গেরিলা দলঃ ‘জাপানিজ রেড আর্মি (JRA)’ পরিচিতি

Japanese Red Army

১৯৭১ সালে লেবাননে বসে ফুসাকো শিগেনোবু তৈরি করেন বাম মিলিশিয়ার এই দলটি। সংগঠনটির সদস্যরা বিশেষ করে ইসরায়েলের লড এয়ারপোর্টে পিএফএলপি কর্তৃক সংঘটিত ২৭ হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের জাপানিজ রেড আর্মি (নিহন শেকিগুন) পরিচয় দিতেন।
শিগেনোবু জাপানের বামপন্থি সংগঠন রেড আর্মি ফ্যাকশনের (শিকেগুন-হা) নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। বিপ্লবের সমর্থনে শিকেগুন-হা নিজস্ব দল গঠন করেন এবং ১৯৬৯-এর সেপ্টেম্বরে তারা স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। দল গঠনের পর পরই পুলিশ তাদের অনেককে গ্রেফতার করে। রেড আর্মির ইন্টেলেকচুয়াল লিডার এবং প্রতিষ্ঠাতা তাকায়া শিওমিকেও বন্দি করা হয় এ সময়। রেড আর্মি ফ্যাকশন (শিকেগুন-হা) তাদের প্রায় ২শ সদস্য হারায়। এ ঘটনার পর কিছু সদস্য মাওপন্থি সংগঠনের সঙ্গে মিলিত হয়ে গঠন করে রেনগো শিকেগুন (ইউনাইটেড রেড আর্মি)। সে বছরই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে রেনগো শিকেগুন ১২ সদস্য হারায়। এর পর শতাধিক পুলিশি অভিযানে রেড আর্মি, ফ্যাকশন ইন জাপান ১৯৭১-এর জুলাইয়ে ধ্বংস হয়।
ফুসাকো শিগেনোবু তখন জাপান ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে দেশত্যাগী হন সামান্য কিছু আত্মত্যাগী মানুষ। তবে বলা হয় তার দলে ৪০ সদস্য ছিলেন যার সমন্বয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাম সংগঠন হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তারা।
১৯৭১ সাল থেকে জাপানিজ রেড আর্মি এবং পিএফএলপি দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। যখন ১৯৭২-এ ইউনাইটেড রেড আর্মি ইন জাপান ধ্বংস হয়ে গেল তখন শিগেনোবুর দল পিএফএলপির ওপর তাদের অর্থ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র বিষয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
জাপানিজ রেড আর্মির উদ্দেশ্য ছিল জাপানের সম্রাটতন্ত্র উচ্ছেদ এবং বিশ্ব বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটানো। এই দলটি আরো একাধিক নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। যেমন এন্টিইমপেরিয়ালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড (এআইআইবি), হোলি ওয়ার ব্রিগেড এবং এন্টিওয়ার ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট।
ফুসাকো শিগেনোবু ২০০০ সালের নভেম্বরে জাপানের ওসাকা থেকে গ্রেফতার হন। এতে সারা বিশ্ব বিস্মিত হয়। কারণ সবাই ভাবত ফুসাকো লেবাননে থাকেন। তাকে আসামি করা হয় নাটকীয় আক্রমণ, অপহরণ, ছিনতাইয়ের অভিযোগে। অথচ সমালোচকরা তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভীতি উৎপাদনকারী মহিলা সন্ত্রাসী’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। শিগেনোবু ১৯৭২-এ লড বিমানবন্দর হামলার একজন পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ২০০৬ সালে জাপানের একটি আদালত তাকে ২০ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে।

রেড আর্মির আক্রমণ (১৯৭০-১৯৮০)-

৩১ মার্চ, ১৯৭০ : জাপান এয়ারলাইন্সের ৩৫১ নং ফ্লাইট, বোয়িং ৭৪৭ বিমান টোকিও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২৯ যাত্রী নিয়ে আকাশে ওড়ে। বিমানটিকে রেড আর্মি ফ্যাকশন বাধ্য করে ফুকুওকা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে। এরপর সিউলে সমস্ত যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বিমানটিকে উত্তর কোরিয়ায় নিয়ে বিমানসহ ক্রুদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার জন্য ইয়োশিমি তানাকা দণ্ডিত হয় ১২ বছরের কারাবাসে। পুলিশের ভাষ্যমতে তার আট সঙ্গী উত্তর কোরিয়াতেই মারা যায়।
৩০ মে, ১৯৭২ : লড এয়ারপোর্ট ম্যাসাকার। এ আক্রমণে তিনজন জাপানিজ রেড আর্মি সদস্য অংশ নেন। একজন গ্রেনেড ফাটিয়ে আত্মহত্যা করেন। যদিও অনেকে সেটাকে দুর্ঘটনা মনে করে। আরেকজন মারা যান ক্রসফায়ারে। আর তৃতীয়জন কোজো ওকামোটো কেবল বেঁচে যান। অনেকের ভাষ্যমতে এই ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের সুইসাইড অ্যাটাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই আক্রমণের পেছনে পিএফএলপি জড়িত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল কিন্তু তা আজো প্রমাণিত হয়নি।
জুলাই, ১৯৭৩ : রেড আর্মি সদস্যরা নেদারল্যান্ডসের ওপর থেকে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে। লিবিয়াতে সমস্ত যাত্রী নামিয়ে ছিনতাইকারী সদস্যরা বিমানটাকে ধ্বংস করে দেয়।
জানুয়ারি, ১৯৭৪ : রেড আর্মি সিঙ্গাপুরে থেকে ৫ জনকে জিম্মি করে। একই সময়ে পিএফএলপি কুয়েতের জাপান দূতাবাসে দখল করে। আটককৃতদের মুক্তির জন্য দাবি করা হয় মুক্তিপণ, সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য বিমান।
১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ : নেদারল্যান্ডসের হেগে ফরাসি দূতাবাস দখলে নেয় রেড আর্মি। রাষ্ট্রদূত এবং আরো ১০ জনকে বন্দি করা হয়। দাবি ছিল রেড আর্মির দণ্ডিত আসামি ইয়াৎসুকা ফুরাইয়াকে মুক্তি দিতে হবে। সঙ্গে ৩ লাখ মার্কিন ডলার এবং একটি বিমান।
আগস্ট, ১৯৭৫ : রেড আর্মি কুয়ালালামপুরে ৫০ জনকে জিম্মি করে। যার মধ্যে একজন ইউএস কনসাল এবং একজন সুইডিশ চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স ছিলেন। ৫ জন সঙ্গীকে মুক্ত করে তারা লিবিয়াতে উড়ে যায়।
সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ : জাপান এয়ারলাইন্সের ৪৭২ নং ফ্লাইট ভারত থেকে ছিনতাই করে ঢাকায় অবতরণ করতে বাধ্য করে রেড আর্মি। দাবি অনুযায়ী জাপান সরকার ৬ জন রেড আর্মিকে মুক্তি দেয় এবং ৬ মিলিয়ন ডলার দেয় জিম্মিদের মুক্তিপণ হিসাবে।
মে, ১৯৮৬ : কানাডা, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের জাকার্তা দূতাবাসে মর্টার হামলা করে।
জুন, ১৯৮৭ : রোম ও ইতালিতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে মর্টার হামলা।
এপ্রিল, ১৯৮৮ : ইতালির নেপলসে ইউএস মিলিটারি রিক্রিয়েশনাল ক্লাবে বোমা হামলায় চালায়। ৫ জন সেনা নিহত হয়।

Advertisements

বিপ্লবী চলচ্চিত্রঃ ‘Thomas Sankara: The Upright Man’

2015_06_27_07_00_55_YDZS2WzhQTzUdLG7t8EJJRT60p88kb_original

থমাস সানকারাঃ দি আপরাইট ম্যান(Thomas Sankara: The Upright Man) চলচ্চিত্রটি বুরকিনা ফাসো’র সাবেক প্রেসিডেন্ট থমাস সানকারা’র উপর ভিত্তি করে ২০০৬ সালে নির্মিত। তরুণ নেতা থমাস সানকারা আফ্রিকার চে হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পশ্চিম আফ্রিকার একটি ক্ষুদ্র দেশ বুরকিনা ফাসো। যদিও আগে দেশটির নাম ছিল রিপাবলিক অব আপার ভোল্টা। দেশটিতে টানা ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন স্বৈরশাসক ব্লাসিই কমপাওর। ১৯৮০ সালের দিকে এক নির্বাচনী পন্থায় এই স্বৈরশাসক পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য দেশের ক্ষমতায় থাকার জন্য একটি নামকাওয়াস্তে নির্বাচনের আয়োজন করেন। কিন্তু দেশের সাধারণ জনতা ব্লাসিই’র এই কালোকানুন মেনে নিতে চায়নি। তারা ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ঠিক সেই সময়ই ১৯৮৩ সালে এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন থমাস সানকারা ও তার দল। যদিও এই অভ্যুত্থানে দেশটির আপামর জনগণের সাড়া ছিল ইতিবাচক। অবশ্য বন্দুকের নল মারফত ক্ষমতা দখল করার কারণে পশ্চিমা দেশগুলো সানকারাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সানকারা একজন যোগ্য বিপ্লবীর সম্মান পাচ্ছেন। ১৯৮৭ সালে যখন সানকারাকে হত্যা করা হয় তখন তার বয়স মাত্র ৩৭ বছর। মৃত্যুর আগে তিনি শাসনক্ষমতায় মাত্র চার বছর থাকতে পেরেছিলেন। তাকে যখন হত্যা করা হয় তখন তার মতাদর্শিক মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। অথচ তার মৃত্যুর পর বিশেষত তরুণদের মধ্যে তার মতাদর্শীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ফ্রান্স থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটিতে বেশ কয়েকবার ক্যু হয়। পঞ্চমবারের ক্যুতে হত্যা করা হয়েছিল সানকারাকে।
সানকারার জাতীয়তাবাদী নীতি সেসময়ে অতটা জনপ্রিয় না হলেও বর্তমানে দেশটিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং এর সুফল পেতে শুরু করেছে দেশবাসী। অল্প কিছু বছরের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হয়ে উঠেছিল দেশটি। অথচ তার মৃত্যুর পর আবারও দরিদ্রতা আর দুর্নীতির অন্ধকারে ঢেকে যায় দেশটি। সানকারা সম্পর্কে দেশটির অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নোয়েল নেবেল একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সানকারা বুরকিনা ফাসোকে স্থানীয় জনশক্তি এবং জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল করতে চেয়েছিলেন। সকল প্রকার বৈদেশিক সাহায্য সহযোগিতার বিরোধী ছিলেন তিনি। আর এর শুরু তিনি করেছিলেন কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন দিয়ে। তিনি দেশের ধনী শ্রেণীকে ভেঙে দিয়েছিলেন যাতে দেশের কৃষিজীবী মানুষগুলো তাদের প্রাপ্য পায়। সর্বোপরি দেশ যাতে স্বনির্ভর হয় সেই চেষ্টাই ছিল সানকারার রাষ্ট্রনীতির মূল বিষয়।’ বুরকিনা আদালতের ৪৭ বছর বয়সী আইনজীবী ইসমাইল কাবোরে বলেন, ‘আপনি যখন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একজন বুরকিনাবে ভাববেন তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার ভেতর নিজের দেশ ও জাতি সম্পর্কে একটা ভাবাবেগ কাজ করবে। প্রথমদিকে মানুষের কাছে বুরকিনা ফাসো নামটি উদ্ভট লাগছিল। কারণ ততদিনে তারা বহির্দেশীয় নামে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সানকারার মৃত্যুর পর তারা বুঝতে পারলো যে সানকারা তাদের দেশের একটি বিশেষ এবং অদ্বিতীয় নাম দিয়েছেন। যে নামের মাধ্যমে দেশের অতীত ঐতিহ্য এবং ইতিহাস সম্পর্কে সহজেই জানা যায়।’ সানকারা তার জীবদ্দশায় শুধু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেননি। পাশাপাশি দেশীয় রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন এবং দেশবাসীর জীবনযাত্রা উন্নত করতে তিনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদে ১৯৮৭ সালের ১৫ অক্টোবর ব্লাসিই কমপাওরে ও তার ১২ জন সঙ্গী নির্মমভাবে হত্যা করে সানকারাকে। হত্যার পর সানকারার মৃতদেহ অজানা এক স্থানে মাটিচাপা দেয়া হয়। তার মৃত্যুর পর কমপাওরের নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসো খুব দ্রুত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে যুক্ত হয়। অথচ এই সংস্থার দুটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের মানুষকে দরিদ্র করতে চাননি সানকারা।

Stream and Download Link:
Full Movie in HD from Mediafire


ছত্তিশগড়ে মাওবাদী গেরিলাদের হামলায় ২ বিএসএফ জওয়ান খতম, আহত ৪

4bk37cf94274a34u2v_620C350

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে মাওবাদী গেরিলাদের হামলায় দুই বিএসএফ জওয়ান খতম এবং ৪ জন আহত হয়েছে। আজ (শনিবার) ছত্তিসগড়ের কাঙ্কের জেলায় মাওবাদীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আহত জওয়ানদের মধ্যে দুই জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হতাহত জওয়ানরা ১২২ ব্যাটেলিয়ানের সদস্য। নিহতরা হলেন- বিজয় কুমার এবং মুকেশ।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ, ছোটেবেটিয়ার কাছে বেচঘাট এলাকায় বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে গতকাল রাত থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। ভোররাত আড়াইটে নাগাদ চলা সংঘর্ষে ৬ জওয়ান আহত হয়। পরে তাদের চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে রাইপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। রাইপুরে যাওয়ার সময় দুই জওয়ানের মৃত্যু হয়। আহত জওয়ানরা হলেন- মনোজ কুমার, সিপ্তেন থমসন, জগদীশ কুমার এবং বাপ্পা দেবনাথ। সংঘর্ষে মাওবাদীদের পক্ষেও কয়েকজন আহত হয়েছে। হামলাকারী মাওবাদীদের খোঁজে নিরাপত্তা বাহিনী সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে।

এদিকে, অন্য একটি ঘটনায় শুক্রবার ছত্তিশগড়ের সুকমা জেলায় মাওবাদীদের পেতে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে ১ সিআরপিএফ জওয়ান নিহত এবং ৪ জওয়ান আহত হয়। এখানে একটি সড়ক নির্মাণের জন্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী আইইডি’র কবলে পড়লে হেড কনস্টেবল রঙ্গা রাঘব প্রাণ হারান। এদিন সিআরপিএফ-এর ২১৭ নম্বর ব্যাটেলিয়ানের জওয়ানরা টহল দেয়ার সময় বিস্ফোরণ ঘটলে ডেপুটি কমান্ডার শ্রীনিবাস, ডেপুটি কমান্ডার প্রভাত ত্রিপাঠি এবং হেড কনস্টেবল রঙ্গা রাঘব এবং অন্য দুই জওয়ান আহত হয়।

অনুবাদ সূত্রঃ http://www.hindustantimes.com/india/2-bsf-men-killed-4-injured-in-naxal-encounter-in-chhattisgarh/story-7TBJBbqxxXd2AYXGPpa0YI.html


“আদিবাসী নারীদের ‘উত্যক্ত এবং গণধর্ষণ’ এর জন্যে নিরাপত্তা বাহিনী দায়ী” – নকশাল নেতা

IMG-20150802-WA014_2500415f

বস্তারে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো ৪০জনের মধ্যে ৮জন ছিল মাওবাদী, বাকিরা ছিলেন নিরীহ গ্রামবাসী।

বস্তারের আইজি এসআরপি কাল্লুরি দাবি করেছিল- ‘২০১৬ সালের প্রথম ২মাসে ৪০জন মাওবাদীকে হত্যা করা হয়েছে’। কাল্লুরির দাবিকে বর্জন করে দিয়ে নকশাল নেতা ‘গণেশ উইকি’ বলছেন- ‘হত্যাকৃত ৪০জনের মধ্যে ৮জন মাওবাদী ছিলেন’।

সিপিআই(মাওবাদী) দক্ষিণ আঞ্চলিক কমিটি’র সম্পাদক ‘গণেশ উইকি’ এক প্রেস বিবৃতিতে দাবি করে বলেন- মাওবাদী বিরোধী অভিযানের নামে বস্তার পুলিশ ৭জন নারীসহ ৪০জনকে হত্যা করেছে।’ তিনি বলেন- নিহতদের মধ্যে বিজাপুর জেলায় ১৭, সুকুমা জেলায় ১২, দান্তেওয়াদায় ৩, কোন্দাগাঁদনে ৫ ও বস্তারের ৩ জন ছিলেন। এই ৪০ জনের মধ্যে, মাত্র ৮জন আমাদের পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি’র সদস্য ছিলেন। বাকিরা ছিলেন নিরীহ গ্রামবাসী, এই সব নির্দোষ কৃষক ও গ্রামবাসীদের ভুয়া এনকাউণ্টারের নামে হত্যা করা হয়েছে।”

‘গণেশ উইকি’ এছাড়াও আদিবাসী নারীদের “উত্যক্ত এবং গণধর্ষণ” এর জন্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিযুক্ত করেন এবং এই সমস্ত ঘটনার প্রতিবাদে ১২ই মার্চ দক্ষিণ বস্তারে বনধ ডাকা হয়েছে।

‘গণেশ উইকি’ বলেন, “কিন্তু কাল্লুরি এবং রমন সিং সরকার মাওবাদীদের হত্যার দাবী করেছে, কোন সামাজিক সংগঠন, আইনি সংগঠন বা সাংবাদিক, যারা এই হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, তারাই পুলিশ ও প্রশাসনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।”-

অনুবাদ সূত্রঃ thehindu.com


ধর্ষণই বেতন দক্ষিণ সুদানের সেনাদের!

Sudan_2200498b

প্রাচীন রোমে সেনাদের বেতন হিসেবে লবণ দেওয়া হতো। মাঝখানে কেটে গেছে বহু সময়। এখন অবশ্য সেনাদের বেতন নগদ অর্থেই মেটায় সরকারগুলো। কিন্তু দক্ষিণ সুদানে এবার সেনাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে ধর্ষণের বিনিময়ে। এমন অস্বাভাবিক ও গা শিউরে ওঠা বিভৎসতায় স্তম্ভিত পুরো বিশ্ব।

‘চোখের সামনে স্বামীকে হত্যা করলো সেনারা। আর তারপরই ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর ওপর হায়নার মতো ঝাপিয়ে পড়লো ১০ জন।’- এই দু’টো লাইন একটা নির্দিষ্ট ঘটনাকে উপস্থাপন করলেও এই চিত্রনাট্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা দক্ষিণ সুদানে।

খোদ জাতিসংঘ বলছে, দেশটির সরকার তার সেনা ও মিলিশিয়াদের জন্য বেতন হিসেবে ধর্ষণকে বৈধতা দিয়েছে।

শুক্রবার (১১ মার্চ) প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করেছে বিশ্বসংস্থাটি। এতে জানানো হয়, ২০১৫ সালে শুধুমাত্র দেশটির তেলসমৃদ্ধ ইউনিটি রাজ্যেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক হাজার তিনশ নারী।

দেশটির এমন পরিস্থিতিকে বিশ্ব মানবতার ‘সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চেহারা’ বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দূত জেইদ রা’আদ আল আল হুসেইন।

এক নারী প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর স্বামীকে হত্যার পর তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে গোটা দশেক সেনা। পাষণ্ডের মতো তাকে গণধর্ষণ করে তারা।

জাতিসংঘ বলছে, দক্ষিণ সুদানে সেনাদের জন্য অপহরণ, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, হত্যা-গণহত্যার বৈধতা দিয়ে রেখেছে দেশটির সরকার।

প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, আমাদের মূল্যায়নকারী দল তথ্য পেয়েছে, দক্ষিণ সুদানিজ আর্মির (এসপিএলএ) সঙ্গে কাজ করা দেশটির সশস্ত্র মিলিশিয়াদের সঙ্গে সরকারের ‘যেকোনো কিছু করার ও যেকোনো কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার’ চুক্তি রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়েছে, এ চুক্তির পর দেশটির সেনারা বিভিন্ন বাড়িতে হানা দিয়ে সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া, ধর্ষণ এবং নারী ও কিশোরীদের অপহরণ শুরু করে। এগুলোই তাদের বেতন বলে ধরা হয়।

এছাড়া, বিরোধীদের সমর্থনের অভিযোগে দেশটিতে শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অনেককেই জীবন্ত পুড়িয়ে বা শিপিং কন্টেইনারে পুরে শ্বাসরোধ করে কিংবা গাছের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে সেনারা। কাউকে কাউকে তো কেটে টুকরো টুকরোও করা হয়েছে।

অপর এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও দক্ষিণ সুদানের সেনাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাটির দাবি, এ অভিযোগের পক্ষে তাদের কাছে প্রমাণও রয়েছে।

প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ৬০ জনেরও বেশি নিরস্ত্র মানুষকে শিপিং কন্টেইনারে পুরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে সেনারা। হত্যার পর তাদের দেহগুলো ইউনিটি রাজ্যের লীর শহরের একটি মাঠে পুঁতে ফেলা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির লামা ফাইখ বলেছেন, দেশটির সরকারি বাহিনীর সদস্যরা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। নির্যাতন করে ধীরে ধীরে তাদেরকে বিভীষিকাময় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, ঘটনা জানতে তারা ৪২ জনেরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এর মধ্যে ২৩ জন দাবি করেছেন, তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে দেখেছেন। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কিশোরও ছিল।

২০১১ সালে সুদানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর দক্ষিণ সুদান ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এরপর গত তিন বছরে সেখানে প্রাণ গেছে হাজারো মানুষের। ঘরছাড়া হয়েছেন লাখেরও বেশি।

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির সরকার। প্রেসিডেন্ট সালভা কিইরের মুখপাত্র আতেনি ওয়েক আতেনি বলেছেন, আমাদের আইন রয়েছে এবং আমরা সে অনুসারেই কাজ করছি।

সূত্রঃ http://www.banglanews24.com/fullnews/bn/473132.html


’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত?

c1

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক ও মতপার্থক্যের মাঝে একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের উপর বিতর্ক সম্প্রতি পুনরায় বড় আকারে দেখা দিয়েছে যখন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এ বিষয়ে কয়েকটি মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়াও আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় দৈনিকগুলোতে তার বক্তব্য যেভাবে এসেছে তাহলো- তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছেন বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কতজন শহীদ হয়েছেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। একেক বই-এ একেক রকম তথ্য পাওয়া যায়। ……যারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি তারা আজ বড় মুক্তিযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম দিয়ে নিজের ঘরে যুদ্ধাপরাধীদেরও পালছে। ………..উনি (শেখ মুজিব) স্বাধীনতা চাননি, চেয়েছিলেন কেবল ক্ষমতা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।” – ইত্যাদি। এই বক্তব্যের সকল বিষয় নিয়ে আমরা এ নিবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করতে পারবো না। শুধু শহীদের সংখ্যা বিষয়ের বিতর্কটিই আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় হবে।

বেগম জিয়া কেন এ বক্তব্যটি দিলেন তার কারণ এটা নয় যে তিনি প্রকৃত ইতিহাস সন্ধান করতে চান। কারণ, বিএনপি-ও শাসক বুর্জোয়া শ্রেণিরই একটি দল, যারা ’৭১-এর চেতনা’র কম/বেশি পরিবর্তিত একটি সংস্করণকে ধারণ করে। তারাও আওয়ামী লীগের মতই দেশ ও জনগণবিরোধী একটি দল। তবে বর্তমান আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দমনে তারা যখন কোনঠাসা, এবং ’৭১-এর চেতনা নিয়ে আওয়ামী সংস্করণের বিকৃত মিথ্যা প্রচারে তারাও এতটা আক্রান্ত যে বেগম জিয়া এখন বাধ্য হচ্ছেন আওয়ামী লীগের মিথ্যা ও বিকৃতির কিছুটা উন্মোচনের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিতে। প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী শাসক শ্রেণির এই অন্তর্দ্বন্দ্বে ইতিহাসের কিছু সত্য উঠে আসতেই পারে, যেমনটা এসেছিল ’৭১-এ আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সেনানী খন্দকারের বই-এ।

দেখা যাচ্ছে বেগম জিয়ার বক্তব্যটি মাঠে পড়তে না পড়তেই আওয়ামী প্রচারযন্ত্র তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তারা তাকে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের দালাল, যুদ্ধাপরাধী ইত্যাদি নামে অভিহিত করেই ক্ষান্ত হয়নি। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মামলা রুজু করা শুরু হয়েছে।

অথচ বেগম জিয়া ৩০ লক্ষের বিপরীতে কোন সংখ্যা পেশ করেন নি। তিনি শুধু এ নিয়ে বিতর্কটিকে তুলে ধরেছেন। যদিও তার সাথে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকা, বিশেষত তাদের প্রধান নেতা শেখ মুজিবের ভূমিকার বিষয়টিতেও মন্তব্য করেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের মন্তব্য বা বক্তব্য দেয়া মানে হলো আওয়ামী ফতোয়ায় দেশদ্রোহীতা করা, সংবিধান লঙ্ঘন করা, রাষ্ট্রদ্রোহীতা করা, মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, শহীদদেরকে অপমান করা- যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হতে পারে। অনেক বিভ্রান্ত একচোখা বাঙালি-জাতীয়তাবাদে অন্ধ বুদ্ধিজীবী বলছেন যে শহীদদের সংখ্যার বিষয়টা নাকি একটি মীমাংসিত ইস্যু, একে বিতর্কিত করা নাকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার সামিল, শহীদদের অপমানের সামিল- ইত্যাদি।

প্রশ্ন হলো, এই বিষয়টি সহ মুক্তিযুদ্ধের গোটা রাজনীতি শুধু নয়, অসংখ্য তথ্যকে আওয়ামী ধারায় বিতর্কের উর্ধে¦ বললেই তো সেগুলো তা হয়ে যাবে না। ইতিহাস নিয়ে এ ধরনের বালখিল্যতা শুধু ফ্যাসিবাদের লক্ষণকেই প্রকাশ করে। যা এখন ইসরাইলীরা করে থাকে। করে থাকে ইসলামী মৌলবাদীরাও। বাবরী মসজিদ নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাও এরকম করেছে ও করছে।

কিন্তু এটা তো একটা জ্বলজ্যান্ত সত্য কথা যে ’৭১-সালের শহীদের এ সংখ্যাটি নিয়ে একেক বই-এ একেক রকম তথ্য পাওয়া যায়। অনেক বুদ্ধিজীবীই এ নিয়ে কথা বলেছেন। অনেকে চুপ করে থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করেছেন বটে, কিন্তু তারা জানেন যে এ সংখ্যাটি কোন প্রামাণ্য তথ্য নয়। ফলে এ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে তাতে কোন সন্দেহই নেই। কিন্তু এই বাস্তব তথ্যটি তুলে ধরার জন্যই যে আওয়ামী নেতা-পাতি নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা খালেদার উপর হামলে পড়েছে তা নয়। বাস্তবে খালেদা জিয়া এ বক্তব্যটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বিষয়ে সরকারি বক্তব্যের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য মিথ্যা প্রচারের উপর আওয়ামী লীগের (এবং আংশিকভাবে বিএনপি’রও) গোটা রাজনীতিটা দাড়িয়ে রয়েছে সেখানে এমন একটি বিষয়ে খালেদা জিয়া আঙ্গুল রেখে ’৭১ নিয়ে আওয়ামী প্রচার, তথা আওয়ামী রাজনীতির একেবারে গোড়াতেই হাত রেখেছেন। এটা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, গোটা শাসকশ্রেণি, রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার সৃষ্টি-সময়কালের প্রকৃত সত্য খুঁচিয়ে তোলার একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঠিক এ জায়গাটাতেই আওয়ামী লীগের আতংক। তাই তাদের প্রচারযন্ত্র তাৎক্ষণিক লাঠির ঘায়ে এ আলোচনাটিকে নিভিয়ে দিতে চাইছে। কাবু করতে চাইছে তার ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-কেও।

আমরা আমাদের পত্রিকায় ’৭১ নিয়ে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির, বিশেষত আওয়ামী লীগের বহু মিথ্যার কিছু বিষয়ে মাঝে মাঝে ইতিপূর্বেও আলোচনা করেছি। এক কথায় যদি বলা যায় তাহলে একটি মন্তব্যই শুধু পুনরায় করা যায়, তাহলো তাদের তৈরি করা পুরো ইতিহাসটিই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। শহীদের সংখ্যাও তার ব্যতিক্রম নয়।

এর অর্থ এটা নয় যে, পাকবাহিনী ’৭১-সালে গণহত্যা করেনি। তারা তা করেছে এবং খুবই বর্বর ও নৃশংসভাবে তার শিকার হয়েছিলেন এদেশের সাধারণ জনগণ। হাজার লাখো সাধারণ মানুষকে তারা হত্যা করেছিল, অসংখ্য নারীকে নিপীড়ন করেছিল, অসংখ্য বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল, লুট করেছিল, ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে দেশছাড়া করার এক বর্বর ‘এথনিক ক্লিনজিং’ চালিয়েছিল। যার কারণে হিন্দু-মুসলিম মিলে প্রায় এক কোটি জনগণ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেক জায়গায় হিন্দুধর্মাবলম্বীদেরকে জোর করে মুসলিম বানানোও হয়েছিল। এসবই ইতিহাস। কিন্তু এটা ইতিহাসের একটি দিকের একটি অংশ মাত্র। এই বর্বরতার বারংবার ও অতিরঞ্জিত উল্লেখ দ্বারা আওয়ামী রাজনীতির মহত্ব প্রকাশিত হয়না। তা যে হয়না তার একটি স্থূল উদাহরণ পাওয়া যাবে এই শহীদের সংখ্যা নিয়ে তাদের রাজনীতিতেই।

খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য ধরে আওয়ামী প্রচারযন্ত্র তাদের হাজারো মিথ্যার রাজনীতির মত ৩০ লক্ষ শহীদের যে অকাট্য সন্দেহাতীত প্রচার চালাচ্ছে, ও এতদিন চালিয়ে এসেছে, তার ভিত্তিটা কী? ’৭১-এর পর দীর্ঘ ৪৪ বছরেও কেন শহীদদের কোন তালিকা করা হলো না? অথবা তার চেষ্টা পর্যন্ত করা হলো না? কী জবাব দেবে আওয়ামী লীগ, তার বর্তমান সরকার ও তাদের অন্ধ সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীকূল, যারা কিনা ’৭১ নিয়ে অনবরত কাঁদুনি গেয়ে চলেছে?

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে প্রতিটি জায়গায় অতিঘনত্বে জনগণ রয়েছেন যুগ যুগ আগে থেকেই (শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বাদে)। এই দেশটি চার দশক আগে তো বটেই, এখনো রয়েছে গ্রামভিত্তিক। প্রতিটি গ্রামের মানুষ একে অন্যকে চেনে জানে। আর এ জানাজানিটা অন্তত দুই তিন পুরুষ ধরে বয়ে চলে। শহরাঞ্চলে যারা থাকেন, এমনকি যাদের বাড়িঘর শহরে, তাদেরও প্রধান অংশটির ভিত্তি এখনো গ্রামে রয়েছে। তারা ঈদের ছুটিতে দল বেধে গ্রামের বাড়িতে যান। একেবারে শিকড়বিহীন মানুষ বাংলাদেশে এখনো খুবই কম; ’৭১-সালে ছিল আরো অতি নগণ্য। তাই গ্রামকে ভিত্তি করে শহীদদের সংখ্যা ও পরিচয় বের করা খুবই সম্ভব।

একটি গ্রামে কয়জন মানুষ ’৭১-সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন তা কোন গোপন ব্যাপার নয়। এখনো যাদের বয়স ৬০-এর উর্ধ্বে তেমন লোকেরা ’৭১-এর স্মৃতি ভালভাবেই স্মরণ করতে পারবেন। এবং প্রতিটি গ্রামে এরকম ব্যক্তির সংখ্যা এখনো একেবারে কম নয়। এরকম অবস্থায় দেশের প্রতিটি গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বে গ্রামভিত্তিক ও পাড়াভিত্তিক সভা করে প্রত্যক্ষভাবে হিসেব বের করা এখনো খুবই সম্ভব যে কারা কারা তখন শহীদ হয়েছিলেন। এটা কোন কঠিন কাজ নয়। তবু কেন কোন সরকার, বিশেষত যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বেশি গলাবাজি করে সেই আওয়ামী সরকার মোট চারবার ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকেও এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি? এটা বোঝা কঠিন কিছু নয়। এর সোজা কারণ হলো তারা প্রকৃত ইতিহাসটিকে তুলে ধরতে চায় না। তারা শহীদদের মধ্যকার মূল জনগণÑ যারা শহীদদের নিরংকুশ সংখ্যাগুরু, তাদের প্রতি কোন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা পোষণ করে না। শুধু জনগণের দুর্গতি দুর্দশাকে পুঁজি করে নিজেদের গণবিরোধী রাজনীতিটা তারা চালাতে চায়।

ধরে নেয়া যাক আওয়ামী লীগের দাবি অনুসারে খালেদা জিয়া পাকিস্তানের দালাল, ধরে নেয়া যাক তার স্বামী জিয়াউর রহমান, যিনি আওয়ামী লীগের প্রধানতম নেতা শেখ মুজিবের সরকার কর্তৃক জীবিতদের জন্য প্রধান রাষ্ট্রীয় খেতাব “বীরোত্তম” প্রাপ্ত, তিনিও পাকিস্তানের দালাল। কিন্তু সেটা বলে তো একথা জায়েজ করা যাবে না যে এখনো পর্যন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত শহীদের নামের তালিকা, পরিচয়, শহীদের ঘটনা ইত্যাদির জরিপ না করে আওয়ামী লীগ শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা করেছে?

তারা প্রায় ১০ কোটি মানুষের ভোটার আইডি কার্ড করতে পারে, ডিজিটাল সুযোগে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্যাদি সংরক্ষণ করতে পারে, মোবাইল ফোনের প্রতিটি সিম কার্ডের তথ্যব্যাংক করতে পারে, অথচ একেকটি গ্রামকে ভিত্তি করে শহীদদের তালিকাটা করতে পারে না? তার চেষ্টাও যে তারা কখনো করেনি তা-কি স্পষ্ট নয়? অথচ এটা রাষ্ট্রের জন্য এক অতি সহজ কাজ। কিন্তু তারা সেটা করছে না, করেনি ও করবেও না, একারণে যে এটা করলে তাদের দ্বারা প্রচারিত এক বড় মিথ্যা প্রকাশ হয়ে পড়বে। অথচ খালেদা জিয়াই প্রথম নন যিনি এ ব্যাপারে বিতর্ক তুলেছেন। বরং তিনি হলেন শাসকশ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে এই সব অনেক মিথ্যার বেনিফিসিয়ারি, যেমনটা আওয়ামী লীগ। এতদিন পর তিনি তার বুর্জোয়া রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এ বিতর্ক তুলেছেন, যা বাস্তবে ৪৪ বছর দেরি হয়ে গেছে।

যদি প্রশ্ন করা হয় ৩০ লক্ষ সংখ্যাটি আওয়ামী লীগ কীভাবে পেল তার কী জবাব? কখনো কি রাষ্ট্্রীয়ভাবে এর জরীপ করা হয়েছে? করা হয়নি। ৩০ লক্ষ শহীদ মানে হলো তৎকালীন গ্রাম পিছু প্রায় ৬০ জন মানুষের শহীদ হওয়া। (তখন যদি ৫০ হাজার গ্রাম ধরা হয়)। কিছু ব্যতিক্রম গ্রাম বাদে এটা এক অসম্ভব সংখ্যা। প্রায় প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ গ্রামে অনুসন্ধান করলেই একথার সত্যতা পাবেন। ’৭১-সালে নগরায়ন এখনকার মত ছিল না। তবুও শহরগুলোর গণহত্যায় নিহত মানুষদের প্রায় জনেরই গ্রামকে ধরে হিসেব বের করা সম্ভব। সব কিছুর পরও ১০ থেকে ২০% ত্রুটি ধরে নিয়েও জরিপ করলে এমন কোন বিরাট সংখ্যা পাওয়া যাবে না।

এই বানানো সংখ্যাটি তাহলে কীভাবে এলো? এ সম্বন্ধে একটা তথ্য প্রচলিত রয়েছে যাকে আওয়ামী লীগ মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছে। বিবিসি’র প্রখ্যাত সাংবাদিক, এক সময়ে শেখ মুজিবের খুবই স্নেহভাজন প্রয়াত সিরাজুর রহমান তার বহু কলামে, আলোচনায় ও পুস্তকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন। সে ব্যাপারে সরকার ও আওয়ামী লীগারদের বক্তব্য কী?

ড.আহমদ শরীফের মত বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবী বহুবার বলেছেন, এটি একটি বানানো সংখ্যা, শহীদের সংখ্যা ২/৩ লক্ষের বেশি হবে না। আহমদ শরীফকে কেউ পাকিস্তানের দালাল বলবে না নিশ্চয়ই।

শহীদদের তালিকা না করে তাদের স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা করে তাদের এক কাল্পনিক সংখ্যাকে বিতর্কের উর্ধ্বে বলে ইতিহাসের সত্য আবিস্কারের পথ রাষ্ট্রীয় আইন ও দমন নির্যাতন দিয়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখাটা শহীদদের মর্যাদা বাড়ায় না, যতই আওয়ামী লীগাররা তার ভাব দেখাক না কেন। ভারত যখন প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তখন থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি পর্যন্ত ভারতের প্রায় ৪/৫ হাজার সেনা নিহত হয়। এর হিসেব রয়েছে। সে সময়টাতে মুক্তিযোদ্ধা মারা যান প্রায় ৪ হাজারের মত। এরও একটা হিসেব আছে। সারা দেশে বুদ্ধিজীবী (যাদের মাঝে রয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক- ইত্যাদি) নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার- যাদের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা বুদ্ধিজীবীও রয়েছেন। এগুলো সরকারি তথ্য। তাহলে কেন সাধারণ জনগণসহ সকল শহীদদের প্রকৃত সংখ্যাটি ও পরিচয় অন্তত কাছাকাছিভাবে করা যাবে না? বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধ-বান্ধব একটি সরকার, যারা প্রকৃতই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এবং শুধু তাদের মৃত্যু নিয়ে অপরাজনীতিতে লিপ্ত নয়, তেমনটা হলেই এটা সম্ভব। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে তারা তা নয়।

শহীদদের সংখ্যা ৩০ লক্ষের বদলে ৩ লক্ষ বা ১ লক্ষ হলে কি সেটা পাকবাহিনীর বর্বরতাকে কমিয়ে দেয়? অথবা সেটা বললে কি পাকবাহিনীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়? মোটেই নয়। তা-কি তৎকালে এদেশের আপামর জনগণের মহাদুর্যোগ ও সংকটকে কমিয়ে দেয়? মোটেই নয়। প্রকৃত সংখ্যাটি যা-ই হোক না কেন সেটা ভয়াবহ। তাকে অতিরঞ্জিত করা বা আন্দাজে একটা সংখ্যা বানিয়ে তাকেই ইতিহাস বলার মধ্যে কোন সত্যটি রয়েছে? কিছুই না। এটা শুধু মিথ্যার পাহাড়কে বড় করা,। এটা হলো ভিন্ন অবস্থান থেকে ইতিহাসের বিকৃতি করা। যা করেছে এদেশের শাসকশ্রেণি, বিশেষত আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। তাদের অপরাজনীতিকে চূর্ণ না করে এইসব মিথ্যা ও বানানো ইতিহাস থেকে জাতি ও জনগণ মুক্তি পাবেন না।

সূত্রঃ আন্দোলন পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ‘১৬ সংখ্যা