২৬শে ফেব্রুয়ারী বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের প্রতিবাদী আয়োজন

10806420_309685275904677_7867052299715307327_n

জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও চিন্তার অধিকার হরণের চক্রান্ত প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন

লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের সভা
২৬ ফেব্রুয়ারি, সকাল ১০টা, জাতীয় প্রেসক্লাব হলরুম (৩য় তলা)

বাংলাদেশে এখন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ন্যূনতম যে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে শাসক শ্রেণী মৌখিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে তার কোনো কিছুই আর কার্যত বিদ্যমান নেই। জনগণের বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, চিন্তার অধিকারকে ভাগাড়ে ছুড়ে ফেলে বর্তমান শাসক গোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার স্বপ্ন দেখছে। বিশেষত গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় ভোটবিহীন এক প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের পর তারা এই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে যেভাবে শাসন কাজ পরিচালনা করছে এবং দেশের স্বার্থকে বিদেশি লুটেরাদের কাছে বিকিয়ে দিচ্ছে তার প্রেক্ষিতে জনগণের মধ্যে উদ্ভূত ক্ষোভকে সামাল দেয়ার জন্য তাদেরকে অবলম্বন করতে হচ্ছে বিভিন্ন নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে শুধু আইন প্রণয়ন করেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি পন্থায় হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন সংগঠিত করে তারা জনগণের জীবনধারণের অধিকার থেকে শুরু করে কথা বলার সামান্যতম স্বাধীনতাটাকেও কেড়ে নেয়ার জন্য আজ উদ্যত হয়েছে।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারের প্রভাবশালী মহলের কতিপয় ব্যক্তির দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হওয়ার হুমকি সৃষ্টি হওয়ায় নিজ বাড়িতে হত্যার শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক সম্পত্তি সাগর-রুনি। সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কারো শয়নকক্ষের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব নয়!! তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের কথা বললেও ৪৮ মাস পার হয়ে গেছে, কোনো বিচার হয় নি। কিন্তু এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড, সংবাদ ও মত প্রকাশের ওপর লিখিত-অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বরাবর জারি আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষত আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন সরকার টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মাত্রা অতীতের সকল সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। ভোটারবিহীন ‘নির্বাচনে’ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তারা আর জনমতের বিন্দুমাত্র পরোয়া করছে না। একদিকে চলছে ক্ষমতাসীন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সাংসদ-আমলা থেকে শুরু করে তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট। সেই সাথে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সৌদি আরব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন অধীনতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তারা দেশের জনগণের সম্পদ, সার্বভৌমত্ব, জানমাল সমস্ত কিছুই গোলামীর বাজারে বিকিয়ে দিয়েছে নিজেদের বখরার বিনিময়ে।

এই পরিস্থিতিতে জনগণ যাতে কিছু বলতে না পারেন, এসব অপকর্মের যাতে কোনো প্রতিবাদ কোথাও না হয়, সেই জন্য আইনগত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রণয়ন করেছে তারা ২০১৩ সালে। এই আইনের উপধারা ১ অনুযায়ী, “কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।” এবং এর শাস্তি হিসেবে একজন ব্যক্তিকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত কিংবা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সর্বস্তরে চলছে অশ্লীলতা ও মিথ্যার বেসাতি, যেখানে তারা নিজেরাই জনগণের জানমাল, মর্যাদা বিভিন্নভাবে ভূ-লুণ্ঠিত করে চলেছে সেখানে আইনে উল্লিখিত অপরাধসমূহের ব্যাখ্যা কে দেবে কিংবা এর মানদণ্ডই বা নির্ধারণ করবে কারা? অথচ ইতোমধ্যেই এই আইনের বলে সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশকারী একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। এছাড়া ২০১৪ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য থেকে জনগণকে অন্ধকারে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীনে রাখার বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ করা হয়েছে।

আইনি নির্যাতনের পাশাপাশি রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, ক্রসফায়ার ইত্যাদি। সরকারের পোষা বাহিনী র‌্যাবকে দিয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ক্ষমতাসীন মহলের সাথে সম্পর্কিত সন্ত্রাসীরা নারায়ণগঞ্জে ৭ জন ব্যক্তিকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের লাশ ফেলে দেয়। এই নিয়ে সারা দেশে সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য। শেষ পর্যন্ত প্রধান আসামী পলাতক নূর হোসেনকে ভারত থেকে নিয়ে আসা হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়ার প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। এভাবে প্রতিনিয়তই চলছে সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ অপরাধীদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা, যার ফলে বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছে দাগী আসামীদের অভয়ারণ্যে।

এছাড়া, গত দুই বছর ধরে ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের নামে চলছে ব্লগার-হত্যা। ঢাকায় রাজিব হায়দার, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রি নিলয়, সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্য রাস্তায় অথবা বাড়িতে ঢুকে। বিগত বইমেলার সময়ে প্রবাসী বিজ্ঞান-লেখক অভিজিৎ রায়কে টিএসসিতে জনসমাগমের মধ্যে চাপাতির আঘাতে হত্যা করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় আততায়ী। আহত হন তার স্ত্রী বন্যা আহমেদ। এইসব ঘটনায় সরকারি মহল থেকে ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দিকে আঙুল তোলা হলেও একটি ঘটনারও এখন পর্যন্ত সুরাহা হয় নি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে আজিজ মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে ঢুকে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে যায় অজ্ঞাত-পরিচয়ধারী। একই দিনে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর অফিসে হামলা চালিয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, লেখক রণদীপম বসু সহ তিনজনকে আহত করা হয়। এসব রহস্যের তদন্ত নিয়ে অনেক রকম ধোঁয়াশা তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশের আইজি স্বয়ং লেখকদেরকে নসিহত করছেন তারা যেন লেখালিখির ক্ষেত্রে ‘সীমালঙ্ঘন’ না করেন! জীবননাশের হুমকির প্রেক্ষিতে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে গেলে পাল্টা তাদেরকে বিদেশে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দান করা হয়!!

২০১৫ সালের বইমেলায় বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল রোদেলা প্রকাশনীর স্টল। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর বইমেলা শুরু হওয়ার আগেই বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলন করে ধাতানি দিয়েছিলেন সকল প্রকাশককে তারা যেন ‘উস্কানিমূলক’ গ্রন্থ প্রকাশ না করেন। এরই মধ্যে কয়েক বছর আগেই প্রকাশিত বইয়ের অজুহাত তুলে মেলায় ব-দ্বীপ প্রকাশনের স্টল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকাশনীর কর্ণধার ও লেখক শামসুজ্জোহা মানিক সহ তিনজনকে কোমরে বেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। রিমান্ডের নামে লেখকের ওপর চলছে শারীরিক নির্যাতন! বোঝা যাচ্ছে, প্রতিরোধহীনতার পরিবেশে সময় যতোই অতিবাহিত হচ্ছে সরকারের ঔদ্ধত্য ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একদিকে এই যখন অবস্থা তখন সরকারের সমর্থক ও সরকার কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীর দলও বসে নেই। সরকার ও এর প্রধানের যাবতীয় ফ্যাসিবাদী তৎপরতাকে তারা সমানে যুগিয়ে যাচ্ছেন নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন। এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর চিন্তা, চেতনা, বক্তব্য ও মনোজগতে ন্যূনতম নৈতিকতাবোধের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তারা সমগ্র ঢাকা শহর অচল করে সোহরাওয়াদী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা প্রদানের ব্যবস্থা করছেন। তাকে বিভিন্ন খেতাব, পদবী, পুরস্কারে ভূষিত করার প্রস্তাব উত্থাপন করছেন। প্রতিবাদহীন এই নিরব আতঙ্কের সময়কে তারা আখ্যায়িত করছেন ‘সুসময়’ হিসেবে। এই বইমেলাতেও তাদের বিভিন্ন তোষামোদপূর্ণ বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়ে লিপিবদ্ধ আবর্জনার স্তূপের আকার বৃদ্ধি করে চলেছে। ব-দ্বীপ প্রকাশনের ওপর হামলার প্রেক্ষিতে এদেরই একজন পাঠকদেরকে নসিহত করছেন তারা যেন এই বইগুলো না পড়েন! অথচ একজন লেখককে দাগী আসামীর মতো ধরে নিয়ে গিয়ে তার ওপর অন্যায় শারীরিক নির্যাতন চালানোর বিরুদ্ধে তার কোনো কথা নেই!!! এদেরকে আর সরকারি দলের শুভানুধ্যায়ী কিংবা পরামর্শক বলা চলে না। তারা পরিণত হয়েছেন শাসক দলের উপাঙ্গে, নিকৃষ্ট লেজুড়ে। ক্ষমতাসীন শাসক গোষ্ঠীর সংকীর্ণ কায়েমী স্বার্থের সাথে তারা এখন আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা।

এই অবস্থাকে নিরবে প্রতিবাদহীন অবস্থায় মেনে নিলে তা হবে প্রকৃতপক্ষে ব্যাপক অর্থে মানবতার পরাজয়েরই নামান্তর। যারা মননশীলতা, সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, মুক্তচিন্তার চর্চায় আন্তরিকভাবে ব্যাপৃত তারা এই বন্ধ্যা অবস্থাকে মেনে নিতে পারেন না। মানুষের মস্তিষ্কের ওপর, তার চিন্তা-চেতনা, মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভাঙতে তাদেরকে এগিয়ে আসতেই হবে। এই লক্ষ্যে বাঙলাদেশ লেখক শিবির-এর উদ্যোগে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখ সকাল ১০.০০ টায় রাজধানীর তোপখানায় অবস্থিত জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মীদের এক প্রতিরোধ সভা। বদরুদ্দীন উমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনু মুহাম্মদ, আজফার হোসেন, আবুল কাসেম ফজলুল হক সহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক-শিল্পী -সংস্কৃতিকর্মীগণ এই উদ্যোগের পুরোভাগে সক্রিয়ভাবে জড়িত আছেন।

এই প্রতিবাদী আয়োজনে শামিল হোন। জনগণের চিন্তার অধিকার হরণের চক্রান্ত প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.