ধর্মীয় মৌলবাদ উদ্ভব ও বিকাশের সামাজিক ভিত্তিটা কী?

INDONESIA_(F)_0302_-_Proteste_anti_sioniste_(600_x_427)

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ প্রগতির বিস্ময়কর ও মহাবিপ্লবাত্মক অগ্রগতির এক শতাব্দী পেরিয়ে বিশ্ব আজ ২১-শতকে প্রবেশ করেছে। আর এমনই এক যুগে কিনা বিশ্বজুড়ে শোনা যাচ্ছে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের কথা। সাম্রাজ্যবাদ যে ব্যাপকতায় মৌলবাদের প্রচার চালাচ্ছে তাকে অবশ্য অতিরঞ্জিত হিসেবেই ধরা উচিত। কিন্তু ইসলামী মৌলবাদী আন্দোলনের একটা বড় বিকাশ বাস্তবেই বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও নেই নেই করে এই জঙ্গি তৎপরতা আজ প্রকাশ্য ও ব্যাপক হয়ে উঠেছে।

সাধারণভাবে বলা হয় যে, সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাদপদ সমাজ হলো ধর্মীয় মৌলবাদের ভিত্তি। এটা সাধারণ অর্থে ভুল নয়। কারণ মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজেই ধর্মীয় শাসন রাজত্ব করতো এবং তেমন কোন সমাজই ধর্মের উৎপত্তি ও রক্ষার জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করতো।

কিন্তু যে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, যখন আমাদের দেশের সমাজ বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তত ঘোষিতভাবে এক আধুনিক জগতে বিচরণ করছে, তখন বিগত কিছু সময়ে কেন এখানে মৌলবাদ বিকাশ লাভ করছে? এই সমাজ ৫০ বছর আগে শিক্ষা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই আরো অনেক পেছনে ছিল। কিন্তু তখনো মৌলবাদের সমস্যা এমনভাবে শোনা যায়নি। এমনকি পাকিস্তান আমলেও না। খোদ পাকিস্তান আন্দোলনও মূলত মৌলবাদী আন্দোলন ছিল না। বরং এটা ছিল অনেক বেশি করে বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন, যা কিনা ধর্মকে ব্যবহার করেছিল। তাই, শুধু সামন্ততান্ত্রিকতার সমস্যার মাঝে আজকের যুগের ধর্মীয় মৌলবাদের কারণ খোঁজাকে সঠিক বলে গ্রহণ করা যায় না। বাস্তবে আমাদের সমাজে সাম্রাজ্যবাদের দালাল যে বড় ধনী শ্রেণীটি বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ক্রমাগত বড় হয়ে উঠেছে, তারা সচেতনভাবে এমন এক ব্যবস্থাকে গড়ে তুলেছে যা অনেক বেশি করে ধর্মীয় মৌলবাদের উদ্ভবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। আর এই বিকৃত ধরনের বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রভু সাম্রাজ্যবাদীরা একে পরিপূর্ণভাবে মদদ দিয়ে চলেছে। এরই ফল হিসেবে আমরা দেখি, এই শাসকরা জনগণের মাঝে চরম পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণার লালন, সৃষ্টি ও বিকাশের সব রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে।

শুধুমাত্র শিক্ষার ক্ষেত্রটাই কিছুটা দেখা যাক। ধর্মীয় শিক্ষা পাকিস্তান আমলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু এখন তা বাধ্যতামূলক। ’৭১-এর পর ৩৪ বছরে প্রাথমিক শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষা বেড়েছে কয়েকগুণ বেশি (প্রায় ৬ গুণ)। সরকারি মাধ্যমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর জন্য খরচ যেখানে ৩ হাজার টাকা, মাদ্রাসায় সেটা ৫ হাজার টাকা (তথ্যসূত্র: ড.বারাকাত, সমকাল/২৯ আগস্ট)। পীর, মাজার, ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রীয় খরচসহ যাবতীয় ধর্ম-ব্যবসা, জ্যোতিষ এগুলো সবই বেড়েছে। খোদ ঢাকা শহরে বিখ্যাত স্কুলের কিশোর ছেলেদেরকে মাথায় গোল টুপি পরে স্কুলে যেতে হয়। কচি কচি মেয়েদেরকে বোরখার পরিবর্তিত রূপের বিভিন্ন পোশাকে মুড়িয়ে আধুনিকতম শহরে স্কুল করানো হয়।

এর সব কিছুই শুধু জামাত আর রাজাকাররা করছে তা কিন্তু নয়। জামাত বা ধর্মীয় রাজনীতির হুজুরদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুবই গৌণ। বরং এগুলো সবকিছুই হয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার (ইদানিং ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগান এদের থেকে তেমন একটা শোনা যাচ্ছে না।) গলাবাজীওয়ালা আওয়ামী আমলে (পিতা ও কন্যা উভয়ের নেতৃত্বে), জাতীয়তাবাদের ফেরীওয়ালা দাবিদার বিএনপি আমলে (স্বামী ও স্ত্রী দুই ক্ষেত্রেই), এবং ফুলের মত পবিত্র চরিত্র বিশিষ্ট এরশাদের আমলে। এরা কেউই দাড়ি-টুপিওয়ালা হুজুর নয়। বরং খুবই আধুনিক, যারা কিনা তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের ‘মুক্ত’ সংস্কৃতিতে নিজেরা ভালভাবেই সজ্জিত। পাঁচতারা হোটেলগুলোতে তাদের যাবতীয় প্রতিনিধি ও  যোগ্য সন্তানদের কর্মকাণ্ড মধ্যযুগীয় ধর্মকর্মের থেকে-যে অনেক দূরে সেটা তারা বিলক্ষণ অবগত।

তাই দেখা যাচ্ছে, ধর্মীয় মৌলবাদের সামাজিক ভিত্তি হিসেবে পশ্চাদপদ সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক ও চিন্তা-চেতনাগুলো কাজ করলেও আমাদের দেশে শাসক বড় ধনী শ্রেণীটি ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদের ‘আধুনিকতা’ থেকে সৃষ্ট সমগ্র ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াশীলতাই এখানে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

আমাদের সমাজটা বিশ্বব্যবস্থারই অংশ, এবং এ পতনোন্মুখ ব্যবস্থা তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে এখন ধর্মকে যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খৃষ্টান প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদের উদ্ভব, বিকাশ, এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে তার প্রতিফলন এ সত্যকেই প্রমাণ করে।

তাই, মার্কিন যখন নিজ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আশির দশকে জঙ্গি মৌলবাদী গোষ্ঠী হিসেবে আল-কায়দা, তালেবান গড়ে তুলেছিল ও পুষছিল, তখন অবধারিতভাবে একই ধারার অসংখ্য গোষ্ঠী এদেশেও বড় হয়ে উঠছিল। আর যখন মার্কিন বিশ্বব্যাপী নিজ একক আধিপত্য কায়েমের জন্য ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামে বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে নতুন করে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তখনও ধর্মীয় রাজনীতি তার কারণেই জোরদার হয়ে উঠছে। এটা হচ্ছে এখন দ্বিবিধ উপায়ে। সাম্রাজ্যবাদের মুসলিম জনগণবিরোধী ক্রুসেড নিঃসন্দেহেই ইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলনকে সৃষ্টি করছে নতুনভাবে, বিশেষত যেখানে বিপ্লবী কর্মসূচি ও আন্দোলনের দুর্বলতা রয়েছে। আর অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিশ্ব আন্দোলন যখন নতুন মাত্রা ও ব্যাপকতা পাচ্ছে, তখন তাকে বিপথগামী করার জন্য, তাকে দমনের জন্য, এবং নিজ আগ্রাসন ও আধিপত্যের কর্মসূচিকে চালানোর অজুহাত হিসেবে সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন হচ্ছে ধর্মীয় রাজনীতি ও মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ খুব নিশ্চিতভাবেই জানে যে, ‘শান্তিকামী’ ধর্মীয় রাজনীতি-তো নয়ই, এমনকি সংঘর্ষকামী ধর্মীয় মৌলবাদও তার জন্য মৌলিক কোন সমস্যা নয়।

এ অবস্থায় এদেশে এখন ইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদ বিকাশ হতে বাধ্য। ভারতে যেমন অনিবার্য হিন্দুত্ববাদের বিকাশ। খোদ আমেরিকাতেও শাসক পার্টি ও রাষ্ট্রের তরফে এখন ক্রমবর্ধিতভাবে খৃষ্টান মৌলবাদ বিকাশ লাভ করছে। শুধুমাত্র এই বিশ্বব্যবস্থা উচ্ছেদের একটা আমূল পরিবর্তনকামী কর্মসূচিকে শক্তিশালী করেই এ অবস্থা থেকে মুক্তি সম্ভব। যার একটি কাজ অবশ্যই হবে রাষ্ট্রের থেকে ধর্মের পরিপূর্ণ বিচ্ছেদসাধন। অবশ্যই যা বিজ্ঞানমনস্কতাকে সমাজের চালিকা চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করবে। যা কিনা পশ্চাদপদ ক্ষুদে উৎপাদন ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে ফেলবে। যাতে সব ধরনের অদৃষ্টবাদের ভিত্তি উচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মীয় মৌলবাদেরও অবসান ঘটে। যে কর্মসূচি দুইশ’ বছরেরও বেশি আগে বুর্জোয়া বিপ্লবের পুরোধারাই প্রথম পৃথিবীতে এনেছিলেন। কিন্তু বিশ্ব শ্রমিক বিপ্লবের ভয়ে সে কর্মসূচি এখন আর বিশ্ব বুর্জোয়ারা অনুসরণ করছে না, এবং তা করতে তারা সক্ষমও নয়। সেটা আমাদের দেশের আওয়ামী-বিএনপি রাজনীতি, আর বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের ‘ধর্মীয়’ আচরণ থেকেই আরো পরিস্কার হবে। তাই, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণকেই এখন এই কর্মসূচিটা বাস্তবায়ন করতে হবে। এমন একটি বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের মৌলিক রূপান্তর করে, অর্থাৎ, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ, আমাদের দেশে তার দালাল বড় ধনী শ্রেণী ও তাদের সহযোগী হিসেবে বিরাজমান সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাদপদ সম্পর্কগুলোকে সমূলে উচ্ছেদ করেই শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের সামাজিক ভিত্তির মূলোৎপাটন করা যাবে। এবং এভাবেই শুধু এই মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার রাহুগ্রাস থেকে দেশ ও জনগণ মুক্তি পেতে পারেন।

(সেপ্টেম্বর, ২০০৫)

সূত্রঃ আন্দোলন প্রকাশনা, সিরিজ- ৩

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s