সিপিআই(মাওবাদী) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক ‘আকাশ’ এর সাক্ষাৎকার

Maoist-Flag

হাওয়াই চপ্পল আর সাদা শাড়ি মমতা সরকারের আসল চেহারা নয়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্রের জোরে তাদের এই অবস্থান গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন। তারা জনগণের জন্য বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সেবা দেবার জন্য স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা, ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য গণআদালত গড়ে তোলা, শিশুদের শিক্ষার জন্য স্কুল নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ এমন কি মুক্তাঞ্চলে শাসন পরিচালনা করার জন্য গণকমিটি গড়ে তোলা, যা কিনা একটি সমান্তরাল সরকার হিসেবে কাজ করে। মাওবাদীরা লালগড় ও সিঙ্গুড়ে সফল আন্দোলন পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে।
মমতা ব্যানার্জী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি মাওবাদীদের দমনের জন্য ১০ হাজার নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ দিয়েছে। সরকার স্বাভাবিকভাবেই মাওবাদীদের গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপের বিরোধী। এ কারণেই দুই পক্ষের উন্নয়ন কার্যকলাপ পরস্পরের মধ্যে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। মাওবাদীদের অভিযোগ সরকারের উন্নয়ন তৎপরতা জনগণের জন্য কার্যকর নয়, কারণ সেগুলোতে জনগণের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। এছাড়াও বরাদ্দের টাকা লুটপাট হয়ে যায়। অপরদিকে সরকারের অভিযোগ মাওবাদীরা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মাওবাদী)’র অন্যতম নেতা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার সম্পাদকআকাশ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তেহেলকা ডট কমের সঙ্গে

আপনাদের সামরিক ও রাজনৈতিক রণকৌশল সম্পর্কে বলুন। মমতা ব্যানার্জীর সরকার সম্পর্কে আপনাদের পার্টির মূল্যায়ন কি? আপনারা কি লক্ষ নিয়ে কাজ করছেন?
আকাশ : সারা ভারতের জন্য আমাদের কৌশল এক ও অভিন্ন। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় পরিস্থিতির বিবেচনায় আমাদের প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সব স্থানে আমরা একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছি না। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান এবং রাজ্যের আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য দরিদ্র মানুষের বসবাস। যেখানে ক্ষুধা একটি মারাত্মক সমস্যা সেখানে আমাদের যুদ্ধকৌশল ও কর্মপদ্ধতি ভিন্ন। আমরা তাদের জীবন মানের উন্নতির জন্য কাজ করছি। তাদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্প পরিচালনা করছি, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রাস্তা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করছি। শিশুদের জন্য স্কুল খোলা হয়েছে। ন্যায় বিচারের জন্য বিচার কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও দারিদ্র্য, নির্যাতন, নিপীড়ন আর অবহেলা থেকে চিরতরে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে তাদের সংগঠিত করার কাজ চলছে। কিন্তু সরকার আমাদের উন্নয়ন কার্যকলাপগুলোয় বাধা দেয়। অথচ তারা উন্নয়নের নামে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করে সেগুলো জনগণের কোনো কাজে আসে না। বরাদ্দের টাকা সবই লুটপাট হয়ে যায়।
বাংলার মানুষের উন্নতির জন্য মমতা ব্যানার্জী যদি সত্যিই কাজ করেন তাহলে আমরা তাকে অভিনন্দিত করব। যদিও সে জনগণের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক অধিকারী মমতা ব্যানার্জী স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর উদাহরণ হলো তৃণমূল এমপি মুকুল রায় যখন রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল তখন তিনি মমতার সম্মানে তার ব্যবহারের জন্য নতুন ধরনের আসন বিন্যাস ব্যবহার করেছিল। এই ঘটনায় আমার মনে হলো, রামায়ণের কাহিনীতে রামের চপ্পল সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করার কথা। এই অবস্থা ২১ শতকে ঘটলে তা হবে হাস্যকর।
আশ্চর্যজনকভাবে মমতার এই সামন্তীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা কোনো কথা বলেননি। এই সংস্কৃতি কি একটি গণপ্রজাতন্ত্রের নাকি রাজা-মহারাজারদের শাসিত কোনো দেশের? আমাদের এই গণবিরোধী সংস্কৃতির মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা আশা করব মমতা তার এই অগণতান্ত্রিক আচরণের পুনর্মূল্যায়ন করবে। যতদিন একটি সরকারের গণবিরোধী অবস্থান থাকবে সেটা মমতা বা যে কেউ হোক না কেন আমরা তার প্রতিরোধ করব। যেমন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র আমেরিকান লবির একজন লোক। তিনি সবসময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সেবা করেন। আর এটা কখনই যথেষ্ট নয় যে, উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো এসি রুম থেকে বা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ঘোষণা করা হয়নি। কোথা থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো উন্নয়ন হচ্ছে কিনা।
আমরা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছি। এই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হলো কৃষি ও শিল্পখাতের বিকাশ। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রের কাঠামোতে এটা সম্ভব হবে না। বর্তমান শাসক শ্রেণী উন্নয়নের নামে এমন প্রকল্প গ্রহণ করেছে যেগুলোতে উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের নীতিগুলো দেখুন। জঙ্গল মহলের পুলিশ ক্যাম্পগুলো থেকে আদিবাসী গ্রামগুলোতে ফুটবল, হকি খেলার সরঞ্জাম, চকোলেট এবং মশারি বিতরণ করা হচ্ছে। এটাকেই তারা বলছে উন্নয়ন। জনগণ ফুটবল নিয়ে কি করবে? ফুটবল খেলতে না পারা কি তাদের জীবনের প্রকৃত সমস্যা। জনগণের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে তারা আন্তরিক নয়? আমরা অবশ্যই রাষ্ট্রের এই প্রতারণামূলক নীতির বিরোধিতা করব।

ভবিষ্যতে আপনাদের কাজের পরিকল্পনা কি? যৌথ বাহিনীকে আপনারা কিভাবে মোকাবেলা করবেন বলে মনে করেন?
আকাশ : এটা রাষ্ট্রের আচরণের ওপর নির্ভর করে। আমাদের রণনীতি একই থাকবে। কিন্তু আমাদের রাজনীতি, সামরিক ও সংগঠনের কৌশল প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল। যখন লালগড়ের বিদ্রোহ সর্বোচ্চ অবস্থায় ছিল তখন আমরা আমাদের কৌশল প্রতিদিন পরিবর্তন করেছি। অতি সম্প্রতি আমরা আমাদের বেশ কিছু কৌশল পরিবর্তন করেছি। আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পরিবর্তন করি না বরং প্রতিদিনের কাজ ও সাপ্তাহিক পর্যালোচনা থেকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সামরিক ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা যৌথবাহিনীকে মোকাবেলা করতে সক্ষম। আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি যে রাষ্ট্রীয় নীতি আমাদের উন্নয়ন নীতিগুলোর জন্য, আমাদের জন্য ক্ষতিকর। মমতা সরকারের সামরিক পদক্ষেপগুলো আমরা লক্ষ্য করছি, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা যৌথবাহিনীকে প্রতিহত করতে পারি। নির্বাচন পরবর্তী মমতা সরকারের আচরণ এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী। একটি উদাহরণ দেই, ঝাড় গ্রামের দুর্গেশ গ্রামে অনেক রাজনৈতিক দল মিটিং করে থাকে। কিন্তু যখন জঙ্গলমহলের জনগণ তাদের নিজেদের সমস্যা নিয়ে মিটিং করতে গেল তখন দলগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সভা সমাবেশ করতে পারে তাহলে জনগণ কেন পারবে না? এই ঘটনা মমতা সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে উন্মোচন করে।

পশ্চিমবঙ্গে আপনাদের সর্বোচ্চ অর্জন কি বলে মনে করেন? জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা আপনাদের উপস্থিতিতে কিভাবে উপকৃত হচ্ছে?
আকাশ : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের প্রথম সর্বোচ্চ অর্জন হলো বর্তমান সমাজের সামাজিক ফ্যাসিস্ট চরিত্রকে উন্মোচন করা। এটা শুধু এখানেই নয়, সারা দুনিয়াজুড়ে অবস্থিত। যেসব এলাকায় আমাদের শক্তিশালী সমর্থক রয়েছে সেসব এলাকাতে আমরা এটা ভালোভাবে করতে সক্ষম হয়েছি। পার্টির বিকাশ এ বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এরপর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমরা ছদ্মবেশী মার্কসবাদীদের উন্মোচন করেছি। আমাদের তৃতীয় অর্জন হলো আমাদের গণলাইন জনগণ গ্রহণ করেছে। চতুর্থত, সিপিএম এবং তাদের মিত্ররা বিপর্যস্ত হয়েছে। লালগড় আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এটা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সারা পৃথিবীকে আমরা জানাতে পেরেছি যে, তারা সেখানে কি  করেছে। পঞ্চমত, আমরা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। দুটোই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা খুবই সফলতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষ সংগঠিত করতে পেরেছি, যারা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগ্রাম করতে শিখেছে। ষষ্ঠত, আত্মবিশ্বাসী মানুষজন তাদের নিজেদের উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজে অংশগ্রহণ করেছে। তারা তাদের নিজেদের দাবি জানাতে এবং অধিকার অর্জন করতে শিখেছে। আরো একটি বড় অর্জন হলো যে, জঙ্গলমহলের আদিবাসী সাঁওতাল মহিলারা যারা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আত্মসম্মান এবং স্বাধীনতা অর্জন করতে শিখেছে।
মাওবাদী পার্টির হস্তক্ষেপের আগে এই অঞ্চলে রাষ্ট্রের কোনো উন্নয়নের কর্মসূচি ছিল না। জঙ্গলমহলে মানুষ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক সম্মান, আত্মমর্যাদা এবং ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। আদিবাসীরা জঙ্গলের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এর আগে এখানে তাদের কোনো অধিকার ছিল না।
জঙ্গলমহলে বনভূমির উন্নয়নের জন্য জনগণের কমিটি গঠিত হয়েছে। বনের সমস্ত উৎপাদন এখন তাদের হাতে আসছে। এসব উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য তারা এখন পাচ্ছে। আরো একটি বড় অর্জন হলো মাওবাদী পার্টিতে আদিবাসী মহিলাদের একটি বড় অংশ যুক্ত রয়েছে। তারা নিজেরাই এখন তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে মদ্যপানের বিরুদ্ধে তারা বড় আকারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। মহিলারা নিজেরাই তাদের গণকমিটিগুলো পরিচালনা করছে। এছাড়া তারা নিজেরা গণআদালত পরিচালনা করছে এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আমাদের কাজের সফলতা। কৃষিতে আমরা ৩-৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি।

প্রাথমিকভাবে কোনটি আপনারা অর্জন করতে চাইছেন আদিবাসীদের উন্নয়ন নাকি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন? আপনাদের প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা আছে কি?
আকাশ : আদিবাসীদের উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন এই দুটোই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু একটি দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে আদিবাসীদের কল্যাণ কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ছাড়া সম্ভব নয়। এটা সত্যি নয় যে, আমরা প্রকাশ্যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চাই না বা করি না। আমরা রাজনীতির গোপন ও প্রকাশ্য উভয় ধারার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
গণতান্ত্রিক কাজে অংশ নিতে আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। এজন্য আমরা বর্তমান ও আগের সরকারকে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি। আমরা একটি তদন্ত কমিশনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। জঙ্গলমহাল এলাকায় উন্নয়নের জন্য যে কোটি কোটি টাকা দেয়া হয়েছিল সেগুলো কোথায় এটা খুঁজে বের করার জন্য। আমরা নতুন সরকারের কাছে এই দাবি জানিয়ে মোট চারবার আবেদন জানিয়েছি কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি। এ হলো মমতার রাজনীতি। সে জনগণের প্রয়োজনে বা কোনো পার্টির আহ্বানে উত্তর দেবার মতো কোনো দায়িত্ব অনুভব করে না।

আপনি কি প্রত্যাশা করেন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে জঙ্গলমহলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন?
আকাশ : আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো জঙ্গলমহলে জনগণের সরকার গঠন করা। এজন্য সেখানে আমাদের একটি মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেখানকার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করতে হবে। ২০০৭ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, জঙ্গলমহলে আমরা স্বাধীন মুক্তাঞ্চল গঠন করতে চাই। যাকে আমরা বলি ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলা। প্রকৃতপক্ষে এটা হলো একটি নতুন রাষ্ট্রের বা নতুন সমাজের ভ্রুণ।
জঙ্গলমহলকে নিয়ে আমাদের একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাও আছে। তবে পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি আর দীর্ঘমেয়াদি যাই হোক না কেন, এখানে আমরা একটি উন্নয়নের মডেল দাঁড় করাতে চাই। যার সব কিছু পরিচালিত হবে জনগণের নিজস্ব উদ্যোগ, পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যাকে আমরা বলি গণকমিটি। জনগণ এই কমিটির মাধ্যমে তার প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা করবে। আমরা বিশ্বাস করি এ সবই অর্জিত হবে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে।
এর কারণ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রাম-পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট পর্যন্ত কোনোখানে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। ভারতের সংবিধান এ দেশের মাটি থেকে উৎসারিত হয়নি। এটা এসেছিল ব্রিটিশ, আমেরিকান ও আইরিশ সংবিধানের অন্ধ অনুকরণে। তাই এই সংবিধান প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে সক্ষম নয়। আমরা এর বিকল্প পথ অনুসরণ করতে চাই। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো জনগণকে আমাদের সঙ্গে রাখা এবং তাদের প্রয়োজন ও পরামর্শে কাজ করা। কারণ জনগণ সবসময় সঠিক অবস্থানে থাকে।
তবে সরকারের ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে না সরিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সাদা শাড়ি আর হাওয়াই চপ্পল বর্তমান সরকারের প্রকৃত পরিচয় নয়। আমাদের সচেতনভাবে বুঝতে হবে জনপ্রিয় স্লোগান ব্যবহার করে কিভাবে মমতা ক্ষমতায় এসেছে। তারা প্রকৃত পক্ষে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। এটা বুঝতে হবে ভোটে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও সামাজিক ফ্যাসিবাদের অবসান হয়নি।

সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি জঙ্গলমহালের বাইরেও বিস্তৃত। কিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলায় আপনারা কাজ গড়ে তুলেছেন বা টিকে আছেন? কলকাতায় আপনাদের শক্তিশালী ভিত্তি কবে গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন?
আকাশ : আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহালেরই তৎপরতা সীমাবদ্ধতা না রেখে এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়া। বর্তমানে পশ্চিবঙ্গের প্রত্যেক জেলাতে আমাদের কমবেশি অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যেই বিভিন্ন স্থান থেকে জনগণ আমাদের আহ্বান করছে। আমরাও সেই সব এলাকাতে পার্টির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য কাজ করে চলেছি। প্রতিদিনই আমাদের কাজের নতুন নতুন এলাকা বাড়ছে এবং অসংখ্য জনগণ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এখনই আমাদের পার্টি নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাকুড়া, বর্ধমান জেলাতে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। আমরা ২০০৪ সাল থেকে এইসব জেলাতে কাজ করছি। আমাদের উপস্থিতি সরকারকে এটা বিবেচনা করতে বাধ্য করছে যে, এসব এলাকাতে যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেনি।
আমরা জ্যোতির্বিদ নই যে এখনই বলতে পারব কবে কলকাতায় আমাদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠবে। তবে এটা নিশ্চিত যে, একদিন কলকাতাতেও আমাদের একটা শক্তিশালী অবস্থান গড়ে উঠবে। এটা নির্ভর করবে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকট এবং সেই সঙ্গে আমাদের তৎপরতার ওপর। এই সংকটে এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হবে যার ফলে মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠতে বাধ্য হবে। সেই সময় কবে আসবে তা আমরা এখনই বলতে পারছি না। তবে সেটা যে খুব দূরেও নয় তো নিশ্চিত। সম্প্রতি আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একটি সার্কুলারে নিদের্শনা দেয়া হয়েছে যে, তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজ্যকমিটি পর্যন্ত পার্টির প্রতিটি কমরেডকে সেই অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য প্রাণপণে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আর তখনই আমরা জনগণের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করতে পারব। এটাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

গত এক বছর ধরে আপনাদের রাজ্য কমিটির অনেক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে বন্দি আছে। তাহলে আপনি কি এটা স্বীকার করবেন যে, রাজ্যকমিটির শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আছে এবং আপনারা জনসমর্থন হারিয়েছেন?
আকাশ : প্রাক্তন রাজ্যকমিটির সম্পাদক কমরেড হিমাদ্রি, বর্তমান কমিটির সম্পাদক কমরেড সুদীপ বা কাঞ্চনসহ রাজ্য কমিটির অনেক নেতৃত্ব জেলে বন্দি আছে। এটা আমাদের জন্য একটি বিপর্যয়। আশা করছি এই বিপর্যয় আমরা কাটিয়ে উঠব। আমরা এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের নতুন নেতৃত্বদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বিশেষ করে কমরেড কাঞ্চন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে আমাদের পার্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা সত্যি যে, কলকাতায় আমাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছিল। আমাদের চলাচল অনেক সীমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা খুব দ্রুতই এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। এজন্য আমাদের পার্টি পুনর্গঠন করতে হয়েছে। আর যে কোনো বিপ্লবী সংগ্রামের জন্য এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বিপ্লব কোনো কুসুমাকীর্ণ পথে আসে না। এখানে বিপর্যয় আসবে সেটা কাটিয়ে আবারো চলতে হবেÑ এটাই নিয়ম।
আমাদের এমন দিনও গেছে যখন যৌথবাহিনী পার্টির সদস্যদের ধরার জন্য গ্রামের প্রতিটি ইঞ্চিতে তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের বিপুল গণভিত্তি ছিল জনগণই আমাদের রক্ষা করেছে। আমরা জনগণের মধ্যে মিশেছিলাম, যৌথবাহিনীর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় তাদের কাছ থেকে আমাদের পৃথক করা। জঙ্গলমহলের জনগণ তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য এক ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এখানে মাওবাদীদের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে।
গণসমর্থন হারানোর অভিযোগ সত্যি নয়। গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো ঘটেছে শহরে। গত ছয় বছরে রাজ্য সরকার তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে যথেষ্ট সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন গণসমর্থন ও গণভিত্তি থাকলে রাষ্ট্রের কোনো নেটওয়ার্কই সম্পূর্ণভাবে শক্তিশালী  হতে পারে না। তারপরেও আমরা এসব গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছি যে, কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল। বেশ কিছু কারণ আমরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছি সেগুলো এখন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।
হ্যাঁ আমি আপনার একটি কথা স্বীকার করছি যে, পুলিশের গোয়েন্দা বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী। মমতা ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে আমাদের পার্টিকে মোকাবেলার জন্য আরো ১০ হাজার জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও হোমগার্ড নিয়োগ দেবে। তিনি তার ইচ্ছোমতো যত খুশি নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ দিক, তাদের ইচ্ছোমতো ব্যবহার করুক না কেন। তার এই তৎপরতা ক্ষণস্থায়ী। জনগণের আন্দোলনের মুখে তার সব চেষ্টা ভেঙে পড়তে বাধ্য। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাওবাদীরা তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেবে।

Advertisements

One Comment on “সিপিআই(মাওবাদী) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক ‘আকাশ’ এর সাক্ষাৎকার”

  1. chinmoy mandal says:

    আকাশ বাবু আমি আপনার মতকে প্রসংশা করলেউ ” জ্যোতির্বিদ নই” কথাটির তীব্র নিন্দা সহ ধিক্কার জানাচ্ছি,তাহলে আপনি ভাবেন যে বাস্তবে কুসংস্কার মুক্তি না ঘটিয়ে সাম্যের সমাজব্যবস্থা কি গড়ে ওঠা সম্ভব….? অন্ধবিশ্বাস যে প্রশ্নহীন আনুগত্য এ চালনা করে বঞ্ছনার কারনকে জানতে দেয়না সেটা কি আপনি মনে করেন না….????

    Like


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s