন লাইন ও নীতি উত্থাপন করে যা ক্রমান্বয়ে রিম-অভ্যন্তরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’-নামে পরিচিত হয়ে ওঠা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট নতুন কিছু নীতি ও লাইন, যাকে নেপাল পার্টি মালেমা’র বিকাশ বলে উত্থাপন করছে।

* এই বিতর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে রিম-কমিটি তার অভ্যন্তরীণ বিতর্কের পত্রিকা “স্ট্রাগল”-এর মাধ্যমে বিভিন্ন পার্টির বিতর্কমূলক কিছু দলিলাদি প্রকাশ করে, যাতে আমাদের পার্টির একাধিক দলিলও প্রকাশ পেয়েছে। নতুন পর্বে ৯নং সংখ্যা পর্যন্ত ‘স্ট্রাগল’-এর কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ হয়।

* ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বিতর্কে নতুনতর বিকাশ ঘটে। নেপাল পার্টি রাজতন্ত্রের পতনের পর ’০৭-সালের শুরুতে প্রকাশ্যে চলে আসে এবং মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ব্যবস্থার অধীনে তাদের সাথে যৌথভাবে সরকারে অংশ নেয়। পরে তারা ’০৮-সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। এভাবে নেপাল পার্টির নতুন লাইনগুলো বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নতুন পর্বে প্রবেশ করে। যা রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির মাঝে গুরুতর বিতর্ক ও অনাস্থার সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে রিম-কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য আরসিপি’র প্রধান নেতা কমরেড বব এ্যাভাকিয়ান এ সময়টাতেই তার বেশ কিছু মতাবস্থানকে সংশ্লেষিত করে গুণগতভাবে এগিয়ে নেন, যাকে তারা “নয়া সংশ্লেষণ”(নিউ সিনথেসিস) নামে মালেমা’র বিকাশ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এমনকি এর বিরোধিতা করে আরসিপি’র মধ্যে ভাঙনও ঘটে ’০৭-সালে। উল্লেখ্য যে, নেপাল পার্টির লাইনকে আরসিপি গুরুতরভাবে বিরোধিতা করে, এবং এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের একটা দিক হলো এই বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যে বিকাশ সেটা।

অর্থাৎ, রিম-কমিটির প্রধানতম দুই সদস্য-পার্টি আপাতভাবে দুই বিপরীতধর্মী অবস্থান থেকে মালেমা’র বিকাশ সাধনের দাবী করছে।

পাশাপাশি পেরু-পার্টির কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্বের দাবীদার এমপিপি এই পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি, প্রচন্ড পথ ও এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বৈরী আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে, যা তারা অনেক আগেই শুরু করেছিল।

এই সমগ্র পরিস্থিতিতে বাস্তবে রিম-কমিটি কার্যকরভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে কোন ভূমিকা বিগত দুই বছর ধরে রাখতে পারেনি। এটা সুস্পষ্ট যে, এই লাইন-বিতর্কের অন্ততঃ প্রাথমিক একটি মীমাংসা ব্যতীত রিম-কমিটি ও রিম পুনরায় গতিশীল ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না।

* আমাদের পার্টি রিম-গঠনের শুরু থেকেই আমাদের সাধ্যমত আন্তর্জাতিক বিতর্কে অংশ নিয়ে আসছে। কারণ, প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদী কমিউনিস্ট সংগঠন হিসেবে আমাদের পার্টি মনে করে যে, আমাদের লাইন হলো আন্তর্জাতিকতাবাদী ও প্রধানত আন্তর্জাতিক। সুতরাং আন্তর্জাতিক বিতর্কে সঠিক অবস্থান গ্রহণ না করে দেশীয় কর্মক্ষেত্রে সঠিক ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়।

সেজন্য আমাদের পার্টি রিম-পরিসরের এই নতুন বিতর্ক, লাইন-সংগ্রাম ও পর্যালোচনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আমরা প্রথমদিকে প্রচেষ্টা নিয়েছিলাম “স্ট্রাগল”-এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা, অন্ততপক্ষে তার প্রধান রচনাগুলো বাংলায় প্রকাশ করা। এটা আমাদের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা এদেশের বিভিন্ন মাওবাদী কেন্দ্র, শক্তি ও ব্যক্তির সাথে আলোচনা করি, যাতে যৌথ সামর্থে একাজোট করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে কিছু কিছু সাড়া পাওয়া গেলেও এ কাজে সক্ষম অনেক কমরেডই সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসেননি। আমাদের পার্টি একক উদ্যোগে অথবা অন্য কিছু শক্তির সাথে যৌথভাবে যতটা সম্ভব কাজটিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা চালায় যা এখনো চলমান।

কিন্তু পরবর্তীকালে লাইন-বিতর্ক এতবেশী ব্যাপকতা অর্জন করেছে যে, শুধুমাত্র মৌলিক গুরুত্বসম্পন্ন দলিলাদির একটা প্রাথমিক তালিকা করলেও সেগুলো আমাদের সামর্থ্যে অনুবাদ করা ও প্রকাশ করা জরুরীভাবে সম্ভব নয়।

অথচ এই বিতর্কে সমগ্র পার্টিকে, অন্তত পক্ষে পার্টির নেতৃত্ব ও কেডার শক্তিকে সমাবেশিত করা খুবই জরুরী। শুধু পার্টিরই নয়, এদেশের মাওবাদী আন্দোলনের প্রধান স্তরগুলোতে এই বিতর্ক আলোচনা করাটা অতি জরুরী। এটা আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশীয় আন্দোলন পুনর্গঠিত করার জন্য এক জরুরী করণীয়। একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্যও এটা অপরিহার্য।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের পার্টির প্রধান নেতৃত্ব-স্তরে যতটা অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা হয়েছে তার নির্যাস তুলে এনে সমগ্র পার্টি ও দেশীয় আন্দোলনের অভ্যন্তরে তা উত্থাপন করা প্রয়োজন বলে সিসি মনে করছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমরা মাও-মৃত্যুর পরবর্তী মহাবিতর্কেও পড়েছিলাম। যখন কিছু সার্কুলারের মাধ্যমে প্রধানতম বিষয়াবলী ও তার বিতর্ককে, একইসাথে আমাদের প্রাথমিক মতাবস্থানকে প্রকাশ করা হয়েছিল। যা আমাদের পার্টিকে তখনকার মত কিছুটা সচেতন হতে ও এদেশের আন্দোলনকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম করে তুলেছিল।

আমাদের পার্টির নেতৃত্ব-স্তরে যতটা অধ্যয়ন করা হয়েছে তার ভিত্তিতে আমরা মনে করি যে, এই বিতর্ক বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে অতীতের বিভিন্ন মহাবিতর্ক, যেমন, ’৬০-দশকে রুশ-চীন মহাবিতর্ক নামে পরিচিত মতাদর্শগত মহাবিতর্ক, অথবা মাও-মৃত্যুর পর রিম-গঠনের প্রক্রিয়ায় ও পরে মাওবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার যে মহাবিতর্কÑ সেসবের মতই, বা তার চেয়ে বেশী জটিল, গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপক ও গভীর তাৎপর্যসম্পন্ন এক মতাদর্শগত মহাবিতর্ক।

তাই, এই লাইন-বিতর্কে মৌলিক কিছু অবস্থান গ্রহণ করাটা রিম-সদস্য হিসেবে আমাদের পার্টির জন্য জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিকতাবাদী দায়িত্ব হয়ে পড়েছে বিশেষতঃ মালেমাবিরোধী নীতি ও লাইনকে সংগ্রাম করা, তাকে পরাজিত করা এবং মালেমা’র পতাকা উড্ডীন রাখা। দায়িত্ব হয়ে পড়েছে এই সংগ্রামে দেশে ও দেশের বাইরে- সর্বত্র অন্যদের থেকে শিক্ষা নেয়া, অন্যদেরকে জয় করা, বিভ্রান্তদেরকে সংশোধনে ভূমিকা রাখা এবং একেবারে অসংশোধিতদেরকে বিচ্ছিন্ন করা।

পাশাপাশি দায়িত্ব এসে পড়েছে প্রকৃত মালেমা-বাদীদের অভ্যন্তরস্থ মতপার্থক্যের উপর, পর্যালোচনার উপর ভূমিকা রাখা। কারণ, নিজেদের অবস্থান ও উপলব্ধিকে উচ্চতর লেবেলে উন্নীত না করে মালেমা-বিরোধী নীতি ও লাইনকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা সম্ভব নয়।

আমাদের পার্টি বিগত কয়েক বছর ধরে এই ভূমিকাটি পালনের জন্য বিশেষ উদ্যোগী হয়েছে। পার্টি “স্ট্রাগল”-সহ বিভিন্ন মুখপত্রে লেখা দিয়েছে, চিঠিপত্র দিয়েছে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে কথা বলেছে, এবং দেশে এই বিতর্কগুলোকে পরিচিত করানো ও বিভিন্ন ভুল অভিমতগুলোকে সংগ্রাম করার মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে। তবে এখন কিছু বিষয়ে বিভক্তি রেখা টানারও সময় এসেছে এবং নতুনতর বিষয়কে হাতে নেবার সময় এসেছে।

* তাই, এই বিতর্ককে পার্টিব্যাপী আরো সুনির্দিষ্টভাবে ও সার্বিকভাবে পরিচিত করানো এবং আমাদের কেন্দ্রের মৌলিক ও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাথমিক মতাবস্থানগুলোকে উত্থাপনের মাধ্যমে পার্টিকে সচেতন ও সজ্জিত করা, দেশের মাওবাদীদের মাঝে সুস্থ, সচেতন ও সুব্যবস্থিত বিতর্ক ও পর্যালোচনাকে ছড়িয়ে দেয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বিতর্কে সক্রিয় অংশ নেবার মাধ্যমে তার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখার সামর্থ্যকে বাড়িয়ে তোলার প্রয়াশ থেকে এ দলিলটি রচনা করা হচ্ছে।

ইতিপূর্বেও আমরা বিভিন্ন দলিলে খন্ড খন্ড ভাবে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্নে আমাদের প্রাথমিক মতাবস্থান বা পর্যালোচনা উত্থাপন করেছি। বিশেষতঃ পেরু-পার্টির কিছু লাইন এবং পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত দুই লাইনের সংগ্রামের বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট কিছু মতাবস্থান ছিল, যা মৌলিকভাবে রিম-কমিটির মতাবস্থানের সাথে প্রধানত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। অবশ্য সমস্যাকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু মতপার্থক্যও রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির সাথে আমাদের ছিল। কিন্তু পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্বের দাবীদারদের কিছু নগ্ন ও সুস্পষ্ট রিম-বিরোধী, মার্কসবাদ বিরোধী অবস্থান ও কার্যকলাপকে বিরোধিতার ক্ষেত্রে রিম-এর ঐক্যে আমরা সামিল ছিলাম ও রয়েছি।

এই দলিলে আমরা প্রধানত উত্থাপন করবো নেপাল পার্টি উত্থাপিত নতুন নীতি, লাইন ও কৌশলগুলোর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন যাকে আমরা মনে করি, সেই ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ তত্ত্বটির উপর। অন্যদিকে আমরা উত্থাপন করবো আরসিপি-উত্থাপিত বব এ্যাভাকিয়ানের ‘নয়া সংশ্লেষণ’-এর উপর যাকে তারাও মালেমা’র বিকাশ বলে দাবী করছেন।

এছাড়া নেপাল পার্টি উত্থাপিত আরো কিছু বিষয়Ñ সাম্রাজ্যবাদ-তত্ত্বের বিকাশ, ফিউশন, কৌশলগত তত্ত্ব, প্রভৃতিকেও আমরা সম্ভবমত আলোচনা করবো।

পেরু-পার্টি বা এমপিপি এখন যাকে প্রতিনিধিত্ব করে সেসবের মৌলিক প্রশ্নাবলীতে আমরা মূলতঃ রিম-কমিটির ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিতে চাই। সেসবেরও সারসংকলনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্য রয়েছে। তবে তা এখন কম গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক প্রশ্নাবলীতে ঐকমত্য অর্জন এখন জরুরী, যার ভিত্তিতে গৌণ প্রশ্নাবলী ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেয়া ব্যতীত অন্য উপায় খোলা নেই। তাই, এ বিষয়গুলোতে আমরা বড় কোন আলোচনা ও বিতর্ক এখন করবো না। তবে নতুনতর পরিস্থিতিতে তার কিছু উত্থাপন এখানে হতে পারে। পেরু-পার্টির মৌলিক লাইনের অংশরূপে থট/পথ প্রশ্ন, জেফেতুরা—-ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের মৌলিক অবস্থানকে এখানে পুনউত্থাপন ভাল হবে।

২১-শতকের গণতন্ত্র’ গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্ন

নেপাল পার্টি এ ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করে ২০০৩-সালে। এ সময়টাতেই রিম-এর দক্ষিণ-এশীয় এক সম্মেলনে নেপাল-পার্টি তাদের এ ধারণাকে প্রাথমিকভাবে ও মৌখিকভাবে প্রকাশ করে ও কিছুটা আলোচনা করে। তখনো তারা এ বিষয়ে সামগ্রিক কোন অবস্থান-পত্র বা দলিলাদি পেশ করেনি।

সে সময়টাতে নেপাল-গণযুদ্ধ বিরাটাকারে বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং গ্রামাঞ্চলে বিশাল অঞ্চল মুক্ত হয়ে পার্টির নেতৃত্বে প্রশাসন চালু হয়েছিল। বাহিনীরও ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। পার্টি তখন দেশব্যাপী ক্ষমতাদখলের জন্য রণনৈতিক ভারসাম্যের স্তর ছাড়িয়ে আক্রমণে যাবার চিন্তা করছিল। এ অবস্থায় নেপাল পার্টি একটি বিপ্লবী ক্ষমতাসীন পার্টির জরুরী আগামী সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিল যা খুবই বাস্তব সম্মত, দুরদর্শী ও বিজ্ঞচিত ছিল।

তারা এ সময়ে যে বিষয়টিকে আকড়ে ধরেন তাহলো, চীনে জিপিসিআর সত্ত্বেও বিপ্লব কেন পরাজিত হলো, পার্টি কেন সংশোধনবাদী হলো। মাও-মৃত্যুর পর যে ব্যাখ্যা মাওবাদীরা দিয়েছেন তাতেই সীমিত না থেকে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং সর্বহারা রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার দ্বান্দ্বিক সারসংকলন করার এ প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছিল।

পার্টি ইতিমধ্যে নিজেদের ক্ষমতা, বাহিনী ও পার্টির মধ্যে উদ্ভূত আমলাতন্ত্রের সমস্যার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই অভিমতের দিকে চালিত হতে থাকে যে, সমাজতন্ত্রের অধীনে জনগণের গণতন্ত্রকে যথোপযুক্তভাবে প্রসারিত করতে না পারার মধ্যে আমাদের ব্যর্থতার কারণ নিহিত। এভাবে তারা বিংশ শতকের বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের অভিজ্ঞতার সারসংকলনের ভিত্তিতে নতুন ধারণা হিসেবে ‘২১-শতকের বিপ্লবের জন্য নতুন নীতি-পদ্ধতির বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

রিম-পরিসরে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা ও উত্থাপিত প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নেপাল-পার্টি কিছু কিছু দলিলাদি হাজির করতে থাকে যার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের অধীনে জনগণের গণতন্ত্রকে প্রসারিত করার জন্য স্থায়ী বাহিনী ও একনায়কত্বকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশিত  হতে থাকে। তারা গুরুত্ব দিয়ে যে কথাটি উত্থাপন করতে চান তাহলো, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র একদিকে পুরনো শাসকশ্রেণীর রাষ্ট্রের মতই একনায়কত্ব চালাবার হাতিয়ার, কিন্তু একইসাথে সেটা তার চেয়ে ভিন্নতর- কারণ, তা সব ধরণের রাষ্ট্র ও একনায়কত্ব বিলোপ করারও প্রক্রিয়া।

এজন্য তারা রাষ্ট্রীয় স্থায়ী সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বিপরীতে সশস্ত্র জনগণের ধারণাকে গুরুত্ব দিতে থাকেন, জনগণের গণতন্ত্র/ক্ষমতাকে সামনে আনতে থাকেন, যাকিনা প্যারি কমিউনে ঘটেছিল, এবং তারা রুশ বিপ্লবের পূর্ব সেই অভিজ্ঞতাকে বরং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার চেয়ে বিশেষ মূল্য দিতে থাকেন। বলা যায়, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের (রুশ ও চীন) অভিজ্ঞতাকে তারা নেতিবাচকভাবে মূল্যায়নের দিকে চালিত হতে থাকেন।

এটা সত্য যে, সকল শ্রেণী বিভক্ত সমাজের সকল ধরণের রাষ্ট্রের থেকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্রগত পার্থক্য সম্পর্কে তাদের উপরোক্ত চিন্তা ভুল নয়। কিন্তু তাসত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রথমত একটি রাষ্ট্র, যা একনায়কত্বের হাতিয়ার ব্যতিত অন্য কিছু নয়, হতে পারে না। বিশেষত যতদিন সাম্রাজ্যবাদ রয়েছে ততদিন একনায়কত্বের প্রশ্নকে কোন ভাবে দুর্বল করার অর্থ হলো সাম্রাজ্যবাদ-পুজিবাদকে শক্তি জোগানোÑ সেটা সচেতন বা অসচতন যেভাবেই ঘটুক না কেন। সেজন্যই মাও জিপিসিআর কালে সর্বহারা একনায়কত্বের তত্ত্ব অধ্যয়নের উপর এত বেশী জোর দিয়েছিলেন।

নেপাল-পার্টি যে প্রকৃত প্রশ্নটিকে উত্থাপন করেছে তার উপর গুরুত্বদান তাদেরকে রাষ্ট্র, বিপ্লব ও একনায়কত্ব সংক্রান্ত আরো মৌলিক প্রশ্নের উপর নতুন চিন্তাভাবনায় চালিত করে। এভাবে ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণাটি তার প্রথমাবস্থায় সমাজতান্ত্রিক সমাজের রং বদলানো ঠেকানোর বাস্তব ও জরুরী প্রয়োজন থেকে একটি সাধারণ ধারণার দিকে এগিয়ে যায়, যার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্নটির মত মার্কসবাদের একেবারে মৌলিক প্রশ্নটি।

নেপাল পার্টি দাবী করতে থাকে যে, মালেমা’র তত্ত্ব সমাজতন্ত্রের এই পরাজয়ের সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণ সক্ষম নয়। এমনকি চীনে জিপিসিআর কালে তার কিছু অগ্রগতি ঘটলেও সেটা মীমাংসিত হয়নি। তাই, তত্ত্বকে বিকশিত করতে হবে। এবং তারা এই ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ তত্ত্বটিকে তার বিকাশ বলেও ধারণা দিতে থাকেন।

তাদের এই শ্লোগান একনায়কত্ব সম্পর্কিত মার্কসীয় মৌলিক ধারণাকে দুর্বল করে বা বাতিল করে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে তারা তাদের শ্লোগানটিকে ‘২১-শতকের গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব’Ñ এভাবেও প্রকাশ করতে থাকেন।

* ইতিমধ্যে নেপাল-বিপ্লবের পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ ঘটে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্ত আন্দোলনের কৌশল হিসেবে পার্টি ’০৫-সালের শেষদিকে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সাথে ১২-দফা সমঝোতা স্থাপন করে। এরপর নেপাল পরিস্থিতি ও পার্টির নীতি ও পদক্ষেপগুলো দ্রুত এগিয়ে যায়। ’০৬-সালের এপ্রিলে রাজতন্ত্র পিছু হটে। পার্টি ক্রমান্বয়ে প্রকাশ্যে আসে; মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও বিদ্যমান রাষ্ট্রের মধ্যে তারা সরকারে অংশ নেয়; পরে নির্বাচনে অংশ নেয়, জয়লাভ করে ও সরকার গঠন করে।

এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় বহুদলীয় ব্যবস্থা, ‘প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থা’র ধারণাটিকে তারা নিয়ে আসেন, যা ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির এখনকার প্রয়োগকে প্রতিনিধিত্ব করে। দেশীয় ক্ষেত্রে এই লাইন কীভাবে কৌশলের নামে বিপ্লবী নীতিকে খেয়ে ফেলে সেটা আমরা বিভিন্ন দলিলপত্রে আলোচনা করেছি। সংক্ষেপে, এটা শুধুমাত্র রাজতন্ত্রকে সরিয়ে বিদ্যমান প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণী ও সমাজব্যবস্থাকে মূলতঃ বজায় রাখে, কিছু কিছু সংস্কার চালিয়ে, এবং, তার অধীনে প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে। এটা বিদ্যমান ব্যবস্থার নির্বাচনকে একটি প্রতিযোগিতার পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। এটা কার্যতঃ সংসদীয়বাদকে লাইন হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও পার্টি বলছে এটা একটা কৌশলমাত্র। এক্ষেত্রে পার্টিকে আদি সর্বহারা বিপ্লবী লাইন, এবং এখনকার বুর্জোয়া সংসদীয়বাদের মধ্যে একটা মিলঝিল করার জন্য ব্যাপকভাবে সমন্বয়বাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে, নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা উপস্তরের আবিস্কার করতে হয়েছে, কিন্তু এটা বরং তাদের স্ববিরোধিতাকেই প্রকাশ করছে আরো স্থূলভাবে। সবচাইতে মারাত্মক হলোÑ এটা রাষ্ট্র, বিপ্লব ও একনায়কত্ব সম্পর্কে মৌল মার্কসবাদী তত্ত্বকে ধোঁয়াশা করে দিয়েছে, তার থেকে সরে গেছে, মালেমা’র বিকাশের নাম করে।

এটা যদি হয় প্রচন্ড পথের প্রধানতম একটা স্তম্ভ, তাহলে এই প্রচন্ড পথ মালেমা’র বিকাশ নয়, বরং মালেমা থেকে সরে পড়া।

* পার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণাটি প্রথম যখন উত্থাপন করে তখনকার আগ্রহটি ভুল ছিল না। কেন সমাজতন্ত্র পরাজিত হলো- জিপিসিআর সত্ত্বেও।

     একে শুধু অনিবার্য্য পরাজয় বলাটা যথেষ্ট কিনা। জিপিসিআর-ই এর সমাধান কিনা- যে পর্যন্ত মাও করে দিয়ে গিয়েছেন? নাকি জিপিসিআর-এর তত্ত্ব-কে বিকশিত করতে হবে। এমনকি জিপিসিআর-কালেও কোন গুরুত্বপূর্ণ ভুল ছিল কিনা সে প্রশ্ন উঠানো যায় কিনা।

এ বিষয়গুলো আলোচনার দাবী রাখে, উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান থেকে বব এ্যাভাকিয়ান ও আরসিপি এই বিষয়টিকে উত্থাপন করেছেন, যা আমরা পরে আলোচনা করবো। কিন্তু নেপাল-পার্টি শুরু থেকে এ সমস্যাটির উত্তর দিয়েছে মালেমা থেকে সরে গিয়ে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিভ্রান্তমূলক মধ্যবিত্ত ধারণা থেকে।

তারা বলেছেন, সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের কারণ আমলাতন্ত্র- পার্টির একচ্ছত্র নেতৃত্ব ও স্থায়ী শক্তিশালী বাহিনী- যার ভেতর থেকে এই আমলাতন্ত্র আসে, এবং যা সংশোধনবাদ এনে পার্টির ও দেশের রং বদলে দেয়। সুতরাং তারা এই আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করার সমাধান হিসেবে শক্তিশালী স্থায়ী বাহিনীর বিপরীতে সশস্ত্র জনগণ, এবং পার্টির একচ্ছত্র নেতৃত্বের বিপরীতে প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় ব্যবস্থা হাজির করেন। এক্ষেত্রে তারা প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতায় ফেরত যাবার সমাধানের কথাও বলেছেন। যাকিনা জনগণের এক নতুন গণতন্ত্রের সৃষ্টি করবে। একেই তারা ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ বলছেন।

– তাদের উপরোক্ত ধারণাগুলো জিপিসিআর-এর অভিজ্ঞতাই শুধু নয়, প্যারী কমিউনের সারসংকলন এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তীকালের রুশ ও চীন বিপ্লবের ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোকে সর্বহারা শ্রেণী লাইন ও দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা না বোঝাকে প্রকাশ করে। এবং উল্টোপথে হাটার মাধ্যমে ১৮-শতকের বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে গিয়ে ঠেকে।

নিশ্চয়ই সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক লাইনের ভুলের কারণে আমলাতন্ত্রের বড় বিকাশ ঘটেছিল। চীনেও আমলাতন্ত্র ছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্র পুজিবাদ-সংশোধনবাদে অধপতনের প্রকৃত কারণ নয়। বরং বলা ভাল যে, আমলাতন্ত্র রোগের প্রকাশ, সেটা নিজেও রোগ বটে, কিন্তু মৌলিক রোগ এটা নয়। যতদিন রাষ্ট্র থাকবে, পার্টি থাকবে, একনায়কত্ব থাকবে- ততদিন আমলাতন্ত্রও থাকবে। সমস্যা হলো তার উৎপত্তিস্থলকে আঘাত করা। নইলে যতই আমলাতন্ত্র বিরোধী সংগ্রাম করা হোক না কেন, তার থেকে সৃষ্ট বিপদকে কাটানো যাবে না।

আমলাতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামের পৃথক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। যার কথা লেনিন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু জিপিসিআর-এর যেটা বিকাশ তাহলো, বুর্জোয়া-অধিকারগুলোকে সীমিত করা- তার চূড়ান্ত বিলুপ্তির লক্ষ্যে; এবং; সেজন্য রাজনৈতিক সংগ্রামকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরা। মার্কস বহু আগেই তার বিখ্যাত “৪-সকলসমূহ”-কে বিলুপ্ত করার কথায় এটাই এনেছিলেন। আমলাতন্ত্র বুর্জোয়া সম্পর্কের একটা দিকমাত্র, যা অর্থনৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামোতে বিদ্যমান বুর্জোয়া সম্পর্কগুলোর থেকে সৃষ্ট ও তার থেকেই বেড়ে ওঠে। জিপিসিআর সেই জায়গাটাকেই তুলে ধরেছে। এবং দেখিয়েছে যে, এর একমাত্র সমাধান হলো বিপ্লবকে অব্যাহত রাখা, বিপ্লবকে তীক্ষ্ণ করা। এর অর্থ হলো, সর্বহারা একনায়কত্বকে শক্তিশালী করা, তাকে দুর্বল করা নয়; এর অর্থ হলো পার্টির নেতৃত্বকে সুনিশ্চিত করা, তাকে নড়বড়ে করা নয়। আর এসবই করা যেতে পারে ব্যাপক জনগণকে পার্টির নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে জাগরিত করে, রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ ও অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তুলে- যা বুর্জোয়া গণতন্ত্রে, নির্বাচনে, সংসদে কখনই ঘটে না। নির্বাচন, সংসদ, বহুদলীয় অংশগ্রহণ এসবের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কিছু উপাদান হতে পারে বটে, কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো পার্টির নেতৃত্ব, পার্টির নেতৃত্বে জনগণের উত্থান, সর্বহারা রাষ্ট্রকে শক্তিশালীকরণ, একনায়কত্বকে শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এর কোন বিকল্প নেই। এথেকে বিচ্যুতিই বরং প্রথম ধাপেই রং বদলে ফেলা। এটা রং বদলানো ঠেকানোর কোন সমাধান নয়।

নেপাল-পার্টি আমলাতন্ত্র সম্পর্কে তাদের এই মধ্যবিত্ত/বুর্জোয়া উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা চালিত হয়ে অবধারিতভাবে নোঙর করেছে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বন্দরে, যা সর্বহারা একনায়কত্ব ও পার্টিনেতৃত্বকে দুর্বলই করে না, তাকে বর্জন করে। কার্যতঃ তা চর্চা করে বুর্জোয়া একনায়কত্ব। যা বহু আগে সমাজ-গণতন্ত্রীদের মাধ্যমে মার্কসবাদী আন্দোলনে দেখা গেছে। এরই অবশ্যম্ভাবী ফল হলো আজকের নেপালে বিপ্লব-বর্জিত সংসদীয়বাদের অনুশীলন। যা ১০বছরের বিপ্লবের ফলকে খেয়ে ফেলার দিকে এগিয়ে চলছে।

* এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব সম্পর্কে, তথা রাষ্ট্র ও বিপ্লব সংক্রান্ত মৌল মার্কসীয় তত্ত্বাবলীকে আমাদের সুগভীরভাবে পুনঃঅধ্যয়ন ও সঠিকভাবে আত্মস্থকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অতিসংক্ষেপেÑ গণতন্ত্র কোন সার্বজনীন বিষয় নয়, যেমনটা পুজিবাদী গণতন্ত্র শিখিয়ে থাকে। সার্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা হলো একটি বুর্জোয়া ধারণা। বুর্জোয়া শ্রেণী তার একনায়কত্বকে ধামাচাপা দেয় ‘গণতন্ত্র’ শ্লোগানের মাধ্যমে- যাতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার হলো তাদের সার্বজনীন ভোট। গণতন্ত্র একনায়কত্ব ছাড়া হয় না। কোন না কোন শ্রেণীর একনায়কত্বই সেই শ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র সৃষ্টি করে। লেনিন শিখিয়েছেন, যখন একনায়কত্ব থাকবে না, তখন গণতন্ত্রেরও কোন অর্থ থাকবে না।

মার্কসবাদ শেখায় যে, রাষ্ট্র হলো একনায়কত্বের হাতিয়ার মাত্র। সুতরাং যতদিন রাষ্ট্র রয়েছে ততদিন তাহলো এক শ্রেণী কর্তৃক বিপরীত শ্রেণীকে দাবিয়ে রাখার যন্ত্র। আর বাহিনী হলো যেকোন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান উপাদান। তাই,  রাষ্ট্র থাকলে তার স্থায়ী বাহিনী থাকতে বাধ্য।

বিপ্লব হলো প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা, সেজন্য তার বাহিনীকে ধ্বংস করা, এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ করা। এভাবে ক্ষমতাসীন শ্রেণীর একনায়কত্বকে ধ্বংস করা। এবং তার স্থলে জনগণের নতুন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। নতুন রাষ্ট্র, নতুন বাহিনী সৃষ্টি করা। এ ছাড়া বিপ্লবের আর কোন সংজ্ঞা নেই, আর কোন বিপ্লব হতে পারে না।

তাই, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করা, অর্থাৎ, বুর্জোয়া একনায়কত্বকে খোলাসা করা এবং জনগণের মাঝে এ সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি ও মোহ রয়েছে তা কাটানোর কাজ হলো মার্কসবাদী রাজনীতির প্রাথমিক কর্তব্য। এটা হলো বিপ্লব করার প্রথম ধাপ।

নেপাল-পার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’ ধারণা উত্থাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্র, বাহিনী, বিপ্লব, একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র সম্পর্কে উপরোক্ত মার্কসবাদী মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে ঝাপসা করে তার থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়েছে। এটা বুর্জোয়া সংসদীয়বাদকে সামনে নিয়ে এসেছেÑ যা নেপালসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের বদলে বুর্জোয়া সংসদীয়বাদী সংস্কারকে সামনে আনে। সাম্রাজ্যবাদী-পুজিবাদী দেশে কর্মসূচী হিসেবে আনবে সমাজ-গণতান্ত্রিক সংস্কার। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে এটি সর্বহারা একনায়কত্বকে দুর্বল করা ও পুজিবাদী সম্পর্কগুলো শক্তিশালী করণের পুজিবাদের পথগামী কর্মসূচী আনবে।

আর সকল ক্ষেত্রেই এটা সর্বহারার পার্টি-নেতৃত্বকে সুনিশ্চিত করার বদলে তাকে দুর্বল করা, বুর্জোয়া নির্বাচনকে পরম করে ফেলা, নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়া, বুর্জোয়ার সাথে তাকে তথাকথিত প্রতিযোগিতায় ফেলা- ইত্যাদি নীতি সামনে আনে। যা বুর্জোয়া নেতৃত্ব বাধাহীনভাবে চলে আসবার পথ প্রশস্থ করতে বাধ্য। এবং যা সর্বহারা বিপ্লবকে সুদূর পরাহত করতে বাধ্য।

* নেপাল পার্টি সরলভাবে উপরের রাজনীতিগুলো অনুসরণ করবে, করতে বদ্ধপরিকর- বিষয়টা এরকম নয়। তাদের তত্ত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ/প্রয়োগ ও পরিণতিগুলো হলো এগুলো। কিন্তু যখন বুর্জোয়া ব্যবস্থা নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়, অথবা বুর্জোয়া প্রতিবিপ্লব আঘাত করে, তখন সদ্য বিপ্লব সাগর থেকে উঠে আসা এক বিশাল পার্টি ও জনগণের সম্বিতে আঘাত লাগে। এটা তাত্ত্বিক বিতর্কের পর্যায়ে ঘটেছে। এখন তাদের তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের সময়ও ঘটছে। এ কারণে নেপাল পার্টিকে বিপুলভাবে সমন্বয়বাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে ও হচ্ছে। এর শেষ পরিণতি দেখতে আমাদের আরো সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, নেপাল-পার্টির ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কিত নয়া ধারণা বা তত্ত্বটিও, তাদের এ সংক্রান্ত লাইন ও নীতিগুলোও, দেখার বিষয়। এগুলো দেখার বিষয় নয়। এগুলো সুস্পষ্টভাবেই অমার্কসবাদী। তাই, এ মুহূর্তেই তা পরিতাজ্য। নেপাল পার্টি এই অমার্কসবাদী লাইন, যার নির্যাস হলো বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকতা- তাকে বর্জন না করে কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে পারবে না। এটা মালেমা’র বিকাশ নয়, মালেমা থেকে সরে পড়া।

ফ্রন্টগঠনের বিষয়টি মার্কসবাদে, বিশেষত মাওবাদে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফ্রন্টের কাজ ছাড়া বিপ্লবে ব্যাপক জনগণকে সমাবেশিত করা সম্ভব নয়, তাই, বিপ্লব করাও সম্ভব নয়। ফ্রন্ট রণনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে যেমন হয়, রণকৌশলগতভাবেও হতে পারে। কিন্তু ফ্রন্টের কাজ আদর্শগত/পার্টিগত কাজকে শক্তিশালীকরণেরই তাগাদা দেয়। যখন ফ্রন্ট ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়, তখন বেশী প্রয়োজন হয় পার্টি কাজ, মালেমা’র শিক্ষা, আদর্শগত কাজ, এবং সর্বহারা শ্রেণী লাইনের দৃঢ়তাকে এগিয়ে নেয়া। বুর্জোয়া স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের সময় যখন বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সাথে কৌশলগত সমঝোতা/ঐক্য হয়, তখন বেশী প্রয়োজন হয় সকল বুর্জোয়া ব্যবস্থার উন্মোচন, বিপ্লবের রণনৈতিক কর্মসূচীকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরার প্রশ্ন। নেপাল পার্টি রাজতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে বুর্জোয়া সংসদীয় দলগুলোর সাথে যে ঐক্য/সমঝোতা গড়ে তুলেছিল, তখন সে ‘কৌশল’ তাদের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনৈতিক কর্মসূচী, তথা তাদের নীতিকে খেয়ে ফেলতে থাকে। এটা বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে অতীতেও ঘটেছে- ২য় বিশ্বযুদ্ধকালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সাথে সাধারণ ঐক্য-লাইন বুর্জোয়া গণতন্ত্রবাদ ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে পুজিবাদের উচ্ছেদের বিপ্লবী কর্মসূচীকে খেয়ে ফেলেছিল এবং ইউরোপের একসারি দেশে কমিউনিস্ট আদর্শের কবর রচনা করেছিল। যা কিনা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াতেও গুরুতরভাবে বেড়ে উঠেছিল। স্ট্যালিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে রুশ পার্টি ও সমাজতন্ত্রের পুজিবাদে অধপতনের একটা বড় মৌলিক কারণ এখানে নিহিত ছিল।

এই খেয়ে ফেলাটা ‘কৌশলগত লাইন’-এর ভুল থেকে যতটা না আসে, তার চেয়ে বেশী আসে মৌলিক নীতি, বিপ্লব, তথা মালেমা’র মৌল আদর্শের প্রশ্নে দুর্বলতা ও তা থেকে বিচ্যুতি থেকে। নেপাল-পার্টির সমস্যাটিও কৌশলগত লাইনজাত নয়। হতে পারে তার শুরু হয়েছে এখান থেকে। কিন্তু তাদের মৌলিক সমস্যা ঘটেছে গণতন্ত্র ও একনায়কত্ব প্রশ্নে মৌল মার্কসবাদী নীতিমালা থেকে সরে পড়া থেকে। আর এই সরে পড়াকে তারা উত্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন মালেমা’র বিকাশ সাধনের শ্লোগান তুলে।

মালেমা’র বিকাশ অপরিহার্য। কারণ, মার্কসবাদ বিজ্ঞান। বিজ্ঞান সতত বিকাশশীল। বিকাশশীল না হয়ে সে বিজ্ঞান হিসেবে নিজ সত্ত্বা বজায় রাখতে সক্ষম নয়। মার্কসবাদও এর অন্যথা নয়। মার্কসবাদের বিকাশের প্রশ্নটি আজকের বিশ্বে আরো গুরুত্ব দিয়ে সামনে এসেছে, কারণ, প্রথমতঃ সমাজতন্ত্র বিগত শতকে বহু বিজয় সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। দ্বিতীয়তঃ বস্তুগত বাস্তবতা উপযোগী নীতি আবিস্কার ছাড়া বিপ্লব এগোতে পারবে না। বিগত কয়েক দশকে, বিশেষতঃ ‘বিশ্বায়ন’ পরবর্তী কালে বিশ্বের বস্তুগত বাস্তবতারও বিপুল পরিবর্তন হয়েছে। যাকে আমাদের তত্ত্ব ও লাইনে ধারণ করতে হবে। কিন্তু মালেমা’র এই বিকাশ মালেমা’র মৌল নীতিগুলোকে ভিত্তি করেই হতে হবে। মালেমা বলে পঠিত, গৃহীত সববাক্যই/সবকিছুই মালেমা নয়। তদুপরি গুণগত বিকাশ অতীত থেকে রাপচারও দাবী করে। কিন্তু সেটা তখনই মার্কসবাদী হবে, যদি তা মার্কসবাদী মৌল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। নইলে তা মার্কসবাদ থাকে না, মার্কসবাদ বিরোধী মতাদর্শ হয়ে পড়ে। নেপাল পার্টি এখানেই বিচ্যুত হয়েছে।

পাঠ্যঃ

         ১।   সিপিএন(মাওবাদী)’র তাত্ত্বিক মুখপত্র “ওয়ার্কার”-এর ৭নং সংখ্যায় এ বিষয়ে কমরেড বাবুরাম-এর নিবন্ধ এবং তার  উপর আরসিপি’র সমালোচনা (স্ট্রাগল/৯-এ প্রকাশিত);

২।   ওয়ার্কার/১০-এ প্রকাশিত কয়েকটি রচনা।

৩।  বব এ্যাভাকিয়ান- ডেমোক্র্যাসি এন্ড ডিকটেটরশীপ এবং এ বিষয়ক আরো রচনা।

৪।   গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা- মার্কস।

৫।   রাষ্ট্র, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, সর্বহারা বিপ্লব ও বিশ্বাসঘাতক কাউটস্কি- লেনিন।

৬।   জিপিসিআর-এর গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি। বিশেষতঃ বুর্জোয়ার উপর সর্বাত্মক একনায়কত্ব     পরিচালনা সম্পর্কে- চ্যাং চুন চিয়াও।

৭।  সমাজতন্ত্র ও সর্বহারা বিপ্লব অধ্যায়/মাও চিন্তাধারার সপক্ষে- আনোয়ার কবীর।

৮।  নেপাল পরিস্থিতি সম্পর্কে সিসি দলিল- এপ্রিল, ২০০৮ (নয়া বিতর্ক/২)।

২। এ্যাভাকিয়ানের “নয়া সংশ্লেষণ”

আরসিপি নেতা বব এ্যাভাকিয়ান মাও-মৃত্যুর পরবর্তীতে বিগত ৩০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিগত অভিজ্ঞতাগুলোর সারসংকলন কাজ করে চলেছেন। এ বিষয়ে ১৯৮১-সালে তার গুরুত্বপূর্ণ দলিল “কনকার দ্যা ওয়ার্ল্ড”(ঈড়হয়ঁবৎ ঃযব ড়িৎষফ) দিয়ে এর গুণগত সূচনা ঘটে বলা চলে। বিগত ৩০-বছর ধরে ধাপে ধাপে যে সারসংকলনগুলো তিনি করেছেন সেগুলো সংশ্লেষিত হতে থাকে বিগত কয়েক বছর ধরে। বিশেষতঃ পিসিপি’র প্রতিনিধিত্ব দাবীকারী এমপিপি’র লাইনকে ও সেইসাথে পিসিপি’র কিছু ঐতিহাসিক লাইনের ত্রুটি/দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ও পরে সিপিএন-এর ‘গণতন্ত্র’ লাইনকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগুলো সংশ্লেষিতভাবে আরো বিকশিত হয় ও নতুন স্তরে উন্নীত হয় বলে তারা মনে করেন। আরসিপি দাবী করছে যে, গত শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম যুগের অবসান ঘটেছে, মাও-মৃত্যুর পর তা সার্বিক বিপর্যয়ে প্রবেশ করেছে এবং আন্দোলন নতুন এক স্তরে প্রবেশ করেছে যখন বিগত স্তরের মৌলিক সারসংকলন করা, মতবাদকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত করা এবং তার ভিত্তিতে নতুন স্তরের আন্দোলন গড়ে তোলা ব্যতীত কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।

* কমরেড এ্যাভাকিয়ান বহুবিধ বিষয়ে সারসংকলন- তথা নতুনতর অবস্থান, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করলেও প্রধানতঃ দর্শন ও রাজনীতিগত কিছু বিষয়ে এই মৌলিক অগ্রগতির দাবী করছে আরসিপি। এর মৌলিক পয়েন্টগুলো শুধু উত্থাপন এখানে আমরা করতে পারি। কারণ, বিষয়গুলো এত বেশী মৌলিক, সেগুলোর উপর এ্যাভাকিয়ানের আলোচনা-পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন ও সংশ্লেষণ এত ব্যাপক যে, সেগুলোকে মোটামুটিভাবে আলোচনা করাটাও এখানে দুঃসাধ্য। বিশেষতঃ যা প্রায় অসম্ভব তা হলো, এ বিষয়গুলোতে এখনি সার্বিক কোন মূল্যায়ন টানা, যদিও বেশ কিছু বিষয়ে আমাদের নেতৃত্ব-স্তরে প্রাথমিক অবজার্ভেশন রয়েছে। কিন্তু এই অবজারভেশন পার্টিতে ও পার্টির বাইরে মাওবাদী মহলে, বিশেষতঃ আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো অনেক আলোচনার দাবী রাখে বলে আমাদের ধারণা। তাই, এখানে আমরা মূলতঃ এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণকে খুবই প্রাথমিকভাবে শুধু পরিচিত করণের প্রচেষ্টা নেবো- যাতে সচেতন ও আগ্রহী কমরেডগণ ও ব্যক্তিগণ ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় অধ্যয়নকে এগিয়ে নিতে পারেন। একইসাথে আমাদের প্রাথমিক বিবেচনার কিছু কিছু পয়েন্টও আমরা উত্থাপন করতে চেষ্টা করবো, যা পর্যালোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে, এবং কিছু মূল্যায়নধর্মী প্রবণতাকেও তা প্রকাশ করবে।

দর্শন

) অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ (ইনএভিটেবল-ইজম/ডিটারমিনিজম)

মার্কসবাদের উদ্ভবের সময় থেকেই ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়ম দ্বারা মানব সমাজের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয়। এ থেকে বলা হতো যে, আদিম সাম্যবাদী সমাজের নেতিকরণ হয় শ্রেণী বিভক্ত সমাজ দ্বারা, এবং শ্রেণী বিভক্ত সমাজ নেতিকরণ হবে পুনরায় উচ্চতর সাম্যবাদী সমাজ দ্বারা। যেহেতু ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়মটিকে বস্তুর বিকাশের একটি সাধারণ নিয়ম বলে ধরা হয়েছিল, তাই সমাজ-বিকাশের ইতিহাসেও এর ফলে উক্ত পরিণতিকে অনিবার্য বলে মনে করা হতো। কমিউনিজম-কে এভাবে অনিবার্য মনে করাটা হলো অনিবার্যতাবাদের একটা দৃষ্টান্ত। অর্থাৎ, কমিউনিজম যে আসবে- এটা পূর্ব নির্ধারিত। এর কোন অন্যথা হতে পারে না। এটা নিয়তিবাদকেও প্রকাশ করে। এটা ইতিহাসকে পূর্ব-নির্ধারিত বলে মনে করার দিকে যায়।

মার্কসবাদের অভ্যন্তরে এই ধরণের চেতনা এক ধরণের ধর্মবাদী চেতনাকে নিয়ে আসে, যদিও এ ত্রুটি ছিল মার্কসবাদের গৌণ দিক।

এমনকি মাও-পূর্ব যুগ পর্যন্ত কমিউনিজম-কে একটা দ্বন্দ্বহীন, স্বর্গীয় যুগ ও সমাজের মত তুলে ধরা হয়েছে।

– মাও ‘নেতিকরণের নেতিকরণ’ নিয়মকে সারসংকলন করেন। কমিউনিস্ট সমাজেও দ্বন্দ্ব চালিকাশক্তি হবে তা তুলে ধরেন, এভাবে তিনি পূর্ববর্তী সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসায় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু অনিবার্যতাবাদ বা নিয়তিবাদ থেকে তিনিও মুক্ত হননি।

) যান্ত্রিক বস্তুবাদের প্রভাব/চেতনার ভূমিকার অবমূল্যায়ন

অর্থনৈতিক ভিত্তি ও তার উপর স্থাপিত উপরিকাঠামো, বিশেষতঃ চেতনার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরণের স্থূল ও যান্ত্রিক বস্তুবাদী প্রবণতা মার্কসবাদে ক্রিয়াশীল ছিল। এক্ষেত্রে চেতনার গুরুত্বকে, তার স্বতন্ত্র পরিমন্ডল ও নিয়মকে এবং বস্তুগত বাস্তবতাকে রূপান্তরিত করার শক্তিকে অবহেলা করা হয়েছে।

এটা এক ধরণের অবনমিতকরণবাদ/রিডাকশানিজম- যা কিনা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে একতরফা ও সরলরৈখিকভাবে গুরুত্ব দেয় এবং সবকিছুকে তাতেই নামিয়ে(রিডিউস) আনে।

মাও এ প্রশ্নেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। চেতনার গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে নিয়ে আসেন। কিন্তু উপরোক্ত অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ এবং অবনমিতকরণবাদ থেকে যাওয়ায় তা চেতনার এই গুরুত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে পারেনি।

) প্রয়োগবাদ

 কতকগুলো প্রবণতা আকারে এই সমস্যা মার্কসবাদী আন্দোলনে বিরাজ করছে।

যেমন-

ইনস্ট্রুমেন্টালিজম- প্রকৃত বস্তুগত সত্যকে না দেখে, বরং আশু ফলাফল দ্বারা তত্ত্বের সত্যতা নির্ধারণ করা।

অভিজ্ঞতাবাদ (এমপিরিসিজম)- শুধু আশু ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই সত্যকে জানা যায়- এই চেতনা।

এ্যাপ্রিওরিজম- বস্তুর থেকে চেতনাকে না এনে বস্তুর উপর চেতনা আরোপ করা।

পজিটিভিজম- বিজ্ঞানকে অনুশীলন/অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমিত করা। তত্ত্ব  যে এগিয়ে থাকে তাকে অস্বীকার করা।

* এসবই প্রয়োগবাদী সমস্যা আকারে বিরাজ করে যা তত্ত্ব ও অনুশীলনের সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্নমুখী ত্র“টিপূর্ণ প্রবণতা।

) জ্ঞানতত্ত্ব

সত্য বস্তুগত। বস্তু যেভাবে আছে সেটাই সত্য। এটা দর্শকের শ্রেণী অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়।

কিন্তু মার্কসবাদী আন্দোলনে ‘শ্রেণী সত্য’(ক্লাস ট্রুথ) বা ‘রাজনৈতিক সত্য’(পলিটিক্যাল ট্রুথ) বলে যে ধারা চালু ছিল সেটা বস্তুগত সত্যকে আবিস্কার ও ধারণ করায় অন্য শ্রেণীর কোন ব্যক্তি/গোষ্ঠীর সামর্থ্যরে সম্ভাব্যতাকে বাতিল করেছে।

এভাবে অনেক সময় আশু ফলাফল দ্বারা ও শ্রেণীর নামে বস্তুগত সত্য চাপা পড়েছে।

এ্যাভাকিয়ান শ্লোগান তুলেছেন, সর্বহারা শ্রেণী বলেই আমরা সত্যকে ধারণ করি এটা সঠিক সূত্রায়ন নয়। এটা ‘শ্রেণী সত্য’-কে নিয়ে আসে। বরং সত্য বস্তুগতভাবে শ্রেণী-উর্ধভাবে বিরাজমান; আর সর্বহারা শ্রেণী তার ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে সেই সত্যকে সবচেয়ে বেশী ও সঠিকভাবে ধারণ করে বলেই আমরা সর্বহারা শ্রেণী লাইন অনুসরণ করি।

* উপরে উত্থাপিত দার্শনিক প্রশ্নাবলী এত সংক্ষিপ্ত, সরল, বিমূর্ত ও সহজ নয়। বরং খুবই জটিল, ব্যাপক, গভীর এবং সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিবিধ বাস্তব রাজনৈতিক ও অন্যান্য অভিজ্ঞতায় কিভাবে এই দার্শনিক অবস্থানগুলো নেতিবাচক বা ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে ও রাখছে, এবং আগামী আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে কীভাবে এগুলো প্রভাব রাখবে তার বিস্তারিত বহুব্যাপ্ত আলোচনা এ্যাভাকিয়ান তার অসংখ্য রচনা ও আলোচনায় করেছেন।

তবে সংক্ষিপ্তভাবে উপরোক্ত পয়েন্টগুলো হলো মৌলিক প্রশ্ন ও উপাদান যাকে ধরে আমরা আমাদের উপলব্ধি, আলোচনা ও বিতর্ককে এগিয়ে নিতে পারি।

পাঠ্য:

১।   অন এপিসটোমলজী- এ্যাভাকিয়ান।

২।   হোয়াট ইজ নিউ সিনথেসিস- ঐ।

৩।  অনুশীলন সম্পর্কে- মাও।

৪।   সঠিক চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে- মাও।

৫।   টকস্ অন ফিলোসফি- মাও।

৬।   দর্শন অধ্যায়/মাওচিন্তাধারার সপক্ষে- আনোয়ার কবীর।

রাজনীতিক প্রশ্নাবলী

এ্যাভাকিয়ানের “নয়া সংশ্লেষণ”-এ রাজনৈতিক প্রশ্নে দুটো প্রধান বিষয় রয়েছে- ১) আন্তর্জাতিকতাবাদ; ও ২) সমাজতান্ত্রিক সমাজে একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র প্রশ্ন। এ দুটো বিষয়কে সংক্ষেপে নীচে উত্থাপন করা হচ্ছে।

। আন্তর্জাতিকতাবাদ

লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্বটিকে বিকশিত করে তার অধিকতর ব্যাখ্যা দিয়েছে আরসিপি, এবং বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতিকে আলোচনা করেছে। এ থেকে তারা দেখাচ্ছে যে, শ্রমিক শ্রেণীর যে আন্তর্জাতিকতাবাদ তার ভিত্তি এখন আরো অনেক বিকশিত ও প্রসারিত।

আইসিএম-এ, বিশেষতঃ স্ট্যালিন-আমল থেকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-চক্রান্তের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্নকে ঘিরে এক ধরণের জাতীয়তাবাদী প্রবণতা বিকশিত হয়ে ওঠে বলে এ্যাভাকিয়ান বহু পূর্বেই সারসংকলন করেছিলেন। যাকে আরো বিকশিত করে তিনি দেখাতে চাইছেন যে, আইসিএম-এ সাধারণ প্রবণতা হয়ে দেখা গেছে নিজ দেশের বিপ্লবকে প্রাধান্য দানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থকে দুর্বল করে ফেলা। যা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিকশিত করে তোলে।

নয়া সংশ্লেষণ হলো এই যে, আমরা কাজ করছি বিশ্ব রণক্ষেত্রে, আমাদেরকে কাজ করতে হবে বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থ থেকে, তাকে প্রাধান্য দিয়ে। জাতীয় বিপ্লবের স্বার্থের সাথে এটা অনেক সময় দ্বন্দ্বমূলক হয়। সেক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্বের মীমাংসা অবশ্যই জটিল, কিন্তু বিশ্ববিপ্লবের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে জাতীয় বিপ্লবের স্বার্থ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা মেনে নিতে হবে, যাকিনা আইসিএম-এ ঘটেছে উল্টোভাবে।

তেমনি, আজকের যুগে এক দেশে বিপ্লব ঘটলেও তার পরিস্থিতি যতনা দেশীয়, তার চেয়ে বেশী করে বিশ্ব পরিস্থিতির থেকে জাত। একেও অনেক সময়ই বিপরীতভাবে দেখা হয়েছে।

সুতরাং, আরসিপি দাবী করছে যে, এ্যাভাকিয়ানের এই সংশ্লেষণ মার্কসবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদকে নতুন স্তরে উন্নীত করেছে এবং আইসিএম-এর এ যাবতকালের নেতিবাচক জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি ও প্রবণতার সারসংকলন করেছে।

পাঠ্যঃ

১।   অন ইন্টারন্যাশনালিজম- এ্যাভাকিয়ান।

২।   কনকার দ্যা ওয়ার্ল্ড- ঐ।

৩।   রিম-ঘোষণা থেকে ফ্যাসিবিরোধী লাইনের সারসংকলন অধ্যায়।

। সমাজতন্ত্র

এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণ অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছে সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার উপর। তা স্ট্যালিন-সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার সারসংকলনভিত্তিক মাও-এর জিপিসিআর-কে তুলে ধরেছে; কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমগ্র অভিজ্ঞতার কিছু সাধারণ দুর্বলতা ও ত্র“টিকে তুলে ধরার কথা বলছে যা কিনা মাও-কে ছাড়িয়ে গেছে এবং সমাজতন্ত্রের নতুন মডেল স্থাপন করার দাবী তুলেছে।

সমাজতন্ত্রে একনায়কত্ব ও গণতন্ত্র প্রশ্নটিতে এ্যাভাকিয়ানের নয়া সংশ্লেষণের প্রধান বিষয়কে তিনটি পয়েন্টে তুলে ধরা যায়। তাহলো-

– মতপার্থক্যের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি;

– বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকার প্রসার; এবং

– শিল্প, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সৃজনশীলতার বিকাশ।

‘সংশ্লেষণ’ দাবী করে যে, এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অগ্রগতি জিপিসিআর-এ হলেও তাতে দুর্বলতা ছিল।

প্রথমতঃ সরকারী/রাষ্ট্রীয় মতবাদ থাকার প্রশ্ন।

সংশ্লেষণ বলছে পার্টির নেতৃত্ব, পার্টির নেতৃত্বকারী মতাদর্শ আমরা স্পষ্ট করে তুলে ধরবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেকেই তার সাথে একমত হবেন না। তাদের নিজ মত/মতাদর্শ পোষণ করা, বলা, বিতর্ক করার সুযোগ দিতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ এইসব ভিন্ন মতাদর্শ-ভিত্তিক রাজনৈতিক গ্র“প, সংগঠন করার সুযোগ থাকতে হবে।

এগুলো বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিউদ্যোগকে বিকশিত করবে, ব্যক্তি-অধিকারকেও।

একে এ্যাভাকিয়ান প্রকাশ করেছেন ‘সলিড কোর, উইথ এ লট অব ইলাসটিসিটি’(ঝড়ষরফ পড়ৎব, রিঃয ধ ষড়ঃ ড়ভ বষধংঃরপরঃু)- এই সূত্র দ্বারা।

* এছাড়াও রাষ্ট্রের মৌলিক ইস্যুগুলো ব্যাপক বিতর্কিত হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাচনের ভূমিকা, সরকার বহির্ভূত বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন হিসেবে সুশীল সমাজের বিকাশ, শারীরিক শ্রম ও মানসিক শ্রমের দ্বন্দ্ব মোকাবিলার জন্য নতুন উপায়, যাতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও ভিন্নমতের সুযোগ বিদ্যমান থাকবে- ইত্যাকার বহুবিধ সংস্কারকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র/সমাজে আনয়নের গুরুত্বকে সংশ্লেষণ পেশ করেছে।

** দর্শন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে উপরোক্ত মৌলিক বিকাশ বিপ্লব সংঘটনের রণনীতিগত ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখে সেক্ষেত্রেও ‘সংশ্লেষণ’ কিছু সাধারণ বিষয়কে তুলে ধরেছে যা এসেছে বিশেষভাবে আমেরিকার মত একটি সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির দেশে বিপ্লবের আলোচনায়।

সেক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোতে নয়া সংশ্লেষণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বা তার বিকাশকে গুরুত্ব দিচ্ছে সেগুলো হলো-

) সংকট ও বিপ্লবী পরিস্থিতি

এ যাবতকাল যান্ত্রিক ও সরলরৈখিকভাবে সাম্রাজ্যবাদের ‘সাধারণ সংকট’ বলে যে ধারণা প্রচলিত ছিল তার সাথে ‘সংশ্লেষণ’ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।

সংশ্লেষণ বলছে যে, সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নিজ চরিত্র ও কর্ম-ধারার কারণে সংকটে পড়ে, কিন্তু তা আবার কাটিয়ে নতুন স্পাইরাল-এ(ঘূর্ণন/আবর্ত) প্রবেশ করে। বিপ্লবী পরিস্থিতির জন্য এর সাথে প্রয়োজন একটি বড় বিপ্লবী জনগণের আবির্ভাব। এই দুয়ের সমন্বয়েই বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

) অপেক্ষা করা, পাশাপাশি তরান্বিত করা

বস্তুগত ও আত্মগত’র দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে ‘সংশ্লেষণ’ গুরুত্ব দিচ্ছে।

পুরনো ধারা হলো যান্ত্রিকভাবে বস্তুগত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করা। এর প্রতি নিস্ক্রিয় থাকা। যা ঐসব দেশে সংস্কারবাদী ধারাকে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে যদিও ইচ্ছার ভিত্তিতে বিপ্লব হয় না, কিন্তু আমেরিকার মত দেশে ডিটারমিনিস্ট ধারণা আত্মগত ভূমিকার গুরুত্বকে নতুন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়। স্বাধীনতা শুধু প্রয়োজনের স্বীকৃতি নয়, তার রূপান্তরও বটে- একে ‘সংশ্লেষণ’ বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

) “কী করিতে হইবে” মতবাদ

এই মতবাদ লেনিন এনেছিলেন, অর্থনীতিবাদকে সংগ্রাম করা, বাইরে থেকে বিপ্লবী রাজনীতি আরোপ করার প্রশ্নকে তুলে ধরে। ‘সংশ্লেষণ’ তাকে উদ্ধার, রক্ষা ও বিকাশের দাবী করে। আরো গুরুত্বের সাথে ও ব্যাপকতার সাথে অর্থনীতিবাদ- যা আশু সমস্যায় কেন্দ্রীভূত থাকে, এবং রণনীতিগত ও আদর্শগত কাজকে কার্যতঃ ভুলিয়ে দেয়, তাকে সংগ্রাম করার প্রয়োজনকে এটা তুলে ধরে। শুধু বিপ্লবী রাজনীতিই নয়, শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে সমাজের সমগ্র ক্ষেত্রে জড়িত করা, বিপ্লবকে সমগ্রভাবে জানা ও সর্বক্ষেত্রে সমাজের রূপান্তরের জন্য কমিউনিজমকে বলিষ্ঠভাবে আরোপ করার বিষয়টিকে নিয়ে আসে।

) ফ্রন্ট

ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্যের মাধ্যমে শুধু বিপ্লবের জন্যই নয়, কমিউনিজম পর্যন্ত যাবার জন্য ফ্রন্টের গুরুত্বকে তুলে ধরা।

) বিপ্লবের সম্ভাবনা

আমেরিকার মত দেশে বিপ্লব সম্ভব- একে বস্তুগত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে তুলে ধরা।

পাঠ্যঃ

।   নিউ সিনথেসিস- এ্যাভাকিয়ান।

।   এমানসিপেটিং হিউম্যানিটি- ঐ।

।   কমিউনিজম, নতুন মেনিফেস্টো- আরসিপি।

আমাদের অভিমত

প্রথমতঃ এ্যাভাকিয়ান মালেমা ও কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিগত ইতিহাসকে প্রধানতঃ ইতিবাচক বলে তুলে ধরেছেন এবং পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বিপক্ষে দাড়িয়ে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, সমাজতন্ত্র, সর্বহারা একনায়কত্ব, বিশেষতঃ জিপিসিআর-কে তুলে ধরেছেন যা ইতিবাচক। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার যেকোন সারসংকলনে, বিশেষতঃ রাপচারের সময়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিশাস্ত্রের(গবঃযড়ফড়ষড়মু) অনুসরণ এক অপরিহার্য বিষয়। এটা আমাদের নিজেদের শিবির থেকে বিচ্যুত হবার ঝুঁকি দূর করে।

দ্বিতীয়তঃ বিগত শতকে সমাজতন্ত্রের পরাজয় শুধুমাত্রই অনিবার্য ছিল তা নয়। বরং সর্বোচ্চ যে অভিজ্ঞতা জিপিসিআর- তারও দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল কিনা সেই বিবেচনা ও মূল্যায়ন প্রচেষ্টা পরিত্যাজ্য নয়। বিশেষতঃ সমাজতন্ত্রগুলো অধপতিত হবার মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুতর দুর্বল হয়ে পড়ার বর্তমান অবস্থায়, যা সুদীর্ঘ ৩০বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। যদিও এই মূল্যায়নে ত্রুটি থাকতে পারে, অনেক মূল্যায়ন সঠিক না-ও হতে পারে, কিন্তু সেটা পৃথক আলোচনা। সামগ্রিক এক সারসংকলন, ও প্রয়োজনে রাপচার অপরিহার্য।

সুতরাং এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণকে আমাদের দেখতে হবে প্রথমতঃ মালেমা-বাদীদের নিজেদের মধ্যকার পর্যালোচনা-গবেষণা ও বিতর্ক হিসেবে। দ্বিতীয়ত সেই বিতর্কের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে আমাদের পরিস্কার হতে হবে যে, এতে কতটুকু গ্রহণীয়, আর কোনটা গ্রহণীয় নয়। অথবা এটি সামগ্রিকভাবে সর্বহারা শ্রেণী লাইন ও কমিউনিজমের মিশন থেকে কার্যতঃ কোনভাবে সরে যায় কিনা।

– এই পর্যালোচনার জন্য মৌলিক মার্কসবাদী সাহিত্য অধ্যয়নের পাশাপাশি এ্যাভাকিয়ান/আরসিপি’র বেশ কিছু দলিলকে অধ্যয়ন না করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। সেজন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় প্রবেশ করতে হবে। কারণ, এর উপর আইসিএম-এর আশু ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। সেক্ষেত্রে আমাদের পার্টিকে যথাসাধ্য ভূমিকা রাখায় উদ্যোগী হতে হবে।

* তবে এ্যাভাকিয়ানকে আমরা এ পর্যন্ত যতটুকু অধ্যয়ন ও আলোচনা করতে পেরেছি তার ভিত্তিতে আমাদের কিছু প্রাথমিক ধারণা ও প্রবণতাকে এখানে উল্লেখ করা যায়, যাকিনা এই পর্যালোচনা ও বিতর্ককে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। আমাদের এই প্রাথমিক অভিমতগুলো চূড়ান্ত কোন মতাবস্থান নয়। সুতরাং এগুলোর উপর আরো বিস্তর পর্যালোচনা ও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। বিশেষতঃ

আন্তর্জাতিক পরিসরে ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিগুলোর সাথে মত বিনিময়ের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে, যার মাঝে আরসিপি’র সাথে আলোচনার প্রয়োজন প্রধান। এমনকি আমরা মনেকরি, যদিও এমপিপি বা সিপিএন-এর বর্তমান মৌলিক মতাবস্থান মালেমা থেকে সরে গেছে বলে মনেকরি, তাসত্ত্বেও এ প্রশ্নে তাদের মতামতকে আলোচনায় আনারও গুরুত্ব রয়েছে। গুরুত্ব রয়েছে আরসিপি থেকে বিভক্ত মাইক এলি(৯চিঠি-গ্রুপ)-গ্রুপের মতামতকে অধ্যয়ন করারও। আমরা সে জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো। আমরা মনেকরি, যেহেতু বিষয়গুলো অতি ব্যাপক, অনুবাদের অভাবে এদেশে ও আমাদের পার্টি-অভ্যন্তরে এগুলোর উপর পর্যাপ্ত পর্যালোচনার সুযোগ অনেক কম, তাই, এ বিষয়গুলোতে চটজলদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে দীর্ঘস্থায়ী পর্যালোচনায় আমাদের প্রবেশ করা উচিত।

এই মতামত গঠনের ক্ষেত্রে প্রথমত রাজনীতিক প্রশ্নে আলোচনা কেন্দ্রীভূত করাটা সঠিক হবে বলে আমাদের ধারণা। রাজনীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা চাবিকাঠি, যদিও এখানে মতবাদিক লাইনের পৃথক গুরুত্ব চলে এসেছে। কিন্তু সেটা দীর্ঘস্থায়ী পর্যালোচনাধীন রাখাটাই ভাল হবে।

* রাজনীতিক প্রশ্নের প্রধান দুটো বিষয় হলো আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সমাজতন্ত্র।

। আন্তর্জাতিকতাবাদঃ

মাও-পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে কমরেড এ্যাভাকিয়ানের যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোকে আমরা বিশেষ মূল্য দেই তার মাঝে অন্যতম হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালে ফ্যাসিবিরোধী যুক্ত ফ্রন্টের সাধারণ লাইন ও ৩য় আন্তর্জাতিক বিলুপ্তিকরণের সারসংকলন। এটা আন্তর্জাতিকতাবাদের সাথে সম্পর্কিত বিষয়, এবং সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

তবে এই সারসংকলনের সাথে মৌলিক ঐকমত সত্ত্বেও আমাদের কিছু পৃথক মত ছিল ও রয়েছে। তাহলো- বিশ্বের তিন বিভাজন সম্পর্কে এ্যাভাকিয়ান সারসংকলনে নেতিবাচক অবস্থান ছিল। আমরা তাকে সঠিক মনে করি না। আমরা তিন বিশ্ব তত্ত্বকে বিরোধিতা করেছি, একইসাথে কৌশলগতভাবে বিশ্বের তিন বিভাজনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এটা বর্তমান বিশ্বেও প্রযোজ্য, যদিও তৎকালীন প্রথম বিশ্বের

অন্তর্ভূক্ত একটি পরাশক্তি সোভিয়েতের পতন হয়েছে, কিন্তু প্রথম বিশ্বের একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন এখনও বজায় রয়েছে। অবশ্য এ্যাভাকিয়ান ও আরসিপি’র বিভিন্ন দলিলে পরবর্তীকালে “তৃতীয় বিশ্ব” শব্দগুচ্ছের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সেটা নিছক পরিচিত/প্রতিষ্ঠিত শব্দের ব্যবহারের অতিরিক্ত কিছু ছিল বলে মনে হয় না।

* আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রশ্নে সারসংকলনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যে উল্লম্ফনটির কথা এ্যাভাকিয়ান সংশ্লেষণে এসেছে তা হলো, বিশ্ব রণভূমি-কে, বিশ্ব পরিস্থিতিকে ও বিশ্ব-বিপ্লবের স্বার্থকে প্রাধান্য দান। এর অধীনে দেশীয় বিপ্লবকে রাখতে না পারা, এবং দেশীয় পরিস্থিতিকে দেখতে না পারা। যা জাতীয়তাবাদী প্রবণতা ও বিচ্যুতিকে বিকশিত করেছে।

এই বক্তব্যকে তাত্ত্বিকভাবে ও কয়েকটি মূর্ত বিষয়ের সারসংকলনের জায়গায় সাধারণভাবে সঠিক বলেই গ্রহণ করা যায়। ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্টের সাধারণ লাইন আসার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল।

– তবে বিশ্ব পরিস্থিতি ও জাতীয় পরিস্থিতি, এবং বিশ্ববিপ্লব ও দেশীয় বিপ্লব- এই দুয়ের সমন্বয়ের প্রশ্নটি আরো জটিল, এবং এক্ষেত্রে আরসিপি’র অবস্থানে একতরফা ঝোঁক রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্ব পরিস্থিতির আলোচনায় অবধারিতভাবে সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ সংকটের কথা চলে আসে। এই সাধারণ সংকট অর্থ কী- তার ভাল আলোচনা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদী দেশে সংকট হয়, আবার তা মীমাংসিত হয়ে নতুন ঘুর্ণন/চক্রাবর্ত শুরু হয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থা। তৃতীয় বিশ্বের দেশে এই সংকট কীভাবে চালান হয়, এবং তা কিভাবে প্রশমিত হয় বা হয় না।

আমাদের দেশে আমরা দেখি যে, সাধারণভাবে বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করে। শাসকশ্রেণী ও রাষ্ট্র সাধারণভাবে সংকটে থাকে। এখানেও এই অবস্থা চক্রাবর্তাকারে এগোয়। কিন্তু তাকে সাধারণ সংকটের মাঝেই আংশিক উদ্ধার/রিলিফ বলে মনে করা যায়।

আমাদের মত দেশের পরিস্থিতিও প্রধানত বিশ্ব পরিস্থিতিরই অংশ, তার বিশেষত্বগুলো বিশ্ব পরিস্থিতির বাইরে নয়। কিন্তু সে কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো, এইসব দেশের বিপ্লবী পরিস্থিতিগুলো আসে কোত্থেকে? ’৮০-দশকে বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলনের ভাটার সময়ে পেরুর গণযুদ্ধ শুরু হয়, এবং সফলভাবে এগিয়ে যায়। ’৯০-দশকে সামগ্রিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে ‘বিশ্বায়ন’ কালে নেপাল গণযুদ্ধ শুরু হয়, এবং সফলভাবে এগিয়ে যায়। সুতরাং, শুধুমাত্র ৬০/৭০-দশকের বিশ্ব বিপ্লবী পরিস্থিতির এক পরিপক্ককালে বিপ্লবী সংগ্রাম বিকশিত হয়েছে বা হতে পারে, বিষয়টা সেরকম নয়। পেরু, নেপাল- এ জাতীয় বিপ্লবের সফলতা বিশ্ব পরিস্থিতিকেও বিরাটভাবে এগিয়ে দেয় সেরকম সামগ্রিক উত্থানমূলক অবস্থার দিকে। আরসিপি’র বক্তব্যে বিশ্ব পরিস্থিতির আলোচনায় অন্তত ৩য় বিশ্বের দেশে সার্বক্ষণিক সাধারণ বিপ্লবী পরিস্থিতি ও সে প্রেক্ষিতে অবিলম্বে গণযুদ্ধ সূচনা ও এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নটি নেতিকরণ হয় কিনা সেটা আমাদের একটি প্রশ্ন। যদিও এ্যাভাকিয়ান তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে সরাসরি এই আলোচনাটি করেননি, কিন্তু আমেরিকায় “অপেক্ষা কর ও ত্বরান্বিত কর”- এই সঠিক সূত্রটি আলোচনার সময় এবং বিশ্ব পরিস্থিতির অধীনে দেশীয় পরিস্থিতিকে বিচার করবার আলোচনাটিকে তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করলে এরকম একটি উপসংহার অনিবার্যভাবে চলে আসতে পারে বলে মনে হয়।

– একই রকম সমস্যা ধারণা করা যায় দেশীয় বিপ্লব ও বিশ্ব বিপ্লবের সমন্বয়ের প্রশ্নে। বিশ্ববিপ্লবের স্বার্থের প্রেক্ষাপটে দেশীয় বিপ্লবকে না দেখলে সেটা জাতীয়তাবাদকে বিকশিত করবে। ৩য় আন্তর্জাতিক বিলুপ্তি ঘটানোর পিছনে এ জাতীয় বিচ্যুতি কাজ করেছে। ফ্যাসিবিরোধী ফ্রন্টের সাধারণ লাইনের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা ছিল। এই অবস্থানগুলোর সাথে একমত হওয়া যায়।

সামগ্রিক স্বার্থ ও আংশিক স্বার্থের মধ্যে সহজভাবেই বোধগম্য যে, সামগ্রিক স্বার্থ প্রধান। বিশ্ব বিপ্লব প্রধান। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রধান। কিন্তু দেশীয় বিপ্লবের সমন্বয়ের প্রশ্নটি এরকম বিমূর্ত ও সহজ নয়, বরং অনেক জটিল।

বিপ্লবটা দেশে দেশেই ঘটে। এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো বিশ্ববিপ্লবের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। ঘাটি রক্ষার প্রশ্নটি যেমন একটি মৌলিক প্রশ্ন, তেমনি দেশীয় বিপ্লব না করে বিশ্ববিপ্লবের কাজ করার কথাও অর্থহীন।

বিশ্ববিপ্লবী প্রক্রিয়া ও দেশীয় বিপ্লবী প্রক্রিয়ার মাঝে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সাধারণভাবে বিশ্ব বিপ্লবী প্রক্রিয়ার বিকাশই দেশীয় বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবার গ্যারান্টি। কিন্তু কখনো কখনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখাটাই বিশ্ববিপ্লবী প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবার জন্য প্রধান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কিনা। এর খুব নির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন। এতে ভুল হতে পারে, ভুল হলে আমরা নিশ্চয়ই তার সারসংকলন করবো, কিন্তু উপরোক্ত দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে অস্বীকার করা যাবে না।

এটা আরো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, বিশ্ব বিপ্লবটা হয়ে থাকে দেশে দেশে। অর্থাৎ, বিশ্ব বিপ্লবের মূর্ত রূপ হলো দেশীয় বিপ্লব, তার যথার্থ আন্তর্জাতিকতাবাদী আদর্শের ভিত্তিতে যদি তা স্থাপিত থাকে। সুতরাং, মূর্তভাবে নির্দিষ্ট কোন দেশীয় বিপ্লবই হলো সংশ্লিষ্ট পার্টির প্রধান কাজ। যদিও আবার সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিপ্লবের কাজে সে পার্টি কীভাবে ভূমিকা রাখছে, কীভাবে তাকে দেখছে, সেটা তার দেশীয় বিপ্লব প্রকৃতই আন্তর্জাতিকতাবাদকে শক্তিশালী করছে কিনা তাকে নির্ধারণ করে।

সুতরাং আমরা মনে করি, এ্যাভাকিয়ানের সারসংকলনের মৌলিক অবদান সত্ত্বেও সাধারণ তত্বের রাপচারের ক্ষেত্রে সেটা বাস্তব দেশীয় বিপ্লবকে দুর্বল করে দেবার দিকে চালিত করে কিনা, অথবা, দেশীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতিÑ এই দুয়ের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে একপেশেভাবে দেখে কিনা সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

। সমাজতন্ত্রঃ-

বিগত শতকের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সর্বহারা একনায়কত্বের অভিজ্ঞতার সারসংকলনে সেই সমাজে মতপার্থক্য, বুদ্ধিজীবী ভূমিকা, দলগঠন- প্রভৃতি বিষয়ে যে প্রস্তাবনাগুলো পেশ করা হয়েছে তার মূল সুরের সাথে একমত হওয়া যায়।

পার্টি যেমন দুই লাইনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, তেমনি সমাজতান্ত্রিক সমাজও বিভিন্ন মতের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। খুব সারমর্মে এটা বুর্জোয়া লাইনের সাথে সর্বহারা লাইনের দ্বন্দ্ব, যা মাও আবিস্কার করেছেন, এবং অনুশীলনও করেছেন। কিন্তু মতপার্থক্যের বৈচিত্র আরো বেশী। সর্বহারা একনায়কত্বের আওতায় একটা অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের স্বীকৃতি দেবার প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে এ্যাভাকিয়ানের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।

– তবে এক্ষেত্রে আরসিপি/এ্যাভাকিয়ানের কিছু মনোভঙ্গি আলোচনার দাবী রাখে বলে আমরা মনেকরি।

তারা প্রায়ই বলে থাকেন, আমরা বিগত শতকের সমাজতন্ত্রে আর যেতে চাইনা।

এটা কেউ চাইলেও পারবে না, কারণ, প্রতিটি নতুন যুগের বিপ্লব নতুনতর, উচ্চতর মান ও মাত্রা নিয়ে আসে। নতুবা সেটা এগোতে পারে না। কিন্তু এ্যাভাকিয়ানের আলোচনায় এ বিষয়টা যথেষ্ট নেতিবাচকভাবে উত্থাপিত হয়। যেন, সেই সমাজতন্ত্রও একটা প্রায় পরিত্যাজ্য বিষয়।

অনুরূপভাবে তারা আরেকটা শ্লোগান দিয়ে থাকেন যার সারমর্ম হলো, সমাজতন্ত্র অধিকতর ভাল সমাজ, পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে। ভাষাগতভাবে কথাটা সঠিক, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটা খুবই আত্মরক্ষাত্মক অবস্থান। মার্কিনের মত এক কট্টর সমাজতন্ত্রবিরোধী সমাজের বাস্তবতা তাদেরকে এরকম শ্লোগানে চালিত করেছে কিনা বলা মুশকিল, কিন্তু এই ধরণের আত্মরক্ষাত্মক শ্লোগান পুজিবাদের ও সমাজতন্ত্রের শ্রেণী চরিত্রকে সামনে না এনে বরং একটা তুলনায় নিয়ে যায়, যা শ্রেণী-লাইনকে দুর্বল করার একটা প্রকাশ হতে পারে।

এ জায়গাগুলো থেকে যদি আমরা পেছন ফিরে এ্যাভাকিয়ান উত্থাপিত সমাজতন্ত্রে মতপার্থক্য, বুদ্ধিজীবী, সৃজনশীলতা, ব্যক্তিঅধিকার- এই বিষয়গুলোকে পুনরালোচনা করি তাহলে এই প্রশ্নটি উঠতে পারে যে, কেন তারা এই সারসংকলনকে রাপচার হিসেবে আনতে চাচ্ছেন। এটা কতটা গুণগত নতুনত্ব নিয়ে আসে।

। দর্শনঃ-

* দর্শনের ক্ষেত্রে এ্যাভাকিয়ানের সমস্ত আলোচনায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিরাজিত প্রয়োগবাদ, অনুশীলনবাদ, তত্ত্বের গুরুত্বহীনতা, যান্ত্রিক বস্তুবাদ, রাজনৈতিক সত্যÑ ইত্যাদির ব্যাপক প্রভাব, এবং রাজনীতিক কার্যকলাপে তার প্রয়োগের যে সারসংকলন এসেেেছ তার সাথে একমত হওয়া যায়। বাস্তবেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে এইসব গুরুতর সমস্যার প্রকাশ আমরা দেখি, বিশেষত, আমাদের যে যুগ, মাও-পরবর্তী যুগ, সে সময়ে পেরু পার্টির বিপর্যয়, নেপাল-পার্টির ডান লাইনে ঘুরে যাওয়াÑ এই সব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সারসংকলনে এসব সমস্যা বেরিয়ে আসবে।

তবে এ্যাভাকিয়ানের সংশ্লেষণের যে প্রধানতম সুর, তার মাঝে ‘শ্রেণী’ ও ‘অনুশীলন’- এই মৌলিক দুটো প্রশ্নে মালেমা থেকে সরে যাবার প্রবণতা রয়েছে কিনা তা আরো পর্যালোচনার দাবী রাখে।

– মাও বলেছিলেন, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দুটো প্রকৃতিÑ এক, শ্রেণী প্রকৃতি ও দুই, বৈজ্ঞানিক প্রকৃতি, যার মাঝে শ্রেণী প্রকৃতি হলো প্রধান। সরাসরি এই বক্তব্যকে এ্যাভাকিয়ান আলোচনা করেননি, তবে তার বক্তব্যে এর থেকে সরে যাবার ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি মূলতঃ বৈজ্ঞানিক প্রকৃতিকে প্রধান গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রথমত এই অবস্থান সঠিক কিনা। যদি সঠিক হয় তাহলে এটা মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বের নতুন ধারাই বটে।

– এ্যাভাকিয়ান জোর দিয়েছেন বস্তুগত বাস্তবতা হলো সত্য, যার নিজের কোন শ্রেণী চরিত্র নেই। বিভিন্ন শ্রেণী নিজেদের শ্রেণী অবস্থান থেকে তাকে ব্যাখ্যা করে। সর্বহারা শ্রেণী অবস্থান বলেই সেটা সত্য- বিষয়টা তা নয়, বরং সর্বহারা শ্রেণী তার ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে সত্যকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ও ভালভাবে ধারণ করতে সক্ষম। তাই, কমিউনিস্ট আন্দোলনে “রাজনৈতিক সত্য” বা “শ্রেণী সত্য” বলে যে কথা আলোচিত ও গৃহীত, তা সঠিক নয়- ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথমতঃ সত্য-যে বস্তুগত বাস্তবতা- সেটা পুরোপুরি সঠিক। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, সেটা সত্য- ধর্মগ্রন্থগুলো যাই বলুক না কেন। কেউ সেটা বলুক বা না বলুক, গ্যালিলিও’র কথা মতো- “তবু পৃথিবী ঘুরছে”, কারন, সেটাই সত্য। এবং সেটা বিজ্ঞান। আর সেটা নির্ভর করে না কোন ব্যক্তির অবস্থানের উপর।

প্রশ্ন হলো প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান- এ দুয়ের মাঝে কোন পার্থক্য রয়েছে কিনা।

দুটোই বিজ্ঞান, তাই, দুই ক্ষেত্রেই সত্য একই- একে সঠিক বলেই গ্রহণ করা যায়।

কিন্তু সকল বাস্তবতাকেই বিভিন্ন শ্রেণী নিজ নিজ অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করলেও সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তা গুণগতভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেটা সরাসরিভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর স্বার্থ ও অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। প্রকৃতি বিজ্ঞানের অনেক সত্যও যখন প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর স্বার্থের বিরোধী হয়, তখন সে তা প্রতিরোধ করে, এবং ভিন্ন ‘সত্য’ নিয়ে আসে। তা সত্ত্বেও প্রকৃতি বিজ্ঞানের অনেক সত্য সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী গ্রহণ করে নিতে পারে এবং তার সাথে অভিযোজন করে নিতে পারলেও সমাজ বিজ্ঞানের মৌলিক সত্যকে গ্রহণ করা তার সামগ্রিক অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই, তার পক্ষে সেটা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

* অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, সত্য আবিস্কার করে মানুষ। এবং মানুষের এই সত্য আবিস্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে। তার মূল কথা হলো বস্তুর নিয়মটা জানতে হলে সেই বস্তুর সংস্পর্শে ও পরিবর্তনে মানুষকে যেতে হয়। যাকে আমরা বলি অনুশীলন।

অনুশীলন ছাড়া জ্ঞান হয় না, সত্য জানা যায় নাÑ এটা নিজেও একটা সত্য।

– তাই, সত্য আবিস্কারের সাথে শ্রেণী ও অনুশীলনের একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত তা যদি হয় সমাজ বিজ্ঞান, সেক্ষেত্রে শ্রেণী খুব নির্ধারক ভূমিকা পালন করে থাকে। সর্বহারা শ্রেণী সেটা পারে এবং বিপরীত শ্রেণীগুলো সেটা পারে না।

এথেকে রাজনৈতিক সত্যের একটা বিষয় চলে আসতে বাধ্য। তা থেকে কেউ মুক্ত নয়, সর্বহারা শ্রেণীও নয়। তফাৎ হলো সর্বহারা শ্রেণী মৌলিক সত্য বা তার কাছাকাছি আসতে সক্ষম, বিপরীত শ্রেণী তাতে সক্ষম নয়।

– এ্যাভাকিয়ান স্ট্যালিন আমলের লিসেংকো-ঘটনাকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয়। সেটা ছিল মূলতঃ প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিষয়। কোন সমাজতান্ত্রিক যুগে প্রকৃতি বিজ্ঞানে কোন ভুল ঘটবে না, তেমন মনে করলে গুরুতর ভুল হবে। এ্যাভাকিয়ান যে সমাজতন্ত্রের আগামী মডেল প্রস্তাব করছেন, তাতেও প্রকৃতি বিজ্ঞানে ভুল ঘটবে। তেমন ক্ষেত্রে হতে পারে কোন বুর্জোয়া বিজ্ঞানী সত্যকে ধারণ করছেন। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। স্ট্যালিন সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ভুল করেছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদী আন্দোলনের যুগে বিগত ১৬০বছরে স্ট্যালিনই তার সময়ে সামাজিক বিজ্ঞানে মৌলিকভাবে সঠিক ছিলেন। সামাজিক বিজ্ঞানের সত্য আবিস্কারগুলো মূলত মার্কসবাদী ও বিপ্লবীরাই করেছেন। এটা কোন আকস্মিক বিষয় নয়। কেন লেনিনবাদ অন্য কেউ আবিস্কার করতে পারেননি, সর্বহারা শ্রেণীর নেতা ও সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলনের নেতা লেনিনই আবিস্কার করলেন এটা জ্ঞানতত্ত্বের বিষয়। প্রশ্ন হলো তারাও ভুল করেছেন, যেমন, স্ট্যালিন অনেক গুরুতর ভুল করেছেন। কিন্তু তার সমাধান হবে এরই মধ্যে- যেমন মাও করেছেন।

এ্যাভাকিয়ান বুর্জোয়াদের সামাজিক বিজ্ঞানের সত্য আবিস্কারের ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে “সত্যের কোন কোন অংশ”- এভাবে শব্দ চয়ন করেছেন। সমস্যাটি মৌলিক সত্যের প্রশ্ন। সত্যের অনেক উপাদান খন্ড খন্ডভাবে সত্যের মৌলিক ধারার বাইরেও অনেক সময় থাকতে পারে, যা ক্রমান্বয়ে মৌলিক ধারাটি আত্মস্থ করণের মধ্য দিয়ে তার সীমাবদ্ধতা কাটাতে পারে। সামাজিক বিপ্লবের মৌলিক ধারার বাইরের সত্য উপাদানগুলোকে আত্মস্থ করণের প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে ত্র“টি ছিল, রয়েছে। কিন্তু তাই বলে শ্রেণী-প্রশ্নের বাইরে এই সত্যকে বিচার করে একটা শ্রেণী উর্ধ চরিত্র দান বাস্তবে সত্য থেকে সরে পড়ার শুরু হতে পারে। সমাজ-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একে অস্বীকার করা যাবে না।

* এ্যাভাকিয়ানের দর্শন-আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনিবার্যতাবাদ/নিয়তিবাদ সম্পর্কে। চাল সঠিকভাবে চুলায় বসালে একটা সময় পরে সেটা ভাত হবেÑ এটা অনিবার্য। এখন কেউ যদি বলেন যে এটা অনিবার্য নয়, কারণ, ভাত হবার আগেই ভূমিকম্প হয়ে পাকঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে, তাকেও বাতিল করা যায় না। কারণ, আমাদের জানার বাইরে বেশ কিছু বিষয় থাকে বা থাকতে পারে। কিন্তু চাল বসালে ভাত হবেÑ একে অনিবার্য বলাটা ভুল নয়। বিশেষত যদি ঐ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার নিয়মটা আমাদের জানা থাকে। নতুবা অনিবার্যতাবাদকে বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা অজ্ঞেয়বাদের খপ্পরে পড়বো। কিছুই আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কোন বিপ্লবই আমরা নিশ্চিত করে করতে পারবো না। এবং ফলত আমরা নিষ্ক্রিয়তায় চলে যাবো।

কমিউনিজম অনিবার্য কিনা- তা নির্ভর করে পুজিবাদের যে বিশ্লেষণ তা সঠিক রয়েছে কিনা। এ্যাভাকিয়ান তাকে সঠিক মানছেন। কিন্তু তিনি যার উপর জোর দিচ্ছেন তাহলো বস্তুগত বাস্তবতার সাথে আত্মগত শক্তির ভূমিকার উপর। আমরা না করলে, সঠিকভাবে না করলে কমিউনিজম আসবে না।

এটা সঠিক যে, আমরা না করলে, বা সঠিকভাবে না করলে কমিউনিজম আসবে না। যে কারণে বিগত শতাব্দীতে তা আসেনি, বরং পুনরায় সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা চেপে বসেছে। সুতরাং কমিউনিজম হবেই, একে ধর্মবাদীদের মত বিশ্বাসে পরিণত করা যে ভুল এর উদ্ঘাটন এ্যাভাকিয়ান করেছেন সঠিকভাবেই। বিপ্লব বিজয়ী হবেই, কিন্তু হচ্ছে না। কেন? তাহলে কি তা অনিবার্য নয়?

আমাদের ধারণা কমিউনিজম অনিবার্য- এটা বলায় ভুল নেই। আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণী ও বুর্জোয়া শ্রেণী রয়েছে। এটা অনিবার্য যে এখানে দ্বন্দ্ব হবে, যেহেতু শোষণ রয়েছে। এটা অনিবার্যতাবাদ নয়, বরং বৈজ্ঞানিক সত্যের উচ্চারণ। পুজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্ব কমিউনিজমে পরিচালিত করতে বাধ্য। এটা সম্ভাব্যতা নয়, অনিবার্যতা। আমাদের জানার বাইরে কোন মৌলিক নিয়ম থাকতে পারে। সেকারণে মানব সমাজের ভিন্ন পরিণতি হতে পারে। তেমন হলে সম্ভাব্য পরিণতিগুলো আমরা নতুনভাবে জানবো এবং সেখানে অনিবার্যতা থাকবে। নতুবা আপনি বিজ্ঞানের কথা বলতে পারেন না। আপনি মহাকাশযান ছেড়ে বলতে পারবেন না যে সেটা চাঁদে যাবে, আপনি চিটাগাঙের ট্রেনে চড়ে বলতে পারবেন না যে, আপনি যাবেনই, কারণ পথে দুর্ঘটনায় ট্রেন নস্ট হতে পারে, আপনি মারা যেতে পারেন। আপনাকে সর্বদাই বলতে হবে যে, হতেও পারে, নাও হতে পারে। ধর্মবাদীরা এভাবেই বলে থাকে শুধু দুটো কথা সংযুক্ত করেÑ আল্লাহ যদি চান তাহলে হবে। এটা এক ধরণের অনিশ্চয়তাবাদ আনবে, যা সমাজ বিপ্লবের জন্য ক্ষতিকর।

। নয়া সংশ্লেষণের রণনৈতিক প্রয়োগযোগ্যতাঃ-

এক্ষেত্রে আরসিপি মূলত মার্কিন সমাজে বিপ্লবের ক্ষেত্রে এর রণনৈতিক তাৎপর্যকে তুলে ধরেছে। এর উপর সংক্ষেপে শুধু দুটো পয়েন্টে আমাদের অবজার্ভেশন তুলে ধরা হলোÑ

– আমেরিকার মত সমাজে “অপেক্ষা কর, একইসাথে ত্বরান্বিত কর”- এই সূত্রায়ন সঠিক, বিপ্লবের সম্ভব্যতার আলোচনা সঠিক। কিন্তু তারা সেখানেও গণযুদ্ধের উত্থাপন করছেন না। যদিও আগে সর্বদাই আরসিপি গণযুদ্ধের বিশ্বজনীনতাকে তুলে ধরেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণযুদ্ধ কীভাবে সূচিত হবে ও পরিচালিত হবে তার উপর তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজও রয়েছে। কিন্তু এখন যখন তারা নয়া সংশ্লেষণের রণনৈতিক প্রযোজ্যতা নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন গণযুদ্ধের বিষয়টি আসেনি। এর কারণ আমাদের কাছে অস্পষ্ট। কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে আসতে পারে।

– অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে আরসিপি সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম করেছে। সংশ্লেষনে তারা অর্থনীতিবাদের উদ্ধার, রক্ষা ও বিকাশের কথা বলেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে যেখানে সমস্যা রয়েছে বলে আমাদের মনে হয় তাহলো, কীভাবে চলমান শ্রেণীসংগ্রাম, অর্থনৈতিক ও আশু রাজনৈতিক সংগ্রাম- ইত্যাদির সাথে অর্থনীতিবাদবিরোধী সংগ্রাম তথা বিপ্লবী রাজনীতি ও কমিউনিজমের সামগ্রিক আদর্শের শিক্ষা ও সংগ্রামকে সমন্বিত করা হবে। সাম্প্রতিক আরসিপি’র বিভক্তির পর অন্য গ্রুপটির পক্ষ থেকে এ প্রশ্নে গুরুতর সংগ্রাম তোলা হয়েছে। হতে পারে সে সংগ্রামের ভিত্তিতে অর্থনীতিবাদ থাকতে পারে। আমরা ভাল জানি না। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণী ও সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন সংগ্রামে বিপ্লবী পার্টি কীভাবে হস্তক্ষেপ করছে তা মৌলিক গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়। সেটা না করলে বিপ্লবী রাজনীতি, রণনৈতিক কর্মসূচী ও কমিউনিজমের আদর্শ শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী আদর্শের বদলে অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের বৈজ্ঞানিক মতবাদে পরিণত হতে পারে। দার্শনিকভাবে শ্রেণী, অনুশীলনÑ প্রভৃতির যেসব প্রশ্ন আমরা উপরে উত্থাপন করেছি তার সাথে এ বিষয়টি মিলে যায়। সুতরাং আমরা পরিস্কার নই যে, আরসিপি’র অর্থনীতিবাদবিরোধী সংগ্রাম সঠিক খাতে প্রবাহিত হচ্ছে কিনা।

** আইসিএম-এর অন্য আরো কিছু মৌলিক বিষয়ের যে বিতর্ক বিগত বেশ কিছু বছর ধরে চলছে, যার থেকে আরসিপি আরো এগিয়ে নিজেদের সংশ্লেষণ পেশ করেছে, সেরকম সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় এখানে আমরা উত্থাপন করবো- যার অনেকগুলোতেই আমাদের পার্টি বিগত সময়ে নির্দিষ্ট কিছু অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেই বিষয়গুলো আমরা নীচে উল্লেখ ও আলোচনা করবো। আমরা মনেকরি, এইসব বিষয়ে আমাদের পার্টির মতাবস্থান ও পর্যালোচনা এ্যাভাকিয়ানের ‘নয়া সংশ্লেষণ’-কে মূল্যায়ন করতে অনেকখানি সহায়ক হবে। বাস্তবে সেক্ষেত্রে আমাদেরকে সেটা কয়েকধাপ এগিয়ে দেবে, যা আমাদের কিছু কিছু প্রবণতাকে ও প্রাথমিক অবস্থানকেও আশাকরি প্রকাশ করবে, যা একত্রে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে পৃথকভাবেও উল্লেখ করবো।

আমরা বিষয়গুলোতে এখানে খুব একটা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই আমাদের মতাবস্থানগুলোকে তুলে ধরবো। কারণ, এ বিষয়গুলোতে পার্টির বিভিন্ন দলিলপত্রে আমাদের বক্তব্য রয়েছে, অথবা রিম-কমিটি বা রিম-ভুক্ত বিভিন্ন পার্টির স্বীকৃত ও গৃহীত দলিলাদি রয়েছে যার সাথে মৌলিকভাবে আমরা একমত।

অন্যান্য লাইন-বিতর্কের বিষয়াবলী

মতবাদিক প্রশ্ন

। প্রধানতঃ মাওবাদ

  পেরু-পার্টি কমরেড গণজালোর নেতৃত্বে আমাদের মতাদর্শের তৃতীয় স্তরকে মালেমা, বা মাওবাদ হিসেবে সূত্রায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। এরই প্রক্রিয়ায় ’৯৩-সালে রিম সম্মিলিতভাবে মাওবাদ-সূত্রায়ন গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু মালেমা গ্রহণ ও উপলব্ধির ক্ষেত্রে রিম-এর অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য প্রথম থেকেই বিরাজমান ছিল। প্রথমতঃ মাওবাদ-ই প্রথম আমাদের মতবাদের তৃতীয় স্তরকে সূত্রায়িত করে, এবং মাওচিন্তাধারার সাথে তার গুণগত ও স্তরগত পার্থক্য রয়েছে। নাকি মাও চিন্তাধারা-সূত্রায়ন প্রথমে এই তৃতীয় স্তরকে সংজ্ঞায়িত করে, যদিও মাও-মৃত্যুর পর মাওবাদ গ্রহণ করা এই তৃতীয় স্তরের উচ্চতর উপলব্ধিকে প্রকাশ করে, যা মাও চিন্তাধারা করতো না। আমরা মালেমা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই দ্বিতীয় মতটিকে তুলে ধরি। কিন্তু পেরু-পার্টি প্রথমটির ধরণে মত ধারন ও প্রকাশ করতো, এবং এর একটা ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল রিম-পার্টিগুলোর একাংশের মধ্যে।

এরই ভিন্ন প্রকাশ ছিল মতাদর্শকে ‘মালেমা, প্রধানতঃ মাওবাদ’- এই সূত্র দ্বারা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। আমাদের পার্টি ‘প্রধানতঃ মাওবাদ’ সূত্রায়নকে প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে, যা কিনা মালেমা’র “অখন্ড সমগ্রতা”-কে খন্ডিত করে দেয়। (দেখুন- নয়া বিতর্ক/১)। পেরু-পার্টির এই ভুল সূত্রায়নের প্রভাবও রিম-ভুক্ত অনেক পার্টির উপর ব্যাপকভাবে পড়ে। এরই একটা প্রকাশ হলো ‘প্রধানতঃ’-এর স্থলে ‘বিশেষতঃ’ শব্দটি ব্যবহার করে একই প্রবণতাকে প্রকাশ করা।

। থট/পথ

পেরু-পার্টির মতবাদিক লাইনে আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল মতবাদকে ‘মালেমা ও গণজালো থট’- এভাবে প্রকাশ করা, যেক্ষেত্রে গণজালো থটকে তারা দাবী করতো পেরুর নির্দিষ্ট অবস্থায় মালেমা’র প্রয়োগ হিসেবে। দেশীয় ক্ষেত্রে গণজালো থটকে মতবাদের প্রধান দিক বলেও তারা উল্লেখ করতো।

এই চেতনা/প্রবণতার ব্যাপক প্রভাব রিম-ভূক্ত অনেক পার্টিতে পড়ে, আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়ে। আমাদের পার্টি একে প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে (দেখুন- ২০০১/রাজনৈতিক রিপোর্ট, রিম-কমিটির পজিশন পেপারের উত্তরে, সিসি’র ১৩, ১৪ ও ১৫-তম রিপোর্ট, মুক্তি সংসদের দলিলের উত্তর, স্ট্রাগল/৭-এ পার্টির নিবন্ধ, ওয়ার্কার/৯-এ প্রকাশিত পার্টির নিবন্ধ- ইত্যাদি)। আমরা মনেকরি, সর্বহারা শ্রেণী একটি আন্তর্জাতিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী শ্রেণী। তার মতাদর্শ ও স্বার্থও আন্তর্জাতিক। তাই, প্রতিটি দেশে তার মতাদর্শ পৃথক হতে পারে না। প্রতিটি দেশে নিজ নিজ থট থাকতে হবে, এই চিন্তা সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদী নয়। প্রতিটি দেশের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী লাইনে যে বিশেষত্বগুলো থাকে সেটা আন্তর্জাতিক অভিন্ন মতাদর্শের ভিত্তিতে, তার অধীনে আসে এবং তাকে এগিয়ে দেয়। সুতরাং, গণজালো বা পেরু-পার্টির বৈশ্বিক অবদানের স্বীকৃতি, আর থট সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। এটা জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি আনে যা বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর মাঝে মতবাদিক বিভক্তির দিকে চালিত করে।

অনেকের মত নেপাল-পার্টিও এই থট চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়, এ চেতনাকে মূলতঃ গ্রহণ করে এবং ‘প্রচন্ড থট’ হিসেবে মতবাদ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়। এ সময় রিম-ভুক্ত কিছু পার্টির সংগ্রামের মুখে তারা ২০০১-এর জাতীয় সম্মেলনে ‘থট’-এর বদলে ‘পথ’ গ্রহণ করে। যদিও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নেপাল পার্টি কিছু ভিন্নতা আনে, কিন্তু আমাদের মতে সারবস্তুগতভাবে তারা পেরু পার্টির বিচ্যুতিকে একবার গ্রহণ করার পর তা থেকে সরতে সক্ষম হয়না, তাকে অব্যাহত রাখে, এবং সমন্বয়বাদী অবস্থান গ্রহণ করে।

বর্তমানে অবশ্য নেপালপার্টি ‘২১-শতকের গণতন্ত্র’, ‘সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত তত্ত্ব’, ‘ফিউশন তত্ত্ব’, ‘কৌশলগত তত্ত্ব’- প্রভৃতি নামে মালেমা’র ক্ষেত্রে বিশ্বজনীন কিছু নতুন বিকাশের কথা দাবী করছে। এইসব ‘বিকাশ’ নিয়ে আলোচনা-মূল্যায়নের উপর নির্ভর করবে ‘প্রচন্ড পথ/থট’ কীভাবে গ্রহনীয় হয় বা হয় না। এ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বিতর্ক ও মীমাংসার এখনো বাকী।

। জেফেতুরা বা মহান-নেতৃত্ব তত্ত্ব

পেরু-পার্টির পক্ষ থেকে এই লাইনটি উত্থাপিত হয়। বিশেষতঃ কমরেড গণজালো গ্রেফতার হবার পর পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত টুএলএস-এর মূল্যায়ন, তাতে গণজালোর ভূমিকা কী তার মূল্যায়নÑ ইত্যাদিকে ঘিরে পরবর্তীতে পেরু-পার্টির প্রতিনিধিত্ব দাবীকারী প্রবাসী সংগঠন এমপিপি এই চিন্তাকে বিপুলভাবে বিকশিত করে তোলে।

এই মতবাদিক দৃষ্টিভঙ্গি দাবী করে যে, বিপ্লব ও পার্টির নেতৃত্ব মহান নেতার স্তরে উন্নীত হলে তিনি নীতিগত ভুল করতে পারেন না। গণজালো-ও এই স্তরের নেতা, তাই তিনি গুরুতর  বা নীতিগত কোন ভুল করতে পারেন না। সুতরাং পিসিপি-তে উদ্ভূত রোল(ডান সুবিধাবাদী লাইন), যাকিনা গণযুদ্ধকে স্থগিত করা ও রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য রাষ্ট্রের সাথে আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছে, তার সাথে কমরেড গণজালোর সম্পর্ক থাকার প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং তিনিই এই শান্তি প্রস্তাবটি দিয়েছেন- এই বক্তব্য শত্রুর ষড়যন্ত্র মাত্র। পিসিপি-তে টুএলএস উদ্ভূত হয়েছে তেমন কোন বক্তব্যও আসলে শত্র“র কথারই প্রতিধবনি করা। গণজালো এমন কোন প্রস্তাব দিয়েছেন কিনা, যাকিনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত, এবং বহু ধরণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তার অনুসন্ধান করার চেষ্টা করাটা হলো শত্র“র বক্তব্যে পরিচালিত হওয়া।

আমরা জেফেতুরা লাইনকে মার্কসবাদী মনে করি না। এটা একদিকে ব্যক্তিতাবাদী, লাইন ও পার্টির উর্ধে ব্যক্তিকে স্থাপন করে, পীরবাদী, অন্যদিকে এটা প্রকৃত বাস্তব থেকে সিদ্ধান্ত না টেনে আত্মগত আকাংখা থেকে সিদ্ধান্ত টানে।

পাঠ্যঃ

।   লিন বিরোধী সংগ্রামের দলিলাদি।

। তথ্য ও বিশ্লেষণে সাংস্কৃতিক বিপ্লব-এর লিন সংক্রান্ত অধ্যায়সমূহ- সমীরণ মজুমদার।

রাজনৈতিক বিষয়াবলী

। সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ

নেপাল-পার্টি ২০০৪-সালে এটি যখন প্রথম উত্থাপন করে তখন তারা বলতে চেয়েছিলেন যে, এটাই মালেমা-বিকাশে প্রধানতম বিষয়। কিন্তু পরবর্তীতে এ প্রশ্নটি ততটা আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হয়নি।

তবে ২০০৬-সালের ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে নেপাল-পার্টি যে অবস্থান-পত্র উত্থাপন করে তার বক্তব্য থেকে কিছু প্রবণতাকে আমাদের নিকট ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে। (দেখুন, ডিসেম্বর, ০৬-এ সিপিএন আহুত আন্তর্জাতিক সেমিনারে নেপাল-পার্টির অবস্থান-পত্র এবং তার উপর আমাদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য)

তারা ‘বিশ্বায়ন’ ফেনমেননকে আলোচনা করা, তার বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনুধাবন করা ও সে অনুযায়ী রণনীতি ও রণকৌশলকে আলোচনা করতে চেয়েছেন যুক্তিসঙ্গতভাবেই। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের ‘বিশ্বায়িত রাষ্ট্র’ বা ‘বিশ্বায়িত অবস্থা’ আলোচনা করার মধ্য দিয়ে আন্ত-সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-কে, তা থেকে উদ্ভূত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে গুরুতরভাবে কমিয়ে ফেলে দেখিয়েছেন বলে আমাদের ধারণা হয়।

২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে সুদীর্ঘ ৬০-বছরের বেশী সময়ে পুনরায় বিশ্বযুদ্ধ-যে হয়নি, একইসাথে ৭০-দশক পরবর্তীতে বিপ্লবও হয়নি, সেটা বিশ্লেষণ ও নতুন আলোচনার দাবী রাখে। এক্ষেত্রে লেনিনবাদকে বিকাশের প্রশ্ন ওঠানো সম্ভবতঃ অন্যায্য নয়- যা কিনা বাস্তব বিশ্ব পরিস্থিতির নতুন বিকাশগুলোকে, বিশেষতঃ বিশ্বায়নকে ধারণ করতে পারে।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় আন্তসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-যে মৌলিক, এবং এটা কোন না কোন রূপে ও ধরণে বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধ সৃষ্টি করে রেখেছে, রেখে যাবে- লেনিনবাদের এই মৌলিক প্রতিপাদ্য মোটেই অকেজো হয়ে যায়নি।

নেপাল-পার্টির উপস্থাপনায় একে নেতিকরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

ফিউশন তত্ত্ব

দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ ও নগর-কেন্দ্রীক অভ্যূত্থান- এই দুই রণনীতির সংমিশ্রণে নতুন রণনীতি বিকাশ করার দাবী করেছে নেপাল-পার্টি। এটিই হলো ফিউশন তত্ত্ব।

পরবর্তীতে এই নয়া রণনীতির প্রয়োজনীয়তাকে তারা ‘বিশ্বায়ন’ ও সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ-এর সাথে সংযুক্তভাবে উত্থাপন করতে চেয়েছে।

প্রথমতঃ নেপাল বিপ্লবের দশ বছরে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের সাথে রাজনৈতিক আন্দোলন-গণসংগ্রাম-গণঅভ্যূত্থানের সংযুক্তকরণের প্রচেষ্টা ও অভিজ্ঞতাকে আমরা উচ্চ মূল্য দেই। সামরিক ও রাজনৈতিক অগ্রাভিযান পরপর চালানো, জাতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, এবং কৌশলগত তত্ত্বের গুরুত্ব- এই তিনটি বিষয়ে নেপাল-বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আমাদের মত দেশের পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে ও সামরিক নীতি-কৌশলের বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গিতে খুবই গুরুত্ব ধরে। আমরা এটাও মনেকরি যে, শুধুমাত্র ‘বিশ্বায়ন’-ই নয়, যদিও এ সময়কালে তার গুরুত্ব বহুল পরিমাণে বেড়েছে, বরং ৩য় বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের বর্ধিত অনুপ্রবেশের ফলে নগরায়ন, পুজিবাদের বিকাশ, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব ও চূড়ান্ত ক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং বিশেষতঃ সাম্প্রতিককালে ফোন, মোবাইল ও যাতায়াতের বিপুল বিকাশ এবং কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিকাশ(যেমন, কৃষিতে হাইব্রিড বীজ, সেচ ব্যবস্থা, যান্ত্রিক চাষ প্রভৃতি) উপরোক্ত দুই রণনীতির সমন্বয়ের বিপুল গুরুত্বকে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু একইসাথে গণযুদ্ধ ও সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান- এইভাবে বিশ্ব সর্বহারা শ্রেণীর রণনীতিকে দুই ধরণে বিভক্ত করার বদলে গণযুদ্ধের সার্বজনীনতাকে তুলে ধরার ধারণাও এ সময়ে বিকশিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কমরেড গণজালোর নেতৃত্বে পিসিপি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যদিও এক্ষেত্রে পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও ৩য় বিশ্বের দেশে গণযুদ্ধ-প্রশ্নে মৌলিকভাবে দুই রণনীতির পার্থক্য করণকে নেতিকরণের একটা প্রবণতাও তাদের মাঝে দৃশ্যমান- যাকে আমরা সঠিক মনে করিনা।

তাই, গণযুদ্ধের সাধারণ রণনীতি কীভাবে প্রযুক্ত হবে তার উপর আলোচনা ও বিকাশ কেন্দ্রীভূত করা প্রয়োজন বলে আমাদের ধারণা। সে অনুযায়ী ৩য় বিশ্বের দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রণনীতিকে বিকশিত করার প্রশ্ন হিসেবেই তাকে আনা যথার্থ হবে বলে আমাদের মনে হয়।

ফিউশন এবং নতুন রণনীতি হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটবে কিনা সেটা আরো গভীর বিবেচনার বিষয়। নেপাল-পার্টি চটজলদি কোন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌছানোর ভুল করতে পারে এবং তা গণযুদ্ধকে দুর্বল করতে পারে। নেপাল-পার্টির লাইনে ও নেপাল বিপ্লবে সর্বশেষ নেতিবাচক বিকাশগুলো ‘গণতন্ত্র’ সংক্রান্ত মূল সমস্যা থেকে উদ্ভূত হলেও এ সংক্রান্ত ডান-প্রবণতা বা বিচ্যুতি তাকে আরো প্রভাবিত করেছে কিনা তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাযোগ্য।

। দক্ষিণ এশীয় সোভিয়েত

দক্ষিণ-এশীয় সোভিয়েতের ধারণা প্রথম নেপাল-পার্টি উত্থাপন করে।

‘কমপোসা’ গঠনে নেপাল-পার্টির দিক থেকে এই ধারণার পরিচালিকা ভূমিকা ছিল বলে অনুমান করা যায়।

পর্যালোচনার পর আমাদের পার্টি একে সমর্থন করে, আঞ্চলিক যুদ্ধের ধারণাকে এর সাথে উত্থাপন করে (দেখুনÑ সিসি’র ১২/১৩/১৪-তম রিপোর্ট)।

এর কিছু পর নেপাল পার্টি ‘বিশ্ব-সোভিয়েত ফেডারেশন’-এর ধারণাটি পেশ করে।

কিন্তু এর উপর কোন আলোচনায় ব্যাখ্যা তারা উত্থাপন করেনি। আমরাও এটার আলোচনায় তাদের সাথে প্রবেশ করতে পারিনি। তার আগেই অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সমস্যা সামনে চলে আসে।

 নেপাল পার্টি ২০০৫-সালে মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সাথে সমঝোতায় প্রবেশ করে, এবং তার পর থেকে নেপাল-পার্টির দিক থেকে ‘সোভিয়েত’ সংক্রান্ত আলোচনা দুর্বল হয়ে যায়। এমনকি ‘কমপোসা’ কার্যক্রমেও ভাটা পড়তে থাকে।

আমরা মনেকরি, দক্ষিণ এশীয় সোভিয়েত ধারণাটিকে আমাদের এগিয়ে নেয়া উচিত। এর আন্তর্জাতিক তাৎপর্য ও প্রয়োগযোগ্যতার আলোচনা হওয়া উচিত, যেমন, আরব অঞ্চলের সোভিয়েত, বা ল্যাটিন আমেরিকান সোভিয়েতÑ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর সাথে সাথে ‘বিশ্ব সোভিয়েত ফেডারেশন’ প্রস্তাবণাটিকে ভালভাবে জানা ও পর্যালোচনা করা উচিত।

। পেরু-পার্টিতে উদ্ভূত টুএলএস-এর মূল্যায়ন

এ প্রশ্নে পেরু-পার্টির সাথে রিম-কমিটি ও রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর গুরুতর মতভেদ বিকশিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে এমপিপি’র পক্ষ থেকে এ প্রশ্নকে ঘিরে রিম-কমিটি, বিশেষতঃ আরসিপি, কমরেড এ্যাভাকিয়ান এবং সাধারণভাবে রিম-কার্যক্রম ও তার ঐক্যের বিরুদ্ধে গুরুতর আক্রমণাত্মক ও বিভেদবাদী তৎপরতা চালানো হয়।

রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর নিজেদের মাঝে পেরু-পার্টির টুএলএস-কে দেখা ও মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী প্রবণতা থাকলেও মৌলিক কিছু প্রশ্নে ঐকমত্য বিরাজিত ছিল যাকে আমাদের পার্টিও সমর্থন করে।

প্রথমতঃ পেরু-পার্টির ভেতরে উদ্ভূত কোন টুএলএস হিসেবে একে দেখা হবে, নাকি নিছক শত্র“র ষড়যন্ত্র (হোক্স) হিসেবে দেখা হবে। পিসিপি ও পরে স্থূলভাবে এমপিপি হোক্স-লাইনকে প্রচার করে, যার সাথে রিম-কমিটি, রিম-ভুক্ত অধিকাংশ পার্টি এবং আমাদের পার্টি একমত ছিল না।

দ্বিতীয়তঃ পেরুর গণযুদ্ধ ও বিপ্লবে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছে কিনা, যাতে এই টুএলএস, ভাঙন, ইত্যাদি গুরুতর বা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। নাকি পেরুর গণযুদ্ধ অব্যাহতভাবে বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে, গণজালো থট যার গ্যারান্টি- যেমনটা প্রাথমিকভাবে পিসিপি, ও পরে এমপিপি বলেছে ও বলে থাকে। আমাদের পার্টি রিম-কমিটির দায়িত্বশীল পার্টিগুলোর এমন অবস্থানের সাথে একমত যে, এটা ঘটেছে, এবং এর কারণ নিহিত রয়েছে গণজালো পরবর্তী পিসিপি’র লাইনের মাঝে, টুএলএস-কে হ্যান্ডলিং করার মাঝে, গণজালো থটের মাঝেও, এমনকি কোন না কোন মাত্রায় পিসিপি’র ঐতিহাসিক লাইনের মাঝেও।

তৃতীয়তঃ এই টুএলএস-এ কমরেড গণজালোর ভূমিকা কী?

এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি বলেছে যে, “লাইন-ই গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রণেতা নন।” আমরা এই শ্লোগানকে তুলে ধরাটা পেরু-পরিস্থিতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

বহু বিভিন্ন তথ্যাবলীতে যা প্রকাশিত তা থেকে আমাদের পার্টি মনে করে যে, এমপিপি কমরেড গণজালোর যে ভূমিকাকে তুলে ধরে তার সাথে একমত হওয়া যায় না। রোল বা এ জাতীয় লাইনের সাথে কমরেড গণজালোর কোন না কোন মাত্রায় ভূমিকা ছিল ও/বা রয়েছে বলে সন্দেহ করার ব্যাপক কারণ রয়েছে। (দেখুন- এ ওয়ার্ল্ড টু উইন-এর ৩২নং সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধ। অনুবাদ- নয়া বিতর্ক/১)

* এই সমগ্র পরিস্থিতিতে রিম-কমিটি সর্বদাই ঐক্যবদ্ধভাবে ও পূর্ণাঙ্গ সঠিকভাবে ভূমিকা রেখেছে তা নয়, এবং রিম-কমিটি ও রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোর মাঝে বিভিন্ন বিতর্ক ছিল ও রয়েছে। কিন্তু এমপিপি’র মৌলিক লাইনের বিরুদ্ধে রিম-কমিটির অবস্থান শেষ পর্যন্ত ছিল মৌলিকভাবে ইতিবাচক ও মূলতঃ সঠিক।

এটা সুস্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন বিশেষতঃ আজকের এমপিপি’র চলমান বিভেদাত্মক ও অনৈতিক রিম-বিরোধী আক্রমণকে সংগ্রাম করা ও পরাজিত করার প্রয়োজন থেকে।

এমপিপি এখন পিসিপি-কে প্রকৃতই প্রতিনিধিত্ব করছে কিনা, করে থাকলে তার কোন অংশকে, সেই অংশের দেশাভ্যন্তরে ভূমিকা কী ও প্রকৃত লাইনটা কী, পিসিপি’র বিভিন্ন অংশের পরিস্থিতি কী ও তাদের লাইনগুলো কী- এসবই খুব বিতর্কিত ও জানার বিষয়। এমপিপি-মাধ্যমে এসব সম্বন্ধে কোন সামগ্রিক ও সন্দেহমুক্ত চিত্র বিগত এক/দেড় দশকে কখনো পাওয়া যায়নি ও যাচ্ছে না। তারা একঘেয়েভাবে বলে চলেছে, পেরুর গণযুদ্ধ বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে, পার্টিতে কোন টুএলএস নেই, এবং গণজালো থট এই বিজয়ের গ্যারান্টি। এবং যারাই গণজালোর ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছে তারাই শত্র“র কথাই বলছে, এমনকি শত্র“র হাতের হাতিয়ার।

সুতরাং এমপিপি-কে পিসিপি’র কোন বিপ্লবী লাইনের ও অংশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। হতে পারে তারা আন্তরিকভাবে বিপ্লব চান, কিন্তু তাদের লাইনগত অবস্থান গুরুতর বিপজ্জনক।

আমরা মনেকরি, আজ নেপাল-পার্টি ও আরসিপি কর্তৃক উত্থাপিত নতুনতর যে লাইন-প্রশ্নগুলোতে রিম-ভুক্ত পার্টিগুলোতে লাইনগত পর্যালোচনা ও বিতর্ক বিকশিত হয়ে উঠেছে, কার্যতঃ কিছু বিভক্তি ঘটে গেছে, তখন এমপিপি’র মত সংকীর্ণতাবাদী ও বিভেদবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লসিত হওয়া ও প্রকৃত মাওবাদীদের মধ্যে ভাঙন-সৃষ্টির ইন্ধনকে সুস্পষ্টভাবে বিরোধিতা করতে হবে। এবং তাকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

একইসাথে রিম-অভ্যন্তরের বিতর্ককে যৌক্তিক পরিণতিতে নেয়ার জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে উচ্চতর লেবেলে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কমিউনিস্টদের নতুনতর দৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। আমাদের পর্যালোচনা ও বিতর্ক সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যেই পরিচালনা করতে হবে।

উপসংহার

উপরে আলোচিত ও উত্থাপিত লাইনগত প্রশ্নাবলী ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে। এছাড়া অবধারিতভাবে এ বিষয়গুলো কমিউনিস্ট আন্দোলনের সুদীর্ঘ দেড়শ’ বছরের আরো অনেক অভিজ্ঞতার আলোচনাকেও তুলে আনতে পারে।

তবে আমরা মনেকরি, সব প্রধান লাইনগত বিতর্ককালেই উঠে আসা অসংখ্য বিষয় ও মতপার্থক্যের মধ্যে প্রধানতম সূত্রগুলোকে বেছে বের করা ও সেগুলোকে আঁকড়ে ধরা প্রয়োজন। সেটা এই ধরনের বিতর্কে সঠিক অবস্থান নিতে পারার প্রধানতম এক সমস্যা। আমাদের পার্টি এবারো প্রথম থেকেই সেভাবেই এগুনোর চেষ্টা করেছে।

নতুন এই মতপার্থক্যগুলো আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক নতুন মহাবিতর্ককে প্রতিফলিত করে। নীতিকে বর্জনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনে বিভক্তির উদ্ভব এবং নীতিকে রক্ষা করার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে উচ্চতর লেবেলে উন্নীত করা এ ধরণের মহাবিতর্কের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক। এর মধ্য দিয়ে সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দেলন নতুন পর্যায়ে বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ সংগ্রামে সফলতার উপর নির্ভর করে আগামী ভবিষ্যতে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বিশ্ববিপ্লব কোন পথে এগুবে। যার সাথে আবার আমাদের দেশীয় আন্দোলনের বিকাশও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

সেজন্য আমরা সমগ্র পার্টিকে খুবই গুরুত্ব সহকারে এই মহাবিতর্কে সচেতন অংশ নেয়া ও সেজন্য উপযুক্তভাবে নিজেদের গড়ে তোলা ও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। এজন্য সংক্ষিপ্ত পাঠ্যগুলো মনোযোগ ও অধ্যবসায়ের সাথে অধ্যয়ন করার কাজকে আঁকড়ে ধরতে হবে। এবং সেগুলো সমাপ্তির পর তাকে ছাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যকে হাতে নিতে হবে। তদুপরি, নতুন নতুন যেসব উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসবে সেগুলোকেও অধ্যয়ন করতে হবে।

এটা শুধু আমাদের পার্টির একান্ত সমস্যা নয়। সমগ্র মাওবাদী আন্দোলন, তথা সমগ্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এ বিতর্কে যথা সম্ভব বেশী করে যুক্ত করতে হবে। আলোচনা করতে হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পরিসরে। এ বিতর্কের বেশ কিছু বিষয় দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা-অধ্যয়ন-গবেষণার বিষয় বলেই আমরা ধারণা করি, যদিও কিছু মৌলিক বিষয়ে আশু সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও প্রয়োজন রয়েছে। আমরা আশা করি পার্টিব্যাপী ও মাওবাদী আন্দোলনে এই বিতর্ক ও আলোচনা ছড়িয়ে দিতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পার্টির সর্বস্তরের নেতৃত্বগণ এবং সচেতন মাওবাদী কেডারগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.