সাম্রাজ্যবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে ধ্বংসের পথে বৈশ্বিক জলবায়ু

climate-change-frame-1000px

ক্রমশ তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এক ভয়ানক পরিণতির দিকে এগুচ্ছে পৃথিবী। হুমকির মুখে পড়ছে  স্বল্পোন্নত ও গরীব দেশগুলো। এই বিপজ্জনক পরিণতি বিবেচনা করেই ৩০ নভেম্বর’১৫ থেকে ১৩ ডিসেম্বর’১৫ পর্যন্ত ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত হল জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের উপস্থিতিতে এই জলবায়ু সম্মেলনের ফলাফল নিয়ে আশাহত বিশ্ববাসী। সম্মেলনে যোগ দেওয়া সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী দেশগুলোর হোমরা-চোমরা নেতৃবৃন্দ স্বীকার করেছে যে বিশ্বে ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন রোধে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা দরকার। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে বিশ্বের ধনী দেশগুলোই প্রধানভাবে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী হলেও বরাবরের মতই নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা কার্বন নিঃসরণ কমাতে মূলত অস্বীকার করেছে। যা বিশ্ব জনগণের জন্য একটি অশনি সংকেত।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বর্তমান মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের পর পৃথিবী আর মানুষের বসবাসের উপযোগী থাকবে না। বলা হচ্ছে যে, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রী  সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বাড়লে সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটারের বেশি বৃদ্ধি পাবে। আশংকা করা হচ্ছে ট্রভ্যালো, মার্শাল আইল্যান্ড, মালদ্বীপ সহ নিচু অঞ্চলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপকূলে বসবাসরত ৪ কোটি জনগণ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে জমে থাকা বরফ গলে এক ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক শূন্য ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একটি আইনি বাধ্যবাধকতার চুক্তি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ধনী দেশগুলো তাতে নারাজ। বরং ধনী দেশগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নানা ষড়যন্ত্র করেছে। বারাক ওবামা তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে গোপন চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে যাতে এবারের সম্মেলনে কোনো আইনি চুক্তিতে না যাওয়া হয়। তারা হাই অ্যাম্বিশান গ্রুপ নামে একটি নতুন গ্রুপ করে আফ্রিকান দেশগুলোকে ৮৪০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার লোভ দেখিয়েছে এবং চীন-ভারতকে চাপ দিয়েছে এই গ্রুপে যুক্ত হওয়ার জন্য। প্রসঙ্গত চীন-ভারত বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রিতে রাখতে চেয়েছে আর যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে ২ ডিগ্রিতে রাখতে।

 শেষ পর্যন্ত প্যারিস সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রই সফল হয়েছে। তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার বিষয়ে শিল্পোন্নত দেশগুলো একমত হয়েছে যা স্বল্পোন্নত এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র দেশগুলো মূলত মেনে নিয়েছে। আমাদের দেশের বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা এতে আত্মপ্রসাদ লাভ করছে এবং নিজেরাই বলছে চুক্তিতে অনেক বিষয় অস্পষ্টতা আছে। যে চুক্তি আগামী পাঁচ বছর পর বাস্তবায়িত হবে। আর জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে কোন চুক্তিই হয়নি। মূলত আশ্বাস দেয়া হয়েছে মাত্র। এই চুক্তির বিষয়ে আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের প্রধান ডায়না লিভারমেন বলেন “……এর ভেতর আশাব্যঞ্জক তেমন উপাদান নেই। কারণ এটি কার্যকর হতে হতে আমাদের আরও মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিশেষ করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে, ততদিনে পৃথিবীব্যাপী আরও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতিকর কার্বন নির্গত হবে। তখন আজকের প্রেক্ষাপটের তুলনায় এই চুক্তির কার্যকারিতা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়বে।”

উন্নত ধনী দেশগুলোই মূলত ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। তবুও তাদের এই গড়িমসি, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হচ্ছে তাবৎ বিশ্বের জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর। আসলে মুনাফা লোভী সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ বিশ্ব জনগণের স্বার্থে যে কোন বিষয় মীমাংসা করতে অক্ষম। তারা নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীকে নিয়ে যাবে ধ্বংসের দিকে। আর নিপীড়িত জাতি জনগণকে ঠেলে দেবে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে। বিশ্বের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের এটা উপলব্ধি করা দরকার যে এই বিশ্বের জলবায়ু সহ সমগ্র সংকটই আসলে পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থারই সৃষ্টি। যা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। তাই এই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা উচ্ছেদের মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র এই সংকট নিরসন করা সম্ভব।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ‘১৬ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s