বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত এবং রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ

images (6)

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত এবং রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ

চার্বাক

 

রবীন্দ্রনাথের দেড়শ’তম জন্মবার্ষিকী মহাসাড়ম্বরে পালন করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। যাকে শুদ্ধ ভাষায় ডাকা হচ্ছে “সার্ধশততম” বলে। আওয়ামী লীগ সরকার নিজেকে বেশী বেশী করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের রক্ষক, এবং কাজে কাজেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবক্তা বলে প্রমাণ করার জন্য যেন বেশী করে এই জন্মবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। সেজন্য তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে একত্রে যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে বোঝাই যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ এই গণবিরোধী শাসকদের জন্য বেশ প্রয়োজনীয়।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার বিরাট সাহিত্যিক। বলা চলে এখনো পর্যন্ত প্রধানতম ব্যক্তি। তিনি বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮০ বছর, যার মাঝে ৬০ বছরের বেশী সময় তিনি সাহিত্য চর্চা করেছেন। তদুপরি তিনি ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান এবং নিজে জমিদার। ফলে নির্বিঘ্ন সাহিত্য চর্চার পথে দারিদ্রের কোন সমস্যা তাকে মোকাবেলা করতে হয়নি। এ কারণে তার পক্ষে আরো ব্যাপক আকারে সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। তিনি ছিলেন মূলত কবি, সঙ্গীতকার। অসংখ্য কবিতা এবং প্রায় ৩ হাজার সঙ্গীত তিনি রচনা করেন। কিন্তু এছাড়াও প্রচুর ছোটগল্প, বেশ কিছু উপন্যাস এবং বহু নিবন্ধ তিনি রচনা করেছেন। সুতরাং তার এই বিরাট বপুর সাহিত্য, তার দীর্ঘ জীবন এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সার্বিক আলোচনা বা মূল্যায়ন করা শুধু বিশেষজ্ঞদের পক্ষেই সম্ভব। তদুপরি বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম পুরুষ হবার কারণে ভাষা, সাহিত্য, শিল্পরূপ ইত্যাদিতে তার যে বিরাট অবদান সেটাও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতির নির্মোহ মূল্যায়নে একটা বড় বোঝা হিসেবে সামনে আসে। প্রায় সর্বদাই রবীন্দ্রনাথের ঐসব ভূমিকার ইতিবাচক দিকগুলো তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির

বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়।

সুতরাং এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য খুব সংক্ষেপে শুধু একটিমাত্র বিষয়ে রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা আলোচনা করা, যাকিনা বর্তমান বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংগ্রাম করার সাথে সরাসরিভাবে যুক্ত। সেটা হলো বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ।

বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতটির রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ এটা প্রায় সবাই জানেন। দেশের শাসকশ্রেণী, রাষ্ট্র ও বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকার ও সেই ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা বাঙালী জাতীয়তাবাদ বলতে আবেগে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আর সেই রকম আবেগ নিয়ে আসে জাতীয় সঙ্গীতটির ও তার রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ আলোচনায়।

জাতীয় সঙ্গীত বুর্জোয়া জাতি রাষ্ট্রে জাতির আবেগের সাথে জড়িত। সেই আবেগ খুব একটা ভাল জিনিস নয়, বিশেষত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ক্ষেত্রে-তো বটেই। কারণ বাস্তবে জাতির আবেগের আড়ালে এটা বুর্জোয়া শ্রেণীর আবেগকে ধারণ করে। বর্তমানের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও এই জাতীয়তাবাদী আবেগ প্রায় ক্ষেত্রেই ভাল নয়। তথাপি অনেক ক্ষেত্রেই জাতির সংগ্রামের ইতিহাস, শৌর্য-বীর্য, অহংকারগুলো জাতীয় সঙ্গীত ধারণ করে যার কিছু কিছু অন্তত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জনগণের মননে সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ইতিবাচক ভূমিকাও রেখে থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত সেরকম কিছুকেই ধারণ করেনা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির ইতিহাস যেমন শাসক শ্রেণী বিশেষত আওয়ামী লীগ মিথ্যা দিয়ে ভরে রেখেছে, তেমনি এর জাতীয় সঙ্গীতটিকে ঘিরেও তারা করেছে এক জঘন্য প্রতারণা।

রবীন্দ্র সাহিত্যের শ্রেণী চরিত্র অনুযায়ীই এই সঙ্গীতে শুধু আকাশ-বাতাস-গাছপালা ব্যতীত অন্য কিছু নেই; মানুষ নেই। সাহিত্যে, মানুষের আবেগ ও মননে, প্রকৃতির অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেসবই মানুষকে কেন্দ্র করে। মানুষ না থাকলে, তার সংগ্রাম না থাকলে, সেসবকে ঘিরে না হলে প্রকৃতি-সংক্রান্ত আবেগ অর্থহীন। প্রকৃতি ও মনুষ্য জাতির শত্র“, তার সমাজ ও উৎপাদন প্রভৃতির সাথে বা তার জন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য ও প্রয়োজনকে উপলব্ধি করে। মানুষের বা জাতির থাকে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথের এ সঙ্গীতে সেসব নেই। ফলে এটা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী অবস্থান থেকেও জীবন-ঘনিষ্ঠ কোন জাতিগত আবেগ সৃষ্টিতে সক্ষম নয়। এটা উৎপাদন বিচ্ছিন্ন, ব্যাপক জনসাধারণের জীবন ও সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন, আয়েশী জমিদার নন্দনের নিরাপদ বড়লোকী দেশপ্রেম ছাড়া আর কিছুকেই ধারণ করে না। আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব এই গানকে যে জাতীয় সঙ্গীত করেছে সেটা তাদের গণবিরোধী শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এসেছে।

এই সঙ্গীতের ইতিহাসটা যদি কিছুটা আলোচনা করা যায় তাহলে বোঝা সম্ভব যে এর জাতীয়তাবাদ বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালী জাতীয়তাবাদকেও কোনক্রমেই ধারণ করে না। শাসকরা যে এটা চালিয়ে যাচ্ছে সেটা একটা প্রতারণা বৈ কিছু নয়।

বৃটিশ ভারতে ১৯০৫ সালে বৃটিশরা বিবিধ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে তৎকালীন বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা বানাতে চেয়েছিল। যা বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। কিন্তু সেটা তারা অব্যাহত রাখতে পারেনি। কারণ, কলকাতা ভিত্তিক মূলত হিন্দু বাঙালী উঠতি বুর্জোয়ারা ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা তার তীব্র বিরোধিতা করে। সেসময় বাঙালী মুসলমানরা তেমন একটা শিক্ষিত ছিল না। শিক্ষিত বাঙালী বলতে হিন্দুদেরকেই বোঝাতো। তারাই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম সারির লোক ছিল।

প্রশ্ন হলো তারা কেন বাঙলা বিভক্তিকে এত বিরোধিতা করেছিল? এর আর্থ-সামাজিক কারণকে গভীরভাবে বুঝতে হলে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। তবে একটি কারণ এটা ছিল যে, পূর্ব বাংলায় বুর্জোয়া বিকাশকে বিরোধিতা করা। পূর্ব বাংলাভিত্তিক বুর্জোয়া বিকাশের অর্থ ছিল কোলকাতা-কেন্দ্রীক উঠতি বুর্জোয়া, জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদেরÑ যারা মূলত ছিল হিন্দু, তাদের বিকাশের একচেটিয়াত্ব ভেঙে পড়া। বিপরীতে ঢাকা শহরকে ভিত্তি করে পৃথক বিকাশ হওয়া, যাকে প্রতিনিধিত্ব করছিল ঢাকা-কেন্দ্রীক মুসলিম সামন্ত-জমিদাররা। রবীন্দ্রনাথের জমিদারীর প্রধান অংশ ছিল পূর্ব বাংলায়। তাই পৃথক প্রদেশ হলে তাতে তার নিজের জমিদারী স্বার্থেরও অসুবিধা হতে পারতো। সেটাও হয়তো তিনি চাইতেন না, আরো সব কোলকাতা ভিত্তিক শিক্ষিত হিন্দু বাঙালীদের মতোই।

১৯৪৭ সালে বৃটিশ চক্রান্তে এবং প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যোগসাজশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে বাংলা বিভক্তির বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহের একটা সম্পর্ক ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ঘটনার সাথে থাকতে পারে বটে। কিন্তু ১৯৪৭-এর বাংলা বিভক্তির প্রতিক্রিয়াশীলতা, আর ১৯০৪ সালের বঙ্গভঙ্গ একই রকম ব্যাপার ছিলনা।

যাই হোক না কেন, আমরা যা আলোচনা করতে চাচ্ছি তাহলো এই জাতীয় সঙ্গীত প্রসঙ্গ। যখন বৃটিশের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ার চলছে কলকাতাইয়্যা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে, সেসময়ই রবীন্দ্রনাথ এই সঙ্গীতটি রচনা করেছিলেন। এটা দ্বারা তিনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার জন্য অখন্ড বাংলার বাঙালী জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিলেন, যা সেসময়ে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের একটা আবেগকেও অবশ্য তুলে ধরে।

প্রশ্ন হলো অখন্ড বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই সঙ্গীত কীভাবে বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়? বর্তমান বাংলাদেশের সংবিধানে এরা জাতীয়তাবাদ যুক্ত করেছে। প্রশ্ন হলো কোন জাতীয়তাবাদ?

আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব বোঝাতে চেয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদ। “সবাই বাঙালী হয়ে যাও”- পাহাড়ের সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাগুলোর প্রতি শেখ মুজিবের নির্দেশ এ থেকেই এসেছিল। কিন্তু যেহেতু বাঙালী জাতিকে সেই ১৯৪৭ সালেই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল, তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্র যদি কোন বিশেষ জাতীয়তাবাদ তুলে ধরেই সেটা হতে পারে পূর্ববাংলার জাতীয়তাবাদ, অখন্ড বাঙালী জাতীয়তাবাদ নয়। এই বিপদে পড়ে শাসকশ্রেণী জিয়ার নেতৃত্বে নিয়ে এলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। কিন্তু বাংলাদেশীরা তো কোন একক জাতি নয়। বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশী পরিচয় দিতে পারে বটে, কিন্তু জাতিসত্ত্বা পরিচয় তো প্রতিদিন বদলে যেতে পারে না। ৬৫ বছরের উর্ধ বয়সী একজন লোকের জাতিসত্ত্বা কি রাষ্ট্রের বদলের সাথে সাথে তার জীবনে তিনবার বদলে যেতে পারে? (বৃটিশ আমলে ভারতীয়, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানী, আর এখন বাংলাদেশী?!)

যাহোক আমাদের আলোচনা ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তার এই সঙ্গীতটি অখন্ড বাংলাকে তুলে ধরেছিল, তাই তার অন্তর্নিহিত জাতীয়তাবাদ ছিল অখন্ড বাঙালী জাতীয়তাবাদ। ১৯৪৭ সালেই যার পরিসমাপ্তির শুরু হয়েছিল। সেই জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরাও কেউ এখন আর বলে না- না ভারতীয় বাঙালী, না বাংলাদেশের বাঙালী। ফলে সেই মৃত আবেগসম্পন্ন সঙ্গীতকে কেন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করা হলো? হলো আর কোন পথ না পেয়ে, রবীন্দ্রনাথকে গৌরবান্বিত করার জন্য, রবীন্দ্র-ভাবমানসের প্রতিক্রিয়াশীলতা দ্বারা জনগণকে প্রভাবিত করার জন্য, যাকিনা এই প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীর কাজে লাগে।

বর্তমান বাংলাদেশে বাঙালী ছাড়াও যে অন্যান্য অনেক সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার বাস তাদেরকে এই ‘জাতীয়’ সঙ্গীতে পাওয়া যাবে না। জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শে এটাই স্বাভাবিক। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিদের মাটি গাছ আকাশ বাতাস রবীন্দ্রনাথের এই জাতীয় সঙ্গীতের মতো মোটেও নয়। তারা কেন এ গান গাইবেন?

* আবারো আসতে হবে রবীন্দ্রনাথে। সেটাই আমাদের আলোচনার আরেকটি মূল বিষয়।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন, তিনি নিজে বাঙালী ছিলেন, তিনি বাংলায় থেকেছেন আজীবন, তাই বাংলা ও তার মানুষ তার লেখায় এসেছে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি নির্ভেজাল বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধারক ছিলেন? যেমনটা বাঙালী বুর্জোয়া শাসক ও বুদ্ধিজীবীরা বোঝাতে চান?

সেটা ভাবলে ঠিক হবে না। একটা উদাহরণই যথেষ্ট। সবাই জানেন যে, বর্তমান ভারতের জাতীয় সঙ্গীতটির রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ। বর্তমান ভারত আর বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ কি এক? দুটো দেশের জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এক হয় কিকরে ? সেটা অসম্ভব। তাহলে রবীন্দ্রনাথ আসলে কোন জাতীয়তাবাদকে ধারণ করতেন?

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত জাতীয়তাবাদ ছিল ভারতীয়। কিন্তু সেটা বাস্তব নয়, কারণ, ভারত কখনোই একটি জাতিভিত্তিক দেশ নয়। ভারতকে ভিত্তি করে একটা দেশপ্রেম, অখন্ড ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম এসবের একটা ভিত্তি থাকলেও যখনই কেউ জাতীয়তাবাদে যেতে চাইবে তখনই তাকে স্বীকার করতে হবে যে, ভারত ছিল একটি বহুজাতিক দেশ। বহু জাতির দেশের জাতি-জনগণ একত্রে স্বাধীনতার জন্য অভিন্ন বৃটিশ বিরোধী সংগ্রাম করেছেন এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক বন্ধন ও সম্পর্কের কারণে সেসময়ে একটি অখন্ড স্বাধীন ভারতের চিন্তা করেছেন- এটা বহু জাতির অস্তিত্ব ও জাতিভিত্তিক বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে বাতিল করতে পারে না। শুধুমাত্র জাতিগত সমতার ভিত্তিতে এবং বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আন্তর্জাতিকতার ভিত্তিতে জাতিগুলো একত্রে থাকতে পারে, নতুবা সেগুলোকে একত্রে রাখার জন্য কৃত্রিম কোন আদর্শ উপর থেকে চাপাতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিরোধী, শোষণহীন সমাজ ও সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারক ছিলেন না। ফলে তিনি অখন্ড ভারতের জন্য প্রাচীন হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করতে চেয়েছেন। সমগ্র রবীন্দ্র সাহিত্যে এই হিন্দুত্ববাদকে আমরা ব্যাপকভাবেই পাবো। যে বাঙালী জাতির প্রধান অংশ ছিল মুসলিম, তাদের সংস্কৃতি রবীন্দ্র সাহিত্যে খুবই কম, নেই বললে চলে। এটাও প্রমাণ করে রবীন্দ্রনাথ বাঙালী জাতীয়তাবাদকে প্রতিনিধিত্ব করতেন না।

প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ মূলত ছিল সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ। আর সাহিত্যচর্চায় তারই আওতায় মাঝে মাঝে এসেছিল অখন্ড বাঙালী জাতীয়তাবাদ। নিশ্চয়ই এ দুয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল যার ভাল আলোচনা হতে পারে এ বিষয়ে গভীর গবেষণার মধ্য দিয়ে। তবে এটা তো আজ পরিস্কার যে, বর্তমান ভারতে যারা উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করছে সেই বিজেপি রবীন্দ্রনাথকে উর্ধে তুলে-যে ধরে তা বিনা কারণে নয়।

উপরের আলোচনা থেকে পরিস্কারভাবেই বোঝা সম্ভব যে, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদকে সাংবিধানিক আদর্শ করে শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্র যে গোঁজামিল চালিয়ে যাচ্ছে তার মাঝে একটা বড় অঙ্গ হলো রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকাশিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিক্রিয়াশীলতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় জায়গাতেই তিনি গণশত্র“ শাসকশ্রেণী ও রাষ্ট্রের কাছে স্মরণীয় বরণীয়। ভাষা ও শিল্প-সাহিত্যের রূপের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বড় অবদান থাকলেও সেসবও বিরাটভাবে কিভাবে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী-দরিদ্র মানুষ নয়, বরং সুখে থাকা মানুষদের সংস্কৃতিকে প্রকাশিত ও প্রতিনিধিত্ব করে তার ভাল বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন ভবিষ্যতে বিপ্লবীদেরকে অবশ্যই করতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ বিশাল বৃক্ষ, তাই তার প্রভাবও বড় এবং তাকে আলোচনা করাটাও বিরাট কাজ। কিন্তু সেকাজকে শুরু করা যায় অল্প থেকেইÑ শুধু যদি তার অচল হয়ে পড়া ও প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদটিকে আমরা বুঝি তাহলেই। প্রথমত বাংলাদেশী জাতীয় সঙ্গীতের এই গোঁজামিলের জাতীয়তাবাদকে এবং সেই সাথে রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদকে বর্জন করার মধ্যেই এক্ষেত্রে একটা বড় অগ্রগতি ঘটতে পারে। #

লেখাটির রচনাকাল – ২০১১ইং

[ “কাদের জন্য লিখব?… …। যত দীর্ঘ সময়ই লাগুকনা কেন, এ প্রশ্নের সমাধান আমাদের করতেই হবে এবং এর স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ সমাধানই করতে হবে। আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলার কর্মীদের অবশ্যই এ কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে এবং নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তন সাধন করতে হবে; শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশ করার প্রক্রিয়া ও বাস্তব সংগ্রামের গভীরে যাবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং মার্কসবাদ ও সমাজকে অধ্যয়ন করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অবশ্যই ক্রমে ক্রমে এগিয়ে আসতে হবে এবং এসে দাঁড়াতে হবে শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের পক্ষে, সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে।

মাও সে তুঙ

সাহিত্য ও শিল্পকলা সম্পর্কে ইয়েনানের আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণ (মে, ১৯৪২), পৃষ্ঠা- ৮৯-৯০ ]

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s