ছত্তিসগড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার ডাক্তার – আইনজীবী – সাংবাদিকরাও

ডাঃ শৈবাল জানা

ডাঃ শৈবাল জানা

চব্বিশ বছর আগেকার এক মামলায় গ্রেপ্তার করা হল ছত্তিসগড়ের এক চিকিত্সককে৷ নিহত শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর হাতে গড়া ‘ছত্তিসগড় মুক্তি মোর্চা’ পরিচালিত দল্লি রাজহারার শহিদ হাসপাতালের চিকিত্সক , এ দেশে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী সংগঠক শৈবাল জানাকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার করে রমন সিং সরকারের পুলিশ৷ শনিবার বিকেলে ছত্তিসগড় থেকে ফোনে আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ জানিয়েছেন , আদালতে হাজির করা হলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ হয়৷ তবে মেডিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে আপাতত শৈবালবাবুকে দুর্গের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ শ্রমিকদের চাঁদায় গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বহু মানুষের সহযোগিতায় ধারাবাহিক ভাবে চিকিত্সা পরিষেবা দিয়ে আসছে৷ চিকিত্সক শৈবাল জানা হাসপাতালটির সঙ্গে যুক্ত প্রায় গোড়া থেকেই৷ ১৯৯১ -এর ২৮ সেপ্টেম্বর খনি মালিক -মাফিয়াদের বাহিনী হত্যা করে শঙ্কর গুহ নিয়োগীকে৷ প্রতিবাদের ঢল নামে৷ ‘৯২ -এর ১ জুলাই ভিলাই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের রেল রোকো আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়৷ ১৫ জন শ্রমিক নিহত হন৷ আহত শ্রমিকদের চিকিত্সার কাজে যুক্ত ছিলেন শৈবালবাবু৷ সেই ঘটনার সূত্রেই ২৪ বছর পরে তাঁকে গ্রেন্তার করা হল ‘সরকারি কাজে বাধাদানে ‘র অভিযোগে৷ মামলা যে ছিল , এতকাল জানতেই পারেননি শৈবালবাবু৷ শ্রমিক ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রতিবাদী বা প্রশ্নকারীদের কণ্ঠরোধে গ্রেন্তার -হয়রানি -অত্যাচারের যে নীতি নিয়ে চলেছে ছত্তিসগড়ের বিজেপি সরকার , শৈবালবাবুর গ্রেন্তারি তারই অন্যতম নজির৷ তাঁরা ওই চিকিত্সকের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন৷ এর আগে গত মাসেই বস্তারে আদিবাসী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সোনি সোরির উপর অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে৷ সোনির বোন অপহূত হয়েছেন৷ তাঁর বছর ষোলোর মেয়েকে ‘চরম শিক্ষা ‘ দেওয়ার হুমকি -চিঠি পাঠানো হয়েছে৷ পুলিশ -প্রশাসনের মদতেই এই হামলা -হয়রানির বলে অভিযোগ৷ উল্টে প্রশাসনিক মহল থেকে দায় চাপানো হয় নকশালপন্থীদের উপরে৷ ওই ঘটনার পরে ‘এই সময় ‘ থেকে বাস্তারের জেলাশাসক অমিত কাটারিয়াকে ফোন করা হলে সোনির উপর হামলাকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে তিনি শুনিয়ে দেন , চলতি বছর প্রথম দেড় মাসেই ৫০ জন নকশালবাদীকে ‘খতম ‘ করেছে প্রশাসন৷ প্রজাতন্ত্র তার নাগরিককে হত্যা করতে পারে না —সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলেও বস্তারের ডিএম আমল দেননি৷ ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার অভিযোগ উঠলেও কোনও রকম তদন্ত হবে না বলে জানিয়ে দেন৷ এর পর অবশ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তদন্তে যায় বস্তারে৷ যদিও কমিশনের রিপোর্টের কথা জানা যায়নি এখনও৷ সোনির উপর হামলার আগে জগদলপুরে কর্মরত দুই আইনজীবী শালিনী গেরা , ইশা খান্ডেলওয়ালকে হুমকির মুখে রাজ্য ছাড়া করা হয়৷ তাঁদের বাড়িওয়ালাকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে হঁশিয়ারি দিয়ে বাধ্য করা হয় শালিনীদের চলে যেতে বলার জন্য৷ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে অত্যাচারিত , মিথ্যা মামলার জড়িয়ে যাওয়া বস্তার -সহ ছত্তিসগড়ের অসংখ্য নাগরিককে আইনি সহায়তা দেওয়ার কাজ করছিলেন ইশা -রা৷ রাজ্য ছাড়া করার আগে কোর্টে তাঁদের প্র্যাকটিস বন্ধেও চেষ্টা হয়েছিল৷ রাজ্য বার কাউন্সিল তাঁদের প্র্যাকটিসের পক্ষে দাঁড়ালেও নানা ভাবে হুমকি দেওয়া চলছিল৷ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত বস্তারের আর এক সমাজকর্মী বেলা ভাটিয়াকেও রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সালাওয়া জুড়ুমের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে৷ বস্তারের আদিবাসী সমাজ , বিশেষত সেখানকার মহিলা ও শিশুদের উপর ধারাবাহিক সন্ত্রাসের তথ্য সংগ্রহে যুক্ত সাংবাদিক মালিনী সুব্রহ্মণ্যমকেও একই ভাবে হুমকির মুখে জেলা সদর জগদলপুর থেকে চলে আসতে হয়েছে৷ গত জানুয়ারিতে দেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের যুক্ত-মঞ্চ সিডিআরও -র প্রতিনিধিরা ছত্তিসগড়ে যান তথ্যানুসন্ধানে৷ সেই তথ্যানুসন্ধানে উঠে এসেছে সুকমা -র জঙ্গলমহলে নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারের রোমহর্ষক কাহিনি৷ তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্য এপিডিআর -এর অশোক দেবরায়ের কথায় , ‘নকশালবাদী মেয়েরা বিয়ে করেন না , এই ধারণা থেকে মেয়েদের মধ্যে নকশালবাদী খুঁজতে শুরু হয়েছে নতুন নির্মমতা –‘নকশালাইট টেস্ট ‘৷ পুরুষ জওয়ানের সামনে বুক উন্মুক্ত করে মেয়েদের স্তন টিপে দেখাতে হচ্ছে দুধ বেরোয় কি না ! অনেক সময় জওয়ানরাই সে কাজটা সারছে৷ যে নারীর স্তন থেকে দুধ নিঃসরণ হচ্ছে না , তাঁকেই অবিবাহিত নকশালবাদী সন্দেহে নিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী৷ চলছে যৌন নির্যাতন৷ ছত্তিসগড়ের এই নির্ভয়াদের কথা বাকি ভারত জানতেই পারছে না৷ বাহিনীর অত্যাচারে ছেলেরা গ্রাম ছাড়া৷ ভয়ঙ্কর ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করে খনি ও জঙ্গল মাফিয়াদের অবাধ লুঠের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে৷ ‘ আর মালিনীরা সেই অত্যাচারের প্রতিবেদন প্রকাশের খেসারত দিচ্ছেন এলাকা ছাড়া হয়ে৷ ডাক্তার শৈবাল জানাদের গ্রেন্তার হতে হচ্ছে অত্যাচারিত -আহত শ্রমিকের পরিচর্যার ‘অপরাধে ‘!

সূত্রঃ eisamay.indiatimes.com

Advertisements

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) (পিপলস ওয়ার)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির দলিল

Maoist-Flag

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) (পিপলস ওয়ার)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র “বিপ্লবী যুগ”-এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ

বিশ্ব জনগণের এক নম্বর শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উন্মত্ত যুদ্ধ-চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ান

পদলেহী ভারত সরকারের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ খ্যাপা কুকুরে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষা তথা সামরিক সদরদপ্তর পেণ্টাগণ আর নিউইয়র্ক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের দুটি বহুতল বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ যুদ্ধের হুংকার ছাড়তে শুরু করেছে। পৃথিবীর সমস্ত দেশকে এই যুদ্ধ উন্মাদনায় জড়িয়ে নিতে চাইছে আমেরিকা। আর সবচেয়ে নির্লজ্জভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী আগ বাড়িয়ে মার্কিন-প্রভুর সেবায় এগিয়ে এসেছে। আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করলে তাতে সবরকম সাহায্য করার আগাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত সরকার। সিপিএম-সিপিআই-এর মতো দলগুলোও আমেরিকারঅপকীর্তি ফাঁস করার বদলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মুখর হয়ে মার্কিন যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক মদম যোগাচ্ছে।

এরা সবাই যেটা চেপে যেতে চাইছে, তাহলো আমেরিকার ওপর আক্রমণের জন্য দায়ী কে? কার দোষে আজ হঠাৎ আমেরিকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন। নিঃসন্দেহে এর জন্য দায়ী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজে। দায়ী দেশে দেশে তার বর্বর অভিযান। দুনিয়ার সমস্তপ্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীকে তার মদদদান। দায়ী তার আর্থিক আর সামরিক নীতি, যার লক্ষ্য সারা পৃথিবীর ওপর প্রভুত্ব বিস্তার। এই লক্ষ্যেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে একের পর এক দেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে  অথবা আঞ্চলিক যুদ্ধ লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। আর দেশে দেশে বিশ্বায়নের নামে নতুন অর্থ-ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন ছারখার করেছে। অনুন্নত দুনিয়ার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অবর্ণনীয় শোষণ, লাঞ্ছনা, দাসত্ব। এসবেরই প্রতিক্রিয়ায় ঘটেছে আমেরিকার বুকে এই আচমকা আক্রমণ। আমেরিকার সামরিক আর আর্থিক শক্তির প্রতীক পেন্টাগন ও বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র আক্রান্ত হয়েছে। দুনিয়ার একমাত্র বৃহত শক্তি হিসেবে আমেরিকার দম্ভ ধূলায় মিশেছে। বেরিয়ে পড়েছে তার কাগুজে বাঘের চেহারা। আর এর ফলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন শাসকগোষ্ঠী। আতঙ্কিতও। যে কোনো মূল্যে তার হৃত ‘গরিমা’ ফিরিয়ে আনতে পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ-উন্মাদনা তৈরি করেছে আমেরিকা। লক্ষ প্রাণের মূল্যেও তাকে ফিরে পেতে হবে বিশ্বপুলিশের মর্যাদা।

মানুষের জীবনের মূল্য কবে দিয়েছে আমেরিকা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুধু বিশ্বজুড়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই আমেরিকা জাপানের দুটো শহরকে মুছে দিয়েছিল দুনিয়ার বুক থেকে। আণবিক বোমা ফেলে হিরোশিমা ও নাগাসাকির কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। আজ দুটো গগণচুম্বী প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কিন্তু সেদিন দুটো শহর ধ্বংস করেছিল আমেরিকা অবলীলাক্রমে। সেই ক্ষত কি দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাবে কোনোদিন?

১৯৫০-৫১ সালে আমেরিকা কোরিয়ার বুকে শুরু করেছিল আগ্রাসী অভিযান। সদ্যমুক্ত চীনের গণমুক্তি ফৌজের হাতে মার খাওয়ার পরই সে অভিযান থেমেছিল। তারপর ’৫০ ও ’৬০-এর দশক জুড়ে আমেরিকা চালিয়েছিল একের পর এক দস্যুবৃত্তি। বিশেষ করে এশিয়া-আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের জোয়ারকে ধ্বংস করতে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল আমেরিকা। পৃথিবী থেকে সাম্যবাদী আন্দোলনকে মুছে দিতে, মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে ধ্বংস করতে নিজে থেকেই আমেরিকা বিশ্বপুলিশের ভূমিকায় নেমেছিল। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সালে লক্ষাধিক কমিউনিস্ট হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল সে। ভিয়েতনাম-লাওস-কাম্পুচিয়ায় চালিয়েছিল দশকব্যাপী বর্বর অভিযান। নির্বিচার আগুনে-বোমা ফেলে সবুজ শস্য ক্ষেত পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

শুধু গত একটি দশকে আমেরিকার দস্যুবৃত্তিতে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ ইরাকে, যুগোশ্লাভিয়ায়…। ইরাকের পানীয় জল পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে গেছে আমেরিকার নির্মম বোমাবর্ষণে। আমেরিকার মদদেই ইজরায়েল নিয়মিত খুন আর সন্ত্রাস চালাচ্ছে প্যালেস্টাইনে আর পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলিতে। এইভাবে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের কারবার চালিয়ে আসছে আমেরিকা আর দেশে দেশে তার পা-চাটা কুকুরের দল। সন্ত্রাস তৈরি করার, মিসাইল ছুঁড়ে বোমা ফেলে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেবার একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করে এসেছে তারা এতদিন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী, সবচেয়ে বড় যুদ্ধবাজ, সবচেয়ে বড় জনবিরোধী যদি কেউ থেকে থাকে, নিঃসন্দেহে তার নাম মার্কিন রাষ্ট্র। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন আর কোনো রাষ্ট্র মিলবে না যার হাতে এতো মানুষ হত হয়েছে, গৃহহীন হয়েছে, সবকিছু হারিয়েছে। হিটলারী সন্ত্রাসকেও বহু আগে ছাড়িয়ে গেছে মার্কিনী বোম্বেটেরা। বাস্তবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন-মদদপুষ্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ।

আসলে, আমেরিকার জনগণেরও সবচেয়ে বড় শত্রু আমেরিকা নিজে। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্র। তার একচেটিয়া পুঁজির মালিক শাসকশ্রেণি। দুনিয়া জুড়ে তাদের আধিপত্যের বাসনাই ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে মার্কিন যুদ্ধ-দানবকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। এইসব বহুজাতিক মালিকশ্রেণির স্বার্থেই ’৮০-র দশক থেকে শুরু হয়েছে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কর্মসূচি। সাম্রাজ্যবাদী নির্দেশ চাপিয়ে একের পর এক দেশকে নয়াউপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের নির্মন যাঁতাকলে পিষ্ট করেছে আমেরিকা। শুরু করেছে পুনরুপনিবেসিকরণের এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। গত দুই দশকে বহু দেশ ছারখার হয়ে গেছে এই নীতির ফলে, যার গালভরা নাম বিশ্বায়ন, কোটি কোটি শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারী জীবন-জীবিকা হারিয়েছেন। অনিশিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ডুবে গেছেন। শুধু আমেরিকাতেই কাজ হারিয়েছেন ৫০ লক্ষাধিক মানুষ। এগুলোও কি সন্ত্রাস নয়? এর প্রতিক্রিয়াতেই আজ বিশ্বজুড়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদ আর তার আর্থিক আগ্রাসনের হাতিয়ার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে। বিশ্বজুড়ে আমেরিকার সর্বনাশা আর্থিক ও সামরিক নীতি গোটা বিশ্ব জনগণকে ঠেলে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে। তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য দল, গোষ্ঠী, চক্র। আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোমর বাঁধছে সারা দুনিয়ার মানুষ। তাদের মধ্যে বেপরোয়া কেউ কেউ চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে আমেরিকাকে পর্যুদস্ত করার কথা ভাবতেই পারে। নিতেই পারে সন্ত্রাসের পথ। তার জন্যও দায়ী আমেরিকার শাসকবর্গ ছাড়া আর কে হবে?

বস্তুত, আজ যাদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ছে আমেরিকা তাদের তৈরি করেছে কে? তালেবান আর লাদেনদের মদদ দিয়েছে কে? সন্দেহ নেই, মার্কিন মদদ ছাড়া তারা পরিপুষ্ট হতে পারতো না। দুনিয়ার সর্বত্র ফ্যাসিবাদ, মৌলবাদ, বর্ণ বৈষম্যবাদ, জিওনবাদ (ইজরায়েলের) প্রভৃতি অন্ধকারের শক্তিকে মদদ দিয়েছে আমেরিকা। তার আগ্রাসী বিশ্ব দখলের পরিকল্পনায় কাজে লাগিয়েছে সবাইকে। আজ তাদের কেউ কেউ যদি ফ্রাঙ্কোস্টাইন হয়ে যায়, আমেরিকার দিকেই বন্দুক তাক করে, তার জন্য দায়ী কে হবে? মার্কিন শাসকরা তাদের নিজেদের তৈরি করা ফাঁদেই আজ আটকা পড়েছে।

এই সুযোগে আরেক চোরের মা আমাদের দেশের বাজপেয়ী সরকার বড় গলা বের করেছে। আমেরিকার মদদ নিয়ে পাকিস্তানকে গুড়িয়ে দেবার স্বপ্নে মশগুল হয়ে উঠেছে তারা। কারণ, এই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য বিস্তারের পথে পাকিস্তানই সবচেয়ে বড় বাধা। আমেরিকা আজ এই উপমহাদেশে ভারতীয় শাসকদের সহযোগী ছোট পুলিশের ভূমিকায় পেতে চাইছে। ভারতীয় শাসকেরা মার্কিন বড়দাদার বিশ্বজয়ের প্রকল্পে ছোট শরিক হবার দৌড়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। ভারত যতদিন রাশিয়ার খপ্পরে ছিল ততদন এই উপমহাদেশে আমেরিকার প্রধান দাবার ঘুঁটি ছিল পাকিস্তান। কিন্তু আজ দিন বদলে গেছে। আজ ভারতের শাসকশ্রেণিই এই অঞ্চলে মার্কিন শাসকদের সবচেয়ে বড় ঘুঁটি। সবচেয়ে বড় অবলম্বন। ভারতের মুৎসুদ্দি শাসকেরা আমেরিকার প্রসাদ পেয়ে আহ্লাদিত।

এই আহ্লাদেরই প্রকাশ পেয়েছে আগ বাড়িয়ে ভারত সরকারের আমেরিকার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় মদদ করার অঙ্গীকার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদীর সহযোগিতা নিয়ে ‘সন্ত্রাস’ নির্মূল করার শপথ নিয়েছে তারা। আমেরিকা যেমন সারা পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, দাদাগিরি করেছে, জনগণের ক্রোধ আর ঘৃণা কুড়িয়েছে। তেমনি ভারত রাষ্ট্রও এই উপমহাদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বিপ্লবী ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেবার প্রচেষ্টা নিয়ে কোটি কোটি জনগণের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্র যেমন আজ বিশ্ব জনগণের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তেমনি ভারত সরকার দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মুখোমুখি। সন্ত্রাস দমনের নাম করে তাই ভারত সরকার আজ তার দমন যন্ত্রটাকে আরো মজবুত আরো তীক্ষè করতে চায়। আগামী দিনগুলোতে জনগণের বিরুদ্ধে আরও বড় যুদ্ধ চালাবার প্রস্তুতি নিতে চায় এই ফাঁকে, মার্কিন মদদে। আমেরিকা আর ভারতীয় শাসকদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতি তাই কোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়। এর লক্ষ্য বিশ্ব জনগণ। এই সুযোগে বিশ্ব জনগণকে সন্ত্রস্ত করা। আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের আধিপত্য কায়েম করা। শ্রমিক-কৃষক-বিশ্ব জনগণকে আমেরিকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করা। সাম্রাজ্যবাদী এই বিশ্বব্যবস্থা তথা বিশ্বায়ন বিরোধী সমস্ত প্রতিবাদ সমস্ত বিরোধিতাকে ধ্বংস করা। এই যুদ্ধ প্রস্তুতি তাই বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে, বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ প্রস্তুতি।

এই যুদ্ধ-দানবকে পরাস্ত করতে তাই জোট বাঁধতে হবে ভারতীয় জনগণকে। বিশ্ব জনগণের সাথে হাত মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধ শুরু করার শপথ নিতে হবে।

 ১৯/০৯/২০০১

সূত্রঃ https://pbspmbrm.files.wordpress.com/2012/09/spark-collections.pdf


তুরস্কের গণযুদ্ধের ভিডিও চিত্র

kaya
তুরস্কের গণযুদ্ধের ভিডিও চিত্র
১৯৯৫
TKP/ML TiKKOগেরিলারা

২০০২
TKP/ML TiKKOগেরিলাদের প্রচারণা

২০০৮
দারসিমের পর্বতমালায়TKP/ML TiKKOএর গেরিলারা




২০১১
পর্বতমালায়TKP/ML TiKKO

২০১২
পর্বতমালার দখলেMKP HKOগেরিলারা

২০১৩
দারসিমেরTKP/ML TiKKOএর গেরিলারা

TKP/ML TiKKOএর প্রশিক্ষণ

২০১৪
দারসিমের ক্যাম্পেTKP/ML TiKKOএর গেরিলারা

ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বিদ্রোহ এবং পর্বতেTiKKOগেরিলারা

পুলিশের বিরুদ্ধেTKP/ML TiKKOএর আক্রমণ

দারসিমের গ্রামাঞ্চলেTiKKOএর অবস্থান

যানবাহনে TiKKO এর অগ্নিসংযোগ

MKP HKOগেরিলাদের সাক্ষাৎকার

২০১৫
TKP/ML TiKKOগেরিলাদের প্রশিক্ষণ


MKP HKOগেরিলাদের ঘোষণা

দারসিমের রাস্তায় TiKKO এবং PKK এর অবস্থান

কায়পাক্কায়া’র শহীদ বার্ষিকীতেMKP HKOগেরিলারা

কমরেড ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া অমর হোন!!!
তুরস্কের গণযুদ্ধ জিন্দাবাদ!!!
মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ জিন্দাবাদ!!!

নরওয়ের মাওবাদীদের ৮ই মার্চ উদযাপন!

অসলো

অসলো

খ্রিসচিয়ানস্যান্ড

খ্রিসচিয়ানস্যান্ড

ট্রনধেইম

ট্রনধেইম

স্টাভাঙ্গের

স্টাভাঙ্গের

বেরগেন

বেরগেন


স্পেনের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান

Poster.-Arenas-723x1024

স্পেনের মাওবাদী PCE(r)[স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টি-পুনর্গঠন] এর সাধারণ সম্পাদক ম্যানুয়াল পেরেজ মার্টিনেজ এর বিরুদ্ধে ফরাসী ও স্পেনের কোর্ট কর্তৃক পনের বছর বিচারকার্য চলার পর Strasbourg-স্ত্রাসবুর্গ ট্রাইবুনাল (ECHR) অসমাপ্ত এই বিচারের দণ্ড প্রদান  নিশ্চিত করেছে।

পেরেজ মার্টিনেজ ২০০০ সালে প্যারিস থেকে গ্রেফতার হন। ফরাসি আদালত কর্তৃক তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, পরে তাঁকে স্পেনে হস্তান্তর করা হয়, স্পেনেও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, শেষ পর্যন্ত এই প্রহসনের বিচার স্ত্রাসবুর্গে এসে শেষ হয়। তার বয়স এবং দুর্বল স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে, রাষ্ট্র ম্যানুয়াল পেরেজ মার্টিনেজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করেছে।

অনুবাদ সূত্রঃ SRI


 ধর্মীয় মৌলবাদ উদ্ভব ও বিকাশের সামাজিক ভিত্তিটা কী?

INDONESIA_(F)_0302_-_Proteste_anti_sioniste_(600_x_427)

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ প্রগতির বিস্ময়কর ও মহাবিপ্লবাত্মক অগ্রগতির এক শতাব্দী পেরিয়ে বিশ্ব আজ ২১-শতকে প্রবেশ করেছে। আর এমনই এক যুগে কিনা বিশ্বজুড়ে শোনা যাচ্ছে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের কথা। সাম্রাজ্যবাদ যে ব্যাপকতায় মৌলবাদের প্রচার চালাচ্ছে তাকে অবশ্য অতিরঞ্জিত হিসেবেই ধরা উচিত। কিন্তু ইসলামী মৌলবাদী আন্দোলনের একটা বড় বিকাশ বাস্তবেই বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও নেই নেই করে এই জঙ্গি তৎপরতা আজ প্রকাশ্য ও ব্যাপক হয়ে উঠেছে।

সাধারণভাবে বলা হয় যে, সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাদপদ সমাজ হলো ধর্মীয় মৌলবাদের ভিত্তি। এটা সাধারণ অর্থে ভুল নয়। কারণ মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজেই ধর্মীয় শাসন রাজত্ব করতো এবং তেমন কোন সমাজই ধর্মের উৎপত্তি ও রক্ষার জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করতো।

কিন্তু যে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, যখন আমাদের দেশের সমাজ বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তত ঘোষিতভাবে এক আধুনিক জগতে বিচরণ করছে, তখন বিগত কিছু সময়ে কেন এখানে মৌলবাদ বিকাশ লাভ করছে? এই সমাজ ৫০ বছর আগে শিক্ষা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই আরো অনেক পেছনে ছিল। কিন্তু তখনো মৌলবাদের সমস্যা এমনভাবে শোনা যায়নি। এমনকি পাকিস্তান আমলেও না। খোদ পাকিস্তান আন্দোলনও মূলত মৌলবাদী আন্দোলন ছিল না। বরং এটা ছিল অনেক বেশি করে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন, যা কিনা ধর্মকে ব্যবহার করেছিল। তাই, শুধু সামন্ততান্ত্রিকতার সমস্যার মাঝে আজকের যুগের ধর্মীয় মৌলবাদের কারণ খোঁজাকে সঠিক বলে গ্রহণ করা যায় না। বাস্তবে আমাদের সমাজে সাম্রাজ্যবাদের দালাল যে বড় ধনী শ্রেণীটি বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ক্রমাগত বড় হয়ে উঠেছে, তারা সচেতনভাবে এমন এক ব্যবস্থাকে গড়ে তুলেছে যা অনেক বেশি করে ধর্মীয় মৌলবাদের উদ্ভবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। আর এই বিকৃত ধরনের বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রভু সাম্রাজ্যবাদীরা একে পরিপূর্ণভাবে মদদ দিয়ে চলেছে। এরই ফল হিসেবে আমরা দেখি, এই শাসকরা জনগণের মাঝে চরম পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণার লালন, সৃষ্টি ও বিকাশের সব রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে।

শুধুমাত্র শিক্ষার ক্ষেত্রটাই কিছুটা দেখা যাক। ধর্মীয় শিক্ষা পাকিস্তান আমলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু এখন তা বাধ্যতামূলক। ’৭১-এর পর ৩৪ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষা বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি (প্রায় ৬ গুণ)। সরকারি মাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর জন্য খরচ যেখানে ৩ হাজার টাকা, মাদ্রাসায় সেটা ৫ হাজার টাকা (তথ্যসূত্র: ড.বারাকাত, সমকাল/২৯ আগস্ট)। পীর, মাজার, ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রীয় খরচসহ যাবতীয় ধর্ম-ব্যবসা, জ্যোতিষ এগুলো সবই বেড়েছে। খোদ ঢাকা শহরে বিখ্যাত স্কুলের কিশোর ছেলেদেরকে মাথায় গোল টুপি পরে স্কুলে যেতে হয়। কচি কচি মেয়েদেরকে বোরখার পরিবর্তিত রূপের বিভিন্ন পোশাকে মুড়িয়ে আধুনিকতম শহরে স্কুল করানো হয়।

এর সব কিছুই শুধু জামাত আর রাজাকাররা করছে তা কিন্তু নয়। জামাত বা ধর্মীয় রাজনীতির হুজুরদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুবই গৌণ। বরং এগুলো সবকিছুই হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার (ইদানিং ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগান এদের থেকে তেমন একটা শোনা যাচ্ছে না।) গলাবাজীওয়ালা আওয়ামী আমলে (পিতা ও কন্যা উভয়ের নেতৃত্বে), জাতীয়তাবাদের ফেরীওয়ালা দাবিদার বিএনপি আমলে (স্বামী ও স্ত্রী দুই ক্ষেত্রেই), এবং ফুলের মত পবিত্র চরিত্র বিশিষ্ট এরশাদের আমলে। এরা কেউই দাড়ি-টুপিওয়ালা হুজুর নয়। বরং খুবই আধুনিক, যারা কিনা তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের ‘মুক্ত’ সংস্কৃতিতে নিজেরা ভালভাবেই সজ্জিত। পাঁচতারা হোটেলগুলোতে তাদের যাবতীয় প্রতিনিধি ও  যোগ্য সন্তানদের কর্মকাণ্ড মধ্যযুগীয় ধর্মকর্মের থেকে-যে অনেক দূরে সেটা তারা বিলক্ষণ অবগত।

তাই দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় মৌলবাদের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক ও চিন্তা-চেতনাগুলো কাজ করলেও আমাদের দেশে শাসক বড় ধনী শ্রেণীটি ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদের ‘আধুনিকতা’ থেকে সৃষ্ট সমগ্র ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াশীলতাই এখানে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

আমাদের সমাজটা বিশ্বব্যবস্থারই অংশ, এবং এ পতনোন্মুখ ব্যবস্থা তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে এখন ধর্মকে যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খৃষ্টান প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদের উদ্ভব, বিকাশ, এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে তার প্রতিফলন এ সত্যকেই প্রমাণ করে।

তাই, মার্কিন যখন নিজ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আশির দশকে জঙ্গি মৌলবাদী গোষ্ঠী হিসেবে আল-কায়দা, তালেবান গড়ে তুলেছিল ও পুষছিল, তখন অবধারিতভাবে একই ধারার অসংখ্য গোষ্ঠী এদেশেও বড় হয়ে উঠছিল। আর যখন মার্কিন বিশ্বব্যাপী নিজ একক আধিপত্য কায়েমের জন্য ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামে বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে নতুন করে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তখনও ধর্মীয় রাজনীতি তার কারণেই জোরদার হয়ে উঠছে। এটা হচ্ছে এখন দ্বিবিধ উপায়ে। সাম্রাজ্যবাদের মুসলিম জনগণবিরোধী ক্রুসেড নিঃসন্দেহেই ইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলনকে সৃষ্টি করছে নতুনভাবে, বিশেষত যেখানে বিপ্লবী কর্মসূচি ও আন্দোলনের দুর্বলতা রয়েছে। আর অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্ব আন্দোলন যখন নতুন মাত্রা ও ব্যাপকতা পাচ্ছে, তখন তাকে বিপথগামী করার জন্য, তাকে দমনের জন্য, এবং নিজ আগ্রাসন ও আধিপত্যের কর্মসূচিকে চালানোর অজুহাত হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন হচ্ছে ধর্মীয় রাজনীতি ও মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ খুব নিশ্চিতভাবেই জানে যে, ‘শান্তিকামী’ ধর্মীয় রাজনীতি-তো নয়ই, এমনকি সংঘর্ষকামী ধর্মীয় মৌলবাদও তার জন্য মৌলিক কোন সমস্যা নয়।

এ অবস্থায় এদেশে এখন ইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদ বিকাশ হতে বাধ্য। ভারতে যেমন অনিবার্য হিন্দুত্ববাদের বিকাশ। খোদ আমেরিকাতেও শাসক পার্টি ও রাষ্ট্রের তরফে এখন ক্রমবর্ধিতভাবে খৃষ্টান মৌলবাদ বিকাশ লাভ করছে। শুধুমাত্র এই বিশ্বব্যবস্থা উচ্ছেদের একটা আমূল পরিবর্তনকামী কর্মসূচিকে শক্তিশালী করেই এ অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব। যার একটি কাজ অবশ্যই হবে রাষ্ট্রের থেকে ধর্মের পরিপূর্ণ বিচ্ছেদসাধন। অবশ্যই যা বিজ্ঞানমনস্কতাকে সমাজের চালিকা চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করবে। যা কিনা পশ্চাদপদ ক্ষুদে উৎপাদন ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে ফেলবে। যাতে সব ধরনের অদৃষ্টবাদের ভিত্তি উচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মীয় মৌলবাদেরও অবসান ঘটে। যে কর্মসূচি দুইশ’ বছরেরও বেশি আগে বুর্জোয়া বিপ্লবের পুরোধারাই প্রথম পৃথিবীতে এনেছিলেন। কিন্তু বিশ্ব শ্রমিক বিপ্লবের ভয়ে সে কর্মসূচি এখন আর বিশ্ব বুর্জোয়ারা অনুসরণ করছে না, এবং তা করতে তারা সক্ষমও নয়। সেটা আমাদের দেশের আওয়ামী-বিএনপি রাজনীতি, আর বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের ‘ধর্মীয়’ আচরণ থেকেই আরো পরিস্কার হবে। তাই, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণকেই এখন এই কর্মসূচিটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এমন একটি বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের মৌলিক রূপান্তর করে, অর্থাৎ, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, আমাদের দেশে তার দালাল বড় ধনী শ্রেণী ও তাদের সহযোগী হিসেবে বিরাজমান সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাদপদ সম্পর্কগুলোকে সমূলে উচ্ছেদ করেই শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের সামাজিক ভিত্তির মূলোৎপাটন করা যাবে। এবং এভাবেই শুধু এই মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার রাহুগ্রাস থেকে দেশ ও জনগণ মুক্তি পেতে পারেন।

(সেপ্টেম্বর, ২০০৫)

সূত্রঃ আন্দোলন প্রকাশনা, সিরিজ- ৩