আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি[মাওবাদী] এর দলিল

logo

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ সংগঠিত করা ও পরিচালনার জন্য এগিয়ে আসুন!

আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক প্রকাশিত, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০১

আবারো আফগানিস্তানের দুর্ভোগ-পীড়িত মানুষ আর দুঃখ জর্জরিত এ দেশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বলী হতে চলেছে, এবার তা করা হচ্ছে “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ”-এর ছুতা দেখিয়ে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা একে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছে আর তাদের পক্ষে বিশ্বের তাবত সাম্রাজ্যবাদী আর প্রতিক্রিয়াশীলদের ব্যাপক জোট গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

“সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জোড়া যুদ্ধ”-এর ধুঁয়া হলো এক জঘণ্য মিথ্যাচার, কারণ এ শ্লোগান তুলেছে দুনিয়ার সবচাইতে বড় সন্ত্রাসবাদী শক্তি। ইয়াংকিরা ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন নিজেদের বসত ভিটাতেই। যারাই এ ক্ষত সৃষ্টি করে থাকুক না কেনো তা নিদারুণ পীড়াদায়ক; ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের পরিমাপের কারণেই শুধু নয় বরং বিশেষভাবে এ জন্য যে তা বিশ্ব জনগণের কাছে এটা ফাঁস করে দিয়েছে যে এদের ব্যবস্থাটাই আসলে কতটা দুর্বল আর বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের প্রাসাদ কতটা নড়বড়ে। এ কারণেই এরা আহত পশুর মতো আর্তনাদ করছে এবং এর রক্তাক্ত প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তর্জন গর্জন করছে। আসলে তারা চায় তাদের ক্ষমতা সর্বাধিক ভীতিকর উপায়ে প্রদর্শন করতে এবং বিশ্বের জনগণকে ভয় দেখাতে যাতে বিশ্ব জুড়ে তাদের ক্ষমতা আর আধিপত্য দুর্বল না হয়। এ কারণে তাদের ঘোষিত “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জোড়া যুদ্ধ” হবে, সাধারণভাবে ও বিশেষভাবে আফগানিস্তানের বেলায়, পৈশাচিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী অভিযান।

কারা নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে এই আত্মঘাতি হামলা চালিয়েছে? ওসামা বিন লাদেন ও তার সাঙ্গ পাঙ্গদের এর জন্য এক নম্বর সন্দেহভাজন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু কে এই ওসামা? সে হলো সিআইএ কর্তৃক সৃষ্ট। বছরের পর বছর ধরে সে ছিল ইয়াংকিদের প্রকাশ্য ও অনুগত সেবাদাস এবং হতে পারে সে হয়তো এখনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এক বা একাধিক অংশের সাথে দহরম মহরম বজায় রেখে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেরাই এই “মহা সন্ত্রাসী”-কে জন্ম দিয়েছে, খাইয়ে দাইয়ে বড় করেছে ও শিখিয়ে পড়িয়ে তুলেছে। এই “মহা মুজাহিদীন”-এর সাথে সম্পর্কিত গোষ্ঠী আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের মিত্রদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতি, উৎসাহ দান ও সমর্থনের ভিত্তিতে আফগান জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক গুচ্ছ ভয়াবহ ও বর্বর কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এই গোষ্ঠীকে তারা সৃষ্টি করেছিল আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য ও আমাদের দেশে হানা দেবার জন্য।

তাদেরকে আশ্রয় দেবার অপরাধে, সেই একই “কঠোর নির্যাতন”-এর জন্য, কাদেরকে “সন্ত্রাসী” হিসেবে টার্গেট করা হচ্ছে? তালিকার এক নম্বরে রয়েছে তালেবান শাসকদের নাম। কিন্তু কারা এই তালেবান? আফগানিস্তান ও অত্র অঞ্চলে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগীরাই তাদেরকে মসজিদ আর মক্তব-মাদ্রাসার অন্ধকার কোণা থেকে বাইরে টেনে এনেছিল। এই সমর্থনের বলেই তালেবানরা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করা থেকে উঠে এসেছিল ক্ষমতার মসনদে। তাদের প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষমতার প্রতিপক্ষকে দমন করার ছুতায় এই পাশবিক সন্ত্রাসী চক্র নিজেদের শাসনামলে গণহত্যা, হাজার হাজার লোকের গুম-খুন আর জবরদস্তিমূলকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করার কাজ থেকে পিছপা হয়নি। কোনো সন্দেহ নেই যে জনগণ, মেহনতি মানুষ, নারী ও নিপীড়িত জাতিসমূহের প্রশ্নে তাদের রাজনীতির সারবস্তু হলো ভয়াবহতা ও সন্ত্রাস। এই যে গোষ্ঠীগুলো যাদের স্বঘোষিত করণীয় হলো “শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন” তারা হলো এই বর্বরতা ও সন্ত্রাসের ভয়াবহ প্রতিফলন।

এটা স্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদের খাস গোলামরা ততক্ষণ পর্যন্তই মূল্যবান যতক্ষণ পর্যন্ত তারা উপকারী আর তাদের উপযোগিতা যখন নিঃশেষ হয়ে যায় বা তাদের অস্তিত্ব প্রভুর জন্য ঝামেলার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় অথবা যখন তাদের বদলে ভালো সেবাদাস পাওয়ার বস্তুগত ভিত্তি সৃষ্টি হয় তারা তখন হয়ে পড়ে অপদার্থ, তারা প্রভুর সমর্থন খোয়ায় কিংবা প্রভুর রোষানলে পতিত হয়। মবুতু, সুহার্তো, ফুজিমোরির মতো সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ত পদলেহীরা বছরের পর বছর ধরে প্রভুর খেদমত করার পর জনগণের সংগ্রামের মুখে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার সক্ষমতা হারায়, অথর্ব হয়ে পড়ে এবং আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু পানামার নরিয়েগার অস্তিত্ব প্রভুর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, সে আক্রমণের টার্গেটে পরিণত হয় এবং শুধু ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয় তা-ই নয়, হাতকড়া পরিয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় “বিচার”-এর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় ওসামা ও মোল্লা ওমরের কপালের লিখনও একই। ওসামার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠা সমেত সামগ্রিকভাবে তালেবান প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল সে দেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্রদের কাঙ্খিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন এবং মধ্য এশিয়ায় তাদের প্রভাবের পথ প্রশস্ত করা। কিন্তু এই প্রকল্প মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে কাঙ্খিত ফল দিতে যে ব্যর্থ হয়েছে শুধু তা-ই নয় বরং হয়ে দাঁড়ায় তার উল্টো, মধ্য এশিয়ায় তাদের প্রভাবের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এবং সব মিলিয়ে বিরক্তির কারণে পর্যবসিত হয়। এ কারণে তালেবান ও ওসামা মার্কিনের সমর্থন হারায় ও মার্কিনী প্রভুর কোপানলে পতিত হয়। সেটা অবশ্য এ কারণে নয় যে বিশ্ব খেকো শক্তি সন্ত্রাসবাদ ও ভীতি ফেরি করার বিরোধী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কি ইহুদিবাদ ও দখলদারিত্ব ও ভয়ভীতির কারবারী রাষ্ট্র ইসরায়েলের এক নম্বর সমর্থক নয় যে ইসরায়েল হলো বিশ্বে বিভীষিকা, সন্ত্রাস, হত্যা আর লুটপাটের অন্যতম রক্তপিপাসু গ্যাং? ইহুদিবাদ ও ইসরায়েলী রাষ্ট্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী বিশ্ব জোড়া যুদ্ধ”-এর টার্গেট নয় কোনো? এটা পরিষ্কার যে “যুদ্ধ”-এর টার্গেট হওয়া তো দূরের কথা, তারা বরং এই যুদ্ধ-ক্যাম্পের এক গুরুত্বপূর্ণ সেকশন।

অধিকন্তু, ওসামা গোষ্ঠী কর্তৃক উত্থাপিত এবং তালেবান কর্তৃক ধুঁয়া ধরা “মার্কিনী নাস্তিকতা বিরোধী জিহাদ” শীর্ষক শ্লোগান ডাহা মিথ্যাচার এবং মহা শঠতা মাত্র। আফগানিস্তানের জনগণ “দুর্নীতি ও অবক্ষয় বিরোধী জিহাদ”-এর “ফল” ও “উপকারিতা” হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। এটা স্বতঃস্পষ্ট ও “মার্কিনী নাস্তিকতা”র আক্রমণ বিরোধী আফগান “জিহাদ” যদি একটা ফাঁকা শ্লোগান থেকে কার্যে রূপান্তরিত করাও যায় তাহলেও তা দেশ ও জনগণের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না। জোর সম্ভাবনা রয়েছে যে, হয় এই সেবাদাসরা কোনো না কোনো পরম পূজনীয় প্রভুর সাথে আপোষ করবে অথবা তাদের আক্রমণ ও আগ্রাসনের মুখে যুদ্ধের ময়দান থেকে দ্রুত সটকে পড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে, তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত প্রতিক্রিয়াশীলদের অর্থাৎ “আফগানিস্তানের ইসলামিক রাষ্ট্র”-এর [উত্তরাঞ্চলীয় জোট (ইংরেজি অনুবাদক)] জীবন-মরণ সমস্যা ও অন্ধকারময় অবস্থাও ঘৃণা উদ্রেককারী ও শোচনীয়। এরা সম্প্রতি এতিম ও কাণ্ডারিহীন হয়ে পড়েছে। এই প্রতিক্রিয়াশীলরা ইতোমধ্যেই রাশিয়া, ভারত এবং আফগানিস্তানের সমস্যার সাথে যুক্ত তাদের মিত্রদের খড়বিচালি থেকে পেট ভরাতে শুরু করেছে। শকুনের মতো মৃত পশুর মাংসের ভাগ পাওয়ার আশায় এখন তারা বার বার ঘোষণা দিচ্ছে যে তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকারীদের খেদমত করতে ইচ্ছুক। যাহোক, একদিকে আফগান জনগণের স্বার্থ এবং অপরদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, তাদের সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল মিত্র এবং সাধারণভাবে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাই শুধু নয়, সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী, প্রতিক্রিয়াশীল ও নির্ভরশীল ব্যবস্থার স্বার্থের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ও দ্বন্দ্ব রয়েছে।

সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ ও দখলদারিত্বকে প্রতিরোধ করার মতোই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের মিত্রগণ কর্তৃক আক্রমণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করাটা আফগানের জনগণের পরম অধিকার ও কর্তব্য। কিন্তু এই অধিকার ও কর্তব্যের প্রকৃতি [তালেবানদের] “ইসলামিক আমিরাত”সহ বাধ্য-অবাধ্য নির্বিশেষে সাম্রাজ্যবাদের পদলেহীদের সাথে তাদেরকে দ্বন্দ্বে নিক্ষেপ করেছে। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং বর্তমান পরস্থিতিতে তাকে প্রয়োগ করতে হবে।

আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের হুমকিকে তীব্রভাবে নিন্দা জানাচ্ছে এবং সাম্রাজ্যবাদ এমন আক্রমণ চালালে ও দখল কায়েম করলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে এবং বিশ্ব বিপ্লবের অংশ হিসেবে তার জন্য স্বাধীন ও বিপ্লবী পতাকাতলে জনগণের প্রতিরোধ সংঘটিত ও পরিচালনার উদ্যোগ নেবে। শুধুমাত্র এ ন্যায়সঙ্গত বিষয় যদি একটি বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হয় এবং ক্রমবর্ধিতভাবে শক্তিশালী ও প্রসারিত হয়, তাহলে গণযুদ্ধ ও আফগানিস্তানের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা স্তর হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ যুদ্ধকে আমরা এগিয়ে নিতে পারি। এর একটা অপরিহার্য শর্ত হলো এই যে – তালেবানী বা অ-তালেবানী যে কিসিমেরই হোক না কেনো -“প্যান ইসলামিজম” ও বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল “ধর্মরাজ” বিপ্লবী সংগ্রামের অন্যতম মূল লক্ষ্যবস্তু (one of the main targets) থেকে যাচ্ছে আর এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে হবে ভিন্ন রূপে। তা না হলে জনগণের অমূল্য রক্তদান বৃথা যাবে এবং নিপীড়ন ও দাসত্ব থেকে যাবে অনড়।

সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়া নিপাত যাক!

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের পতাকাকে ঊর্ধে তুলে ধরুন!

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, দীর্ঘজীবী হোক কমিউনিজম!

আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি হলো বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন-এর অন্যতম অংশগ্রহণকারী পার্টি।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য লিখুন: BCM RIM, London WCIN 3XX,UK

সূত্রঃ https://pbspmbrm.files.wordpress.com/2012/09/spark-collections.pdf

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s