জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন ও জাতীয় কমিটির সাম্প্রতিক লং মার্চ

1379511_296897887115178_58637038_n

সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোর জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করা সাম্রাজ্যবাদের একটি সাধারণ কর্মসূচী।  বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত একটি দেশ। সুতরাং এখানে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের পাঁয়তারা সর্বদা বিরাজমান। সাম্রাজ্যবাদ এখানে তার নতুন নতুন উন্নয়নের মডেলের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করতে চায়। আর তার সমস্ত কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে এদেশের পুতুল সরকার। যার উদাহরণ আমরা পাই যখন দেশের অর্থমন্ত্রী সুন্দরবনে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে জেনেও বলেন, ‘আমরা জানি সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কিন্তু সেখান থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সরানো সম্ভব না’।

সুন্দরবনের ঠিক পাশেই কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে। আর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে ভারতের কোম্পানী এনটিপিসি। তার সাথে থাকবে বাংলাদেশের পিডিবি।এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ধ্বংস হবে সুন্দরবন। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ২২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড ও ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে। টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হত। ফলাফল স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি জুড়ে গাছপালা ধ্বংস হয়েছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পশুর নদীর পানি ব্যবহার করা হবে তার ফলে যা ক্ষতি হবে, প্রতি ঘণ্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার ও ৫১৫০ ঘনমিটার হারে আবার নদীতে ফেরত পাঠানো হবে। যার ফলে দূষিত হবে পশুর নদীর পানি। প্রভাব পড়বে প্রাণি ও উদ্ভিত জগৎ এবং মাছের উপর।কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির ফলে শব্দ দূষিত হবে।উৎপন্ন ছাই থেকে যে পরিবেশ দূষণ হবে তা বলায় বাহুল্য।(আরও অনেক ক্ষতি হবে যার বিস্তারিত আমরা জাতীয় কমিটির বুকলেটে পাবো।সুবিধার্থে এই লেখার নিচে বুকলেটটি যুক্ত করা হয়েছে)

বাংলাদেশের মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম এই সুন্দরবনকে ধ্বংসের লক্ষ্য থেকেই করা হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র । কেননা এত আন্দোলন এত ক্ষতি জানা সত্ত্বেও যখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন চলতে থাকে তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই দেশের পুতুল সরকার ঐ ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের তাবেদার এবং এরা সম্প্রসারণবাদ ভারতের লুণ্ঠন নীতির বিরোধিতা করতে পারে না এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথেই বলেন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবেই।

সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হচ্ছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলা করা যাবে।দেশের উন্নয়ন হবে। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে সেই দেশের নুন্যতম ২৫% বনাঞ্চল থাকতে হয়। আমাদের বাংলাদেশে সেখানে ১৩% এর ও কম বনাঞ্চল রয়েছে। আর এই ১৩% এর একটা বড় অংশ হল আমাদের সুন্দরবন। এই সুন্দরবনই যদি ধ্বংস হয় তাহলে এত এত উন্নয়ন দিয়ে কি হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা হল এই উন্নয়ন কার স্বার্থে?? এটা কি ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন? না। অবশ্যই না। এই উন্নয়ন শাসকশ্রেণির উন্নয়ন।

আমরা ফুলবাড়ি আন্দোলনের সময় দেখেছি সেখানেও ছিল শাসকশ্রেণির উন্নয়ন এর ফিরিস্তি। কিন্তু আমরা জানি যে ঐ ফুলবাড়ি কয়লা খনি যদি হয় তাহলে কি পরিমাণ ক্ষতি জনগণের হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে উদ্বাস্তু হবে। তাই জনগণ তা প্রতিরোধ করেছেন।

বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর উন্নয়ন হল তার প্রভু সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারনবাদকে খুশি করার উন্নয়ন। তার উন্নয়ন ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন নয়। যদি তাই হত তাহলে আমরা তার নমুনা পেতাম।

সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে।আন্দোলন চলছে তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে। এর আগে ফুলবাড়ি আন্দোলন এর মাধ্যমে জাতীয় কমিটি সেখানে জনগণকে সাথে নিয়ে উন্মুক্ত কয়লা খনির পাঁয়তারা রুখে দিয়েছে।যা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু জাতীয় কমিটির এবারের আন্দোলন নিয়ে এবং বর্তমানের জাতীয় কমিটি নিয়েই অসততার প্রশ্ন উঠেছে। আমাদের একটু গভীরে যেয়ে দেখা দরকার বিষয়টা কি?

জাতীয় কমিটি একটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য কমন মঞ্চ। এখানে যে কোন মানুষ জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যারা কিনা সরকারে রয়েছে এবং যেই সরকারই এসব গণবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা নিশ্চয় এখানে থাকতে পারে না। কিন্তু মজার বিষয় এই যে,জাতীয় কমিটিতেই রয়েছে বাংলাদেশের তথাকথিত বাম নামধারী সাম্রাজ্যবাদের দালাল দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। যার নেতা অধঃপতিত বাম নেতা মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। এরা হাসিনার মহাজোটের মাধ্যমে হাসিনার মন্ত্রী পরিষদে রয়েছে।

তাহলে এখানে বোঝায় যাচ্ছে তাদের সাথে নিয়ে এই আন্দোলন হতে পারে না। তারা কখনই জনগণের বন্ধু হতে পারে না। এরা সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের নামে জনগণকে ধোঁকা দেয়।

তাই জাতীয় কমিটি নিয়ে অসততার প্রশ্ন তোলাটা অযৌক্তিক নয়। আশা করি জাতীয় কমিটির নেতারা এর জবাব দেবেন।

গত ১০-১৩ মার্চ জাতীয় কমিটি একটি লং মার্চ করেছে। যেখানে ওয়ার্কার্স পার্টিও অংশ নিয়েছে। (বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের পক্ষ থেকে লংমার্চ পর্যবেক্ষণ করার জন্য ও জনগণের মনোভাব বোঝার জন্য লংমার্চে গিয়েছিলাম) লংমার্চ যখন বিভিন্ন জায়গায় থেমেছে তখন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি। তারা বলেছেন তারা সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চান না। কিন্তু সরকারে থাকা বাম দল এই আন্দোলনে থাকায় তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনের গতি প্রকৃতি নিয়ে। আর লংমার্চের ভেতরেও আন্তরিক কর্মীদের মধ্যে এ  নিয়ে ক্ষোভ দেখা গেছে। যার ফলে সমগ্র লং মার্চ জুড়েই ছিল ঢিলেঢালা ভাব। জাতীয় কমিটির এই লং মার্চে ছিল ছাত্র ও মধ্যবিত্তদের আধিক্য। সেকারনেই পুরো লংমার্চই পরিচালিত হয়েছে মধ্যবিত্তীয় মতাদর্শ দ্বারা। লংমার্চ যখন যশোরে পৌঁছায় তখন পুলিশ সমাবেশ করতে বাঁধা দেয় আর জাতীয় কমিটি সেখানে ভালভাবে সংগ্রাম করে নি। এমন কি সমাবেশ করেছে পুলিশ নির্ধারিত স্থানে। পুরো লংমার্চ জুড়ে সমাবেশ গুলো হয়েছে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে। যার ফলে স্থানীয় জনগণ লংমার্চের সাথে একাত্ম হতে পারে নি। মূলত এই আন্দোলন ব্যাপক জনগণকে সাথে নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে না। আমি জাতীয় কমিটির এই ধরনের আন্দোলনের পদ্ধতিকে বেঠিক মনে করি। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন এর মডেল হিসেবে সিঙ্গুর-নন্দিগ্রাম ও লালগড়ের আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সেখানকার জনগণের প্রতিরোধের ধরন এবং রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে আন্দোলন সেখানকার জনগণ করেছেন তা থেকে আমাদের শিখতে হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন নিশ্চয় আপস ও দাবি দাওয়ার মধ্য দিয়ে হবে না। রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করেই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। ভারতে জল জঙ্গল জমি রক্ষার আন্দোলন চলছে সেখান থেকেও আমাদের শিখতে হবে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী সকলকে সাথে নিয়ে লড়াই করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা এই রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই এসব জনবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সুতরাং এই রাষ্ট্র ব্যাবস্থায়ই সমস্যা। তাই আমাদের কেও আমাদের এই জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র ভেঙ্গে জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার সাথে যুক্ত করেই করতে হবে। নতুবা আমরা শোষণ হতেই থাকবো। আর আমরা যদি আমাদের লক্ষ্য ঠিক রেখে আগাতে পারি তাহলে জনগণের বিজয় অনিবার্য।

আহনাফ আতিফ অনিক

সহ-আহবায়ক

বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন”, বাংলাদেশ

সূত্রঃ http://ncbd.org/?p=1489

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s