পেরুর বিপ্লবী সংগ্রামে মাওবাদী নারীদের আত্মত্যাগ

পেরুর কান্টো গ্র্যান্ড কারাগারের নারী বন্দীরা

পেরুর কান্টো গ্র্যান্ড কারাগারের নারী বন্দীরা

প্রায় তিন যুগ ধরে পেরুতে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে । শুরু থেকেই এ মুক্তিযুদ্ধে বিপ্লবী যোদ্ধা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের প্রায় অর্ধ সংগঠন শক্তি রয়েছে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে সরকারী বাহিনী অনেক নারীকে হত্যা করেছে। শাসক গোষ্ঠী বন্দি করেছে অনেক নারীকে। অসংখ্য নারীকে বন্দিশালায় হত্যা অত্যাচার-নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে- গুম করা হয়েছে। বিপ্লবী যুদ্ধে নজিরবিহীন আত্মবলিদানের জন্যে আজ ওরা স্মৃতিতে ভাস্বর ও সম্মানিত।

এদের মধ্যে বীর নারী শহীদ এডিথ লাগোস অন্যতম। ১৯৮২- এর দিকে এই নারী ছিলেন ১৯ বছরের নবীন গেরিলা যোদ্ধা। তিনি আয়াকুচো জেলখানায় গোপন গর্ত খননের কাজে একটি ছোট গেরিলা দলের নেতৃত্ব দেন। এই গেরিলা দল সকল বন্দি বিপ্লবীদের মুক্ত করে নিরাপদে ফিরে আসে। এই ঘাঁটি থেকে অনেক সরকারী অস্ত্রশস্ত্র দখল হয়। পরবর্তীতে এডিথ লাগোস পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। শাসক শ্রেণী তাদেরই সৃষ্ট আইনে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য এডিথ লাগোস আয়কুচোতে অনেক জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশের জন্য শেষকৃত্যানুষ্ঠানে জনতার ভীড়কে সরকার বেআইনি ঘোষণা করে। তবুও ৭০,০০০ জনপদ অধ্যুষিত আয়কুচোতে ৩০,০০০ লোক এডিথের বিদায়ের শোক মিছিলে যোগদান করে।

শুধু পেরুতেই নয়-এডিথ লাগোস বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীদের আদর্শের প্রতীকে পরিণত হন। ’৯২ সালে জার্মানির তরুণ বিপ্লবীরা এডিথ লাগোস গ্রুপ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী কবিতা গানে এডিথ লাগোসের বীরত্বের কথা ছড়িয়ে পড়েছে।

আর এক মহান বিপ্লবী নারী যোদ্ধা হচ্ছেন লোরা জ্যাম্বানো পাছিলা নামে একজন স্কুল শিক্ষিকা। যিনি মিচি নামেই সর্বাধিক পরিচিত। ১৯৮৪ সালে তাঁকে বন্দি করে ১০ বছর সাজা দেয়া হয়। শাসক গোষ্ঠী মিচি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে রাজধানী লিমা অঞ্চলে পার্টি সংগঠনে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখার জন্য। ১৯৮১ সালের মার্চে জারীকৃত তথাকথিত সন্ত্রাস বিরোধী ৪৬ ধারা অনুসারে তাকে দোষী বলে সিদ্ধান্ত নেয়। প্রেসিডেন্ট এই অধ্যাদেশ বলে পেরু কমিউনিস্ট পার্টি(পিসিপি)কে বেআইনি ঘোষণা করে। তারা সন্ত্রাস শব্দটির একটি আইনগত সংজ্ঞা প্রদান করে- যার অর্থ হলো পিসিপি চালিত সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে যে কোন মন্তব্যই সন্ত্রাসের আওতাধীন।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত “বিশ্ব বিজয়” (A world to win)- AWTW পত্রিকায় ১৯৮৫ সালে মিচির একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। সে বিবৃতিতে মিচি বিশ্ববাসীকে বলেছিলেন- “যে পুরনো ঘুণে ধরা শোষণনীতি, অত্যাচারী আইন ও বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে তা এই রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিবিপ্লবী বৈশিষ্টকেই তুলে ধরেছে। এমনকি এই আইনি ব্যবস্থার অন্ধ ও অমানবিক খুঁটিনাটি দিকগুলোকেও নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। কিন্তু আইনের নামে এই কসাইখানার শাস্তি ও শোষণ নীতি বিপ্লবীদের দমন করতে পারেনি। ওরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এবং বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সকল কালাকানুন প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০ জুলাই দু’জন নারী পুলিশ আমাকে আটক করে। ২৩ জুলাই পর্যন্ত আমি সিভিল গার্ডের নিয়ন্ত্রনে থাকি। সে কয়দিন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আমাকে সকল ধরণের নির্যাতন চালায়। ওরা আমার সকল মনোবল চুরমার করে দিতে চেষ্টা করে। মিথ্যা স্বীকারোক্তির জন্যে আমার উপর অত্যাচার চালায়। সবচেয়ে জঘন্য ও বিকৃত নির্যাতনের মাধ্যমে আমার বিপ্লবী নৈতিকতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। সেখান থেকে আমাকে সন্ত্রাস দমনকারী পুলিশ বাহিনীর কাছে পাঠানো হয়। যেখানে ৪ আগস্ট শনিবার পর্যন্ত আমাকে তাদের মাটির নীচে কারাকক্ষে থাকতে হয়। আমাকে তিন ধরণের নির্যাতন সহ্য করতে হয়।

() মানসিক নির্যাতন- যাতে ছিল নিদ্রাহীন ও বিশ্রামহীন অবস্থায় একনাগাড়ে ৪ দিন দাঁড়িয়ে থাকা, সর্বক্ষণ প্রহরীর দৃষ্টি আতঙ্কিত ও নির্যাতিত অবস্থায়।

() এভাবে তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে, আমার দেহের বিভিন্ন অংশে পিটাতে শুরু করে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি, ফুসফুস ও মস্তিষ্কে।

() তারপর পিঠ মুড়ে হাত বেঁধে আমাকে শিকল দিয়ে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আর আমার সর্ব অঙ্গে চলতে থাকে প্রহার। তারপর এসিড কিংবা পায়খানার মলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। কারণ ওরা আমাকে শারীরিকভাবে ধ্বংস করে দিতে চেষ্টা করে।

 রক্তপাত ঘটিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলচক্র বিপ্লবকে ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু যতই রক্তপাত ঘটছে বিপ্লব ততই তীব্র হচ্ছে। ঝরে যাওয়া রক্তে বিপ্লব তলিয়ে যায় না বরং ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিক্রিয়াশীল হায়েনার দল জনগণের লাশ খাওয়ায় স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামের লেলিহান শিখা তাদের পুড়িয়ে ছাই ভস্মে পরিণত করবে। আমাদের লক্ষ্য পৃথিবীকে পরিবর্তন করা। নতুন বিশ্ব পুরনো পৃথিবীকে পরাজিত করবেই।”

সূত্রঃ [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী পত্রিকা – রেভ্যুলেশনারী ওয়ার্কার, লন্ডন থেকে প্রকাশিত “বিশ্ব বিজয়”-(AWTW) এবং ব্রিটেনের টিভি Channel 4 কর্তৃক প্রচারিত পেরুর যুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা অবলম্বনে লিখিত।]

Advertisements