মনিপুরের মাওবাদীদের ডাকা সাধারণ ধর্মঘটে রাজধানীসহ অন্যান্য জেলা অচল

Bandh_20160222

বিটি রোডে পুলিশের ভুয়া এনকাউন্টারের অপরাধ এবং অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে মনিপুরের কমিউনিস্ট পার্টি মাওবাদী  র আহবানে গত ২১শে ফেব্রুয়ারি ডাকা ১২ ঘণ্টা ধর্মঘটে ভারতীয় দখলদারিত্বে থাকা মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল সহ অন্যান্য জেলা অচল হয়ে পড়ে। ধর্মঘটের প্রভাবে সকল বাণিজ্যিক ও পরিবহন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে মিডিয়া এমনটিই জানাচ্ছে।


০২-০৯ই এপ্রিল ২০১৬ঃ আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক পদক্ষেপের ডাক

draft4-BLK-723x1024


বিচারপতির কাছে সোনি সোরি’র চিঠি

[ ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াড়ার একজন স্কুল শিক্ষিকা ৩৫ বছর বয়সি সোনি সোরি। তাঁর স্বামী ছত্তিশগড়ের জেলে বন্দি মাওবাদী সমর্থক সন্দেহে। সোনি সোরিকে নকশাল হিসেবে ভান করতে বলেছিল পুলিশ, তিনি করতে চাননি। তখন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হয়। সোনি সেটা আঁচ করে দিল্লিতে পালিয়ে আসেন সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি আবেদন করার জন্য, কারণ ছত্তিশগড় তাঁর কাছে নিরাপদ নয়। কিন্তু তিনি কোর্টে পৌঁছনোর আগেই ধরা পড়ে যান এবং তাঁর আবেদন সত্ত্বেও তাঁকে সেই ছত্তিশগড় পুলিশ হেফাজতে ফেরত পাঠানো হয়। পুলিশ হেফাজতে সোনি পুলিশের বয়ানে সম্মতি না জানানোয় তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ করা হয় ২০১১ সালের ৮-৯ অক্টোবর রাতে দান্তেওয়াড়ার নতুন থানায়। পরে স্বাধীন ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, শিরদাঁড়া মারাত্মক জখম হয়েছে। ২০১২ সালের ৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির উদ্দেশ্যে সোনি সোরির লেখা একটি চিঠি পাঠ করেন নারী আন্দোলনের কর্মীরা এবং তার ভিডিও ইন্টারনেটে ইউটিউব ওয়েবসাইটে রাখা হয়। নিচে এই চিঠির বাংলা অনুবাদ করেছেন জিতেন নন্দী। ছবি তহলকা ম্যাগাজিনের সৌজন্যে ]

বিচারপতি মহাশয়,
আপনার আদেশ অনুযায়ী আমাকে কলকাতায় চিকিৎসা করা হয়েছে। তার ফলে আমি জীবন ফিরে পেয়েছি। তবে কেন আমাকে আবার ওই লোকেদের কাছেই পাঠানো হল? আমি এখানে নিরাপদ নই। আমাকে অনেক সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যদি আপনাদের আদালত আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি বিশ্বাস করে, তবে আমাকে শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু আমাকে ওইসব লোকেদের মাঝে ছেড়ে দেবেন না। প্রতিটি রাত আর প্রতিটি দিন ওখানে খুবই অসহ্য। আমার ভিতরে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি আপনার বিচারের অপেক্ষায় রয়েছি। ছত্তিশগড় সরকার আমাকে আদালতে নিয়ে আসতে বিলম্ব করেনি। দিল্লির আদালত খুব তাড়াতাড়ি আমাকে ওদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাহলে আপনার আদালতে এই বিলম্ব কেন?
আমার ওপর নির্যাতন কি যথেষ্ট হয়নি? তবে কেন আপনি আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিলেন? আপনার তো আমায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত ছিল। আপনার আদেশের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এটা আমি জীবনে ভুলব না। আমি জানি না কেন দিল্লির আদালত আমার আর্তনাদ শুনতে পায়নি। যদি ওরা আমার অসহায়তা উপলব্ধি করত, আমাকে এই রাজ্যে আসতে হত না। এসব সত্ত্বেও আমাকে ছত্তিশগড় পুলিশের কাছে ফেরত পাঠানো হল। সেই মুহূর্তে আমার হৃদয় বলছিল, ‘আমাকে ওদের সঙ্গে পাঠিও না। ওরা নিজেদের বোন বা মেয়েদের সঙ্গে কী করতে পারে, তোমার কোনো ধারণা নেই।’ কিন্তু মহামান্য আদালতের নিজেদের মেয়ের চেয়ে পুলিশের ওপর বিশ্বাস বেশি। আর সেজন্যই আমি আজ সব হারিয়েছি। আদালত এখনও বুঝতে পারছে না। যাই হোক, আজ একটা মেয়ে অপমানিত হয়েছে। কাল আর একজন হবে।
এটা এক অসহায় মেয়ের আবেদন। দয়া করে কিছু অন্তত করুন, নাহলে আগামীদিনে ওরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ওরা আমাকে বলেছিল, খোদ আদালত তোমায় আমাদের জিম্মায় রাখবার অনুমতি দিয়েছে। এখন আমি কোন আদালতে আবেদন করব? বিচারপতি মহাশয়, এর অর্থ হল, আপনার আদালত আমাকে ওদের হাতে সমর্পণ করেছে। ওরা যা খুশি করতে পারে। আমি এদেশের প্রথম মেয়ে, যাকে আদালতের অনুমতি নিয়ে ওরা এখানে নিয়ে এসেছে আর হৃদয়হীনভাবে আমার ওপর মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন করেছে। আমার ওপর এই অবিচার কেন? আমায় ইলেকট্রিক শক দেওয়া, নগ্ন করে ফেলা, শরীরের ভিতর পাথর গুঁজে দেওয়া — এসব করে কি নকশাল সমস্যার সমাধান হবে?
বিচারপতি মহাশয়, আমার শরীরময় যন্ত্রণা। আপনার বিচার পাওয়ার আগেই যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে দায়ী হবে ছত্তিশগড় সরকার আর পুলিশ। আমি গুরুতর অসুস্থ আর আমার ওপর যা কিছু হয়েছে তা করেছে এসপি অঙ্কিত গর্গ এবং অন্য পুলিশ অফিসারেরা। আমার তিনটি সন্তান। আমি চলে গেলে ওদের দেখার কেউ নেই। আমার স্বামী গত দেড় বছর যাবৎ এক মিথ্যা মামলায় বন্দি হয়ে রয়েছেন। নকশালেরা আমার বাবার বাড়ি লুঠ করে নিয়েছে। আমার সন্তানদের সহায়তা প্রয়োজন। ওরা খুব অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। ওরা আজ নেহাতই অনাথ। বিচারক মহাশয়, এক মায়ের কাছ থেকে তার সন্তানদের জন্য এই আবেদন। আপনি দেখুন, পুলিশ অপরাধ করে যাচ্ছে আর আমি শাস্তি ভোগ করছি।
যদি দেড় বছর আগেই ওদের কাছে হুকুমনামা ছিল, তাহলে কেন ওরা আমাকে গ্রেপ্তার করেনি? আমি পুলিশ স্টেশন এবং সিআরপি ক্যাম্পে বারংবার গিয়েছি। আমি বারবার পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে দেখা করেছি, নিরাপত্তা রক্ষীরাও বহুবার আমার বাড়িতে এসেছে। যখন দান্তেওয়াড়ার কালেক্টর কিংবা অন্য কোনো অফিসার প্রশাসনিক সভা ডেকেছেন, আমি সবসময় উপস্থিত থেকেছি। কেন সেইসময় আমায় গ্রেপ্তার করা হয়নি? ‘এসার’-এর ঘটনায় পুলিশ তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল এবং আমাকে নকশাল হিসেবে ভান করতে বলেছিল। আমি যখন ওদের কথায় রাজি হলাম না, ওরা বলল, তোমার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। যদি তুমি আমাদের জন্য এটুকু করো, তাহলে তোমায় গ্রেপ্তার করব না। একবার ব্যাপারটা ভেবে দেখুন। বিচারপতি মহাশয়, আমি ওই পথে যাইনি।
আমার আবেদন আপনার কাছে,

সোনি সোরি(সোদি)