একটি RADICAL নোটঃ জাতি-বর্ন বিলোপের সংগ্রাম, রোহিত ও তারপর……

আমি এই শতাব্দীর শেষপ্রান্ত থেকে কথা বলি,
আমি এই সল্প্রাংশু মধ্যরাত্রি থেকে কথা বলি,
আমার মায়ের রক্ত হাতে নিয়ে আমি কথা বলি,
হোলি খেলেছিল যারা আমার মায়ের রক্ত নিয়ে,
আগুণ জ্বালিয়ে যারা শবের ওপর নেচেছিল,
এই শেষ অন্ধকারে তাদের সবার কথা বলি ;
শহীদ শিখর – শঙ্খ ঘোষ
—————————————————————————————————————————————–
bb
কি হয়েছে না হয়েছে আমরা সবাই জানি। সেই সুত্রেই হয়তো জেনে গেছি হাজার হাজার বছর ধরে কি হয়ে এসেছে এই ভূখন্ডে। ‘রামায়ন’, ‘মহাভারত’এ যদি সেই সময়কার বাস্তবতার বিন্দুমাত্র ছবিও প্রতিফলিত হয়ে থাকে তবে সেই ‘শম্বুক’, ‘একলব্য’ থেকে শুরু, দলিত-শুদ্রের রক্তে বারবার লাল বয়েছে এই মাটি। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা বিবেকানন্দের তথাকথিত শুদ্রপ্রেমের বানী যে আসলে অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্ত্ন করতে পারে নি তাতো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আসলে তারা কোনো সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধাই হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই প্রশ্নে মুখে অনেক কিছু বলেও। এই বাস্তবতা স্বীকার আজ করতেই হবে। সেই কারনেই আমাদের সামনে আজও প্রশ্ন করে বাথানীটোলা-আরওয়াল, দলিত শিশুদের পুড়িয়ে মারা থেকে চুনী কোটাল-রোহিত ও আরো অজস্র নাম। এখনো কি চিৎকার করে বলার সময় আসেনি এ আর্যাবর্ত আমার দেশ নয়?
না নয়, আমার দেশ কে গড়ে তুলতে পারে দেশের ৮৭% দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু জনগণ। আর কেউ নয়। সেটাই হতে পারে নয়া গণতান্ত্রিক ভারত। যে দেশের সিংহভাগ মানুষকে তথাকথিত স্বাধীনতার ৬০ বছর পরেও ‘সোনার টুকরো’, ‘সোনার চামচ’ বলে ব্যাঙ্গো, যে দেশে সংরক্ষনের মতো গণতান্ত্রিক দাবীকে দায়ী করা হয় মেধা অনুশীলনের পথে বাধা হিসেবে অবৈজ্ঞানিকভাবে আর অন্যদিকে মুষ্টিমেয় মানুষ হাজার বছর ধরে শিক্ষায়, চাকরিতে বকলমে অন্যায্য সুবিধা ভোগ করতে থাকেন সেই দেশ ও সেই সমাজ আর যাই হোক কোনো দিক দিয়েই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। বহু যুগ আগে জন্মনির্ধারিত পেশার বন্ধনে জনগণকে বেঁধে রাখার যে ধূর্ত কৌশল তৈরি করেছিল শাষক শ্রেনী তার বহিরঙ্গে অনেক পরিবর্তন এসেছে, যেমন কিছু দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু মানুষ সমাজের উপরের দিকে ঊঠে গেছে, জমিদার-ব্যবসায়ী থেকে নেতা-মন্ত্রীও হয়েছে। বলা ভালো তাদের উপরের দিকে উঠতে দিয়েছে এই ব্রাক্ষন্যবাদী সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। যাতে এদের খুড়োর কলের মতো ঝুলিয়ে রাখা যায় বাকি দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু জনগণের সামনে, আর তাঁদের ওপর চালিয়ে যাওয়া যায় অবাধ শোষণ ও শাসন।
জ্যোতিবা রাও ফুলে, সাবিত্রী ফুলে, পেরিয়ার, আম্বেদকারের মতো সংগ্রামীরা দলিত মুক্তি আন্দোলনে অমূল্য অবদান রেখে আমরন সংগ্রাম করে গেলেও, সিধু-কানহু, বিরসা মুন্ডারা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জীবন দিয়ে গেলেও আজও দেশটা উচ্চবর্নের হিন্দুদের দেশ! আম্বেদকার বলেছিলেন “সংরক্ষন আসলে প্রতিনিধিত্ব, যা গণতন্ত্রের ভিতস্বরূপ”, সেই সংরক্ষনকে করে দেওয়া হয়েছে পঙ্গু। ধরে নেওয়া যাক সংরক্ষনের সুযোগে কোনো অনুন্নত এলাকার দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু ছাত্র বা ছাত্রী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় জায়গায় পড়তে এলো, যেখানে পড়ানোর মাধ্যম ইংরিজি। অনুন্নত এলাকা থেকে আসার ফলে ইংরিজিতে সেই সাবলীলতা না থাকাই স্বাভাবিক তাঁর মধ্যে(সবার পক্ষে আম্বেদকার, রঘুনাথ মূর্মু বা ধীরেন বাস্কে হওয়া সম্ভব নয়)। ফলে পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর পক্ষে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয় কোলকাতা ও তার আসেপাসের থেকে আসা ইংরিজিতে সাবলীল ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে। সেই পাল্লা না দিতে পারাকে অজুহাত করে প্রচার চলে সংরক্ষনের বিরুদ্ধে। আসলে যে সংরক্ষনকে খুব সচেতনভাবেই পঙ্গু করে রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার, দেশের শ্রমজীবি মানুষদের দেকে তাকালেই সেটা আমরা বুঝতে পারি যদি বুঝতে চাই। শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য খেটে খাওয়া জনগণের ৯৫% দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু। অবশ্যই ঐ খুড়োর কল হিসেবে কিছু দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু মানুষকে সমাজের উপরের স্তরে বসিয়ে রাখেছে পুতুলের মতো ব্রাক্ষন্যবাদী শাসকেরা। যে কজন সব প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রবল সংগ্রাম করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্দ্যোগী সমাজে তাঁরা যদি ঐ পুতুলে পরিণত না হতে চান তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে চুনী কোটাল, রোহিত বা প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালইয়ের অধ্যাপক মহীতোষবাবুর পরিনতি। যাঁরা মাথা তুলতে চান এই অমানবিক, অগণতান্ত্রিক ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁদের জন্য তৈরি থাকে বাথানীটোলা-আরওয়ালের পরিণতি।
ভারতের বিপ্লবী কমিউনিষ্ট ও বাম শিবিরও জাতি-বর্নব্যবস্থা এবং ব্রাক্ষন্যবাদী সামন্ততন্ত্রের এই বৈশিষ্টকে ধরতে পারেনি বহুকাল। দেবীপ্রসাদ, কোসাম্বি, রাহুল সংকীর্তায়নের মতো কিছু মানুষ ছাড়া। ঠিক যেমন ভারতীয় সমাজের আমূল পরিবর্তণের সঠিক লাইনটির ধারে কাছেও যাওয়া যায় নি বহুকাল। সেটি ঠিক হওয়ার পর যতই বিপ্লবী জনগণের মধ্যে বেড়েছে অনুশীলন ততোই স্পষ্ট হয়েছে জাতি-বর্নব্যবস্থা ও ব্রাক্ষন্যবাদী সামন্ততন্ত্রের আসল চেহারা। আর আজ সময় এসেছে সমস্ত ভুল শুধরে নেওয়ার সংগ্রামের মাটিতেই। দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু জনগণের মুক্তির আন্দোলনকে গড়ে তোলা ও দিকে দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার আজ সময়ের দাবী। বিপ্লবী দাবী ও গণতান্ত্রিক দাবী। জাতি-বর্নব্যবস্থার বিলোপ ও ব্রাক্ষন্যবাদী সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংসসাধনের মাধ্যমেই শুধু হতে পারে #JusticeForRohith. চুনী কোটাল থেকে বাথানীটোলা-আরওয়ালের জন্য ন্যায় বিচার। হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের VCর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের পদত্যাগ/অপসারন বা শাস্তির দাবীর সাথে দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু জনগণের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিশায় আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া এখন সমস্ত প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক-বিপ্লবী জনগণের কর্তব্য। যে আন্দোলন ও সংগঠনের লক্ষ্য হবে জাতি-বর্নব্যবস্থার বিলোপ এবং ব্রাক্ষন্যবাদী সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসসাধন। রোহিতদের সংগ্রাম, দলিত-আদিবাসী-সংখ্যালঘু জনগণের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম আসলে ভারতীয় সমাজের আমূল গণতান্ত্রিকীকরনের সংগ্রামের সাথেই যুক্ত। সেখানে লিংডো কমিশন, ক্যাম্পাস গণতন্ত্র, UAPA, রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির দাবী, অপারেশান গ্রীনহান্টের বিরোধীতা এক সূত্রে বাঁধা। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অধিকার, ক্যাম্পাস থেকে CCTV ও পুলিশ পিকেটিং প্রত্যাহারের দাবী, এককথায় ক্যাম্পাস গণতন্ত্রের দাবী রোহিতের লড়াইয়ের থেকে আলাদা কিছু নয়। তাই আমাদের সক্রিয়তা অনেক বেশি করে দাবী করছে পরিস্থিতি।

র‍্যাডিকাল

_______________________________________________________________
র‍্যাডিকাল এর পক্ষে জুবি(৯৫৬৩৯১১৫৫৭) ও সুদীপ্ত(৯৮৩০৬৪৮৫৬৭) কর্তৃক প্রকাশিত


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.