পেরুর মহান মাওবাদী নেত্রী কমরেড ‘নোরা’

অগাস্টা লা তোররে কারাস্কো ওরফে কমরেড নোরা(১৯৪৬-১৯৮৮) হচ্ছেন মাওবাদী পেরু কমিউনিস্ট পার্টি, যা Sendero Luminoso (শাইনিং পাথ) নামে পরিচিত, এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নেত্রী ছিলেন। তার অন্য একটা পরিচিতি হল, তিনি পেরু কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান কমরেড এবিমেল গুজম্যান গণজালোর স্ত্রী ছিলেন। কমরেড নোরা তার কমিউনিস্ট বাবা এবং প্রগতিশীল দাদা’র রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তবে তিনি কমরেড গণজালো’র মাধ্যমে মাওবাদী আন্দোলনের প্রতি প্রভাবিত হন।

১৯৬২ সালে ১৭ বছর বয়সে তিনি পেরু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তখন তিনি পেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক গণজালো’র সাথে পরিচিত হন। ওই সময় রাজনৈতিক কারণে তার বাড়ীতে কমরেড গণজালো’র নিয়মিত যাতায়ত ছিল। এক সময় মতাদর্শগত মিল থাকায় তারা পরস্পরকে বিয়ে করেন। ১৯৭৮ সালে তারা গোপন রাজনৈতিক জীবনে চলে যান। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কমরেড গণজালো’র সাথে পেরুর গণযুদ্ধের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পার্টি ও জনগণের সেবা করে যান।

তিনি ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া পেরুর গণযুদ্ধের সময় গোপনে নারীদের সংগঠিত করে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা অব্যাহত রাখেন। তিনি আলোচনা, লিখিত প্রচারণার মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করে বিপ্লবী আন্দোলনকে নারীদের অংশগ্রহণের জনপ্রিয় কেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি গেরিলা অ্যাকশনের সময় পার্টিতে নারীদের সমঅধিকার নিশ্চিত করেন।

কমরেড 'নোরা'

কমরেড ‘নোরা’

nora

কমরেড নোরা ও কমরেড গণজালো

কমরেড নোরা ও কমরেড গণজালো

কমরেড নোরা ও কমরেড গণজালো

কমরেড নোরা ও কমরেড গণজালো

augusta-wedding-full

abimael-guzman

কমরেড নোরার শবদেহের প্রতি লাল সালাম জানাচ্ছেন কমরেড গণজালো

কমরেড নোরার শবদেহের প্রতি লাল সালাম জানাচ্ছেন কমরেড গণজালো

DIRE220610abima

Advertisements

জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন ও জাতীয় কমিটির সাম্প্রতিক লং মার্চ

1379511_296897887115178_58637038_n

সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোর জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করা সাম্রাজ্যবাদের একটি সাধারণ কর্মসূচী।  বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত একটি দেশ। সুতরাং এখানে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের পাঁয়তারা সর্বদা বিরাজমান। সাম্রাজ্যবাদ এখানে তার নতুন নতুন উন্নয়নের মডেলের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করতে চায়। আর তার সমস্ত কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে এদেশের পুতুল সরকার। যার উদাহরণ আমরা পাই যখন দেশের অর্থমন্ত্রী সুন্দরবনে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে জেনেও বলেন, ‘আমরা জানি সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কিন্তু সেখান থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সরানো সম্ভব না’।

সুন্দরবনের ঠিক পাশেই কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে। আর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে ভারতের কোম্পানী এনটিপিসি। তার সাথে থাকবে বাংলাদেশের পিডিবি।এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ধ্বংস হবে সুন্দরবন। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ২২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড ও ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে। টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হত। ফলাফল স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি জুড়ে গাছপালা ধ্বংস হয়েছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পশুর নদীর পানি ব্যবহার করা হবে তার ফলে যা ক্ষতি হবে, প্রতি ঘণ্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার ও ৫১৫০ ঘনমিটার হারে আবার নদীতে ফেরত পাঠানো হবে। যার ফলে দূষিত হবে পশুর নদীর পানি। প্রভাব পড়বে প্রাণি ও উদ্ভিত জগৎ এবং মাছের উপর।কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির ফলে শব্দ দূষিত হবে।উৎপন্ন ছাই থেকে যে পরিবেশ দূষণ হবে তা বলায় বাহুল্য।(আরও অনেক ক্ষতি হবে যার বিস্তারিত আমরা জাতীয় কমিটির বুকলেটে পাবো।সুবিধার্থে এই লেখার নিচে বুকলেটটি যুক্ত করা হয়েছে)

বাংলাদেশের মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম এই সুন্দরবনকে ধ্বংসের লক্ষ্য থেকেই করা হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র । কেননা এত আন্দোলন এত ক্ষতি জানা সত্ত্বেও যখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন চলতে থাকে তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই দেশের পুতুল সরকার ঐ ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের তাবেদার এবং এরা সম্প্রসারণবাদ ভারতের লুণ্ঠন নীতির বিরোধিতা করতে পারে না এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথেই বলেন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবেই।

সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলা করা যাবে।দেশের উন্নয়ন হবে। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে সেই দেশের নুন্যতম ২৫% বনাঞ্চল থাকতে হয়। আমাদের বাংলাদেশে সেখানে ১৩% এর ও কম বনাঞ্চল রয়েছে। আর এই ১৩% এর একটা বড় অংশ হল আমাদের সুন্দরবন। এই সুন্দরবনই যদি ধ্বংস হয় তাহলে এত এত উন্নয়ন দিয়ে কি হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা হল এই উন্নয়ন কার স্বার্থে?? এটা কি ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন? না। অবশ্যই না। এই উন্নয়ন শাসকশ্রেণির উন্নয়ন।

আমরা ফুলবাড়ি আন্দোলনের সময় দেখেছি সেখানেও ছিল শাসকশ্রেণির উন্নয়ন এর ফিরিস্তি। কিন্তু আমরা জানি যে ঐ ফুলবাড়ি কয়লা খনি যদি হয় তাহলে কি পরিমাণ ক্ষতি জনগণের হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উদ্বাস্তু হবে। তাই জনগণ তা প্রতিরোধ করেছেন।

বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর উন্নয়ন হল তার প্রভু সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারনবাদকে খুশি করার উন্নয়ন। তার উন্নয়ন ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন নয়। যদি তাই হত তাহলে আমরা তার নমুনা পেতাম।

সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে।আন্দোলন চলছে তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে। এর আগে ফুলবাড়ি আন্দোলন এর মাধ্যমে জাতীয় কমিটি সেখানে জনগণকে সাথে নিয়ে উন্মুক্ত কয়লা খনির পাঁয়তারা রুখে দিয়েছে।যা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু জাতীয় কমিটির এবারের আন্দোলন নিয়ে এবং বর্তমানের জাতীয় কমিটি নিয়েই অসততার প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের একটু গভীরে যেয়ে দেখা দরকার বিষয়টা কি?

জাতীয় কমিটি একটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য কমন মঞ্চ। এখানে যে কোন মানুষ জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যারা কিনা সরকারে রয়েছে এবং যেই সরকারই এসব গণবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা নিশ্চয় এখানে থাকতে পারে না। কিন্তু মজার বিষয় এই যে,জাতীয় কমিটিতেই রয়েছে বাংলাদেশের তথাকথিত বাম নামধারী সাম্রাজ্যবাদের দালাল দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। যার নেতা অধঃপতিত বাম নেতা মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। এরা হাসিনার মহাজোটের মাধ্যমে হাসিনার মন্ত্রী পরিষদে রয়েছে।

তাহলে এখানে বোঝায় যাচ্ছে তাদের সাথে নিয়ে এই আন্দোলন হতে পারে না। তারা কখনই জনগণের বন্ধু হতে পারে না। এরা সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের নামে জনগণকে ধোঁকা দেয়।

তাই জাতীয় কমিটি নিয়ে অসততার প্রশ্ন তোলাটা অযৌক্তিক নয়। আশা করি জাতীয় কমিটির নেতারা এর জবাব দেবেন।

গত ১০-১৩ মার্চ জাতীয় কমিটি একটি লং মার্চ করেছে। যেখানে ওয়ার্কার্স পার্টিও অংশ নিয়েছে। (বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের পক্ষ থেকে লংমার্চ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ও জনগণের মনোভাব বোঝার জন্য লংমার্চে গিয়েছিলাম) লংমার্চ যখন বিভিন্ন জায়গায় থেমেছে তখন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি। তারা বলেছেন তারা সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চান না। কিন্তু সরকারে থাকা বাম দল এই আন্দোলনে থাকায় তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনের গতি প্রকৃতি নিয়ে। আর লংমার্চের ভেতরেও আন্তরিক কর্মীদের মধ্যে এ  নিয়ে ক্ষোভ দেখা গেছে। যার ফলে সমগ্র লং মার্চ জুড়েই ছিল ঢিলেঢালা ভাব। জাতীয় কমিটির এই লং মার্চে ছিল ছাত্র ও মধ্যবিত্তদের আধিক্য। সেকারনেই পুরো লংমার্চই পরিচালিত হয়েছে মধ্যবিত্তীয় মতাদর্শ দ্বারা। লংমার্চ যখন যশোরে পৌঁছায় তখন পুলিশ সমাবেশ করতে বাঁধা দেয় আর জাতীয় কমিটি সেখানে ভালভাবে সংগ্রাম করে নি। এমন কি সমাবেশ করেছে পুলিশ নির্ধারিত স্থানে। পুরো লংমার্চ জুড়ে সমাবেশ গুলো হয়েছে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে। যার ফলে স্থানীয় জনগণ লংমার্চের সাথে একাত্ম হতে পারে নি। মূলত এই আন্দোলন ব্যাপক জনগণকে সাথে নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে না। আমি জাতীয় কমিটির এই ধরনের আন্দোলনের পদ্ধতিকে বেঠিক মনে করি। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন এর মডেল হিসেবে সিঙ্গুর-নন্দিগ্রাম ও লালগড়ের আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সেখানকার জনগণের প্রতিরোধের ধরন এবং রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে আন্দোলন সেখানকার জনগণ করেছেন তা থেকে আমাদের শিখতে হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন নিশ্চয় আপস ও দাবি দাওয়ার মধ্য দিয়ে হবে না। রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করেই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। ভারতে জল জঙ্গল জমি রক্ষার আন্দোলন চলছে সেখান থেকেও আমাদের শিখতে হবে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী সকলকে সাথে নিয়ে লড়াই করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা এই রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই এসব জনবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সুতরাং এই রাষ্ট্র ব্যাবস্থায়ই সমস্যা। তাই আমাদের কেও আমাদের এই জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র ভেঙ্গে জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার সাথে যুক্ত করেই করতে হবে। নতুবা আমরা শোষণ হতেই থাকবো। আর আমরা যদি আমাদের লক্ষ্য ঠিক রেখে আগাতে পারি তাহলে জনগণের বিজয় অনিবার্য।

আহনাফ আতিফ অনিক

সহ-আহবায়ক

বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন”, বাংলাদেশ

সূত্রঃ http://ncbd.org/?p=1489


ডাঃ শৈবাল জানা’র মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হোন!

Untitled


মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা এবং ‘বীরাঙ্গনা’ প্রসঙ্গ

সিরাজগঞ্জের বীরাঙ্গনা

সিরাজগঞ্জের বীরাঙ্গনা

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা নিয়ে ’৭১-এর চেতনা’র পথিকরা যা কিছু প্রচার করে থাকে তার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে পাকবাহিনী কর্তৃক নারীদের লাঞ্ছণার বিবরণ। তাতে থাকে ধর্ষিতা নারীদের বিশাল সংখ্যা ও তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতা প্রমাণের দ্বারা নিজেদের ভূমিকাকে চাপা দেয়ার প্রয়াস। এসবের সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আওয়ামী সরকার কর্তৃক ধর্ষিতা নারীদেরকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত। তারা যে মুক্তিযুদ্ধের জন্য জান-প্রাণ দেয়া একটা দল তা প্রমাণ করতে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা উত্তরোত্তর দীর্ঘ করা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়িয়ে চলা, চাকুরি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে কোটা বাড়ানো, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও পরিবারের জন্যও একই সুবিধা বজায় রাখার সাথে নতুন এই মাত্রাটি যুক্ত হয়েছে।

এটা এক ঐতিহাসিক সত্য যে পাকিস্তানী বাহিনী ’৭১-সালে এদেশের জাতি ও জনগণের বিরুদ্ধে যে বর্বর গণহত্যা-জ্বালাও পোড়াও-লুটপাট-অত্যাচার-দমন অভিযান চালিয়েছিল তাতে নারীদের উপর নিপীড়ন ছিল এক অঙ্গাঙ্গী বিষয়। তাদেরকে এ কাজে সহযোগিতা করেছে তৎকালীন তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির একাংশ। এরা নিজেরাও এই নারী-নিপীড়নে অংশ নিয়েছিল। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তাদের গৌণ ভূমিকা এবং যুদ্ধের স্বল্পকালীন স্থায়ীত্বের কারণে তারা এক্ষেত্রে ততটা ভূমিকা রাখতে পারেনি, যতটা কিনা পাকবাহিনীর অফিসার ও সৈনিকেরা করেছিল।

কিন্তু একথা সবাই জানে যে, ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীসহ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানী সৈনিককে কোন রকম বিচার ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ মুজিব একক সিদ্ধান্তে ক্ষমা করে দিয়েছিল। তাদের এদেশীয় সহযোগীদের একাংশকেও তখন ক্ষমা করা হয়। বাকীদেরকে পরবর্তী জিয়া সরকার ক্ষমা করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এই জাতীয় বিশ্বাসঘাতক কার্যক্রম পূর্ণতা পায়। শাসকশ্রেণির সকল পক্ষের দ্বারা এই সমগ্র কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে এই চরম গণবিরোধীরা সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অবস্থায় বর্বর গণহত্যাসহ নারীদের উপর মধ্যযুগীয় নিপীড়নের জন্য যারা মূল দায়ী ছিল সেই পাকবাহিনী ও ভূট্টোকে এই শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমা করে দিয়ে এখন সুদীর্ঘ ৪৫ বছর পর যখন ধর্ষিতা নারীদেরকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান দিয়ে তাদেরকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে, তখন এটা এক চরম প্রহসন ও তাদের সাথে এক জঘণ্য প্রতারণা ছাড়া আর কিছু বলে মনে করার কারণ নেই।

* শেখ মুজিব ’৭২-সালে দেশে ফিরে এই ধর্ষিতা নারীদেরকে “বীরাঙ্গনা” উপাধি দিয়েছিলেন। সেই উপাধি তারা ধুয়ে খেয়েছে বিগত ৪৫ বছর ধরে। দু’একজন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী, যারা কার্যত সমাজের উচুস্তরের মানুষ তারা ছাড়া গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে থাকা নির্যাতিতা নারীরা বিগত চার যুগ ধরে তাদের জীবন-যৌবন কাটিয়ে এখন অনেকেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। অনেকে সারা জীবন ধরে লাঞ্ছণা-গঞ্জনা সয়ে সমাজচ্যুত হয়ে অনাহারে থেকে জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। অনেকে তাদের সেই লাঞ্ছিত জীবন কাহিনীকে গোপন করে সংসার ও সমাজে টিকে থাকতে চেয়েছেন, কেউ কেউ তা করতে সক্ষমও হয়েছেন। অথচ এই দীর্ঘ সময়জুড়ে শেখ মুজিব ও তার কন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বহু বছর ক্ষমতায় ছিল। যুদ্ধের পরপরই এসব বিষয় চূড়ান্ত করা উচিত ও সহজেই সম্ভব ছিল। তখনো শেখ মুজিব সরকার কিছুই করেনি, যুদ্ধ শিশুদেরকে বিদেশে নির্বাসিত করা ব্যতীত।

লাঞ্ছিতা নারীদের সংখ্যাটি নিয়েও কিছু কথা বলা উচিত। কীভাবে আওয়ামী লীগ ও রাষ্ট্র এই তথ্যটি নিশ্চিত করলো যে ২ লাখ নারী তখন ধর্ষিতা হয়েছিলেন? এর কোন জরিপ বিবরণী নেই। এটা সত্য যে লাঞ্ছিতা নারীরা আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে অনেকেই নিজেদেরকে প্রকাশ করেন না। তারা নিজেদেরকে গোপন রেখেছেন। বহু নারী এখনো তা-ই রাখবেন। কারণ, রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণি ও বুর্জোয়া দলগুলো সমাজে এমন কোন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটাতে পারেনি যাতে নারীরা এগিয়ে এসে একাজে সহায়তা করতে পারেন। কিছু এনজিও রয়েছে যারা এই ২ লাখ সংখ্যাতেও আপত্তি জানিয়ে বলতে চান যে অন্তত ৪ লাখ নারী ধর্ষিতা হয়েছেন। তাই যদি সত্য হয়, তাহলে সরকারি ও আওয়ামী ২ লাখ তথ্যটি দ্বারা লাঞ্ছিতা নারীদের সংখ্যা কমিয়ে তাদেরকে কি অপমান করা হচ্ছে না? বাস্তবে এই সংখ্যাটি নিয়ে এখন অনুমান করা অর্থহীন। শাসকশ্রেণি ও বিশেষত আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বেশি মিথ্যা প্রচারকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ও আরো করতে চায় যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন রকম গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা বিতর্ক করাটাই এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের তথ্য ও সত্যকে তারা সরকারি আইন আদালত ও আদেশ নির্দেশের বিষয়ে পরিণত করেছে। বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ইসরাইল রাষ্ট্র, তালেবান ও আইএস ছাড়া আর কোথাও এত স্থূলভাবে এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে না।

তবে কিছু তথ্য তো অস্বীকার করা যাবে না। যেমন, মুজিব আমলে কতজন যুদ্ধশিশুকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কানাডার এনজিও-রা ১৬ জনের মত যুদ্ধশিশুকে তাদের দেশে নিয়ে যায় বলে তথ্য দেয়া হয়। ধরে নেয়া যায় যে, আরো কিছু যুদ্ধশিশু সমাজে তখন রয়ে গেছে, আর বিরাট সংখ্যক গর্ভবতী নারী সম্ভবত নিজেরাই গর্ভপাত ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু মিলিয়েও এটি খুব বড় একটি সংখ্যা হবে না।

আরেকটি তথ্যও এখানে তুলে ধরা যায়। সরকার ধর্ষিতা নারীদেরকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়ার পর যারা এ খাতে নাম লিখিয়েছেন তাদের সংখ্যা ৫০-এর নিচে। এতেও বোঝা যায় যে, এখনো লাঞ্ছিতা নারীরা ব্যাপক সংখ্যায় নিজেদেরকে প্রকাশ করতে চান না। সেক্ষেত্রে ধর্ষিতা নারীদেরকে প্রকাশিত করার মাধ্যমে তাদেরকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’র সম্মান দেয়া এবং তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা দেবার প্রকল্পটি কি একটি ব্যর্থ ও প্রতারক প্রকল্প হতে বাধ্য নয়? এ দ্বারা কি বিরাট সংখ্যক ধর্ষিতা নারীদেরকে অপমান করা হয়নি?

* মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা নিয়ে এ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করা উচিত

একটি তিক্ত সত্যকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল খুবই নগণ্য। এই কথা দ্বারা নারীদেরকে কোনভাবে ছোট করা হচ্ছে না। বরং এই সত্য দেখিয়ে দেয় যে, ভারতীয় মদদে আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রকৃত গণযুদ্ধ থেকে কতটা দূরে ছিল।

ঠিক যে, নারীরাও ’৭১-সালের যুদ্ধে এক বড় ভূমিকা রাখতে পারতেন যা আওয়ামী লীগের মত প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বের কারণে ও প্রকৃত কোন স্বাধীন মুক্তিকামী যুদ্ধ তাদের দ্বারা না হওয়াতে সেটা হতে পারেনি। আওয়ামী রাজনীতির নেতৃত্বে গঠিত বাহিনীগুলোর সেনাসংখ্যা যুদ্ধকালে ভারতে গঠিত সরকার-প্রধান তাজুদ্দিনের জবানীতে এক লক্ষের মত। এই সমগ্র বাহিনীতে নারী যোদ্ধার সংখ্যা কত ছিল? কেউ জানে না। এই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যকার নারীদের নাম ও সংখ্যা কখনো কি কেউ আলোচিত হতে দেখেছেন? একজন নারী বীরশ্রেষ্ঠ নেই, একজন বীরউত্তমও নেই। যুদ্ধের বহু বছর পর ছয় শতাধিক পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন কাঁকন বিবি বা একজন তারামন বিবিকে মাত্র পদক প্রাপ্ত হিসেবে খুঁজে বের করেছে রাষ্ট্র। সেটাও হয়েছে প্রথমে বেসরকারি উদ্যোগে। পরে রাষ্ট্র ও সরকারগুলো একে নিজেদের রাজনীতির স্বার্থে প্রচারে নিয়ে আসে। এর  অর্থটা তো পরিস্কার। আওয়ামী লীগ ও শিক্ষিত বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত নারীরা যতই গলা ফাটাক না কেন যে তাদের নেতৃত্বে যে যুদ্ধ তা পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ মুক্তিযুদ্ধ, যাতে নারীরাও বিপুল ভূমিকা রেখেছে- এগুলো যে সত্য নয় তাই এতে প্রমাণিত হয়।

২৫ মার্চের ঠিক পরপরই ভারতের বেতার থেকে জনৈকা রওশনারার বুকে মাইন বেধে পাকিস্তানী ট্যাংক ধ্বংস করার আবেগময় কাহিনী বহু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথায় সে রওশনারা? ২৫ মার্চের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা যে সামরিক ট্রেনিং নিচ্ছিলেন তার ছবিও দেখানো হয়। অথচ সেসব ছাত্রীদের কতজন মুক্তিযুদ্ধে কী ভূমিকা রেখেছেন তার কোন ইতিহাস নেই। তাহলে নারীদের প্রধান ভূমিকা কী ছিল? সেটা য্দ্ধু বিষয়ে শিল্প সাহিত্যগুলোতেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নারীরা ধর্ষিতা হচ্ছেন- সেটাই যেন মুক্তিযুদ্ধে নারীদের প্রধান অবদান। শিল্প সাহিত্য পড়ুন, সিনেমা দেখুন- প্রধানভাবে সেটাই পাবেন।

* কিন্তু নারীরা কি তখন ত্যাগ কম করেছেন, সাহস কম দেখিয়েছেন? তা নয়। দেশের মধ্যে থেকে অসংখ্য নারী মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযাদ্ধাদেরকে সহায়তা করেছেন। কিন্তু তাদের এই দেশপ্রেম আবেগ ত্যাগ সাহস ও সংগ্রামী মনোভাবকে আওয়ামী নেতৃত্ব কোন রকম সক্রিয় শক্তিতে পরিণত করতে পারেনি। যুদ্ধের এত বছর পর আওয়ামী উদ্যোগের বাইরে থেকে কিছু ইতিহাস বেরিয়ে আসায় আমরা দেখি যে, কিছু নারী সীমান্তে গান গেয়েছেন, কেউ কেউ ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে সেবার কাজ করেছেন, কিন্তু যুদ্ধের মাঠে আমরা বিশেষ কোন আওয়ামী নারী দেখিনা। গ্রাম গ্রামান্তরে এবং শহরেও নারীরা নিপীড়িত হয়েছেন, সমাজে ত্যাজ্য হয়েছেন। তারা দেশকে মুক্ত করার জন্য দূরের কথা, প্রতিশোধ নিতেও যুদ্ধে নামতে পারেননি। আওয়ামী নেতৃত্ব সেরকম গণযুদ্ধ গড়তেই পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও এইসব ধর্ষিতা নারীরা সমাজচ্যুত হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরা তাদের ত্যাগ করেছেন, অবিবাহিতদেরকে যাপন করতে হয়েছে অসহনীয় জীবন। তারা, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সমাজ গঠনে বীরের মত সম্মানের সাথে নামতে পারেননি। যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেননি। এখন এত বছর পর তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বলার কী অর্থ থাকতে পারে?

তুলনা করা যেতে পারে অন্য সব দেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে। সাম্প্রতিক বিশ্বের তিনটি প্রধান মাওবাদী মুক্তিযুদ্ধে পেরু, নেপাল ও ভারতে বিপ্লবী বাহিনীর ৩০% থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধাংশই ছিলেন ও আছেন নারী। ভারতে রাষ্ট্রের এক ধারাবাহিক ফ্যাসিবাদী গণহত্যা ও নিপীড়নের মাঝেও যে নারীরা যুদ্ধের মাঠেই নারী সংগঠনে সংগঠিত হয়ে সক্রিয়ভাবে বিপ্লবের পক্ষে কাজ করছেন তাদের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার (তথ্য অরুন্ধতী রায়)। বিপ্লবী যুদ্ধের কথা বাদই দেয়া যাক। আওয়ামী লীগকে কেউ বিপ্লবী পার্টি বলবে না। কিন্তু প্রকৃত জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামেও নারীদের যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ সর্বত্রই বিপুল। কিছুদিন আগ পর্যন্ত চলতে থাকা শ্রীলংকার তামিল স্বাধীনতা যুদ্ধের বাহিনীতে ৪০% ছিল নারী যোদ্ধা। এখনো কুর্দি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোদ্ধাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সেটা ধারে কাছেও নয়। কেন? কারণ, সেভাবে কোন মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগ করেনি। আর নারীদের মুক্তির কোন প্রকৃত কর্মসূচিও তাদের ছিল না। শেখ মুজিবের ৬-দফা দেখুন; কিছুই পাবেন না। তাদেরকে যুদ্ধের জন্য ও তার সহায়তায় কোন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও তাদের দিক থেকে ছিল না। থাকলে লক্ষ লক্ষ নারী তাতে এগিয়ে আসতেন। সেটা না হওয়ার ফলে নারীদের লাঞ্ছনা, ক্ষোভ, সুপ্ত উদ্যোগ ও ক্ষমতাকে তারা স্ফুরিত করতে পারেনি। তার কোন চেষ্টাও তাদের ছিল না।

* শেষ যে বিষয়টা অপ্রীতিকর হলেও বলা উচিত তাহলো, লাঞ্ছিতা নারীদের জীবনের ত্যাগ কষ্ট ও গ্লানি যত বেশিই হোক না কেন, তারা ধর্ষিতা হবার কারণে কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন এ প্রশ্নটি সঙ্গতভাবেই তোলা যায়। মুক্তিযোদ্ধা একটি বিশেষ ক্যাটাগরি। যারা যুদ্ধ করেছেন প্রত্যক্ষভাবে, তারাই যোদ্ধা। কিন্তু যোদ্ধারাই শুধু নমস্য নন। মাঠের যোদ্ধা ছাড়াও একটি স্বাধীনতা সংগ্রামে বা বিপ্লবী যুদ্ধে বহু বিভিন্ন ফ্রন্টে বহু মানুষ বহু বিভিন্নভাবে যুদ্ধকে সহায়তা করেন। যারা সরাসরি যুদ্ধ করেননি তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধে বেশি অবদান রাখার দাবিদার। এমনকি যারা তা না করেও বিভিন্নভাবে নিপীড়িত হন তারাও যুদ্ধের জন্য ত্যাগের দাবিদার। কিন্তু সবাইকে যোদ্ধা বললে হয়তো কিছু সংখ্যক মানুষকে সন্তুষ্ট করা যাবে, যেহেতু এর সাথে এখন আওয়ামী সরকার একটি বড় অংকের ভাতাসহ বিবিধ সুযোগ সুবিধাদানকে যুক্ত করেছে, কিন্তু বাস্তবে এটা মুক্তিযুদ্ধের সবকিছুকে এক পাল্লায় রাখার এক চরম দায়দায়িত্বহীনতা ছাড়া কিছু নয়।

যারা ধর্ষিতা হয়েছেন তারা ভিন্ন ক্যাটাগরির মানুষ। নিশ্চিতভাবেই আমাদের মত সমাজে তাদের উপর এই নিপীড়ন ও সেকারণে জীবনভর তাদের যে ত্যাগ তাকে খুবই গুরুত্ব সহকারে মূল্য দেয়া উচিত। কিন্তু তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বললে যে জনগণ দেশের মধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে ও অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে গিয়ে অপরিসীম কষ্ট সয়েছেন, অনেকে অসুখে-অনাহারে মারা গিয়েছেন, তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন না? যারা পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারে পঙ্গু হয়েছেন, কিন্তু ভারতে যেতে পারেননি, অথবা প্রত্যক্ষ যুদ্ধও করতে পারেননি তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন না? যাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে শেষ সম্বল ধ্বংস ও লুট করা হয়েছে তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন না? যারা শহীদ হয়েছেন (যার সংখ্যা আওয়ামী লীগ বলে থাকে ৩০ লক্ষ) তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন না? যেসব হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভারতে না গিয়ে দেশে থাকতে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ নিজ ধর্মকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা কেন মুক্তিযোদ্ধা হবেন না?

অথচ শুধু ছাত্রলীগের সদস্য হওয়ার কারণেই দেরাদূনে বিশেষ ট্রেনিং নিয়ে কোন রকম যুদ্ধে অংশ না নিয়ে, বা কোন রকম নিজস্ব বা পারিবারিক ক্ষতির মুখে না পড়ে (মুজিব বাহিনীর ১০ হাজার সদস্যের অধিকাংশ এই ক্যাটাগরিতে পড়ে) বহু লোক এখন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবং বিবিধ সুখ-সুবিধা ভোগ করছে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষ কোটি মানুষ এখনো অসহায় জীবন যাপন করছেন এই রাষ্ট্রের অধীনে।

যারা দেশের মধ্যে থেকে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সেই মাওবাদী ও বামপন্থীদের কথা বাদই দিলাম।

বহুবার বহু বিভিন্ন মহল থেকেই দাবি উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা না করে রাজাকারের তালিকা করতে। শহীদের তালিকা করতে। কিন্তু তারা সেটা করেনি। তারা মুক্তিযোদ্ধা নামে এক বিশেষ সুবিধাভোগী তালিকা করে সমগ্র জনগণের অপরিসীম ত্যাগ সংগ্রাম ক্ষয়ক্ষতিকে ধামাচাপা দিয়েছে। তাদেরকে চরম অপমান করছে।

প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভাতা কোটা ও অন্যান্য সুবিধাদি দিয়ে সমাজে এক প্রচন্ড রকমের অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রচন্ড এক অসাম্যের সূচনা করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা এইসব ভাতা ও সুবিধাদি পাবেন, আর দেশজুড়ে লক্ষ কোটি জনগণ মানবেতর জীবন যাপন করবেন- এজন্য নিশ্চয়ই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। এখন এই সুযোগ সুবিধার লোভে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কলুষিত করা হচ্ছে। অথচ ’৭১-সালে সমগ্র জাতি ও সকল জনগণ (গুটিকয় জাতীয় বেইমান ব্যতীত) মুক্তিযুদ্ধে সামিল ছিলেন। আওয়ামী লীগ কখনই সেটা উপলব্ধি করেনি, করার কথাও নয়। কারণ তাদের তৎকালীন নেতৃত্বের খুব ক্ষুদ্র অংশ ব্যতীত অন্যরা মুক্তিযুদ্ধে তেমন কোন অংশ নেয়নি। বরং যারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের ব্যাপক সংখ্যাগুরুর ত্যাগ ও সংগ্রামকে, মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ভারতের সম্প্রসারণবাদী রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।

একারণেই হাসিনার আওয়ামী লীগ এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সমস্ত বিতর্ক, গবেষণা ও ইতিহাসচর্চাকে বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের সরকারি ইতিহাস মানুষকে গেলানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। একারণেই তারা জনগণের মধ্যে কিছু কিছু ক্যাটাগরি করে তাদেরকে সুযোগ সুবিধা দিয়ে সমগ্র জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। চাচ্ছে একদল চিরস্থায়ী দালাল সৃষ্টি করতে।

লাঞ্ছিতা নারীদেরকে সম্মান জানানোর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারতো তাদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। যা এই শাসকশ্রেণি, রাষ্ট্র ও তাদের পার্টিগুলো সুদীর্ঘ ৪৫ বছরে করেনি। তারা সেটা করতেও পারেনা, কারণ, সমাজের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক আমূল রূপান্তর ব্যতীত সেটা সম্ভব নয়। আমাদের সমাজ রয়ে গেছে পাকিস্তান আমলেরই সমাজ। পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে ভিন্ন একটি রাষ্ট্র হয়েছে মাত্র। এ সমাজে একজন ধর্ষিতার কোন সম্মান নেই। তাকে সাধারণত কেউ বিয়ে করে না। সেটাই ঘটেছে বাংলাদেশে এই নারীদের ক্ষেত্রে। সমাজের আমূল রূপান্তর ব্যতীত শুধু ’৭১-এর লাঞ্ছিতা নারীদের নয়, সাধারণভাবে কোন ধর্ষিতার প্রতিই মনোভাবের কোন পরিবর্তন হতে পারে না। এটা যে বাংলাদেশে হয়নি তা প্রতিদিন পত্রিকাতেই দেখা যায়। যে শেখ হাসিনা আজ ’৭১-এর ধর্ষিতা নারীদের ‘সম্মান’ জানানোর প্রচার দিচ্ছে, তার ‘সূর্য সৈনিকে’রা বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবের ভীড়ে নারী লাঞ্ছনা করে এবং আওয়ামী পুলিশ, ছাত্রলীগ, নেতা, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত তাদেরকে রক্ষার হাজারো প্রচেষ্টা চালায়। এরা মধ্যযুগীয় কায়দায় ধর্ষণের সেঞ্চুরি পর্যন্ত উদযাপন করে। এই রাষ্ট্রের সেনারা পাহাড়ে ধর্ষণ করে পার পেয়ে যায়। ’৭১-এর মত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি হলে এরা কী করবে ও করতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। তারা পাকবাহিনীর বর্বরতার চেয়ে এক বিন্দু কম যাবে না। এ সত্যটি না বোঝা পর্যন্ত সকল ধরনের নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত তরুণ ও জনগণ মুক্তির দিশা পাবেন না।

সমাজের সমগ্র ইতিহাসে সকল নিপীড়িত ও শোষিত শ্রেণিগুলো তাদের নিপীড়কদের কাছে প্রথমত, তাদের অপরিশোধিত শ্রম এবং দ্বিতীয়ত, তাদের নারীদেরকে “প্রভুদের” রক্ষিতা হওয়ার জন্য তুলে দিতে সর্বদাই বাধ্য হয়েছে। দাসপ্রথা, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদ এ বিষয়ে একইরকম। শুধুমাত্র শোষণের রূপটা বদল হয়, শোষণটা থেকে যায়

– লেনিন, “পুঁজিবাদ ও নারী শ্রম”, সংগৃহীত রচনাবলী, খ- ৩৬, ১৯১৩


আজ ডাকসুতে তনু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে প্রপদের মশাল মিছিল

12809729_836758513136512_5106844183584085437_n

আজ তনু সম্ভ্রম হারিয়েছে,হারিয়েছে তার প্রাণ, কিন্তু আজ আমরা যদি সোচ্চার না হই, কাল হয়তো ধর্ষিত হবে আমার বোন, আপনার স্ত্রী, অন্য কারো মা।

আমি, আপনি, আমরাই তো বাংলাদেশ, আমরা যদি দেশের সম্মান রক্ষায় এগিয়ে না আসি তবে দায়িত্ব নিবে কে???

যোগাযোগ করার জন্য :০১৮৬৪০০৩৪৭৮

তারিখ – ২৬শে মার্চ

সময় – সন্ধ্যা ৬টা-৮টা

স্থান – ডাকসু

আহবানে – প্রগতির পরিব্রাজক দল (প্রপদ)