পেরুর সংগ্রামী এলাকায় নতুন শক্তি ও নতুন নারীদের অবস্থান

 

fmln-16

গ্রামাঞ্চলের মূল বিপ্লবী এলাকাগুলোতে(Base Area) গণযুদ্ধে নতুন জনশক্তি গড়ে উঠেছে। জনগন নতুন নতুন সংগঠন, নতুন রেজিমেন্টে এবং নতুন বিপ্লবী কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে।  নারীদের জীবনে এ কর্মসূচীর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। নারী নির্যাতনের মূলভিত্তি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, নারী নেতৃত্ব এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে নারী ও পুরুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসছে। যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক সম্পদ ও সম্পর্কের কথা।

গণকমিটি নির্বাচিত হচ্ছে। তাদের নেতৃত্ব সংগঠিত হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা, নতুন সংস্কৃতি, বিচার ব্যবস্থা, জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক। গণ প্রতিনিধিগণ এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে পুরনো ঘুণে ধরা উৎপাদন ও বিনিময় সম্পর্ক উচ্ছেদ করে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে। অতীতে বড় বড় সামন্ত প্রভু ও মাদক ব্যবসায়ীদের খবরদারীতে উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হত। এখন গণযুদ্ধের অনুকূলে যৌথ শ্রম ও আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংঘটিত হচ্ছে। জমিদারদের জমি দখল করে ভূমিহীন ও গরীব চাষীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হচ্ছে। জমি শুধু পরিবার প্রধান পুরুষদের নামে দেয়া হয়নি, পরিবারের সকল সদস্যদের নামে বরাদ্দ করা হয়। সম্পত্তির উপর নারীদের সমান অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ থাকে। প্রত্যেক পরিবারকে ভিন্ন ভিন্ন জমি বরাদ্দ করা হলেও চাষাবাদ ব্যবস্থা/পদ্ধতি পরিবার ভিত্তিক নয়। চাষের কাজ যৌথভাবে পরিচালিত হয়। যেখানে সার্বিক সমাজ কল্যাণে সকলকেই অংশগ্রহণ করতে হয়।

দাবী জানালে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমুতি প্রদান করা হয়। নারী ও সন্তানেরা স্বামী কিংবা পিতার সম্পত্তি নয়। পিতা অথবা স্বামীর অনুমতি ছাড়াই নারীরা ইচ্ছা করলেই গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। গণকমিটিগুলো বেশ্যাবৃত্তি, মাদকশক্তি, স্ত্রী পেটানো বন্ধ করে দিয়েছে।  বিধবা ও বয়স্করা সমাজের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে থাকে। শিক্ষা সুবিধা সকলের জন্য সহজলভ্য। সামন্ত ও পুঁজিবাদী প্রথায় জবরদস্তিমূলকভাবে কৃষকদের যে অবস্থায় বাস করতে বাধ্য করতে হতো- এসব ব্যবস্থা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সংগ্রামী এলাকাগুলোতে সর্বক্ষেত্রেই অভিনব রূপান্তর কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতা চলছে।  এভাবেই গণযুদ্ধ সমগ্র জাতির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পথকে প্রস্তুত করে দিচ্ছে।

১৯৮২ সালে এল কোল্লাওতে এক নারী বন্দির সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে নারীদের ভুমিকার গুরুত্বকে তুলে ধরে।  লিলিয়ান টয়েছ ছিলেন লিমার রাজপথের ফেরিওয়ালা। গণযুদ্ধে যোগদানের অপরাধে তাকে জেল বন্দি করা হয়।  তিনি বলেন, প্রথম যখন ওরা আমাকে পার্টিতে যোগদানের প্রস্তাব আনে, তখন আমি কিছুটা আতংকিত হয়ে পড়ি।  কিন্তু পরিশেষে আমি যখন বুঝতে পারলাম, আমি শুধু পেরুর জন্যে যুদ্ধ করছি না, যুদ্ধ করছি সারা বিশ্বকে শৃঙ্খল মুক্ত করার জন্যে, বিশ্ব বিপ্লবের জন্যে। তারপর আমি আতংক মুক্ত হলাম।  অবশেষে বুঝলাম আমার বাঁচা-মরার কিছু উদ্দেশ্য আছে। তখন আমি বাজারে সবজির মত বেচাকেনা হতে অস্বীকার করলাম। এমনি ধারণায় সজ্জিত হয়ে অসংখ্য নারী যোদ্ধা বিপ্লবকে শক্তিশালী ও বিজয়মণ্ডিত করতে এগিয়ে আসছে।

সূত্রঃ [মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী পত্রিকা – রেভ্যুলেশনারী ওয়ার্কার, লন্ডন থেকে প্রকাশিত “বিশ্ব বিজয়”-(AWTW) এবং ব্রিটেনের টিভি Channel 4 কর্তৃক প্রচারিত পেরুর যুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা অবলম্বনে লিখিত।]

Advertisements

বাংলাদেশঃ ৮ই মার্চ অান্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘বিপ্লবী নারী মুক্তি’ এর ডাক

1

2

3

4

 

5


বাংলাদেশের গণযুদ্ধে শহীদ নারী কমরেড ‘রাবেয়া আখতার বেলী’

রাবেয়া আখতার বেলী

রাবেয়া আখতার বেলী

কমরেড ‘রাবেয়া আখতার বেলী’

উপজেলা – আক্কেলপুর, জয়পুরহাট

৬০ এর দশকের শেষের দিকে বগুড়ার জয়পুরহাট এলাকায় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যে কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ছমির মণ্ডল ছিলেন তার স্থপতি।  কমরেড রাবেয়া আখতার বেলী ছিলেন ছমির মণ্ডলের অন্যতম সহকর্মী।  তিনি ছাত্র ইউনিয়ন(মাহবুবুল্লাহ) বগুড়া শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন; একই সাথে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি বগুড়া শাখার নেতৃস্থানীয় সংগঠকও ছিলেন তিনি।

’৭১ সালে পাকবাহিনী বাঙ্গালী নিধন করা শুরু করলে ছমির মণ্ডলের নেতৃত্বে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের যে প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়েছিল বেলী তাতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন।

পাকবাহিনী জয়পুরহাটে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে ভারতে যাওয়ার পথে বেলী ছমির মণ্ডলসহ পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন।  পাক সেনারা ছমির মণ্ডল, কাজল মাঝি, আব্দুল মেম্বরকে হত্যা করে এবং বেলী ও অন্যান্যদের ছেড়ে দেয়।  এলাকায় ফিরে এসে ছমির মণ্ডলের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বেলী পুনরায় প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠিত করার প্রস্তুতিকালে মুসলিম লীগ ও জামাতরা তাকে আটক করে পাকবাহিনীর নিকট সোপর্দ করে।  খুনী পাক সেনারা বেলীর সহযোদ্ধা আজম, কুদ্দুস, সাত্তার, ফজলু, মোফাজ্জেল এযারতকে হত্যা করে এবং তাকে একটি বাড়ীতে অন্তরীন করে রাখে।  আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় কিছু লোকের তদবীরে বেলী পুনরায় ছাড়া পান।

পরে বেলী ভারতে চলে যান। বামপন্থি হওয়ার অপরাধে সেখানেও ভারতীয় সম্প্রসারনবাদী ও আওয়ামীপন্থীরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে, ফলে ভারতে পালিয়ে থাকতে হয়।  ’৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি বেলী দেশে ফিরে আসেন।  ইতিমধ্যেই মুসলিম লীগ- জামাতের একাংশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। শ্রেণীগত ভাবে মিত্র আওয়ামী লীগ- জামাত যৌথ ভাবে বেলীকে খোঁজ করতে থাকে।  তাই আক্কেলপুরে নিরাপত্তার সমস্যা হতে পারে ভেবে বেলী জাফরপুর ফুফুর বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন।  পথিমধ্যে আওয়ামীলীগ মুক্তিবাহিনী বেলীকে হত্যা করে লাশ পলাশপুরে ফেলে রেখে চলে যায়।  পরে স্থানীয় জনগণ এখানেই লাশ কবর দেন।

ছমির মণ্ডলের নেতৃত্বে গড়ে উঠা কৃষক আন্দোলনের যোগ্য উত্তরসূরী রাবেয়া আখতার বেলী।  মুসলিম লীগ, জামাত, আওয়ামীলীগ এই গণশত্রুরা গড়ে উঠা কৃষক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধ্বংসের জন্যে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। তৎকালীন সামাজিক বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে মফস্বল এলাকার একজন নারী নেত্রী হিসেবে জনগণের শোষণের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্যে যে লড়াই করে গেছেন তা নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীদের বিশেষতঃ শৃঙ্খলাবদ্ধ নারী জাতিকে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে প্রেরণা দেবে।