ফিলিপিনের কমিউনিস্ট পার্টি’র শহীদ মুখপাত্র ‘কা রজার’ লাল সালাম

tumblr_lsu93uUSE01qesnz6o1_1280-1-791x1024

ফিলিপাইন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (NDFP), নিউ পিপলস আর্মি (এনপিএ) এর ৪৭তম বার্ষিকীতে কমরেড ‘কা রজার’ এর প্রতি আবারো সর্বোচ্চ সন্মান জানিয়েছে।

কা রজার ছিলেন এনপিএ’র একজন দৃষ্টান্তমূলক কমান্ডার ও ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র। ফিলিপিনে ৪৭ বছর ব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে ও ফিলিপিনের জনগণের প্রতি তিনি অকৃত্রিম সেবা করে গেছেন। তার নেতৃত্বে এনপিএ, প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক কৌশলী অভিযান পরিচালনা করেছিল। বহু বছর ধরে মার্কোস স্বৈরতন্ত্রের সময় থেকে কা রজার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রাণবন্ত মুখ হিসেবে ফিলিপিন জনগণের ভালোবাসার ও পছন্দের পাত্র ছিলেন। তিনি একজন চমৎকার যোগাযোগ বিনিময়কারী ছিলেন,  জনগণের আন্দোলনের লাইনকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সম্প্রচার, বিভিন্ন বিষয়, এমনকি সবচেয়ে কঠিন কিছুকে সহজ ব্যাখ্যা এবং খুব বোধগম্য ভাবে জনগণের কাছে উপস্থাপন করতেন। শ্রমজীবি জনগণের কাছ থেকে আসা তাদের অবস্থা, জীবন ও সংগ্রামের গভীরতম অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষা তিনি সহজেই বুঝতে পারতেন। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছেও তিনি বেশ প্রিয় ছিলেন। তারাও ভালোবেসে তার সাক্ষাৎকার নিতেন।

তার স্মৃতি এবং অনুপ্রেরণা সমগ্র জনগণের মধ্যে বেঁচে থাকবে। প্রকৃত ভূমি সংস্কার এবং জাতীয় শিল্পায়ন, মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য এবং শুধু মাত্র দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য তাঁর অবিরাম সংগ্রামের জীবন ও সেবা জনগণের হৃদয়ে আঁকা থাকবে।

কমরেড ‘কা রজার‘ এর প্রতি রইল ‘লাল সংবাদ‘ এর লাল সালাম।।

(অনূদিত)


ব্রাজিলঃ ০২-০৯ এপ্রিল, ২০১৬ ‘আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক পদক্ষেপ’ এর আনুষ্ঠানিক পোস্টার

br


‘দুর্ভাগ্য, এক বিচিত্র কারণেই তাঁকে নিয়ে এত কথা’ – বিনায়ক সেন

বিনায়ক সেন

বিনায়ক সেন

কয়েক দশক ধরে ছত্তিশগড়ের প্রান্তিক অঞ্চলে চিকিত্সা কর্মে নিরলস শৈবাল জানা৷ তাঁর গ্রেফতারি এবং দেশ জুড়ে স্বাধীন মতের কণ্ঠরোধ কি নিছকই সমাপতন ?

লিখছেন বিনায়ক সেন

ডঃ শৈবাল জানা

ডাঃ শৈবাল জানা

প্রায় তিরিশ বছর ধরে ডা . শৈবাল জানাকে চিনি আমি৷ তিনি আমার বন্ধু, সহকর্মী এবং সহযোদ্ধা৷ একটি হাস্যকর এবং বিভ্রান্ত বিচার প্রক্রিয়ার ফেরে তিনি দুর্গের জেল হাজতে ছিলেন৷ এবং সেই ঘটনার জেরে তাঁর নাম সংবাদ -শিরোনামেও বটে৷ শনিবার জামিনে মুক্তি পেলেন তিনি৷ গত তিরিশ বছর ধরে শৈবাল , তাঁর স্ত্রী আলপনা এবং দল্লির শহিদ হাসপাতালের এক দল দায়িত্ববান চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মী চেষ্টা করে যাচ্ছেন , কী ভাবে গরিব মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়৷ পঞ্চাশ হাজার মানুষের বসতি যে দল্লি শহরে , সেখানেই যে তাঁরা শুধু কাজ করেছেন তা-ই নয় , দল্লি -রাজহরা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের দণ্ডকারণ্যের হতদরিদ্র বাঙালি উদ্বাস্ত্তরাও দীর্ঘ কাল ধরেই তাঁদের চিকিত্সা পরিষেবায় উপকৃত৷ বস্ত্তত বহুকালের চেষ্টা ও পরিশ্রমে ছত্তিশগড়ের একটা বড়ো অংশে প্রান্তিক মানুষের কাছে চিকিত্সার সুযোগ পৌঁছে দিতে পেরেছেন শৈবাল , আলপনা এবং এই হাসপাতালের চিকিত্সক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা৷ দল্লি -রাজহারা শহিদ হাসপাতালটি আজ ১৫০ শয্যার একটি আইকনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র৷ অথচ , শুরুতে ছিল ছোট্ট একটা ক্লিনিক৷ সেই ক্লিনিকও বসত এক চিলতে জায়গায় , একটি মোটর গ্যারাজের ভিতরে৷ আজ সেটি নিছক বড় একটা হাসপাতালই নয় , পড়ানোরও বন্দোবস্ত রয়েছে সেখানে৷ সেই ছোট্ট একটা ক্লিনিক যে আজ এমন একটা হাসপাতাল হয়ে উঠতে পেরেছে , সেই রূপান্তরের অন্তরালে রয়েছে শৈবাল জানার সুযোগ্য নেতৃত্ব৷ ছত্তিশগড়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ , যাঁদের বেশির ভাগই বসবাস দারিদ্রসীমার নীচে , তাঁদের একটা বড়ো ভরসার জায়গা এই হাসপাতাল৷ এর আগে পর্যন্ত তাঁদের অবলম্বন বলতে ছিল স্রেফ ওই রায়পুর মেডিক্যাল কলেজ৷ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করা মানুষদের জন্য যে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প রয়েছে , সেগুলি যথাযথ ভাবে ব্যবহার করে তাঁদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এই হাসপাতালের চিকিত্সক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা৷ এবং শেষ পর্যন্ত সে কাজে যথেষ্ট সাফল্যও পেয়েছেন৷ শৈবালের নেতৃত্ব ছাড়া হয়তো এটা সম্ভব হত না৷ ১৯৯১ সালে ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার নেতা শঙ্কর গুহনিয়োগীর গুন্তহত্যার পর -পরই নিজেদের ন্যায্য দাবি -দাওয়া নিয়ে ছত্তিশগড়ের আদিবাসী -শ্রমিকরা বড়ো আকারে শান্তিপূর্ণ ধর্না শুরু করেন৷ ১৯৯২ সালের জুলাইয়ে তা ‘রেল রোকো ’ কর্মসূচির রূপ পায়৷ আন্দোলন চলার গোটা পর্যায়টা জুড়েই শৈবাল আন্দোলনকারীদের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন৷ উদ্দেশ্য , কোনও আন্দোলনকারী যদি হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন , যাতে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চিকিত্সার ব্যবস্থা করা যায়৷ ১ জুলাই পুলিশ নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ জমায়েতে গুলি চালায়৷ মারা যান ষোলো জন শ্রমিক৷ আহতদের চিকিত্সার বন্দোবস্ত করলেন শৈবাল৷ বেশ কয়েকটি ধারায় প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে৷ তার মধ্যে একটি ছিল ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৩৩ নম্বর ধারা — সরকারি কর্মীকে কাজে বাধাদান৷ কিন্ত্ত ১৯৯২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত শৈবালকে এক বারের জন্যও কোনও সমন পাঠানো হয়নি৷ তত্সত্ত্বেও তাঁকে ‘ফেরার ’ ঘোষণা করা হল৷ যদিও দল্লির পুরনো বাজারচক এলাকা থেকে মাত্র ২০০ মিটার হেঁটে গেলেই যে কোনও পুলিশ অফিসার তাঁকে দেখতে পেতেন ! বস্ত্তত , দল্লিতে থেকে শৈবালকে চেনেন না বা তিনি কোথায় থাকেন জানেন না , এমন কোনও ওয়াকিবহাল মানুষ খুঁজে পাওয়াই শক্ত৷ যখন শৈবাল আরও কিছু কর্মীর সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ‘আত্মসমর্পণ ’ করলেন , তখনই ‘আবিষ্কৃত’ হল তিনি ‘ফেরার ’! সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জেলে পোরা হল৷ অন্য কর্মীদের অবশ্য গ্রেফতার করা হয়নি৷ শৈবালের একজন সহকর্মী হিসেবে আমি আর কী -ই বা বলতে পারি ! শৈবাল অত্যন্ত ভালো চিকিত্সক৷ নানা ধরনের রোগের চিকিত্সায় শৈবালের জুড়ি দেখিনি৷ যক্ষ্মা , প্রসূতির সমস্যা , ম্যালেরিয়া , সেপ্টিসেমিয়া , শিশুরোগ , হূদরোগ , হাড়ভাঙা , থায়ারোটক্সিকোসিস , মানসিক সমস্যা থেকে শুরু করে নিতান্ত মাথা ব্যাথা — সব কিছুরই চিকিত্সায় তিনি দড়৷ আর সব চেয়ে বড়ো কথা হল , দল্লি বা তার আশপাশের এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের কাছেই শৈবাল জানা যেন একজন অভিভাবক , অভিজ্ঞ ‘বুড়া ’৷ অথচ নিতান্ত নির্বোধ একটি গ্রেফতারির জন্য শৈবালের দিকে আজ সাধারণ মানুষের নজর পড়েছে৷ সেখান থেকেই আন্দাজ করা যায় , এই সময়ে জনগণের ভাবনা -চিন্তা , আলাপ আলোচনার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে৷ শৈবালের গ্রেফতারির ঘটনাটি এমন সময়েই ঘটল , যখন ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের অধিকারের পক্ষে যে কেউ কোনও স্বাধীন মত প্রকাশ করলেই — তা তিনি সাংবাদিক , আইনজীবী বা স্বাস্থ্যকর্মী যাই হোন না কেন , নেমে আসছে দমন -পীড়ন৷ আজকের পরিস্থিতি নানা দিক থেকেই ২০০৫ -০৬ সালের সেই সালওয়া জুড়ুমের মতো৷

লেখক– বিশিষ্ট চিকিত্সক -সমাজকর্মী