নেপালের সংবিধান আন্দোলন ও মাওবাদীদের পরিস্থিতি

IMG_3086

২০০৩ সাল পর্যন্তও বিশ্বজনমনে আকাঙ্খা ছিল নেপালে মাওবাদীদের গণযুদ্ধ বিজয় অর্জন করবে এবং নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফলতা লাভ করবে। হিমালয়ের চূড়ায় উড্ডীন কাস্তে-হাতুড়ির লাল পতাকা হবে বিংশ শতাব্দীর একটি সফল বিপ্লবের উদাহরণ। কিন্তু নতুন বিপ্লবে মালেমা-র মৌলিক তাত্ত্বিক বিকাশের আবশ্যকতার নামে প্রচন্ড ও বাবুরাম ভট্টরায়ের নেতৃত্বে “প্রচন্ড পথ” অগ্রসরমান গণযুদ্ধকে বহুদলীয় বুর্জোয়া সংসদীয় পথে চালিত করে, গণযুদ্ধ বিরোধী মাওবাদী দাবীদারদেরকে নিয়ে ইউসিপিএন গঠন করে এবং গণযুদ্ধের সকল বিপ্লবী অর্জনকে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়। নেপাল ও সারাবিশ্বের বিপ্লবাকাঙ্খী জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। তারা রাজতন্ত্র উচ্ছেদের প্রেক্ষিতে প্রচলিত সংসদীয় প্রক্রিয়ায় একটি বুর্জোয়া সংবিধান প্রণয়নের কর্মসূচিকে সামনে নিয়ে আসে। নেপালের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণি এই কর্মসূচিকে  স্বাগত জানায়।

এই পরিস্থিতিতে  কমরেড কিরণের নেতৃত্বে পার্টিতে প্রচন্ড-বাবুরামের নয়া সংশোধনবাদ বিরোধী দুই লাইনের সংগ্রাম শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায়  ইউসিপিএন পার্টি ভেঙ্গে যায়। এবং কমরেড কিরণ ও কমরেড গৌরবের নেতৃত্বে ২০১২ সালে সিপিএন-এম গঠিত হয়। তারা প্রচন্ড পথকে বর্জন করে মালেমা-র ভিত্তিতে পার্টিকে পুনর্গঠনের নীতি গ্রহণ করেছে, বুর্জোয়া নির্বাচনপন্থাকে বর্জন করেছে। এবং নয়া সংবিধান প্রণয়নের  ইস্যুতে কৌশলগত কর্মসূচি দিয়ে গণযুদ্ধের অর্জিত ফলের ভিত্তিতে শহরভিত্তিক অভ্যুত্থান ‘নেপালি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’-এর  মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লাইনে সংগঠন-সংগ্রাম গড়ে তুলছে। ২০১৫ সালে ৮ নভেম্বর দশবছরের গণযুদ্ধের বিরোধী অন্য একটি মাওবাদী দাবিদার ক্ষুদ্র গ্রুপের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পার্টির নতুন নামকরণ করেছে সিপিএন (বিপ্লবী মাওবাদী)। তারা সংশোধনবাদী প্রচন্ডের সাথেও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা চালাচ্ছে। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিপ্লবের মাধ্যমে উচ্ছেদের লাইন না থাকার সমালোচনা করে এ পার্টিতে কমরেড বিপ্লবের নেতৃত্বে পুনরায় দুই লাইনের সংগ্রাম হয়। এবং গণযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় ‘সমন্বিত গণবিপ্লব’ (ইউনিফাইড পিপল্স রেভ্যুলিউশন)-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লাইন গ্রহণ করে কমরেড বিপ্লবের নেতৃত্বে ২০১৪ সালে সিপিএন মাওবাদী গঠিত হয়।

এমতাবস্থায় একের পর এক সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে থাকে। কিন্তু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কোন সরকারই নতুন সংবিধান গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। ফলে দেশব্যাপী এক নৈরাজ্যিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। তারসাথে যুক্ত হয় বড় আকারের ভূমিকম্পের আঘাতে প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয়। নেপালের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের হস্তক্ষেপ আরও ব্যাপকতা লাভ করে।  চীনা পুঁজিবাদ এ অঞ্চলে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রভাব বৃদ্ধি করছে। মাওবাদীদের বাহিনী ও গণক্ষমতা না থাকার কারণে গ্রামাঞ্চলসহ সর্বত্র শাসক বুর্জোয়া ও সামন্তশ্রেণির সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, লুণ্ঠন, নারী নিপীড়ন, মানব পাচার, মাদকব্যবসা, এনজিওদের সুদিব্যবসা এবং সরকারে পুলিশি হয়রানি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যা নেপালি জনজীবনকে রাজতান্ত্রিক শাসনামলের চেয়েও দুর্বিসহ করে তুলেছে।

২০১৫ সালের শেষদিকে নেপালের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণি একটি সংবিধান গ্রহণ করেছে। নেপালের সমাজ কাঠামোতে ঘাসমূল স্তরে মাওবাদীদের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ও  মাওবাদী বিপ্লবীদের সংগঠন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকায় ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাসে সম্পূর্ণরূপে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী একটি সংবিধান গ্রহণ করেছে। নিপীড়িত জনগণ ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার সংকট ও সমস্যা যে তিমিরে  ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। ফলে এই সংবিধানকে কেন্দ্র করে নেপালের রাজনীতি নতুনভাবে মোড় নিয়েছে।

ভারতের উগ্র হিন্দু মৌলবাদী বিজেপি সরকার হিন্দু প্রধান দেশে হিন্দু ধর্মভিত্তিক সংবিধান না হওয়ায় তার বিরোধিতা করছে। এবং  নেপাল  সীমান্তে ভারতীয়  পণ্য প্রবেশে অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে চাপ প্রয়োগ করছে। এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রভাবিত মাধেশী ও থারু জনগোষ্ঠীর আন্দোলনে মদদ দিয়ে চলেছে। অন্যদিকে ভারতীয় কংগ্রেস নেপালের সংবিধানকে সমর্থন করে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী কর্তৃত্বকে বজায় রাখছে। নেপালী কংগ্রেস, ইউএমএল, প্রচন্ড-বাবুরামের ইউসিপিএন ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক বলে নেপালের এই নয়া সংবিধানকে মাথায় করে উদ্বাহু নৃত্য করছে। কমরেড কিরণের নেতৃত্বে সিপিএন(বিপ্লবী মাওবাদী) মাওবাদীদেদের বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যদিয়ে ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে। কমরেড বিপ্লবের নেতৃত্বে সিপিএন মাওবাদী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী সকল স্বার্থের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক-সামরিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং নেপালের জনজীবন ও সংবিধানের এ সমস্যা সমাধান না হলে তারা গণযুদ্ধের সময়কালের মতো সমান্তরাল সরকার হিসেবে বিপ্লবী গণপরিষদের অধীনে অবাধ স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ঘোষণা করবে । সে প্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ জনতা ৬ জানুয়ারি ২০১৬ কাঠমান্ডুর নিকটবর্তী ভারতের বহু সমন্বিত ১.৫ বিলিয়ন ডলারের একক বৃহৎ বিনিয়োগ ললিতপুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতীকী বোমা হামলা করেছে। মদ উৎপাদনকারী কারখানায় আগুন দিয়েছে। ভারতীয় ডিশ লাইন বন্ধ করে দিয়েছে, ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে ৩ জানুয়ারি লুম্বিনি প্রদেশের তিন জেলা রূপচান্দি, নওয়ালপসারি ও কপিলাবস্তুকে অবাধ স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। পার্টির পলিটবুরোর সদস্য নেপালের বিপ্লবী গণপরিষদের প্রধান কমরেড সন্তোষ বুধামাগার এটাকে তুলনা করেছেন মাওবাদী উত্থানের সময়কালের স্বাধীন প্রদেশের সাথে। একইসাথে শীঘ্রই গণপরিষদ ও স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের আইন-কানুন ঘোষণা করার পার্টি পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন।

নেপাল সরকার মাওবাদীদের এই নতুনভাবে বিকশিত সংগ্রামকে দমনের পদক্ষেপ নিয়েছে। ৮ জানুয়ারি ২০১৬ ঝাপা জেলার সেক্রেটারি বিভাস কিরিটিসহ চারজন কমরেডকে পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে জেলা পুলিশ অফিসে রেখেছে। মদের কারখানায় আগুন দেয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। মাওবাদীরা জনগণের  সংগ্রামে বাধা দিলে এবং দমন চালালে সরকারকে সমুচিত জবাব দেয়ার ও প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে  মাওবাদী বিপ্লবী শক্তিকে দমন করে সরকারের টিকে থাকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিপরীতে মাওবাদীদের বিপ্লবী ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইনে সজ্জিত হয়ে পুনরায় ঘাঁটি এলকা গড়ে তুলে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। মাওবাদীদের নেতৃত্বে নেপালের বিপ্লবী সংগ্রামে পোড় খাওয়া শ্রমিক-কৃষকসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ সেপথেই নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের পথে এগিয়ে যাবেন- এটাই মুক্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ‘১৬ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s