ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) (পিপলস ওয়ার)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির দলিল

Maoist-Flag

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) (পিপলস ওয়ার)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র “বিপ্লবী যুগ”-এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ

বিশ্ব জনগণের এক নম্বর শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উন্মত্ত যুদ্ধ-চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ান

পদলেহী ভারত সরকারের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ খ্যাপা কুকুরে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রতিরক্ষা তথা সামরিক সদরদপ্তর পেণ্টাগণ আর নিউইয়র্ক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের দুটি বহুতল বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ যুদ্ধের হুংকার ছাড়তে শুরু করেছে। পৃথিবীর সমস্ত দেশকে এই যুদ্ধ উন্মাদনায় জড়িয়ে নিতে চাইছে আমেরিকা। আর সবচেয়ে নির্লজ্জভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী আগ বাড়িয়ে মার্কিন-প্রভুর সেবায় এগিয়ে এসেছে। আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করলে তাতে সবরকম সাহায্য করার আগাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত সরকার। সিপিএম-সিপিআই-এর মতো দলগুলোও আমেরিকারঅপকীর্তি ফাঁস করার বদলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মুখর হয়ে মার্কিন যুদ্ধ-প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক মদম যোগাচ্ছে।

এরা সবাই যেটা চেপে যেতে চাইছে, তাহলো আমেরিকার ওপর আক্রমণের জন্য দায়ী কে? কার দোষে আজ হঠাৎ আমেরিকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন। নিঃসন্দেহে এর জন্য দায়ী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিজে। দায়ী দেশে দেশে তার বর্বর অভিযান। দুনিয়ার সমস্তপ্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীকে তার মদদদান। দায়ী তার আর্থিক আর সামরিক নীতি, যার লক্ষ্য সারা পৃথিবীর ওপর প্রভুত্ব বিস্তার। এই লক্ষ্যেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে একের পর এক দেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে  অথবা আঞ্চলিক যুদ্ধ লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। আর দেশে দেশে বিশ্বায়নের নামে নতুন অর্থ-ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন ছারখার করেছে। অনুন্নত দুনিয়ার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অবর্ণনীয় শোষণ, লাঞ্ছনা, দাসত্ব। এসবেরই প্রতিক্রিয়ায় ঘটেছে আমেরিকার বুকে এই আচমকা আক্রমণ। আমেরিকার সামরিক আর আর্থিক শক্তির প্রতীক পেন্টাগন ও বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র আক্রান্ত হয়েছে। দুনিয়ার একমাত্র বৃহত শক্তি হিসেবে আমেরিকার দম্ভ ধূলায় মিশেছে। বেরিয়ে পড়েছে তার কাগুজে বাঘের চেহারা। আর এর ফলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন শাসকগোষ্ঠী। আতঙ্কিতও। যে কোনো মূল্যে তার হৃত ‘গরিমা’ ফিরিয়ে আনতে পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ-উন্মাদনা তৈরি করেছে আমেরিকা। লক্ষ প্রাণের মূল্যেও তাকে ফিরে পেতে হবে বিশ্বপুলিশের মর্যাদা।

মানুষের জীবনের মূল্য কবে দিয়েছে আমেরিকা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুধু বিশ্বজুড়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই আমেরিকা জাপানের দুটো শহরকে মুছে দিয়েছিল দুনিয়ার বুক থেকে। আণবিক বোমা ফেলে হিরোশিমা ও নাগাসাকির কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। আজ দুটো গগণচুম্বী প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কিন্তু সেদিন দুটো শহর ধ্বংস করেছিল আমেরিকা অবলীলাক্রমে। সেই ক্ষত কি দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাবে কোনোদিন?

১৯৫০-৫১ সালে আমেরিকা কোরিয়ার বুকে শুরু করেছিল আগ্রাসী অভিযান। সদ্যমুক্ত চীনের গণমুক্তি ফৌজের হাতে মার খাওয়ার পরই সে অভিযান থেমেছিল। তারপর ’৫০ ও ’৬০-এর দশক জুড়ে আমেরিকা চালিয়েছিল একের পর এক দস্যুবৃত্তি। বিশেষ করে এশিয়া-আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের জোয়ারকে ধ্বংস করতে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল আমেরিকা। পৃথিবী থেকে সাম্যবাদী আন্দোলনকে মুছে দিতে, মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে ধ্বংস করতে নিজে থেকেই আমেরিকা বিশ্বপুলিশের ভূমিকায় নেমেছিল। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সালে লক্ষাধিক কমিউনিস্ট হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল সে। ভিয়েতনাম-লাওস-কাম্পুচিয়ায় চালিয়েছিল দশকব্যাপী বর্বর অভিযান। নির্বিচার আগুনে-বোমা ফেলে সবুজ শস্য ক্ষেত পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

শুধু গত একটি দশকে আমেরিকার দস্যুবৃত্তিতে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ ইরাকে, যুগোশ্লাভিয়ায়…। ইরাকের পানীয় জল পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে গেছে আমেরিকার নির্মম বোমাবর্ষণে। আমেরিকার মদদেই ইজরায়েল নিয়মিত খুন আর সন্ত্রাস চালাচ্ছে প্যালেস্টাইনে আর পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলিতে। এইভাবে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের কারবার চালিয়ে আসছে আমেরিকা আর দেশে দেশে তার পা-চাটা কুকুরের দল। সন্ত্রাস তৈরি করার, মিসাইল ছুঁড়ে বোমা ফেলে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেবার একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করে এসেছে তারা এতদিন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী, সবচেয়ে বড় যুদ্ধবাজ, সবচেয়ে বড় জনবিরোধী যদি কেউ থেকে থাকে, নিঃসন্দেহে তার নাম মার্কিন রাষ্ট্র। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন আর কোনো রাষ্ট্র মিলবে না যার হাতে এতো মানুষ হত হয়েছে, গৃহহীন হয়েছে, সবকিছু হারিয়েছে। হিটলারী সন্ত্রাসকেও বহু আগে ছাড়িয়ে গেছে মার্কিনী বোম্বেটেরা। বাস্তবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন-মদদপুষ্ট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক কোটি মানুষ।

আসলে, আমেরিকার জনগণেরও সবচেয়ে বড় শত্রু আমেরিকা নিজে। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্র। তার একচেটিয়া পুঁজির মালিক শাসকশ্রেণি। দুনিয়া জুড়ে তাদের আধিপত্যের বাসনাই ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে মার্কিন যুদ্ধ-দানবকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। এইসব বহুজাতিক মালিকশ্রেণির স্বার্থেই ’৮০-র দশক থেকে শুরু হয়েছে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে আর্থিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কর্মসূচি। সাম্রাজ্যবাদী নির্দেশ চাপিয়ে একের পর এক দেশকে নয়াউপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের নির্মন যাঁতাকলে পিষ্ট করেছে আমেরিকা। শুরু করেছে পুনরুপনিবেসিকরণের এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। গত দুই দশকে বহু দেশ ছারখার হয়ে গেছে এই নীতির ফলে, যার গালভরা নাম বিশ্বায়ন, কোটি কোটি শ্রমিক-কৃষক-কর্মচারী জীবন-জীবিকা হারিয়েছেন। অনিশিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে ডুবে গেছেন। শুধু আমেরিকাতেই কাজ হারিয়েছেন ৫০ লক্ষাধিক মানুষ। এগুলোও কি সন্ত্রাস নয়? এর প্রতিক্রিয়াতেই আজ বিশ্বজুড়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদ আর তার আর্থিক আগ্রাসনের হাতিয়ার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে। বিশ্বজুড়ে আমেরিকার সর্বনাশা আর্থিক ও সামরিক নীতি গোটা বিশ্ব জনগণকে ঠেলে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে। তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য দল, গোষ্ঠী, চক্র। আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোমর বাঁধছে সারা দুনিয়ার মানুষ। তাদের মধ্যে বেপরোয়া কেউ কেউ চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে আমেরিকাকে পর্যুদস্ত করার কথা ভাবতেই পারে। নিতেই পারে সন্ত্রাসের পথ। তার জন্যও দায়ী আমেরিকার শাসকবর্গ ছাড়া আর কে হবে?

বস্তুত, আজ যাদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ছে আমেরিকা তাদের তৈরি করেছে কে? তালেবান আর লাদেনদের মদদ দিয়েছে কে? সন্দেহ নেই, মার্কিন মদদ ছাড়া তারা পরিপুষ্ট হতে পারতো না। দুনিয়ার সর্বত্র ফ্যাসিবাদ, মৌলবাদ, বর্ণ বৈষম্যবাদ, জিওনবাদ (ইজরায়েলের) প্রভৃতি অন্ধকারের শক্তিকে মদদ দিয়েছে আমেরিকা। তার আগ্রাসী বিশ্ব দখলের পরিকল্পনায় কাজে লাগিয়েছে সবাইকে। আজ তাদের কেউ কেউ যদি ফ্রাঙ্কোস্টাইন হয়ে যায়, আমেরিকার দিকেই বন্দুক তাক করে, তার জন্য দায়ী কে হবে? মার্কিন শাসকরা তাদের নিজেদের তৈরি করা ফাঁদেই আজ আটকা পড়েছে।

এই সুযোগে আরেক চোরের মা আমাদের দেশের বাজপেয়ী সরকার বড় গলা বের করেছে। আমেরিকার মদদ নিয়ে পাকিস্তানকে গুড়িয়ে দেবার স্বপ্নে মশগুল হয়ে উঠেছে তারা। কারণ, এই দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য বিস্তারের পথে পাকিস্তানই সবচেয়ে বড় বাধা। আমেরিকা আজ এই উপমহাদেশে ভারতীয় শাসকদের সহযোগী ছোট পুলিশের ভূমিকায় পেতে চাইছে। ভারতীয় শাসকেরা মার্কিন বড়দাদার বিশ্বজয়ের প্রকল্পে ছোট শরিক হবার দৌড়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। ভারত যতদিন রাশিয়ার খপ্পরে ছিল ততদন এই উপমহাদেশে আমেরিকার প্রধান দাবার ঘুঁটি ছিল পাকিস্তান। কিন্তু আজ দিন বদলে গেছে। আজ ভারতের শাসকশ্রেণিই এই অঞ্চলে মার্কিন শাসকদের সবচেয়ে বড় ঘুঁটি। সবচেয়ে বড় অবলম্বন। ভারতের মুৎসুদ্দি শাসকেরা আমেরিকার প্রসাদ পেয়ে আহ্লাদিত।

এই আহ্লাদেরই প্রকাশ পেয়েছে আগ বাড়িয়ে ভারত সরকারের আমেরিকার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় মদদ করার অঙ্গীকার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদীর সহযোগিতা নিয়ে ‘সন্ত্রাস’ নির্মূল করার শপথ নিয়েছে তারা। আমেরিকা যেমন সারা পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, দাদাগিরি করেছে, জনগণের ক্রোধ আর ঘৃণা কুড়িয়েছে। তেমনি ভারত রাষ্ট্রও এই উপমহাদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বিপ্লবী ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেবার প্রচেষ্টা নিয়ে কোটি কোটি জনগণের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্র যেমন আজ বিশ্ব জনগণের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তেমনি ভারত সরকার দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মুখোমুখি। সন্ত্রাস দমনের নাম করে তাই ভারত সরকার আজ তার দমন যন্ত্রটাকে আরো মজবুত আরো তীক্ষè করতে চায়। আগামী দিনগুলোতে জনগণের বিরুদ্ধে আরও বড় যুদ্ধ চালাবার প্রস্তুতি নিতে চায় এই ফাঁকে, মার্কিন মদদে। আমেরিকা আর ভারতীয় শাসকদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতি তাই কোনো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়। এর লক্ষ্য বিশ্ব জনগণ। এই সুযোগে বিশ্ব জনগণকে সন্ত্রস্ত করা। আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের আধিপত্য কায়েম করা। শ্রমিক-কৃষক-বিশ্ব জনগণকে আমেরিকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য করা। সাম্রাজ্যবাদী এই বিশ্বব্যবস্থা তথা বিশ্বায়ন বিরোধী সমস্ত প্রতিবাদ সমস্ত বিরোধিতাকে ধ্বংস করা। এই যুদ্ধ প্রস্তুতি তাই বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে, বিশ্ব মানবতার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ প্রস্তুতি।

এই যুদ্ধ-দানবকে পরাস্ত করতে তাই জোট বাঁধতে হবে ভারতীয় জনগণকে। বিশ্ব জনগণের সাথে হাত মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধ শুরু করার শপথ নিতে হবে।

 ১৯/০৯/২০০১

সূত্রঃ https://pbspmbrm.files.wordpress.com/2012/09/spark-collections.pdf

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s