ভারতে মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণ ও বিবিসি’র তথ্যচিত্র

udwin-story_650_030515034954

মেডিকেল ছাত্রী নির্ভয়া (ছদ্ম নাম) ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিল্লির চলন্ত বাসে পাঁচজন পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হন। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান।

এই ঘটনায় সারা ভারতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আমাদের দেশের নারী সমাজও তীব্র নিন্দা জানান। ভারতীয় শাসক শ্রেণি বাধ্য হয়ে ধর্ষণকারি পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এমনকি নি¤œআদালত তাদেরকে ফাঁসির আদেশ দেয়।

নির্ভয়ার ধর্ষণ নিয়ে লেসলি এ্যাডউইন  নামে লন্ডন নিবাসী একজন নারী তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ছবির নাম দেয়া হয়েছে india’s daughter-ইন্ডিয়ান ডটারস বা ভারতকন্যা। এই তথ্যচিত্রটি ভারতীয় শাসক শ্রেণি নিষিদ্ধ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতকন্যা তথ্যচিত্রটি নিয়ে সংসদেও সমালোচনা করেছে। যে কর্তাব্যক্তিরা লেসলি এ্যাডউইনকে আসামি মুকেশ সিং-এর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছে তাদেরকেও একচোট ধুয়েছে। তথ্যচিত্রটি নাকি ভারতীয় সমাজের সম্মানহানি করেছে।

হায়রে! অবাক করা কান্ডই বটে। কি আছে এই তথ্যচিত্রটিতে? নির্মাতা লেসলি এ্যাডউইন ধর্ষক মুকেশ শিং-এর সাক্ষাতকার নিয়েছেন। মুকেশ শিং তার জবানিতে বলেছে- মেয়েরা রাস্তায় একা-একা বের হবে কেন, বের যদি হতেই হয় তাহলে স্বামী বা বাবার সাথে রাস্তায় বের হবে, বের হলে তো ছেলেরা ধর্ষণ করবেই। মেয়েটির (নির্ভয়ার) উচিত ছিল ধর্ষণে বাধা না দেয়া, বাধা দেয়ার কারণেইতো মারধোর করতে হয়েছে, মেয়েটিকে মরতে হলো। মুকেশ আরো যে ভয়াবহ বক্তব্যটি দেন তাহলো- আদালত তাদেরকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে ঠিক করেনি। “আমরা যেমন ঐ রাত্রে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেই ছেড়ে দিয়েছিলাম, এখন আর কেউ তা করবে না। ধর্ষণ করে মেয়েদের হত্যা করা হবে।” ইত্যাদি।

আসামীদের দুই উকিলও আলাদা সাক্ষাতকারে নারীদের সম্পর্কে আজেবাজে বক্তব্য দিয়ে ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নোংরা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। যেমন- মেয়েরা হচ্ছে ফুলের মতো। ফুলেরতো রক্ষক দরকার। ফুল  পূজনীয়। ফুল নর্দমায় ফেললে নষ্ট হবে। মন্দিরে রাখলে পূজিত হবে। মেয়েরা হীরার মতো- হীরা বাহিরে রাখলে অবশ্যই কুকুরে খাবে। আরো বিস্তারিত সাক্ষাতকারে তুলে ধরা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি রাজনাথ সিং-এর তথ্যচিত্র নিষিদ্ধ করার মূল কারণ হচ্ছে- (লেসলি এ্যাডউইন যে উদ্দেশ্য নিয়েই চিত্রটি নির্মাণ করুন না কেন) এতে ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের দগদগে ঘা বেরিয়ে এসেছে। তাই জনবিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। সম্ভাব্য এই জনবিদ্রোহকে ঠেকাতে তড়িঘড়ি করে শাসকরা তা নিষিদ্ধ করেছে। এর কারণ হিসেবে দেশের সম্মান হানির যে যুক্তি রাজনাথ সিং দিয়েছে সেটা একটি খোঁড়া যুক্তি। দেশের বিশেষতঃ নারী সমাজের সাথে স্থুল এক তামাশা। ভারত জুড়ে রাস্তা-ঘাটে, স্কুল-কলেজে, বাসে-ট্রেনে, গৃহে, কর্মস্থলে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর খুন ও পঙ্গু করার খবর প্রায় প্রতিদিন সে দেশের পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সর্বত্র, এমনকি বিদেশেও। এতে দেশের সম্মান হানি হয় না। সম্মান হানি হয় প্রতিবাদে, বিচারের দাবিতে জনগন বিক্ষোভ-আন্দোলন-সংগ্রাম করলে! রাজনাথ সিং-রা সর্বদাই গণবিদ্রোহের ভয়েই থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, উকিল এবং মুকেশ শিং-রা একেকজন নারী বিদ্বেষী ভারতীয় স্তম্ভ।

 ভারতে নির্ভয়া ধর্ষণের আসামীরা যাতে শাস্তি পায়, আর যেন নারীরা ধর্ষিত না হন এজন্য আজো ভারতীয় নারীরা বিক্ষোভ-মিছিল করছেন। ধর্ষণকারী পাঁচ আসামীর মধ্যে একজন ছিলেন আঠারো বছর বয়সের নীচে। সম্প্রতি রাষ্ট্র যে তাকে মুক্তি দিয়েছে তার প্রতিবাদেও নারীরা মাঠে নামছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি ভারতকন্যা তথ্যচিত্রটি নিষিদ্ধ করেও জনবিক্ষোভ বন্ধ করতে পারেনি।

ধর্ষণ নারীর প্রতি সহিংস, নির্মম, বীভৎস একটি অপরাধ। ধর্ষণ ছাড়াও নারী নিপীড়ন বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। সেগুলো আলোচনায় প্রাধান্য কম পায়। নির্ভয়ার মৃত্যু না হলে হয়তো এতখানি আলোচনায় আসতো না। শুধু ভারতীয় সমাজেই নয়। পৃথিবীর সর্বত্রই পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে তো বটেই, আমরা যদি তথাকথিত উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো আমেরিকায় বিদ্যুৎ না থাকলে মিনিটে ৩টি মেয়ে ধর্ষিত হয়। পুঁজিবাদী বিশ্বের গণতন্ত্রের মডেল বৃটেনেও একই অবস্থা। আরব বিশ্বের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ তা বলাইবাহুল্য।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে-নির্ভয়ারা এভাবে কেন ধর্ষিত  হচ্ছেন, মৃত্যুবরণ করছেন। বা মুকেশ শিং-রা যে দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করছেন, তারই বা কারণ কি !

মূল কারণ হচ্ছে- পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় নারী হচ্ছে ভোগ্যপণ্য। সকল ধর্মীয় ব্যবস্থার মূলকথাও একই। শিল্প,সাহিত্য, সংস্কৃতি, সিনেমা-নাটকেও নারীকে একইভাবে তুলে ধরা হয়। নারী হচ্ছে পুরুষের ভোগের জন্য।  মুকেশ বা তার উকিল যা বলেছে তা কেবল এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গিরই স্থুল প্রকাশ মাত্র।

বিশেষভাবে বলতেই হয় যে ভারতের বোম্বের হিন্দি সিনেমায় নারী দেহকে যেভাবে অশ্লীলতা-নগ্নতা দেখানো হয়। যৌনতা প্রদর্শন করা হয়। তাতে তরুণ-যুবকদেরকে ধর্ষণসহ যৌন অপরাধের অন্যান্য দিকেও নিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়াও রয়েছে ইন্টারনেটে যৌন ব্যবসা। পুঁজিবাদীরা নারী দেহকে প্রদর্শন করে হাজার-হাজার ডলার লুটে নিচ্ছে। তরুণ-যুবকদেরকে এর মধ্যদিয়ে বিপথে চালিত করছে। এর জন্য দায়ী পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা। মুকেশ বা মুকেশের মতো ধর্ষণকারীরা এই ব্যবস্থারই সৃষ্টি। যেখানে নারীকে মর্যাদাশীল নারী হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে দেখানো হয় পুরুষের ভোগের সামগ্রী হিসেবে সেক্ষেত্রে নারী তার সম্মান পাবেন কিভাবে। এখানে শ্রেণির প্রশ্নটিকেও ভুলে গেলে চলবে না। এ পর্যন্ত যারা ধর্ষণের মতো অপরাধে অপরাধী হয়েছেন তারা কিন্তু নিরঙ্কুশভাবেই শ্রমিক-কৃষক বা সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ-যুবকরা। তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকা এর অন্যতম কারণ। এজন্যও দায়ী এই গণবিরোধী সমাজ ও রাষ্ট্র। সিনেমা, নাটকে জীবনটাকে দেখানো হয় স্বর্গের রাজ্য হিসেবে। বাস্তব জীবনে সিনেমা নাটকের স্বপ্ন পুরণ হয় না। ফলে তরুণ-যুবকদের একটি অংশ বিপথে চালিত হন।

মুকেশদের মতো যারা অপরাধ করেছে তাদেরকে ফাঁসি দিয়ে নারী ধর্ষণ বা নারী নিপীড়ন বন্ধ হবে না। বরং আরো নারী বিদ্বেষী হয়ে উঠবেন তা মুকেশ-এর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুকেশদের মতো যারা অপরাধী তাদেরকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। যা এই সমাজ ব্যবস্থায় সম্ভব নয়।

ধর্ষণ সমাজ থেকে উচ্ছেদ করতে হলে নারী বিরোধী আইন-কানুন, ধর্মীয় ফতোয়া পরিপুর্ণভাবে বিলুপ্ত করতে হবে। যা এই রাষ্ট্র করতে সক্ষম নয়। এই রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে বিপ্লবী রূপান্তরের মাধ্যমে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই পারে ভারতীয় নারীর উপর থেকে সকল ধরনের নিপীড়নের অবসান ঘটাতে। সে লক্ষ্যেই ভারতের  অন্ধ্র, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা, ছত্রিশগড়, পশ্চিমবঙ্গসহ বিশাল অংশ জুড়ে মাওবাদী নারী বিপ্লবীরা যুদ্ধ চালিয়ে আসছেন। সর্বভারতের নিপীড়িত নারীদেরকেও বিপ্লবী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে। সেই বিপ্লবী যুদ্ধে পুরুষরাও নারীদের সাথি। এই মূল কাজকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি ধর্ষণসহ নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারী-পুরুষের সুপরিকল্পিত আন্দোলন-সংগ্রাম বেগবান করতে হবে।

 ৪ ধর্ষকের ছবি

৪ ধর্ষক



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.