গেরিলা দলঃ ‘জাপানিজ রেড আর্মি (JRA)’ পরিচিতি

Japanese Red Army

১৯৭১ সালে লেবাননে বসে ফুসাকো শিগেনোবু তৈরি করেন বাম মিলিশিয়ার এই দলটি। সংগঠনটির সদস্যরা বিশেষ করে ইসরায়েলের লড এয়ারপোর্টে পিএফএলপি কর্তৃক সংঘটিত ২৭ হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের জাপানিজ রেড আর্মি (নিহন শেকিগুন) পরিচয় দিতেন।
শিগেনোবু জাপানের বামপন্থি সংগঠন রেড আর্মি ফ্যাকশনের (শিকেগুন-হা) নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। বিপ্লবের সমর্থনে শিকেগুন-হা নিজস্ব দল গঠন করেন এবং ১৯৬৯-এর সেপ্টেম্বরে তারা স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। দল গঠনের পর পরই পুলিশ তাদের অনেককে গ্রেফতার করে। রেড আর্মির ইন্টেলেকচুয়াল লিডার এবং প্রতিষ্ঠাতা তাকায়া শিওমিকেও বন্দি করা হয় এ সময়। রেড আর্মি ফ্যাকশন (শিকেগুন-হা) তাদের প্রায় ২শ সদস্য হারায়। এ ঘটনার পর কিছু সদস্য মাওপন্থি সংগঠনের সঙ্গে মিলিত হয়ে গঠন করে রেনগো শিকেগুন (ইউনাইটেড রেড আর্মি)। সে বছরই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে রেনগো শিকেগুন ১২ সদস্য হারায়। এর পর শতাধিক পুলিশি অভিযানে রেড আর্মি, ফ্যাকশন ইন জাপান ১৯৭১-এর জুলাইয়ে ধ্বংস হয়।
ফুসাকো শিগেনোবু তখন জাপান ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে দেশত্যাগী হন সামান্য কিছু আত্মত্যাগী মানুষ। তবে বলা হয় তার দলে ৪০ সদস্য ছিলেন যার সমন্বয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বাম সংগঠন হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তারা।
১৯৭১ সাল থেকে জাপানিজ রেড আর্মি এবং পিএফএলপি দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। যখন ১৯৭২-এ ইউনাইটেড রেড আর্মি ইন জাপান ধ্বংস হয়ে গেল তখন শিগেনোবুর দল পিএফএলপির ওপর তাদের অর্থ, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র বিষয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
জাপানিজ রেড আর্মির উদ্দেশ্য ছিল জাপানের সম্রাটতন্ত্র উচ্ছেদ এবং বিশ্ব বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটানো। এই দলটি আরো একাধিক নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। যেমন এন্টিইমপেরিয়ালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড (এআইআইবি), হোলি ওয়ার ব্রিগেড এবং এন্টিওয়ার ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট।
ফুসাকো শিগেনোবু ২০০০ সালের নভেম্বরে জাপানের ওসাকা থেকে গ্রেফতার হন। এতে সারা বিশ্ব বিস্মিত হয়। কারণ সবাই ভাবত ফুসাকো লেবাননে থাকেন। তাকে আসামি করা হয় নাটকীয় আক্রমণ, অপহরণ, ছিনতাইয়ের অভিযোগে। অথচ সমালোচকরা তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভীতি উৎপাদনকারী মহিলা সন্ত্রাসী’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। শিগেনোবু ১৯৭২-এ লড বিমানবন্দর হামলার একজন পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ২০০৬ সালে জাপানের একটি আদালত তাকে ২০ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে।

রেড আর্মির আক্রমণ (১৯৭০-১৯৮০)-

৩১ মার্চ, ১৯৭০ : জাপান এয়ারলাইন্সের ৩৫১ নং ফ্লাইট, বোয়িং ৭৪৭ বিমান টোকিও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২৯ যাত্রী নিয়ে আকাশে ওড়ে। বিমানটিকে রেড আর্মি ফ্যাকশন বাধ্য করে ফুকুওকা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে। এরপর সিউলে সমস্ত যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। বিমানটিকে উত্তর কোরিয়ায় নিয়ে বিমানসহ ক্রুদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার জন্য ইয়োশিমি তানাকা দণ্ডিত হয় ১২ বছরের কারাবাসে। পুলিশের ভাষ্যমতে তার আট সঙ্গী উত্তর কোরিয়াতেই মারা যায়।
৩০ মে, ১৯৭২ : লড এয়ারপোর্ট ম্যাসাকার। এ আক্রমণে তিনজন জাপানিজ রেড আর্মি সদস্য অংশ নেন। একজন গ্রেনেড ফাটিয়ে আত্মহত্যা করেন। যদিও অনেকে সেটাকে দুর্ঘটনা মনে করে। আরেকজন মারা যান ক্রসফায়ারে। আর তৃতীয়জন কোজো ওকামোটো কেবল বেঁচে যান। অনেকের ভাষ্যমতে এই ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের সুইসাইড অ্যাটাকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই আক্রমণের পেছনে পিএফএলপি জড়িত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল কিন্তু তা আজো প্রমাণিত হয়নি।
জুলাই, ১৯৭৩ : রেড আর্মি সদস্যরা নেদারল্যান্ডসের ওপর থেকে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে। লিবিয়াতে সমস্ত যাত্রী নামিয়ে ছিনতাইকারী সদস্যরা বিমানটাকে ধ্বংস করে দেয়।
জানুয়ারি, ১৯৭৪ : রেড আর্মি সিঙ্গাপুরে থেকে ৫ জনকে জিম্মি করে। একই সময়ে পিএফএলপি কুয়েতের জাপান দূতাবাসে দখল করে। আটককৃতদের মুক্তির জন্য দাবি করা হয় মুক্তিপণ, সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য বিমান।
১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ : নেদারল্যান্ডসের হেগে ফরাসি দূতাবাস দখলে নেয় রেড আর্মি। রাষ্ট্রদূত এবং আরো ১০ জনকে বন্দি করা হয়। দাবি ছিল রেড আর্মির দণ্ডিত আসামি ইয়াৎসুকা ফুরাইয়াকে মুক্তি দিতে হবে। সঙ্গে ৩ লাখ মার্কিন ডলার এবং একটি বিমান।
আগস্ট, ১৯৭৫ : রেড আর্মি কুয়ালালামপুরে ৫০ জনকে জিম্মি করে। যার মধ্যে একজন ইউএস কনসাল এবং একজন সুইডিশ চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স ছিলেন। ৫ জন সঙ্গীকে মুক্ত করে তারা লিবিয়াতে উড়ে যায়।
সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ : জাপান এয়ারলাইন্সের ৪৭২ নং ফ্লাইট ভারত থেকে ছিনতাই করে ঢাকায় অবতরণ করতে বাধ্য করে রেড আর্মি। দাবি অনুযায়ী জাপান সরকার ৬ জন রেড আর্মিকে মুক্তি দেয় এবং ৬ মিলিয়ন ডলার দেয় জিম্মিদের মুক্তিপণ হিসাবে।
মে, ১৯৮৬ : কানাডা, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের জাকার্তা দূতাবাসে মর্টার হামলা করে।
জুন, ১৯৮৭ : রোম ও ইতালিতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে মর্টার হামলা।
এপ্রিল, ১৯৮৮ : ইতালির নেপলসে ইউএস মিলিটারি রিক্রিয়েশনাল ক্লাবে বোমা হামলায় চালায়। ৫ জন সেনা নিহত হয়।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s