বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলিল

Maoist-Flag

ভয়ংকর ব্যবস্থা হতে উদ্ভূত বিভীষিকা

বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রকাশিত

[নোট: RCO(USA) তথা রেভ্যুলিউশনারী কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস্ অব আমেরিক কর্তৃক ইংরেজিতে প্রকাশিত এই বিবৃতির বাংলা অনুবাদ]

১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রবল মানসিক ধাক্কা। সবকিছু গুড়িয়ে দিয়ে, কাড়ি কাড়ি ইস্পাত আর কংক্রিটের ধস। ক্ষয়ক্ষতি। মুহূর্তে জীবন লণ্ডভণ্ড। বিপুল ধ্বংসাবশেষের তলে সমাধিস্থ প্রিয়জনের খোঁজাখুঁজি।

আকাশ থেকে নেমে আসা বিভীষিকা।

বাদামী রঙের এক মহিলা তার নিখোঁজ স্বামীর ছবি নিয়ে রেড ক্রসের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ চারদিকে আতিপাতি করে খুঁজছে যেনো তাতেই তার স্বামী ফিরে আসবেন। নীলচক্ষু এক যুবক তার প্রেমিকার খবরের আশায় শংকিত চিত্তে অপেক্ষমান। প্রত্যাশা অবশেষে এই উপলব্ধিতে পর্যবসিত হয় যে সাথী, বন্ধু কিংবা সহকর্মী হারিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। নিত্যদিনের জীবনে স্বর্গ থেকে নেমে আসা সংঘাতের পাশবিক অনুপ্রবেশ ছিনিয়ে নিয়েছে তাদেরকে।

নিউইয়র্ক নগরী এক লহমায় আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় বাগদাদ,বেলগ্রেড,সুদান, পশ্চিম তীর,ভিয়েতনাম,পানামা,ইন্দোনেশিয়া,হিরোশিমা ও ভিয়েকুস (Vieques)। আমাদের মনের পর্দায় একের পর এক ছবি ভেসে ওঠে। মার্কিনী বোমা যখন বৃষ্টির মতো ঝরছে, মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে বাগদাদের রাস্তা ধরে দৌঁড়াচ্ছেন। ইরাকি নারীরা তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের সন্তানদের মরে যেতে দেখছেন, কারণ – মার্কিনী বোমা আর অবরোধ বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য পানিকে পরিকল্পিতভাবে বিষাক্ত করে তুলেছে। পশ্চিম তীরে পরিবার পরিজন আমেরিকায় তৈরি রকেটের আঘাতে নিহত তাদের পুত্রের কফিন বয়ে নিয়ে চলেছেন। সুদানে শ্রমিকগণ আমেরিকার ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে গুড়িয়ে যাওয়া ঔষধ কারখানার ধ্বংসাবশেষে খোঁজাখুঁজি করছেন। আমেরিকার বোমা যখন আকাশ থেকে ঝরছে বেলগ্রেডের (লোকজন) আশ্রয়ের তালাশে আর্তনাদ করছেন। ওয়াশিংটনের নীলনকশার অভ্যুত্থান তাদের যে প্রিয়জন, পুত্র-কন্যাদের চিরদিনের জন্য মৃত্যুর শীতল গুহায় ঠেলে দিয়েছে চিলির স্টেডিয়ামে দাঁরিয়ে দাঁড়িয়ে তাই তারা দেখছেন। আতঙ্কে জমে গিয়ে তারা খাবি খাচ্ছেন যখন ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর ফায়ারিং স্কোয়াড সিআইএএর তালিকা অনুসারে শত শত হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করছে আর নদী ভরে তুলছে তাদের লাশ দিয়ে।

হিরোশিমা, ভিয়েতনাম আর বাগদাদ ঘুরে যুদ্ধ এখন নিজ দেশে হাজির। বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র আর পেন্টাগণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রতীক যদি হয়েও থাকে, বাস্তবতা এই যে এর ফলশ্রুতিতে বহু নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন।

কিন্তু এর জন্য দায়ী কে? কে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে এই বিপাকে ফেলেছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ইঙ্গিত করছে। কিন্তু উত্তরটা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই। অসংখ্য অপরাধী কর্মকাণ্ড, বিশ্বজুড়ে নির্মম শোষণ-পীড়ন ও সামরিক তৎপরতা, বিশ্বের জনগণের ওপর দুর্ভোগ-দুর্বিপাক চাপানো প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এই সাম্রাজ্যবাদীরা এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যার ফলে সারা দুনিয়ার লক্ষ কোটি মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে ঘৃণা করেন।

* * * * *

 চোখের ওপর থেকে ধূলোর পর্দা সরে যাবার পর বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী দেশের জনগণ দেখতে পান যে তারা মার্কিনের ক্ষমতার কাঠামো ও তাদের রক্ত মাখা সামরিক যন্ত্রের দুষ্কর্মের অনিবার্য পরিণামফলের হাতে জিম্মি হয়ে বসে আছেন। আর এখন, সারা দুনিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে যে বিভীষিকা এরা চালিয়েছে যার পরিমাণ নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনের বর্ষিত অশ্রুর চাইতে হাজার গুণ বেশি, সেই বিভীষিকা ছাড়াও এই কঠিন হৃদয় সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের পশুর পেটের ভেতর একই ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

আর এরা এখন কিনা লোকজনকে বলছে তাদের প্রতিশোধমূলক কার্যক্রমকে সমর্থন করতে। তারা যুদ্ধ আর ন্যায় বিচারের বুলি কপচাচ্ছে। [আমাদের সাফ জবাব] না।

এই আধিপত্যবাদী জালিমদের কোনো অধিকার নেই যুদ্ধের শিঙ্গা বাজিয়ে যাবার। সারা দুনিয়া জুড়ে দুঃখ-কষ্ট আর দুর্ভোগের জন্য এরাই তো দায়ী। এখানো নাম না বলা (unnammed) দেশ ও লক্ষ্যের বিরুদ্ধে এদের বর্তমান  যুদ্ধ ও সামরিক কার্যক্রমকে বিরোধিতা করতে হবে সক্রিয়ভাবে।

এই মানসিক ধাক্কার ভেতর দিয়ে আমরা সত্য অনুসন্ধান করি। বিশ্ব জুড়ে শোষণ-পীড়ন পরিচালনাকারী ও গণহত্যাকারীদের কোনো অধিকার নেই প্রতিশোধ নেবার, তারা আরো ধ্বংসযজ্ঞ ও অন্যায়-অবিচারই শুধু ডেকে আনতে পারে। তাদের সাথে সহযোগিতা করা কিংবা তাদের কাছ থেকে নিরাপত্তা চাওয়া হলে বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে আরো অপরাধ সংঘটনে তাদেরকে উৎসাহিতই শুধু করা হবে।

অধিকৃত অঞ্চলের রাস্তায় আরব যুবকরা উল্লাস করছে এমন ছবি দেখিয়ে তারা আমাদেরকে আতঙ্কিত হতে ও প্রতিশোধবাদী হতে বলে। কিন্তু আমাদের জানা দরকার কেন মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যান্য অংশের জনগণ ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলীর জন্য উল্লাস করছেন; নিরীহ মানুষজন নিহত হয়েছেন এজন্য তারা তা করছেন না বরং করছেন এ জন্য যে, যে উদ্ধত ক্ষমতাধররা মানুষ খুন করে পার পেয়ে যাচ্ছিল এবং নিজেদের তথাকথিত অজেয়তার জন্য বড়াই করছিল দেখা গেল তাদের অবস্থা আসলে অত্যন্ত নড়বড়ে(vulnerable)।

* * * * *

শাসকরা আমাদের বেদনাকে পুঁজি করে এবং লোকজনকে বলে তাদের সাথে প্রার্থনায় যোগ দিতে। কিন্তু মানুষরা যখন মৃত আপনজনকে স্মরণ করছেন, কি করছে তখন শাসকরা? তারা চাগিয়ে তুলছে আরো যুদ্ধ আর রাষ্ট্রীয় পুলিশি তাণ্ডবতা। বিশ্ব জুড়ে তারা মানুষ শিকার করে বেড়াচ্ছে। তারা মানুষজনকে রক্ষা করার বুলি ঝাড়ে। কিন্তু সর্বদাই তারা যা করছে তাহলো নামের তালিকা করা, হামলা চালানো এবং যত্রতত্র দাদাগিরি ফলানো।

তারা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসের অবসানের কথা বলে এবং আরো বড় মাত্রার বিভীষিকা চালাতে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত করে।

তারা চায় আমরা তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই আর তাদের পতাকা দোলাই।[আবারো] না।

আজকের এই উত্তেজনার মুহূর্তেও আমরা ইতিহাসের শিক্ষাকে স্মরণ করি। তারা যখন আরেকটা পার্ল হারবারের কথা বলে, আমাদের স্মৃতিতে জাগে কীভাবে মার্কিন সরকার নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে লোকজনের ভীতিকে পুঁজি করেছিল এবং জাপ-মার্কিনীদের পাকড়াও করা, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং নির্যাতন শিবিরে বন্দি রাখার কাজে তাদেরকে সমাবেশিত করেছিল। আমাদের মনে আছে কেউ তাদেরকে বিরোধিতা করলে কীভাবে তারা তাকে শত্রুর মদদগার হিসেবে চিত্রিত করতো।

এই সব স্মৃতি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আমাদের প্রতিজ্ঞাকে জোরদার করে। সরকারি বেসরকারি চাপের মাধ্যমে আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে তাদের যুদ্ধ কার্যক্রম ও পতাকার পেছনে সমাবেশিত করা যাবে না। এই বিশেষ যুক্তি (logic)টা কী তা আমরা দেখতে পাই আরব জনগণের ওপর পরিচালিত নোংরা হুমকি ধমকি ও নির্যাতনের ভেতর।

মানুষ যখন নিহত আপনজনের জন্য শোক করে, আমরা যখন পরস্পরকে সমবেদনা জানাই, যারা গুরুত্ব দিয়ে ন্যায় বিচার কামনা করেন তাদের প্রয়োজন হলো বিশ্বের জনগণের কাছে পৌঁছা, এই ব্যবস্থার অপরাধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো এবং যুদ্ধ ও নিপীড়নের প্রতিটি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা।

প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় আমাদেরকে এই নিপীড়ক – যারা নতুন একটা যুদ্ধের জন্য দাপাদাপি করছে – তাদের খাসলত সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে; এই উদ্ধত মিথ্যুক পশুগুলো এ দেশ কিংবা বিশ্বের জনগণের স্বার্থে শাসনকার্য পরিচালনা করে না। যতদিন পর্যন্ত এরা ক্ষমতাসীন থাকবে, তাদের ব্যবস্থা হতে উদ্ভূত বিভীষিকা আকাশ থেকে ঝরতেই থাকবে।

 বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

৪ সেপ্টেম্বর, ২০০১

সূত্রঃ https://pbspmbrm.files.wordpress.com/2012/09/spark-collections.pdf

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s